ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৩০)

আলাপ
আজ মিলিয়ে মিশিয়ে মাইহার ঘরানার অনন্য শিল্পী রবিশংকর, অন্নপূর্ণা দেবী, আলি আকবর ও নিখিল ব্যানার্জীর কথা। তখন বিশের দশকের শেষ। একদিন মাইহারে বাবা আলাউদ্দীনের সেই বাড়ির বারান্দায় বসে রেওয়াজ করছিলেন তাঁর ছেলে ছোট্ট আলি আকবর। বাবা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন শক্ত যন্ত্র সরোদ। বাবার ঘরানাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্ব তো তাঁরই! ছোট্ট আলি আকবর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন একটা কঠিন তান সরোদে সঠিকভাবে বাজানোর। বাবা আলাউদ্দীনের শাসণ খুব কড়া! সেই ভোরবেলা থেকে শুরু হয়েছে রেওয়াজ। উঠোনে খেলে বেড়াচ্ছিলো ছোটবোন অন্নপূর্ণা। সে হঠাত ছুটে এলো। বললো “কী বাজাচ্ছো? এ তান তো এমন নয়। আমি আব্বুর বাজানো শুনেছি! শোন তবে” বলে ছোট্ট মেয়েটি নির্ভুলভাবে গেয়ে দেখিয়ে দিলো সেই তান! হতবাক হয়ে গেছে আলি আকবর! কী মিষ্টি সুরেলা কন্ঠ আর তানের কী নিকাশ! মেয়েটি সব ভুলে গেয়ে চলেছে। কখন যে বাবা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছেন, সে খেয়ালই করেনি! হঠাত পিঠে বাবার হাত পড়তে চমকে উঠে ভয় পেয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো! এক্ষুণি না তবলার হাতুড়ি পড়ে পিঠে! বাবার মেজাজ চড়লে এমনকি মাইহারের রাজার দিকেও নাকি একবার ছুঁড়ে মেরেছিলেন হাতুড়ি, রাজার বেসুরো স্বর শুনে! কিন্তু না, আব্বু তো কিছুই বললেন না! অন্নপূর্ণার বড়ো দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। দিদিকে যন্ত্র শিখিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু বিয়ের পর এতে মেয়ের গোঁড়া শ্বশুরবাড়িতে খুব অশান্তি হয়। তাই আব্বু তাকে শেখাননি সঙ্গীত। এ যে তার কী দুঃখ! সঙ্গীতই তো প্রাণ ছোট্ট মেয়েটির। তার ওপর আজ এই কান্ড! দুপুরবেলা অন্নপূর্ণাকে ঘরে ডেকে পাঠালেন বাবা আলাউদ্দীন। ভয়ে ভয়ে গেলো অন্নপূর্ণা! কী না জানি বলেন আব্বু! কিন্তু আদর করে তাকে বসালেন আব্বু। বললেন “তোমার মধ্যে সঙ্গীত আছে! তুমি নির্ভুল শুনিয়েছো আমার তৈরী কঠিন তান! তোমাকে না শেখালে খোদা আমাকে মাফ করবেন না। আমি বিশ্বাস করিনা মেয়েরা সঙ্গীত শিখতে পারে না। ইসলামে এমন কথা কোথাও বলা নেই। তুমি প্রথমে কিছুদিন সেতার শেখো। তারপর তোমাকে দিয়ে যাবো আমার গুরুর দেওয়া ঐশ্বর্য – সুরবাহার! আর কারো হাতে এ যন্ত্র তুলে দিইনি আমি। খুব শক্ত যন্ত্র! প্রচুর রেওয়াজ করতে হবে। কোন জাগতিক লোভ থাকলে হবে না। কারণ সেতার সরোদ শুনে অনেক মানুষ সহজে তারিফ করবে, পয়সা দেবে। কিন্তু এ যন্ত্র শুনে বোঝার লোক কম! তবে যে বুঝবে, সে সারা জীবন এর রসে বুঁদ হয়ে থাকবে। তুমি বলো তুমি কী করতে চাও। শুধু সেতার শিখবে, নাকি সুরবাহার শিখবে ও বাজাবে?” অন্নপূর্ণার মন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে গেলো! দাদার মতো সেও তবে শিখতে পারবে সঙ্গীত! সে ছোট থেকেই খুব শান্ত, কম কথা বলে। শুধু বললো “আপনার যা আদেশ আব্বু!”
কিছুদিনের মধ্যেই আলাউদ্দীন বুঝলেন অন্নপূর্ণার অসাধারণ প্রতিভা! তার সেতার ও সুরবাহারের গুঞ্জরণে ভরে উঠলো মাইহারের সেই ছোট্ট বাড়িটি! অপরপক্ষে অসাধারণ সরোদ বাজাতে লাগলেন আলি আকবর। কিছুদিনের মধ্যেই এসে উপস্থিত হলেন রবিশংকর! সে যেন সঙ্গীতের এক ত্রিবেণীসঙ্গম! প্রত্যেকেই অসম্ভব প্রতিভাবান, তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন অন্নপূর্ণা! বাবা নিজে বলতেন যে অন্নপূর্ণা যেন স্বয়ং দেবী সরস্বতীর বরপুত্রী! কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিভাত হলো যে অন্নপূর্ণা দেবী যদি প্রতিভার দিক থেকে বাবা আলাউদ্দীনের ৮০ শতাংশ হন, আলি আকবর তবে ৭০ শতাংশ আর রবি শংকর ৪০ শতাংশ! আর সেখানেই মূল গন্ডগোলের সূচনা। দীর্ঘ কঠিন শিক্ষা ও দিনে আঠেরো ঘন্টা রেওয়াজের পর, মাত্র তেরো বছর বয়সে এলাহাবাদে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনে প্রথম বাজালেন আলি আকবর খান! চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেলো! এর ঠিক দুবছর পর ১৯৩৮ সালে প্রথম বাজাতে গেলেন রবিশংকর। তখনও তার নাম রবীন্দ্রশংকর! সেখানে আলি আকবর তার সেতারের সাথে সরোদে সহযোগ করলেন। সূচনা হলো এক অসাধারণ যুগলবন্দী জুটির!
এই জুটি এরপর বহু বহু অসাধারণ যুগলবন্দী বাজিয়েছেন, যা মন্ত্রমুগ্ধ করেছে শ্রোতাদের।
আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে একবার এই যুগলবন্দী শোনার সৌভাগ্য হয় যখন দুজনেই একেবারে শেষ বয়সে পৌঁছেছেন। সেবার ডোভার লেন মিউসিক কনফারেন্স আলি আকবর খানকে বিশেষ সম্মাননা দেবেন ঠিক করলেন। সেই সম্মাননা নেওয়ার জন্য ও বাজানোর জন্য আমেরিকা থেকে এলেন আলি আকবর। সঙ্গে তার ছেলে আলম খান। সেবার রবিশংকর কোন কারণে কলকাতায় ছিলেন সে সময়। তিনি আলি আকবর বাজাবেন এবং সম্মানিত হবেন শুনে চলে এলেন অডিটোরিয়ামে। তার আগে বহু বছর দুজনে নিজেদের মধ্যে বিভেদের কারণে একসঙ্গে বাজানো ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু পারস্পরিক বন্ধুত্ব এবং সাংগীতিক টান মনে রয়েই গেছে। আলি আকবরের হাতে সম্মান তুলে দিতে উদ্যোক্তারা মঞ্চে ডেকে নিলেন পন্ডিত রবিশংকরজীকে! স্টেজে উঠে দুজনে জড়িয়ে ধরলেন দুজনকে! সে এক ঐতিহাসিক মূহূর্ত! দুজনেই আমেরিকায় থেকেও নাকি যোগাযোগ ছিলো না বহু বছর। অতঃপর বাজাতে বসলেন আলি আকবর। সেটিই বোধহয় তার শেষ বাজনা ছিলো ডোভার লেনে। পন্ডিতজীকে বহু অনুরোধ করায় তিনিও বসেছিলেন স্টেজে। তখন তিনি চেয়ারে বসে বাজাতেন। মঞ্চে বসতে পারতেন না আর। একটু আলাপ বাজিয়েছিলেন দুজন একসঙ্গে। তাতেই হল ফেটে পড়েছিলো করতালি ধ্বনিতে!
পিছিয়ে যাই সেই ত্রিশের দশকে। বাবা আলাউদ্দীন তো তার প্রিয় ছাত্র রবুর হাতে তুলে দিলেন কন্যা অন্নপূর্ণাকে। শোনা
যায় তাঁদের মধ্যে নাকি প্রেম বা রোমান্স তেমনভাবে কিছু গড়ে ওঠেনি আলাউদ্দীনের কঠোর অনুশাসনে। তিনি
ছাত্রছাত্রীদের ব্রহ্মচর্য পালন করাতেন, যা আগেই বলেছি। তাই বিয়েটি ছিলো, যাকে বলে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। দুজনের
কেউই গুরুর আদেশ অমান্য করতে পারেননি। অন্নপূর্ণা দেবী হিন্দু হয়েছিলেন এবং হিন্দু মতেই দুজনের বিবাহ হয়।
আলাউদ্দীন খানের বাড়ির দোতলার ছোট্ট একটি ঘরে বৈবাহিক জীবনযাপন করতে শুরু করেন দুজন। সেই ঘরটি
আজও তেমনই সংরক্ষিত আছে। পুরোনো একটি ডবল বেডের ওপর পড়ে আছে একটি বড়ো তানপুরা। একটি টেবলের
ওপর রাখা একটি ভয়েস রেকর্ডার, একটি বোন চায়নার টি-সেট, একটি ছোট ড্রেসিং টেবলের আয়নায় এখনো লাগানো
আছে একটি টিপ! রামকৃষ্ণপরমহংস দেবের একটি ছবি! একটি বড়োসড় হারমোনিয়াম! সব কিছুর ওপরে
পড়েছে দীর্ঘদিনের ধূলোর আস্তরণ! দেয়ালে কীটদংশিত মা মদিনা দেবী ও মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবীর একটি ছবি আর কিছু
বন্দিশের স্বরলিপি সহ একটি খাতা। পঞ্চাশ বছরে কেউ পা দেয়নি সে ঘরে যেখানে ভারতের দুই শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ তাঁদের
বিবাহপরবর্তী সোনালী দিনগুলি কাটিয়েছিলেন! শোনা যায় বিয়ের পর একসাথে নানা কনফারেন্সে বাজাতে শুরু করেন
অন্নপূর্ণা দেবী ও রবিশংকর। এমন নানা অনুষ্ঠান শেষে শ্রোতারা ঘিরে ধরতো অন্নপূর্ণাজীকে। তুলনায় রবিশংকর
শ্রোতাদের প্রশংসা পেতেন কম! রবিশংকর অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন। তার উচ্চাশা এবং স্বভিমান এতে আঘাত পেতো।
বছরখানেকের মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁদের পুত্র শুভেন্দ্রশংকর। এরপর মাইহার ছেড়ে মুম্বাইতে বসবাস করতে যান এই
দম্পতি। জন্ম থেকেই ইন্টেস্টাইনের সমস্যা ছিলো শুভশংকরের। রাতে সে যন্ত্রনায় কাঁদত, ঘুমোতে পারতো না। এতে
রেওয়াজে বাধা পড়তো রবিশংকরের। অন্নপূর্ণারও বাবা আলাউদ্দীনের মতো উঁচু মেজাজ। দুজনের মধ্যে শুরু হলো
ঝগড়া ও মতবিরোধ! ছেলে সেরে উঠলেও এই বিরোধ ঘুচলো না। ক্রমে অন্নপূর্ণা বুঝতে পারলেন জনসমক্ষে তার
বাজানো এবং শ্রোতাদের তাকে ঘিরে ধরা পছন্দ করছেন না রবিশংকর। তিনি স্থির করলেন আর কনফারেন্সে বাজাবেন না। এমনকি তিনি দেবতার সামনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে আর বাইরে বাজাবেন না। কিন্তু ততোদিনে দুজনের বিরোধ চরম রূপ নিয়েছে। এমন সময় অন্নপূর্ণা জানতে পারলেন যে রবিশংকর কমলা শাস্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত। দুজনের ঝগড়া নতুন মোড় নিলো। অন্নপূর্ণা বললেন “তোমার আমার প্রতি কোন ভালোবাসা নেই? বাবার কাছ থেকে তার পুরো সঙ্গীত আত্মস্থ করার জন্যই তুমি আমাকে বিবাহ করেছিলে?” অবশেষে কমলা শাস্ত্রীর বিবাহ অন্যত্র হয়ে যাওয়ার পরও তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ রোখা গেলো না। এই কাহিনী নিয়েই পরে শোনা যায় হৃষীকেশ মুখার্জী অভিমান সিনেমাটি তৈরী করেছিলেন। ক্রমে শুভশংকর সঙ্গীত ও আঁকার দিকে তার প্রতিভা প্রদর্শন করলেন। জেজে স্কুল অফ আর্টে আঁকা শিখতে শুরু করলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে পারিবারিক জীবনে ভাঙ্গনের ফলে দীর্ঘদিনের জন্য অন্নপূর্ণা দেবী শুভকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান এবং পন্ডিতজীও আমেরিকা যাওয়ার আহবান পেয়ে চলে যান। শুভকে নিয়ে মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন অন্নপূর্ণা এবং ছেলেকে শেখাতে শুরু করেন প্রাণমন দিয়ে। দীর্ঘ শিক্ষার পর শুভশংকর অসাধারণ সেতার বাজাতে শুরু করেন। সেই সময় একবার রবিশংকর বিদেশ থেকে মুম্বই আসেন। একটি স্টুডিওতে ভাগ্যক্রমে তিনি ছেলের রেকর্ডিং শোনেন এবং কৌতুহল প্রকাশ করেন যে শিল্পী কে। পরে তার নিজের সন্তান জানতে পেরে তিনি শুভকে ডাকেন এবং তার সঙ্গে আমেরিকার যেতে বলেন। অন্নপূর্ণা দেবী শুভকে বলেন যে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু তার সমস্ত বিরোধ সত্ত্বেও শুভশংকর রবিশংকরের সঙ্গে বিদেশ চলে যান। একেবারে একা এবং জনবিমুখ হয়ে পড়েন অন্নপূর্ণা। তারপর থেকে তার বাজনা আর কেউ শোনেনি। তিনি শুধু ছাত্রদের শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করেন এবং তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে থাকেন। এরপর একমাত্র বিটলস জর্জ হ্যারিসন যখন ভারতে আসেন তখন প্রধাণমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে তিনি একমাত্র হ্যারিসনকে তার রেওয়াজ শুনতে দেন। এই কারণে অন্নপূর্ণার অসাধারণ সঙ্গীতের তেমন কোন রেকর্ড নেই। কিন্তু রয়েছেন তার বিখ্যাত ছাত্ররা, যেমন হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, নিখিল ব্যানার্জী ইত্যাদি। তাঁদের বাজনার মধ্য দিয়েই অন্নপূর্ণা দেবী অমর হয়ে আছেন। শোনা যায় তিনি যখন তাঁদের ঘরের বিখ্যাত রাগ ইমন কল্যান কিংবা মিয়াঁ মল্লার রেওয়াজ করতেন মধ্যরাতে, সেখানে অপূর্ব ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়তো, ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো। বাবা আলাউদ্দীন বলে গেছিলেন এমন হলে বুঝতে হবে স্বয়ং দেবী সরস্বতী সেখানে নেমে এসেছেন।
আমেরিকায় ভারতীয় সঙ্গীতকে নতুনভাবে তুলে ধরেন রবিশংকর! বহু বিদেশী মানুষ প্রথম শোনেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রথম রবিশংকরের হাত ধরে। রবিশংকরের প্রচেষ্টাতেই পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধন সম্ভব হয়। বিখ্যাত বেহালাবাদক ইহুদী মেনুহিনের সঙ্গে “ইস্ট মিটস ওয়েস্ট” সিরিজের বিখ্যাত রেকর্ডগুলি কিংবা বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের তার ছাত্র হওয়ার গল্পগুলি তো সর্বজনবিদিত। সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালি, অপরাজিত ইত্যাদি ছবিগুলিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন পন্ডিত রবিশংকর। বহু অনুষ্ঠানের জন্য সূচনা সঙ্গীত তৈরী করেন পন্ডিতজী, যেমন “স্বাগতম, অথ স্বাগতম, আনন্দ মঙ্গল মঙ্গলম”। আমেরিকায় রবিশংকরের সঙ্গে পরিচয় হয় এক অস্ট্রেলিয়ান অভিনেতা এবং কন্সার্ট প্রোমোটার স্যু জোন্সের। বেশ কিছুদিন রবিশংকরের আমেরিকান কন্সার্টগুলি বুকিং এবং দেখাশোনা করতেন স্যু এবং ক্রমে তাঁর ওপর রবিশংকরের নির্ভরতা বাড়তে থাকে। তাকে বিয়ে না করলেও, তাঁরা বেশ কিছুদিন একসঙ্গে বসবাস করতেন। স্যু জোনস-এর সঙ্গেই তাঁর কন্যা নটি গ্র্যামি জয়ী গায়িকা নোরা জোনস। রবিশংকর শেষ বয়সে বিবাহ করেন সুকন্যা দেবীকে, যার সঙ্গে তার কন্যা অনুষ্কা শংকর বহন করে চলেছেন মাইহার সেতারে ঘরানার ধারা।
শুভশংকর আমেরিকা গিয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে পিতার সঙ্গে বাজাতে শুরু করেন, কিন্তু তিনি চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। তাকে ধরে রাখার কেউ ছিলো না। সহজ প্রলোভনে পা দিয়ে তিনি রেওয়াজ প্রায় বন্ধ করে দেন। বিদেশেই বিয়ে করেন এবং তার দুই সন্তান হয়। একসময় তিনি দেশে ফিরে আসেন। মায়ের কাছে আবার শেখা শুরু করেন। ততদিনে বুঝতে পেরেছেন মায়ের কাছে শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে গিয়ে কী ভুল করেছেন। কিন্তু তিনি আবার বিদেশে ফিরে যান। শেষবার যখন আসেন পন্ডিতজীর সঙ্গে একটি যুগলবন্দী বাজান। সেটিই তার শেষ বাজনা। অসুস্থতার ফলে অসময়ে তার মৃত্যু হয়।
পন্ডিত রবিশংকরের মতো ওস্তাদ আলি আকবরও সরোদে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি প্রথমে কলকাতায় তার সঙ্গীত স্কুল এবং পরে আলি আকবর কলেজ অফ মিউসিক স্থাপন করেন। ক্রমে এই কলেজ তার সঙ্গে আমেরিকায় চলে যায় এবং অসংখ্য বড়ো হলে এবংকনফারেন্সে আমৃত্যু বাজানোর পাশাপাশি সেখানে অসংখ্য দেশী বিদেশী ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা দেন। অনেকগুলি নতুন রাগ তৈরী করেছিলেন তিনি। সরোদ বাজনা সম্বন্ধে তিনি বলতেন “দশ বছর রেওয়াজ করার পর তুমি হয়তো তোমাকে খুশী করার মতো বাজাতে পারবে, বিশ বছর পর শ্রোতাকে খুশী করার মতো বাজাবে আর ত্রিশ বছর পর হয়তো তুমি তোমার গুরুকে খুশী করার মতো বাজাবে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী হওয়ার জন্য তোমাকে আরো অনেক বছর বাজাতে হবে।“ চেতন আনন্দের আঁধিয়াঁ, সত্যজিত রায়ের দেবী, তপন সিংহের ক্ষুধিত পাষাণ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি সিনেমায় সুরারোপ করেন ওস্তাদ আলি আকবর। চন্দ্রনন্দন, নন্দকোষ, কৌশি কানাড়া ইত্যাদি তার সৃষ্ট কয়েকটি অসাধারণ রাগ। আলি আকবর তিনবার বিবাহ করেন। তার পুত্র ধ্যানেশ খান, আশিস খান প্রভৃতি এগিয়ে নিয়ে চলেন ঘরানার ধারা। আমি ডোভার লেন গভীর রাতে ওস্তাদজীর বাজনা শুনেছি বেশ কয়েকবার। দরবারীর সেই অভিঘাত ভোলার নয়। ওস্তাদজীর বাজনার বৈশিষ্ট যেটি আমার মনে হয়েছে তা হলো অসাধারণ মীড়ের প্রয়োগ এবং অত্যন্ত বলিষ্ঠ স্বরাঘাত! সেই সুরেলা জোর আঘাত মধ্যরাতের ঘুম ভাঙ্গিয়ে গোটা হলকে বাধ্য করতো মহা শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে শুনতে! সরোদ এমন একটি যন্ত্র, যাতে কোন সুরের ঘাট থাকে না। সেতারে যেমন প্রতিটি স্বরের ঘাট থাকে, সরোদ কিন্তু বাজাতে হয় সম্পূর্ণ হাতের আন্দাজ ও টানের ওপর! সেই যন্ত্রে এমন মীড় যা হৃদয় নিংড়ানো! কতো রেওয়াজে অমন বিশুদ্ধ স্বর ও শ্রুতি প্রয়োগ হয় তা সে বাজনা না শুনলে বিশ্বাস হয় না।
সবশেষে বলি মাইহার ঘরানার আর এক বিখ্যাত শিল্পী নিখিল ব্যানার্জীর কথা। কলকাতায় ১৯৩১ সালে তার জন্ম। পিতা সেতার বাজাতেন, কিন্তু তিনি চাইতেন না ছেলে সেতার বাজাক। অথচ শিশু নিখিলের ছোটবেলা থেকেই বাবার মতো বাজানোর শখ। অবশেষে চার বছর বয়সেই হাতে তুলে নেন সেতার। অল্পদিনের মধ্যেই পিতার শিক্ষাই তিনি বিস্ময় বালকে পরিণত হন এবং মাত্র নয় বছর বয়সে সর্বভারতীয় সেতার প্রতিযোগিতা জিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সবচেয়ে কম বয়সী শিল্পী হিসাবে পারফর্ম করেন। এই সময় কলকাতায় আমীর খানের খেয়াল নিখিল ব্যানার্জীকে গভীর প্রভাবিত করে এবং কয়েক বছর তিনি যেন সেই সঙ্গীতে বুঁদ হয়ে থাকেন। ১৯৪৭ সালে বাবা আলাউদ্দীনের সঙ্গে কলকাতায় দেখা হয় নিখিল ব্যানার্জীর এবং তিনি বাবার সরোদ শুনে মুগ্ধ হন ও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চান । বাবার তখন প্রচুর ছাত্র, তিনি আর নতুন ছাত্র নিতে চাননি। পরে একটি রেডিও সম্মেলনে নিখিলের বাজনা শুনে তিনি মত পরিবর্তন করেন এবং তাকে মাইহারে ডেকে পাঠান। সেখানে সেই কঠোর চর্চার মধ্য দিয়ে তার শিক্ষা শুরু হয়। ভোর চারটা থেকে উঠে সারাদিন কয়েকটি বিশ্রাম ছাড়া রেওয়াজ সেই গভীর রাত পর্যন্ত। সঙ্গে শিখছেন রবিশংকর, আলি আকবর, পান্নালাল ঘোষ বাঁশীতে, অন্নপূর্ণা দেবী সুরবাহারে! সে এক নক্ষত্র সমাবেশ! কিন্তু আশ্চর্য ভাবে বাবা আলাউদ্দীন তার ঘরানার বৈশিষ্ট ও বাজ প্রত্যেক ছাত্রকে শেখালেও প্রত্যেকের মধ্যে আলাদা শৈলী ও স্টাইল তৈরী হয়! এখানেই তার শিক্ষার সার্থকতা!
শিক্ষা শেষে নিখিল ব্যানার্জী গোটা ভারতবর্ষ ঘুরে বিভিন্ন কনফারেন্সে এবং ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বাজাতে লাগলেন। সঙ্গে নিয়মিত রেডিওর অনুষ্ঠান, রেকর্ডে বাজানো চলতে লাগলো। ক্যালিফোর্নিয়ায় আলি আকবর কলেজ অফ মিউসিকেও আমন্ত্রিত হয়ে বাজান ও শিক্ষাদান করেন তিনি। আশির দশকে হার্টের অসুখ শুরু হয় শিল্পির। পরপর তিনটি হার্ট অ্যাটাক হয়। অতঃপর ১৯৮৬ সালে তিনি তার কন্যার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার পর ডোভার লেনে বাজাতে আসেন। সঙ্গে বাজাচ্ছিলেন স্বপন চৌধুরী। তার নিজের মুখে তিনি বলেন কীভাবে মারা গেলেন নিখিল ব্যানার্জী। সে কথা শুনি স্বপন চৌধুরীর একটি বাজনার অনুষ্ঠান যখন শুনতে যাই। ঝালায় প্রচন্ড গতিতে বাজাতে বাজাতে হঠাত তার ছিঁড়ে যায়! এমন প্রায়ই হয় সেতারে। তাই স্বপনবাবু তবলা চালিয়ে যেতে থাকেন, এই আশায় যে শিল্পী অল্প সময়েই তার পরিবর্তন করে আবার ঝালা শুরু করবেন। তার বের করে পরাতেও যান নিখিল ব্যানার্জী। কিন্তু তার না পরিয়ে আস্তে আস্তে তার মাথাটি ঢলে পড়ে সেতারের ওপর! হঠাত তাকিয়ে তবলা থামিয়ে দেন স্বপন চৌধুরী! ছুটে যান পন্ডিতজীর দিকে! ছুটে আসেন কর্মকর্তারা! তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইমার্জেন্সিতে! কিন্তু ততক্ষণে থেমে গেছে তার দুর্বল হৃদযন্ত্র! অকালে মৃত্যু হয় এক অসাধারণ সেতার শিল্পীর! বাবার ভান্ডারে ছিলো নিখিল ব্যানার্জীর মেঘমল্লার! নীচের পঞ্চম থেকে রেখাবের সেই মোচড় যেন কানে লেগে আছে! পন্ডিত নিখিল ব্যানার্জীর বৈশিষ্ট ছিলো তার বাজনার মিষ্টত্ব ও এক অদ্ভুত গভীরতা! রাগগুলি যেন বাঙময় হয়ে উঠতো সেতারের তারের তন্ত্রীতে! আলি আকবরের বাজনাকে যদি পুরুষালী বলা যায়, তবে নিখিল ব্যানার্জীর বাজনায় ছিলো এক অপূর্ব কোমলতা! একই গুরু কিন্তু অসাধারণ দুই স্টাইল! অনন্য মাইহার ঘরানা ও তার পৃথিবীখ্যাত অমর শিল্পীরা!