তানসেন পরবর্তী পর্বে গোয়ালিয়র ঘরানার সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পিদের মধ্যে ছিলেন সদারঙ্গ এবং অদারঙ্গ। এই দুটিই তাঁদের ছদ্মনাম বা পেন নেম ছিলো। সদারঙ্গের আসল নাম ছিলো নিয়ামত খান। তিনি ১৬৭০ থেকে ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ঔরঙ্গজেব পরবর্তী মুঘল শাসক মুহম্মদ শাহের দরবারে তিনি সভাগায়ক ছিলেন। সদারঙ্গ মূলত সঙ্গীত রচয়িতা ও শিক্ষক ছিলেন। তিনি নিজে গান খুব কম গাইতেন। গান গাওয়াতেন মূলত তাঁর ভাইপো অদারঙ্গকে দিয়ে। বর্তমানে আমরা খেয়াল গানের যে রূপ শুনি, অর্থাৎ বিলম্বিত একতাল ও দ্রুত তিনতাল বা ত্রিতালে বদ্ধ খেয়াল গায়ন, তার প্রধান রূপকার ছিলেন সদারঙ্গ। আজও আমরা যারা মার্গসঙ্গীত বা হিন্দুস্থানি ক্লাসিকাল সঙ্গীত শিক্ষা করি ও গাই, তারা সদারঙ্গের বন্দিশ বিনা পথ চলতে পারি না। এক্ষুণি মনে পড়ছে রাগেশ্রী রাগে দ্রুত তিনতাল বন্দিশ –
“বেগুণকে গুণবন্তা দাতা
কিয়ো করম কে এক নজর মোপে
হুঁ অধীন তু, দয়া কর নিহার
সদারঙ্গ মন কি ইয়েহি ইচ্ছা।।“
অথবা
দেশী টোড়িতে একটি দ্রুত বন্দিশ
“সাচি কহত হ্যায় সদারঙ্গ ইয়হ
নদী নাব সংযোগ”।।
তাঁর রচনা বন্দিশগুলিতে কোথাও না কোথাও তাঁর পেন নেম সদারঙ্গের উল্লেখ থাকতোই। সদারঙ্গের প্রচুর সংখ্যক বিখ্যাত ছাত্রছাত্রী ছিলেন যারা পরবর্তীকালে গোয়ালিয়র ঘরানার বিখ্যাত শিল্পি রূপে স্থানলাভ করেছেন। খেয়াল গান ছাড়াও সদারঙ্গ অসাধারণ বীণ বাজাতেন। ১৭৩৭ থেকে ১৭৪১ সাল, দাক্ষিনাত্যের হায়দ্রাবাদের সালার জঙ্গ নবাব দরগার এক যুবক, যার নাম ছিলো কুলি খান তিনি দিল্লিতে বসবাস করতে আসেন এবং দরবারে সদারঙ্গের বীণবাদন শুনে মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি হায়দ্রাবাদে ফিরে মুরাক্কা-ই-দিল্লি বলে একটি উর্দু গ্রন্থে লেখেন যে সদারঙ্গ বীণা বাজাতে শুরু করলে বীণার প্রতিটি সুর শ্রোতৃমন্ডলীকে একেবারে বশ করে ফেলে এবং তাঁরা এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থায় পড়েন। জলে মাছ যেমন ডানা ঝাপটায় তেমন করতে শুরু করেন!
সদারঙ্গের ভাইপো এবং জামাই অদারঙ্গ ছিলেন বিখ্যাত খেয়ালিয়া। তাঁর আসল নাম ছিলো ফিরোজ খান। তাঁর নিজের রচিত বেশ কিছু বন্দিশও ছিলো। মহম্মদ শাহের দরবারের প্রধান গায়ক তিনিই ছিলেন। খেয়াল ছাড়াও ফিরোজ খান অদারঙ্গ-এর নাম সেতারের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দিল্লি দরবারে সেতার প্রথম তিনিই নিয়ে আসেন। কুলি খান তাঁর বাজনার কথাও তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। পরে দিল্লির কাছে আনোলাতেও অনেক সঙ্গীত সমারোহে সেতার বাজিয়েছেন অদারঙ্গ।
এরপর অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় পর্যন্ত, অর্থাত যতদিন শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ রাজত্ব করেছেন, তাঁর দরবারে সদারঙ্গের পদাঙ্ক অনুসরণ করে গোয়ালিয়র ঘরানাকে এগিয়ে নিয়ে যান উস্তাদ নাথান খান, নাথান পীরবক্স, হদ্দু ও হসসু খান।
গায়কদের কথা তো হলো। এবার মনে প্রশ্ন জাগে এতোজন বিখ্যাত শিল্পির মাধ্যমে যে ঘরানা এগিয়ে চলেছে, তার গায়নশৈলীর বৈশিষ্টগুলি ও স্বাতন্ত্র কী? কিভাবে চেনা যাবে যে একজন শিল্পি গোয়ালিয়র ঘরানার? ঘরানার সেই বৈশিষ্টগুলির একটি পূর্ণ রূপ তৈরী হয় হদ্দু ও হসসু খানের সময়েই। প্রথমত এই ঘরানায় বহুল-পরিচিত শুদ্ধ বড় রাগগুলি গাওয়া হয়, যাতে শ্রোতারা সহজেই রাগ চিনতে পারেন। মিশ্র রাগের প্রয়োগ বা কোন অলঙ্কার প্রয়োগে আসল রাগের বৈশিষ্ট গোপন করা হয় না। এই সহজতা ঘরানাকে আলাদা করে। এই ঘরানায় সবচেয়ে বেশি গাওয়া হয় আলাহিয়া বিলাবল, ইমন, ভৈরব, সারং, হাম্বীর বা হামীর, গৌর মল্লার, মিয়াঁ কি মল্লার ইত্যাদি রাগগুলি। এই ঘরানায় বলা হয় যে একটি রাগের মূল রূপটি ফুটিয়ে তুলতে পারে একটি সার্থক বন্দিশ। বন্দিশই নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে রাগটি গাওয়া হবে এবং কিভাবে তার সৌন্দর্য ও মেলোডি ফুটে উঠবে। বন্দিশের স্থায়ী অংশটি দুবার গাওয়া হয় এবং অন্তরাটি তারপর গাওয়া হয়। এরপর মধ্যলয়ে স্বর-বিস্তার শুরু হয়। এই ধীর গতিতে রাগ সম্প্রসারণকে বেহলাওয়া বলা হয়। মন্দ্র সপ্তকের মা থেকে তারসপ্তকের পা পর্যন্ত এই বিস্তার চলে। রাগরূপের টুকরাগুলি আরোহ ও অবরোহ অংশে মিলিয়ে এই বিস্তার চলে। একবার অন্তরা অংশ গেয়ে যখন স্থায়ীতে ফেরা হয়, তখন শুরু হয় দুগুণ কি আলাপ। লয় বৃদ্ধি পায় এবং আলাপ অংশটি দুই থেকে চার স্বরের সমাহারে গাওয়া হয়। কখনো আবার বোল-আলাপ অর্থাৎ গানের কথা দিয়েই আলাপ করা হয়। এরপর বোল-বাট ও বোল-তান অর্থাৎ গানের কথা দিয়েই ছোট ছোট তান করা হয়। এরপ্র মুড়কি অর্থাৎ আরো দ্রুত লয়ে নানা আলংকারিক প্রয়োগ করা হয়। বিলম্বিতের শেষে এবং প্রধাণত তিনতালে দ্রুত খেয়ালে বিভিন্ন ধরণের তান যেমন বোল-তান, গমক তান, সাপাট ইত্যাদি করা হয়। সাপাট তান ঘরানার অন্যতম প্রধাণ বৈশিষ্ট, যেখানে তিন সপ্তকে সোজা উঠে যায় একটি তান এবং সোজা ফিরে আসে। যেমন ইমনে –
. . . . . . . . .
নি রে গা (কড়ি)মা পা ধা নি সা রে গা (কড়ি)মা পা (কড়ি)মা গা রে সা নি ধা পা (কড়ি)মা গা রে সা
.
খেয়াল ছাড়াও গোয়ালিয়র ঘরানায় ধ্রুপদ গাওয়া হতো। তবে এই ঘরানায় ধ্রুপদের বৈশিষ্ট হল তাকে বলা হয় মুন্ডি ধ্রুপদ অর্থাৎ তাতে ধ্রুপদের সব অঙ্গ থাকলেও মুখড়া গাওয়া হয় না।
পরবর্তী কালে এই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পিদের মধ্যে ছিলেন বড়ে ইনায়ত হুসেন খান, রেহমত আলি খান, বালকৃষ্ণবুয়া ইছালকরঞ্জিকর (গোয়ালিয়র ঘরানার রীতি মহারাষ্ট্রে নিয়ে আসেন), বিষ্ণুদিগম্বর পালুসকর (গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন), বিনায়করাও পটবর্ধন(পদ্মভূষণ), ডি ভি পালুসকর, আব্দুল রশিদ খান (ভারতরত্ন এবং আকাদেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত) ইত্যাদি।