ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৩৭)

আলাপ

কন্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতের পর এবার তালবাদ্যের কথা না বললেই নয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের, বা সেই অর্থে ভারতীয় যে কোন সঙ্গীতের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো গায়ন বা বাদনের সঙ্গে তালবাদ্য সঙ্গত। উত্তরভারতীয় সঙ্গীতের প্রধাণ তালবাদ্য যন্ত্র হলো তবলা। এ ছাড়াও পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ, খোল, ঘটম ইত্যাদি নানা তালবাদ্য বাজানো হয়, যার মধ্যে মৃদঙ্গ এবং ঘটম বাজানো হয় প্রধাণতঃ দক্ষিণভারতীয় শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে। আলাপের পাতায় আমাদের আলোচনা একটি প্রধাণ যন্ত্র, অর্থাৎ তবলাতেই সীমাবদ্ধ রাখছি।

এক জোড়া যন্ত্র নিয়ে তবলা। একই সঙ্গে বাদক সাধারণতঃ ডানহাতে একটি কাঠের খোলের যন্ত্র বাজান যার ওপরে থাকে চামড়ার পর্দা, যেটিকে বলে ডাঁয়া বা তবলা এবং বাঁ হাতে বাজান আরেকড়ি বড়ো মুখের যন্ত্র যেটি মাটির বা স্টিলের বা তামার তৈরী খোলের ওপর চামড়া বসিয়ে তৈরী হয়, যেটিকে বলা হয় বাঁয়া। দুটি যন্ত্রেই টানটান চামড়ার পর্দার কম্পন থেকে উদ্ভুত হয় আওয়াজ। চামড়ার পর্দা টানটান করা হয় চামড়ার ছড় এবং গুলি দিয়ে চামড়াটিকে টেনে বেঁধে। যত টানটান করা হবে তত উঁচু স্কেলে বাঁধা হবে তবলা আর যত কম টানা হবে, তত নীচু স্কেলে বাজবে। এই টানটান করা বা ছাড়াকেই বলা হয় তবলা বাঁধা। সাধারণতঃ বিছিন্ন গায়নের স্কেলের ষড়জে তবলা বাঁধা হয়।
ভারতীয় সঙ্গীত সাধারণতঃ ছন্দবদ্ধ বা মাত্রাবদ্ধ। চক্রাকারে এই মাত্রাগুলি ঘুরে এসে সমে বা প্রথম তালে পড়ে। গানের বা বন্দিশের কথাগুলিও সেই তাল বা ছন্দের অনুসারী হয়। এই তাল নানা মাত্রা বা ছন্দের হতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে তা পরিষ্কার হবে।

দাদরা তাল – ৬ মাত্রা
+              ০
ধি   ধি  না । না   তি   না

প্রথম মাত্রায় তালি দিয়ে শুরু হয় এবং চতুর্থ মাত্রায় ফাঁক বা খালি। ছয়টি মাত্রা বলা হলে আবার প্রথম মাত্রা “ধি” বা সমে এসে পড়ে। এইভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে তালটি।  এই তালে খুব পরিচিত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত হল “পুরানো সেই দিনের কথা”। দেখুন কিভাবে তিন তিন ছন্দে ছটি মাত্রায় গানের সুর অনুসরণ করছে তালকে।  ঠিক যে ভাবে তবলার বা বায়ার ওপর আঙ্গুলের বা হাতের চেটোর বা কব্জির চাঁটিতে আওয়াজ হয়, সেই ভাবেই তালটিকে বোল দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

কাহারবা তাল – ৮ মাত্রা
+                 ০
ধা  গে  তে  টে । না  গে  ধি  না
প্রথম মাত্রায় তালি দিয়ে শুরু হয় এবং পঞ্চম মাত্রায় খালি বা ফাঁক। আটটি মাত্রা বলা হলে আবার “ধা” বা সমে ফিরে আসে। কাহারবা তালে নিবদ্ধ একটি খুব পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত হল “বড়ো আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও” ।
দেখুন কিভাবে চার চার ছন্দে চলেছে গান, তালকে অনুসরণ করে।

এবার ফিরে আসি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথায়। উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গায়নে স্বল্প রাগ আলাপের পরেই সাধারণতঃ বিলম্বিত বন্দিশ গাওয়া হয়। বিলম্বিত অর্থাৎ বিলম্বিত বা ধীর লয়, অর্থাৎ তালচক্র চলবে ধীরে ধীরে, টেনে টেনে। বেশীরভাগ বিলম্বিত বন্দিশ বিলম্বিত একতালে নিবদ্ধ থাকে। দেখে নেওয়া যাক কেমন এই তাল। আসলে একতাল একটি বারো মাত্রার তাল। বারোটি মাত্রার বোল এরকমঃ
+
ধিন  ধিন  ধাগে  তেরেকেটে  থুন  না  কত  তে  ধাগে  তেরেকেটে  ধিন  ধা  ধা

এবার এটিকে বিলম্বিত লয়ে বাজানোর জন্য বারোটি মাত্রাকে টেনে চারগুণ বা ৪৮ মাত্রা করা হয়। অর্থাৎ এক একটি মাত্রাকে চারটি করে ভাগ করা হয়। অনেকটা এরকমঃ
+
ধিন – – -। ধিন – – -। ধা – গে – । তে রে কে টে । থুন – না -। কত – তে -। ধা – গে – । তে রে কে টে ।
ধিন – – -। ধা – – – । ধা – – – ।
এই ৪৮ মাত্রায় নিবদ্ধ থাকে এক একটি বিলম্বিত বন্দিশ। বন্দিশটি ধীর লয়ে গেয়ে সমে ফিরে আসেন গায়ক। তারপর বন্দিশের এক একটি শব্দ দিয়ে বা আ-কার দিয়ে রাগ বিস্তার বা বঢ়হত করেন। আবার সমে ফিরে আসেন।
এরপর লয় একটু বাড়িয়ে চলে বিভিন্ন লয়দারী, বোলকারী ইত্যাদি। বিলম্বিতের শেষে শুরু হয় দ্রুত। এই দ্রুত বন্দিশ সাধারণতঃ নিবদ্ধ হয় তিনতাল বা ত্রিতালে। ত্রিতাল একটি ষোল মাত্রার তাল। এর বোলগুলি হলো এরকমঃ
+                                       ০
ধা  ধিন  ধিন  ধা । ধা  ধিন  ধিন  ধা । না  তিন  তিন  না । তেটে  ধিন  ধিন  ধা

বিলম্বিতের থেকে অনেক দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় গান এই তাল অনুসরণ করে। বন্দিশের সঙ্গে সঙ্গে চলে বোলকারী ও তানকারী। দ্রুতের মূল উপজীব্য হলো অত্যন্ত দ্রুত আ-কারান্ত তান, যাকে সাপাট তানও বলা হয়। বিদ্যুৎ গতিতে এই তান ছুটে চলে নীচের সপ্তক থেকে তার সপ্তকে। তবে সবটাই রাগ, তাল ও লয় মেনে। প্রত্যেকবার নিজের সৃষ্ট পথে তান করেও সেই সমে ফিরতেই হবে গায়ককে। সেখানেই মুন্সীয়ানা। সেখানেই সৃজনশীলতা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের। পুরোটাই তাৎক্ষণিক সৃষ্টি! রাগরূপ ছাড়া আর কোন কিছুই দৃঢ়বদ্ধ নয়।

ধান ভানতে শিবের গীতের মতো তালবাদ্য দিয়ে শুরু করে চলে গিয়েছিলাম শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথায়। আবার ফিরে আসি তবলায়। এই তবলা শুধু যে সঙ্গত যন্ত্র, তা একেবারেই নয়। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বাদন মাধ্যম। তবলা বাদকগণ তাঁদের শিল্পের নমুনা দেখাতে পারেন একক তবলা লহরা বাজিয়ে অথবা যৌথ বা আনসাম্বল (দলবদ্ধভাবে) আরো তবলা বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তালবাদ্য কাচেরী বাজিয়ে।
তবলা লহরা সাধারণতঃ যে কোন একটি তালের ওপর নিবদ্ধ হয়। প্রথমে তালের বোলটি বাজিয়ে তারপর সেই তালের মাত্রার মধ্যেই নানা ধরণের কায়দা, টুকরা এবং চক্রধার বাজানো হয়। যেমন ষোল মাত্রার ত্রিতালে হয়তো লহরা বাজানো হচ্ছে। প্রথমে তালের বোলটি বাজিয়ে সমে পড়া হলো। তারপর বোলের ষোলটি মাত্রাকে নানা ভাবে ভেঙ্গে দ্বিগুণ বা তিনগুন লয়ে বিভিন্ন বোলবাণী দিয়ে সাজানো হয় কায়দা বা টুকরাগুলি। এমন ভাবেই তালবিভাগ করা হয়, যাতে মাত্রা সমান থাকে এবং ঠিক সমে এসে পড়ে। সেখানেই সৌন্দর্য। চক্রধার হলো যখন টুকরাগুলি দুটি বা তিনটি তালচক্রের পর এসে সমে পড়ে।
এবার বলা যাক তবলার ঘরানা বলতে কী বোঝায়? তবলার ঘরানার বৈশিষ্ট হলো তাঁদের বাজ অর্থাৎ বাজানোর কায়দা এবং সেই ঘর বা ঘরানার তৈরী নিজস্ব কায়দা, টুকরা ও চক্রধারগুলি যা সেই ঘরানার শিল্পীরা ছাড়া কেউ জানবেন না বা বাজাতে পারবেন না। বাজানোর কায়দার মধ্যে পড়ে কী ধরণের তবলা বাজবে সেটাও। কোন কোন ঘরানায়, যেমন বেনারস ঘরানায় বড়ো মুখের তবলা বাজে। যেমন কিষণ মহারাজ যেমন বাজাতেন। এতে তবলার আওয়াজ হয় গম্ভীর ও নীচু। আবার কোন কোন ঘরানায় ছোট মুখের তবলা বাজে, যেখানে তবলার আওয়াজ হয় চড়া তীক্ষ্ণ তীরের ফলার মতো, যাতে বিদ্যুৎ গতিতে খেলে নানা কায়দা কসরত! আর ঘরানার কায়দা, টুকরা ও চক্রধারগুলি তৈরী করতেন সেই ঘরানার বুজুর্গ বা বিশিষ্ট ওস্তাদেরা। সেগুলি ঘরানার পরম্পরায় গুরু থেকে শিষ্য পেতেন। ঘরানায় ঘরানায় রীতিমতো লড়াই বা প্রতিযোগিতা হতো যে কার কায়দা বা চক্রধার কতো সুন্দর বা কতো কঠিন বাজানো!

ভারতে তবলা ঘরানা মূলতঃ ছয়টি। তার মধ্যে আমরা তিনটি ঘরানার কথা স্বল্প করে বলে, সেই সব ঘরাণার দু একজন বিখ্যাত শিল্পী, যারা শুধু ভারতবিখ্যাতই নয়, পৃথিবীবিখ্যাত, তাঁদের কথা বলবো। এই তিনটি ঘরানা হলো ফারুখাবাদ ঘরানা, বেনারস ঘরানা এবং পাঞ্জাব ঘরানা।

প্রথমে আসি ফারুখাবাদ ঘরানার কথায়। এই ঘরানা ভারতের সবচেয়ে পুরোনো তবলা ঘরানা। খ্রীষ্টিয় একাদশ শতকে একজন রাজপুত সভাবাদক আকাসা এই ঘরানার সূচনা করেন। পরে উনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে মীর আকাসা নামে পরিচিত হন। উনিই প্রথম তবলার আওয়াজগুলিকে বিভিন্ন বোল দিয়ে প্রকাশ করেন। প্রথম বোলগুলি ছিলো তাত, ধিত, থুন, নান। ওঁর নয় পুত্র ছিলো। উনি মৃত্যুর সময় পুত্র বিলাবল খানের হাতে ওঁর ঘরানার দায়িত্ব দিয়ে যান। তিনি তার পুত্র আলি বক্স খানের হাতে তা তুলে দেন। এই আলি বক্স প্রথম “ক্রান” বোলটি তৈরী করেন। এই বংশেরই ছাব্বিশতম বংশধর ওস্তাদ হাজী বিলায়েত আলি খান। তিনি যে জেলায় থাকতেন সেই অনুসারে এই ঘরানার নাম দেন ফারুখাবাদ ঘরানা। তিনি সাতবার হজ যাত্রা করেন। হাজী বিলায়েত আলি খানের ভাইপো সালালি খানসাহেব, লক্ষ্ণৌ ঘরানার ওস্তাদ বক্সু খানসাহেবকে তবলার লড়াইতে আহবান করেন। তাঁর হয়ে ফারুখাবাদ ঘরানার সম্মান রক্ষার জন্য বাজান বিলায়েত আলি খান। পনেরো দিন চলে সেই লড়াই! একজন একটি গৎ বাজালে অন্যজনকে তাঁর ঘরানার তার জোড়া গৎ বাজাতে হবে। পনেরোতম দিনে বিলায়েত আলি একটি ঘরানার একেবারে নিজস্ব একটি গৎ বাজান যেটিকে বলা হয় গৎ অফ গাজী! বক্সু খান তার জোড়া বাজাতে পারেননি। তাই বিলায়েত আলির জয় হয়! বক্সু খান তখন পুরস্কার হিসাবে নিজের মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন এবং নিজের ঘরানার ৫০০ টি কায়দা তাঁকে শিখিয়ে দেন।
এই হাজী বিলায়েত আলি খানই প্রক্রিতপক্ষে ফারুখাবাদ ঘরানাকে বিখ্যাত করেন। তাঁর বাজনা শুনে অযোধ্যার রাজা তাঁকে সভাবাদক করে নেন এবং খুব শীঘ্রই ফারুখাবাদ ছেড়ে তাঁরা রামপুরে বসবাস শুরু করেন। রামপুরের রাজাও সঙ্গীতের অত্যন্ত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই বংশের এরপর বিখ্যাততম তবলিয়া হলেন ওস্তাদ মসিত খান। ১৮৭২ সালে উত্তরপ্রদেশের রামপুরেই তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ছিলো নানহে খান। তাঁর ছয় পুত্রের মধ্যে ইনিই একমাত্র বেঁচে ছিলেন। খুব ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে শিক্ষা শুরু তাঁর। কিন্তু নানহে খান দেখেন যে তবলা ছাড়াও কুস্তি আর ছুরি চাকু চালানোয় ছেলের বিশেষ নজর। তিনি রেগে গিয়ে তাঁকে শেখানো বন্ধ করেন এবং নিজের তবলা জোড়াও তাঁকে বাজাতে দিতে রাজী হলেন না। অনুতপ্ত মসিত খান তখন নিজেই মাটি দিয়ে তবলার মতো যন্ত্র তৈরী করে নিজের মতো তাতে লুকিয়ে রেওয়াজ করতে লাগলেন! ক্রমে তিনি অসাধারণ বাজাতে লাগলেন! ক্রমে মোরাদাবাদে তিনি বাজানোর সুযোগ পেলেন। সেখানে তিনি এতো অপূর্ব বাজালেন যে সে খবর নানহে খানের কাছে এসে পৌঁছল! তিনি অবাক হয়ে গেলেন মসিত খানের উন্নতি দেখে। তারপর থেকে তিনি ঘরানার সব জিনিস শেখাতে লাগলেন ছেলেকে। নিজের তবলা জোড়াও দিলেন তাঁকে। মসিত খান বললেন যে বাবার এই তবলা জোড়া পাওয়ার জন্যই তিনি এতো সাধনা করেছেন। রামপুরের সঙ্গীতপ্রেমী নবাব হামিদ আলি সযত্নে মসিত খানকে তাঁর সভাবাদকরূপে ডেকে নিলেন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সেখানেই বাজাতে লাগলেন মসিত খান। নবাবের মৃত্যুর পর তিনি শুনলেন যে কলকাতায় অনেক সঙ্গীতগুনী বাস করেন এবং সেখানে গেলে সিনেমায় বাজানোরও সুযোগ পাওয়া যায়। ঠিক সেই সময় উস্তাদ আমজাদ আলি খানের পিতা হাফিজ আলি খান রামপুর থেকে কলকাতায় এসে বসবাস করতে শুরু করেন। কলকাতায় সে সময় প্রচুর সঙ্গীতের মহফিল বসতো। সেখানে গানবাজনা শোনানোর সুযোগও ছিলো অনেক। কলকাতায় তখন তেমন ভালো তবলাবাদক ছিলেন না। হাফিজ আলি মসিত খানকে ডেকে পাঠালেন কলকাতায়। সেই ডাক শুনে কলকাতায় চলে এলেন ওস্তাদ।
শুরু হলো ফারুখাবাদ ঘরানার এক নতুন পর্ব। কলকাতায় এসে মসিত খান শুধু যে বিভিন্ন বিখ্যাত গায়ক বাদকদের সঙ্গে সঙ্গত করতে লাগলেন তাই নয়, তিনি একক ভাবে বহু অনুষ্ঠানে তবলা বাজাতে লাগলেন। সবাই তাঁর বাজনার কদর করতে লাগলো। ফারুখাবাদ ঘরানার বিশিষ্টতায় আকৃষ্ট হতে লাগলেন কলকাতার সঙ্গীতপ্রেমী জনগণ। এই ঘরানায় বোল পড়ার ওপর জোর দেওয়া হতো। ঘিদান, তক তক, নগ নগ, ধিরধির কিটতক ইত্যাদি বোল এই ঘরানারই দান। দোধারি, তিনধারি, চৌধারি, তিপাল্লি, চৌপাল্লি ইত্যাদি নানারকম বোল পঢ়াও হতো ঘরানায়। ঘরানায় প্রায় হাজারের ওপর কম্পোসিশন বাজানো হতো! এই সময় মসিত খানের সংস্পর্শে আসেন শ্রী রাইচাঁদ বড়াল এবং শ্রী জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের মতো মানুষ এবং তাঁর কাছে শিখতে শুরু করেন। পরে এঁরাই তবলার এক একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন। রাইচাঁদ বড়াল ছিলেন অন্যতম সিনেমা প্রযোজক। তিনি মসিত খানকে সিনেমাতে বাজানোর সুযোগও করে দেন। মসিত খান এইসব ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে তৈরী করতে লাগলেন পুত্র কেরামতুল্লা খানকে যিনি ভবিষ্যতে এই ঘরানার বিখ্যাততম শিল্পিদের মধ্যে একজন হন।
প্রচুর ছাত্রছাত্রী শিখতে শুরু করায় মসিত খান নিজের বাড়ির বাইরে বিভিন্ন স্কুলে শেখাতে শুরু করেন, যেমন ১৯৩১ থেকে ৫০ পর্যন্ত ঝংকার মিউসিক সার্কল, ১৯৫১ – ৫৫ পর্যন্ত তানসেন মিউসিক স্কুল, ৫৫ – ৫৭ রাগরঙ, ৫৭ – ৭১ কলাকার ইত্যাদি।
রাইচাঁদ বড়াল এবং জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ছাড়াও আজিম খান, মন্টু ব্যানার্জী, কানাই দত্ত ছিলেন মসিত খানের ছাত্র। বাংলার বেশীরভাগ বিখ্যাত তবলিয়ার সঙ্গেই ফারুখাবাদ ঘরানার যোগাযোগ স্থাপিত হয় মসিত খানের মাধ্যমে। মসিত খানের নাতি এবং কেরামতুল্লা খানের ছেলে হলেন এখনকার বিখ্যাত তবলিয়া উস্তাদ সাবির খান। তিনিও কলকাতা নিবাসী এবং নিজে বহু অনুষ্ঠানে বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে বহু ছাত্রছাত্রীকে শিখিয়ে চলেছেন।
এই ঘরানার আরেক পতাকাবাহক বিখ্যাত গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও তাঁর বিখ্যাততম ছাত্রদের কথা বলবো পরের পর্বে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।