ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৪২)

আলাপ

শুরু করছি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং নৃত্য ঘরানাগুলির কথা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় ভরত মুনীর নাট্যশাস্ত্রে। ভরত মুনী নাট্যশাস্ত্র রচনা করেন আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্বাব্দ দুশো থেকে খ্রীষ্টিয় দুশো শতাব্দীর মধ্যে। এতে ছত্রিশটি পর্বে মোট ছ হাজারটি শ্লোক আছে। শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, অদ্ভুত, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, শান্ত এই নয়টি রস বা নবরসের বর্ণনা আছে। গ্রন্থে তান্ডব নাচের তত্ত্ব, ভাব, অভিব্যাক্তি, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দ্বারা ঈঙ্গিত, অভিনয় তত্ত্ব, দাঁড়াবার নানা ভঙ্গিমা এবং মূল নৃত্যের পদক্ষেপগুলি বর্ণিত আছে। এইগুলিই ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের অঙ্গ। এই পৌরাণিক গ্রন্থ অনুযায়ী, নৃত্য ও উপস্থাপন কলা আসলে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, তার গুণাগুণ এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলির আদিতত্ত্বের প্রকাশ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, ঐতিহ্যগত ভাবে নানা অভিব্যক্তিপূর্ণ ও অভিনয়যুক্ত ধর্মীয় উপস্থাপন-কলা যা অনেকটা নৃত্যনাট্যের মতো উপস্থাপন করা হয়। কোন কোন নৃত্যধারা শৈব, কোনটি আবার বৈষ্ণব রীতি ও নানা মহাকাব্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কখনো আবার তার মূলভাব দ্রাবিড় গোষ্ঠির নানা লোকাচারের মধ্যে প্রোথিত।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ও স্বীকৃত নৃত্যধারাগুলি হলো – কত্থক – উত্তরপ্রদেশ, ভারতনাট্যম – তামিলনাড়ু, মোহিনীআট্যম – কেরালা, কুচিপুরী – অন্ধ্রপ্রদেশ, কথাকলি ও মোহিনীআট্যম – কেরালা, ওড়িশী – উড়িষ্যা, মণিপুরী – মণিপুর, শাত্রিয় ও গৌড়িয় – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। এছাড়াও ছৌ নাচ, যক্ষগণা, ভাগবত মেলা ইত্যাদি নৃত্যধারাকে নানা সময় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই সব নৃত্যের সঙ্গে যে সঙ্গীত পরিবেশিত হয় তা ঐ রাজ্যগুলির নিজস্ব ভাষা অথবা সংস্কৃত কিংবা হিন্দীতে নিবদ্ধ। বাদ্যযন্ত্রও সেই সেই রাজ্যের নিজস্ব অথবা ভারতীয় নানা বাদ্যযন্ত্র। নৃত্যগুলি ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন মন্দিরের গর্ভগৃহে, মন্দির চত্ত্বরে, ভ্রাম্যমান নৃত্যশিল্পিদের দ্বারা ধর্মীয় মেলায় অথবা রাজগৃহে বা রাজ দরবারে পরিবেশিত হতো।
আমরা আলাপের পাতায় আমাদের আলোচনা, সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কয়েকটি নৃত্যধারা, যেমন কত্থক, ভারতনাট্যম, ওড়িশী, কুচিপুরী, কথাকলি ও মণিপুরী নৃত্যে সীমাবদ্ধ রাখবো।

প্রথমে উত্তরভারতীয় কত্থক নৃত্য ও নৃত্যঘরানা নিয়ে বলবো। কত্থক কথাটির উৎস “কথাকার” থেকে। এই কথাকারেরা ছিলেন উত্তরভারতের ভ্রাম্যমান চারণশিল্পী ও কবি যারা কবিতার মাধ্যমে গল্প বলতেন। সংস্কৃত শব্দ ‘কথা’ থেকেই ‘কথক’ বা গল্পকার। এই ভ্রাম্যমান কবি ও গল্পকারেরা বিভিন্ন মহাকাব্যের গল্প ও নানা পৌরাণিক গল্প, নৃত্য গীতের মাধ্যমে পরিবেশন করতেন। তাঁরা নিজেদের প্রকাশ করতেন নানা হস্তমুদ্রা ও পদচালন দ্বারা। এছাড়াও দেহভঙ্গিমা ও মুখের নানা ভঙ্গী দিয়ে তাঁরা ভাব প্রকাশ করতেন। কথকের মূল প্রচলন হয় ভক্তি আন্দোলনের সময়। এতে অবতার কৃষ্ণের ছোটবেলার ও যৌবনের বিভিন্ন আকর্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করা হতো। ক্রমে নৃত্যগীত উত্তরভারতের বিভিন্ন রাজা মহারাজার সভাতেও পরিবেশিত হতে শুরু করে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ নৃত্যের রূপ নেয়।

কথক এমন একটি নৃত্য যেটি হিন্দু এবং মুসলিম দুটি সাংস্কৃতিক ধারা অনুযায়ীই পরিবেশিত হয়। মুঘল আমল থেকে এই নৃত্যের মুসলিম শাখাটির সূচনা হয় যেখানে কথকের সঙ্গে গজল এবং নানা ইসলামিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হতো। এই ধারার নৃত্য নবাব বাদশাহদের সভায় এবং ক্রমে তবায়েফদের কুঠিতেও পরিবেশিত হতে শুরু করে।
এই দুই রীতি অনুযায়ী কথকের মূল তিনটি ঘরানা। জয়পুর, লক্ষ্ণৌ এবং বেনারস ঘরানা। জয়পুর ও বেনারস ঘরানায় হিন্দু সাংস্কৃতিক ধারায় এবং লক্ষ্ণৌ ঘরানায় ইসলামিক ধারায় কথক পরিবেশিত হয়। জয়পুর ঘরানায় জোর দেওয়া হয় পদচারণার ওপরে, কিন্তু বেনারস ও লক্ষ্ণৌতে পদসঞ্চালনা থাকলেও, নানা মুখভঙ্গী ও হস্তসঞ্চালনের ওপরেই জোর দেওয়া হয় ভাবপ্রকাশের জন্য। তবে সবধরণের কথক নাচেই চওড়া ঘুঙ্গুরের আওয়াজ ও বোলের সঙ্গে পদসঞ্চালনা একটি অঙ্গ হিসাবে থাকেই। এই পদসঞ্চালনা করা হয় মূলতঃ তবলা বা পাখোয়াজের তালের সঙ্গে মিলিয়ে। এই নাচে ধড় বা দেহের মধ্যভাগ থাকে সোজা। নৃত্যের মাধ্যমে গল্প বলা হয় হস্তভঙ্গিমা, হস্তসঞ্চালন, মুখভঙ্গিমা, চোখ ও ভ্রুভঙ্গিমা, মঞ্চে চলাফেরা এবং দেহের কৌণিক ভঙ্গী ও ঘূর্ণনের মধ্য দিয়ে। পদসঞ্চালন এবং মুখ ও চোখের ভঙ্গিমার মধ্যে এক ধরণের সাযুজ্য রক্ষা করা হয়। গল্পের অভিনয় বা নাট্যাংশের প্রকাশ হয় মূলতঃ মুখ, চোখ ও ভ্রুভঙ্গীর দ্বারা নানা ভাব ব্যক্ত করে। জয়পুর ঘরানায় যেখানে নৃত্যের মূল সৌন্দর্য হলো দ্রুত এবং অসাধারণ পদসঞ্চালন ও ঘূর্ণন, সেখানে লক্ষ্ণৌ ও বেনারস ঘরানায় অভিনয় ও নাটকই হলো আসল বৈশিষ্ট ও সৌন্দর্য, যেটি মুখ চোখের ও ভ্রুর নানা ভঙ্গীর মাধ্যমে করা হয়।
খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে কথক নাচের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনুমান করা হয় যে কথক নাচের সূচনা হয় বেনারস বা ভারাণসীতে এবং পরে তা উত্তর পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্ণৌ, দিল্লী বা জয়পুরে পৌঁছয়। অষ্টম শতাব্দীতে ভক্তি আন্দোলনের সময় কথক নাচে মূলতঃ মহাভারতের গল্প, কৃষ্ণলীলা ও কৃষ্ণের জীবনকাহিনী, রামলীলা ও রামের জীবনকাহিনী, ভার্গবপুরাণের কাহিনী ইত্যাদি কথক নাচের মাধ্যমে তুলে ধরা হতো। হিন্দু ধর্মের বৈষ্ণবীয় রীতি ও ধারার প্রকাশই ছিলো প্রধাণ এবং নৃত্যধারায় ভক্তিরসের প্রাধাণ্য ছিলো। বালগোপাল ও মা যশোদা, কৃষ্ণের ননীচুরি, কালীয়দমন, যৌবনে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও বিরহ, রাসলীলা, শ্রীরামের হরধনু ভঙ্গ ও বিবাহ, রামের বনবাস ও সীতাহরণ, রাম-রাবণের যুদ্ধ ও হনুমানের লঙ্কাজয়, নবরস ইত্যাদি ছিলো জনপ্রিয় বিষয়। নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীত হিসাবে ভজন ও কীর্তনের প্রচলন ছিলো। এমনকি আধুনিক যুগে এখনো এই বিষয়গুলি কথকনাচের অন্যতম জনপ্রিয় বিষয়।
এরপর মুঘল আমলে ইসলামিক ও পারস্যের নৃত্যধারার মিলন ঘটে ভারতীয় কথক নৃত্যশৈলীর সঙ্গে। সুলতান ও বাদশাহের সভায় পরিবেশিত হতে শুরু করে কথক নাচ। গজল, ঠুংরী, দাদরা ইত্যাদি নানা উপশাস্ত্রীয় ধারার সঙ্গে কথক পরিবেশিত হতো। নাচের নাট্যাংশে ভক্তির জায়গায় পিয়া বা প্রেমিকের জন্য আকুতি, প্রিয়মিলনের আকাঙ্খা, প্রিয়ের জন্য শৃঙ্গার ও অপেক্ষা, প্রিয়তমকে ভোলানোর জন্য নানা অঙ্গভঙ্গী, রাগ অভিমান, মিলন বিরহ ইত্যাদি নাচের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো।
এরপর ব্রিটিশ আমলে রাজা বাদশাহের সভা আর রইলো না। তখন কথক নাচের সেই রমরমাও পড়ে এলো। কথক এই সময় পরিবেশিত হতে শুরু করে তবায়েফদের কোঠিতে। বিভিন্ন দেহভঙ্গী ও চোখ ও ভ্রুভঙ্গীর ব্যবহার বেড়ে যায়। নাচ তার পরিশীলিত ভাব, চারুকলা ও সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর, আবার নতুন করে ভারতীয় নৃত্যকলা ও চর্চায় প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং কথক ঘরানাগুলি নতুন করে জেগে ওঠে। বেশ কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পীর জন্ম হয় এবং তাঁদের ও তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে ক্রমাগত উন্নতি হতে থাকে এই নৃত্যধারার। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য নৃত্যধারার মতো কথকও পরিবেশিত হয় মূলতঃ মঞ্চে। এ ছাড়াও বিভিন্ন মন্দিরের নৃত্য উৎসব ও সমারোহগুলিতে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন নাটক ও চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে এই নাচ।
কত্থক নাচের তিনটি প্রধাণ অংশ হলো “আমন্ত্রণ” বা “সালামি”, “নৃত্ত” বা “নাচ” এবং “অভিনয়” বা “নৃত্য” বা “ভাও”। “নৃত্ত” ও “নৃত্য” এই দুইরকম বানান, দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। কথক নৃত্য হিন্দু বা মুসলিম রীতি অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়। হিন্দু রীতিতে “আমন্ত্রণ” অংশে শিল্পী নিজের গুরুকে এবং সভায় উপস্থিত বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীদের বন্দনা করেন, হিন্দু দেবদেবীদের বন্দনা করেন বিভিন্ন হস্তমুদ্রা ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে। মুসলিম রীতিতে শিল্পী এই অংশে দর্শকদের সালাম করেন বা সালামি দেন হস্তমুদ্রার মাধ্যমে।
নৃত্ত বা নাচ অংশ একটি মূল অংশ, যেখানে বিশুদ্ধ নাচই প্রধাণ। এই অংশ শুরু হয় ঠাট দিয়ে, যেখানে শিল্পী ধীরলয়ে সুললিত ভ্রুভঙ্গিমা, কব্জির আন্দোলন ও ঘাড়ের আন্দোলনের মাধ্যমে নাচ শুরু করে ক্রমে তবলার বিভিন্ন বোল, পরহন্ত, পরণ ও তোড়া ও টুকরার সঙ্গে হস্ত আন্দোলন, অপূর্ব পায়ের কাজ ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নাচেন এবং ঘোরেন। প্রতি তালচক্রের শেষে শিল্পী সমে এসে পড়েন মাথাটি জোরে একদিকে নেড়ে ও হাত তুলে। তবলার ঠেকার সঙ্গে একটি বোল মুখে বলা  বা পাঠ এবং তারপর সেটি নাচের মাধ্যমে প্রকাশ কথকের বৈশিষ্ট। ক্রমে বাড়তে থাকে তবলার বা পাখোয়াজের লয়। সেই লয়ের সঙ্গে পায়ের লয় ও ঘুঙরুর আওয়াজের সাযুজ্য রেখে তৈরী হয় এক অদ্ভুত ছন্দময় আওয়াজ! একে বলে তৎকার! যতো লয় বাড়ে ততই দ্রুত শুরু হয় শিল্পীর পায়ের কাজ ও এক, দুই, তিন, চার মাত্রা গুণে গুণে ঘুর্ণন! প্রতিবার ষোল, চব্বিশ বা আটচল্লিশ মাত্রার তালচক্রের শেষে সমে এসে পড়া। সর্বশেষে নৃত্য বা অভিনয় অংশে হিন্দু রীতিতে ব্যবহার হয় কোন ভজন, ঠুংরী বা দাদরা যাতে একটি গল্প, আধ্যাত্মিক বা পৌরাণিক বিষয়, কোন বার্তা বা মনের ভাব প্রকাশ করা হয় মুখভঙ্গী, হস্তমুদ্রা ও দেহভঙ্গিমার মাধ্যমে। মুসলিম রীতিতে গজলের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়কে আহবান করা হয়, প্রিয়মিলনের আকাঙ্খা বা প্রিয় বিরহের দুঃখপ্রকাশ করা হয় এই অভিনয় অংশে।

কথক নাচে মহিলা শিল্পীদের হিন্দু ও মুসলিম রীতি অনুযায়ী দু ধরণের পোশাক ব্যবহৃত হয়। হিন্দু রীতিতে বেনারস ঘরানায় বিশেষভাবে পরা শাড়ির সঙ্গে চোলি ও উড়নী অথবা জয়পুর ঘরানায় লম্বা ঘাগরার সঙ্গে চোলি ও উড়নী ব্যবহার হয়। মুসলিম রীতিতে কুঁচি দেওয়া পুরো হাতা আনারকলি কামিজের সঙ্গে চুড়িদার পায়জামা ও ওড়না ব্যবহার হয়। নানা ধরণের কসটিউম গয়না বা সোনার গয়না পরেন শিল্পী। মুসলিম রীতিতে মাথায় টিকলি ও ঝাপটা ব্যবহার করা হয়।
পুরুষ শিল্পীরা হিন্দু রীতিতে সিল্কের ধুতি ও কোমরবন্ধ পরেন। সাধারণতঃ উর্ধাঙ্গ অনাবৃত থাকে অথবা ঢোলা জ্যাকেট পরা হয়। তার ওপর থাকে উত্তরীয় বা চাদর, যেটি কোমরবন্ধে আটকানো থাকে। মুসলিম রীতিতে পুরুষ শিল্পীরা চুড়িদার, আংরাখা পরেন। দুই রীতিতেই চোখে থাকে বড়ো করে সুরমা বা কাজল আঁকা এবং হিন্দু রীতিতে পুরুষ শিল্পীরা তিলক পরেন। কথক শিল্পীর পায়ের ভারী ভুঙ্গুর তৈরী হয় চামড়ার ওপরে রূপোর ছোট ছোট বেল বা ঘন্টা বসিয়ে। কথকে অনেক বাদ্যযন্ত্র এবং কন্ঠ ব্যবহৃত হতে পারে, তবে কয়েকটি যন্ত্র থাকতেই হবে, যেমন তবলা বা পাখোয়াজ, মঞ্জিরা, হারমোনিয়াম। সঙ্গে অনেক সময়েই সেতার, সরোদ, বাঁশী ইত্যাদিও ব্যবহার হয়।

বিখ্যাত কথক শিল্পীদের মধ্যে আছেন জয়পুর ঘরানার রাজেন্দ্র গঙ্গানী, দুর্গা লাল, প্রেরণা শ্রীমালি, উমা ডোগরা। দুজন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী চেতনা জালান ও রানী কর্ণা মূলতঃ জয়পুর ঘরানার শিল্পী হলেও পরবর্তীকালে লক্ষ্ণৌ ঘরানার স্টাইলেও শিক্ষা নিয়েছেন ও নেচেছেন।
বেনারস ঘরানার কয়েকজন বিখ্যাত কথক শিল্পী হলেন সিতারা দেবী, কমলিনী ও নলিনী আস্থানা। এর মধ্যে সিতারা দেবীর নাচ সত্যজিত রায় তাঁর জলসাঘর ছবিতে অসাধারণ ভাবে ব্যবহার করেছেন।
তবে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কথক ঘরানা হলো লক্ষ্ণৌ ঘরানা। এই ঘরানায় জন্ম অনেক বিখ্যাত শিল্পীর, যেমন পন্ডিত আচ্ছন মহারাজ, পন্ডিত শম্ভু মহারাজ, পন্ডিত বিরজু মহারাজ, গৌরী জোগ এবং শ্বাশ্বতী সেন।
আলাপের সীমিত পরিসরে সব শিল্পীর কথা বলা সম্ভব নয়। প্রতি নৃত্যশৈলীর এক বা দুজন সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও গুরুর কথাই তুলে ধরবো, যারা শুধু দেশে ও বিদেশে নৃত্যপ্রদর্শন করে ভারতবর্ষ ও তার শাস্ত্রীয় নৃত্যের ঐশ্বর্য  বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন তাই নয়, নৃত্যশিক্ষা দিয়েছেন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে এবং তৈরী করেছেন এক নিজস্ব পরম্পরা। শুধু মঞ্চেই নয়, বিভিন্ন মাধ্যম, যেমন চলচ্চিত্র বা নাটকের মাধ্যমে বা বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও বক্তৃতার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁদের নাচ। সেক্ষেত্রে  কথক নাচে বেছে নিলাম লক্ষ্ণৌ ঘরানার বিখ্যাততম গুরু ও নৃত্যশিল্পী পন্ডিত বিরজু মহারাজের কথা। আমরা এই ২০২২ সালেই সবে হারিয়েছি তাঁকে। বলবো তাঁর সফল জীবনের কিছু কথা।

সেটি সম্ভবতঃ নব্বইয়ের দশক। তখন আমি সবে ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলন দেখা শুরু করেছি। তখন একদিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই সারা রাত্রিব্যাপী হতো এই অনুষ্ঠান। খালি স্টেজের মেঝেতে এক উইং-এ যন্ত্রশিল্পীরা বসতেন, অন্য দিক দিয়ে নৃত্যশিল্পী প্রবেশ করতেন। প্রথমে নাচের অনুষ্ঠান হতো, তারপর স্টেজ পরিষ্কার করে চৌকি পেতে শুরু হতো গীত ও বাদ্যের অনুষ্ঠান। কিন্তু একদিন এর হেরফের হলো। সেদিন বেশ কিছুক্ষণ গান বাজনা হওয়ার পর নাচের কথা ঘোষণা হলো। ততক্ষণ সবাই অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলেন কতক্ষণে নাচ শুরু হয়, কারণ নাচবেন আর কেউ নয়, পদ্মবিভূষণ পন্ডিত বিরজু মহারাজ! শোনা গেলো বিরজুজী কোথা থেকে একটি অনুষ্ঠান করে রাতের প্লেন ধরে আসছেন, তাই গোটা অনুষ্ঠানের সময় পরিবর্তন করা হয় তাঁর জন্য। কিন্তু তাও তাঁকে ছাড়তে রাজী নন উদ্যোক্তারা, কারণ তাঁর জন্যই প্রতিটি দর্শক অপেক্ষা করছেন। যন্ত্রীরা বসে পড়েছেন। বাজনা শুরু হয়ে গেছে। বড়ো আলো নিভে গেলো। স্টেজের একদিকে মৃদু আলোর আভাষের মধ্যে ছম ছম ঘুঙ্গুরের মৃদু আওয়াজ! যেন কোন রমণীর ভীরু পদচারণা! সঙ্গে বাজছে মধুর বাঁশী! বজ্রের শব্দ! মধুর বিভঙ্গে দেহলতা বাঁকিয়ে এ কে? লজ্জায় টেনে দিলেন মাথার ঘোমটা, তারপর হস্তভঙ্গিমায়, যেন মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে উঁকি দিলেন কাজল কালো চোখের কটাক্ষ ছুঁড়ে! মেঘ ঘিরে এসেছে! থেকে থেকে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ! এই তো মিলনের ঋতু! তাই শ্রীরাধিকা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কুঞ্জবনে শ্যামের জন্য। ঐ তো পিয়ালতরুর আড়ালে শ্যামকে দেখা যায় বুঝি! শোনা যায় তাঁর বাঁশী! রাধার আগ্রহ বাধা মানে না! সখীরা পিয়ালের ডালে বেঁধে দিয়েছেন ফুলের দোলনা, তাতে বসে দুলছেন শ্রীরাধিকা! কিন্তু কেন সামনে আসছেন না শ্যাম? অভিমানে মুখ ফিরিয়ে থাকেন রাধা, অথচ মনে অধীর প্রতীক্ষা কতক্ষণে শ্যাম এসে তাঁর মান ভাঙ্গাবেন! “এ ঘির ঘির আয়ি বাদরা, গর্জে বরসে চমকে মেহা!” ঠুংরীর প্রতিটি লাইনের সঙ্গে যিনি একেবারে সত্যি করে তুলছেন এই আকুতি সেই সুন্দরী রাধিকা আর কেউ নন, স্বয়ং বিরজু মহারাজজী! অবিশ্বাস্য লেগেছিলো প্রথমবার! কোন পুরুষ এইভাবে নারীর ছলাকলা, ভাব ভঙ্গিমা এতো অপূর্ব ভাবে প্রকাশ করতে পারেন! অথচ কী সংযত, সুন্দর! ঘাড়ের সামান্য দুলুনি, দুটি হাতের বিভিন্ন সঞ্চালনা আর মুখের ও ভ্রুর অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা! মুগ্ধ বাকরূদ্ধ হয়ে দেখেছিলাম! তারপর আরো বহুবার তাঁর ও শ্বাশতী সেনের যৌথ নৃত্য দেখেছি নানা স্থানে, দেখেছি তবলার বোলের সঙ্গে হরিণের পিছনে বাঘের ছোটা, ময়ূরের নাচ কতো কী! দেখেছি তাঁর গোটা পরিবারের সঙ্গে সেট সেটিং নিয়ে রানী রূপমতীর অভিনয়! যেমন নাচ, তেমনই হাত তবলায়, তেমনই কন্ঠসঙ্গীতেও সমান পারদর্শিতা।

১৯৩৭ সালে এলাহাবাদ জেলার হান্ডিয়াতে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে বিরজু মহারাজের জন্ম। তাঁর আসল নাম ব্রিজমোহন নাথ মিশ্র। লক্ষ্ণৌয়ের কল্কা-বিন্দাদিন ঘরানায় শিক্ষা শুরু বিরজুজীর, তাঁর পিতা আচ্ছন মহারাজের কাছে। তিনি ছিলেন রায়পুরের রাজার সভানর্তক। তবে খুব ছোটবেলায় পিতার মৃত্যুর পর তাঁকে শেখাতে লাগলেন তাঁর কাকা শম্ভু মহারাজ ও লাচ্চু মহারাজ। তাঁরা দুজনেই ছিলেন অসাধারণ কত্থক নর্তক এবং সেই সময়ের সব হিন্দী সিনেমাতেও তাঁরা নাচতেন। তিনি একটি ইন্টারভিউতে বলেছেন, তাঁর পিতামহ বিন্দাদিন মহারাজ প্রায় পাঁচ হাজার ঠুংরি ও ভজন রচনা করেছিলেন। যখনই তাঁর মনে কোন গান আসতো, তিনি লিখে রেখে দিতেন ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর নাচের কোরিওগ্রাফিও করে ফেলতেন। তাঁর মৃত্যুর পর যতদিন সম্ভব সেই গান ও সুর ব্যবহার করেছিলেন পরিবারের শিল্পীরা। তারপর একদিন ইঁদুরে খেয়ে গেলো সেই খাতা। তখন গোমতীর জলে ফেলে দেওয়া হলো তা। কিন্তু তাঁর ঠাকুমার মনে ছিলো সেগুলি। কিছু কিছু বন্দিশ ছাত্রদের কাছেও ছিলো। সেগুলি লিখে রাখতে লাগলেন বিরজুজী। এইভাবে প্রায় তিনশো গান পুনরূদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তিনি এই গানগুলির ভিতরকার কাহিনী বা কথা আত্মস্থ করেছিলেন। তাঁর বাবার তালের ও লয়ের জ্ঞান ছিলো অসাধারণ! তাঁর কাছে
পেয়েছিলেন তালের ও লয়ের শিক্ষা আর কাকাদের কাছে ভাও বা ভাবের অর্থাৎ অভিনয়ের তালিম। এই সবকিছু নিয়েই নিজেকে তৈরী করেন এই বরেণ্য শিল্পী!
তাঁর মায়ের কাছ থেকে তিনি বিশুদ্ধ কত্থকের কৌলিন্য ধরে রাখার শিক্ষা পেয়েছিলেন। কাকা লাচ্চু মহারাজ বহুবার তাঁকে বম্বেতে সিনেমায় কাজ করার জন্য ডাকলেও তিনি যাননি। বাড়ি গাড়ি বা পয়সার মোহ তাঁর ছিলো না। মা বলেছিলেন “তুই যদি বম্বে যাস তবে তুই বম্বইয়া কত্থক নাচবি! তাকে কেউ ঘরানাদার নাচ বলবে না।“ সেই থেকে বিশুদ্ধ নাচই ছিলো তাঁর জীবন। বহু ছাত্রছাত্রীকে আজও একই ভাবে শিখিয়ে চলেছেন।
বিরজু মহারাজ বলেছেন কত্থক নাচ প্রথমে মন্দির থেকে ক্রমে মেহফিল বা সভায় এবং শেষে বর্তমানে মঞ্চে পরিবেশন করা হয়। কিন্তু এই নাচেও তাঁর পরিবারে নারীদের নৃত্য করার সাহস ছিলো না। নাচ মূলতঃ পরিবারের পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তাঁরা সাধারণতঃ মন্দিরে দিওয়ালি, দশেরার সময় নাচতেন। এ ছাড়া রাজা বা জমিদারদের সভায় তাদের বাড়ির কোন শুভ কাজ, যেমন অন্নপ্রাশণ, বিবাহ, মুন্ডন ইত্যাদিতে তাঁরা নাচতে যেতেন। এই রাজা জমিদাররা গ্রামে থাকতেন। তখন গাড়ি ঘোড়াও তেমন ছিলো না। তাই মহিলারা কখনোই ঘুরে বেড়াতে পারতেন না। তাই পুরুষেরাই নাচতেন। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, তাঁর বোনেরা অনেক নাচ শিখতে চাইলেও তাঁর কাকারা তাতে মত দেননি। তাঁদের পর্দার আড়ালেই থাকতে হয়েছিলো। কিন্তু বিরজু মহারাজজী এই বাধা সম্পূর্ণ সরিয়ে দেন। তিনি তাঁর ছেলেমেয়ে এবং ছাত্রদের সমান ভাবে শিখিয়েছেন। তাঁর কন্যা মমতা মহারাজ, পুত্রদ্বয় জয়কিষণ এবং দীপক মহারাজ সমানভাবে নাচ শিখেছেন ও পারফর্ম করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্রী শাশ্বতী সেন বলেছেন “গুরুজী শয়নে স্বপনে আহারে ভোজনে শুধু তাঁর কলাকেই দেখেন! তিনি এ কথা প্রমাণ করেছেন যে কত্থক নাচ শুধু কটি গানে বা রাজার সভায় সীমাবদ্ধ নয়। তা সর্বত্রবিহারী! সমগ্র প্রকৃতির মধ্যেই ছড়িয়ে আছে লয় ছন্দ ও নাচ! তা ছড়িয়ে আছে ময়ূরের নৃত্যে, কোকিলের কুহুধ্বনিতে, হরিণের ছন্দোময় গতিতে, বাঘের লম্ফনে, হাতির দুলকি চালে, বর্ষার রিমঝিমে, বিদ্যুতের চমকে, বসন্তের বাতাসে, বৃক্ষের মর্মরে, রাজমিস্ত্রীর গৃহ তৈরীর গাঁথনির ছন্দে, এমনকি ক্রিকেটে বোলারের ছুটে আসার মধ্যে! তিনি তাঁর এই জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর ছাত্রদের মধ্যেও। এখানেই তাঁর সার্থকতা! এটিই বিরজু মহারাজ স্টাইল অফ ডান্স! তিনি ছাত্রছাত্রীদের বলেছেন প্রথমে সঙ্গীতের তিনটি অংশ অর্থাৎ গান ও বাদ্য শিখতে হবে, তবেই পরিপূর্ণ নৃত্য করা সম্ভব! নিজে না বাজালেও বা গাইলেও তা সম্পূর্ণ আত্মস্থ ও অনুভব করতে হবে। তবেই কথকের মতো শাস্ত্রীয় নৃত্য সম্ভব!
মাত্র তেরো বছর বয়সে সঙ্গীত ভারতী নিউ দিল্লীতে তিনি নাচ শুরু করেন। এরপর তিনি ভারতীয় কলাকেন্দ্র, দিল্লীতে শেখাতে শুরু করেন। অবশেষে তিনি দিল্লীর কথক কলাকেন্দ্রের প্রধাণ হন। শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে দেশে ও বিদেশে অসংখ্য মঞ্চে সারা জীবন নৃত্যপরিবেশন করেছেন বিরজুজী! তাঁর নাচে মুগ্ধ হয়েছে গোটা পৃথিবী! তিনি একাই ঠুংরী বা ভজন গেয়ে এবং তবলা বাজিয়ে বোল বলে নেচে দেখিয়েছেন! তিনি সত্যজিত রায়ের শতরঞ্চ কি খিলাড়িতে একটি ঠুংরীতে কোরিওগ্রাফি করেন, সঞ্জয় লীলা বনশালীর দেবদাস তাঁর নৃত্য পরিচালনায় বিখ্যাত হয় “কাহে ছেড় ছেড় মোহে গরবা লাগায়ে” অথবা পদ্মাবতে “মোহে রঙ্গ দো লাল”। ঢেড় ইশিকিয়াঁতে “জাগবে সারি রয়না” !
তিনি সর্বাপেক্ষা ছোটবেলায় সঙ্গীত নাটক আকাদেমী পুরস্কার পান। এরপর পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ সহ আরো বহু সম্মান লাভ করেন কত্থকের অবিসংবাদী মহারাজ বিরজুজী!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।