ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ১৬)

আলাপ

কয়েকজন বিখ্যাত খেয়ালিয়ার কথা বলবো যাঁদের ঘরানার বন্ধনে বাঁধা যায় না, তার মধ্যে বেগম পরভীন সুলতানার পর আজ বলব বিখ্যাত খেয়ালিয়া জুটি রাজন সাজন মিশ্রজীর কথা। অতি সম্প্রতি ২০২১ সালে করোনার প্রকোপে আমরা হারিয়েছি রাজনজীকে, যে ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।
এঁদের কথা বলার আগে দু কথায় বলে নিতেই হবে বনারস ঘরানার কথা। এই ঘরানার তো শুধু খেয়াল ঘরানা নয়, এর কথা এরপর বারবার ঘুরে আসবে। কারণ এটি একটি আশ্চর্য ঘরানা। প্রায় ছয় সাতশো বছর আগে আজমগড়, ভাগলপুর, সমস্তিপুর, লক্ষ্ণৌ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে প্রচুর সঙ্গীতজ্ঞ কাশী বা বনারসে এসে বসবাস করতে শুরু করেন। তার মূল কারণ হলো কাশী নরেশ বা কাশীর রাজা চেত সিং ছিলেন সঙ্গীতের বিশেষ সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক। তিনি এই সঙ্গীতজ্ঞদের আদর করে তার সভায় স্থান দেন এবং অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে ছিলেন ধ্রুপদ ধামার শিল্পী, খেয়ালিয়া, ঠুংরী গায়ক, সেতার ও বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র শিল্পী, তবলিয়া এবং নৃত্য শিল্পীগণ। তারা এবং তাদের বংশধরেরা বনারসের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে বাস করতে থাকেন। গড়ে ওঠে এক মিশ্র ঘরানা, বনারস ঘরানা। আদি বনারস ঘরানার সঙ্গীতকে রূপ দেন ঠাকুর প্রসাদ, দরঘাই, মিঠাইলাল। তারা গায়ন, অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র, তবলা  এবং নৃত্য এই চারটি ধারাতেই ছিলেন সমান পারদর্শী। ফলে প্রথম থেকেই বনারস ঘরানায় এই সবকটি ধারার সঙ্গীত চর্চা হতো। দুশো বছর আগে রাম সহায় বনারস তবলা ঘরানার সূচনা করেন এবং পাঁচটি সংখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ধরণের তাল তৈরীর পদ্ধতি বানান, যা বিভিন্ন ধরণের গান এবং নৃত্যে ব্যবহার হতো।
কাশীর বা বনারসের সঙ্গীত ঘরানার কয়েকজন প্রতিভূ হলেন বড়ে রামদাস, রাম প্রসাদ মিশ্র, বদ্রীপ্রসাদ মিশ্র, হরিশঙ্কর মিশ্র, বাগেশ্বরী দেবী, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, রসুলন বাঈ, গিরিজা দেবী প্রভৃতি এবং বাদ্যযন্ত্রী যেমন হনুমান প্রসাদ মিশ্র, গোপাল মিশ্র, আনোখে লাল, কন্ঠে মহারাজ এবং কিষণ মহারাজ। লক্ষ্য করলে দেখবেন এরা কেউ খেয়ালিয়া, কেউ সেতার শিল্পী, কেউ বিখ্যাত ঠুংরী গায়িকা, কেউ তবলা বাদক, সারেঙ্গী বাদক আবার কেউ বা বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। অর্থাৎ সঙ্গীতের সমস্ত শাখাতেই উৎকৃষ্টতার সাক্ষর রেখেছেন এই ঘরানার শিল্পীরা এবং ঘরানার সবকটি বৈশিষ্ট্যই মাটির কাছাকাছি এবং তাতে গঙ্গাতীরের লোকপরম্পরা ও হিন্দু মন্দিরের গায়ন, বাদন ও নৃত্যের ছাপ। এই মিশ্র ঘরানার অসাধারণ সাংগীতিক ঐতিহ্যের জন্যই বনারসকে ২০১৫ সালে ইউনেস্কো “সঙ্গীতের শহর” উপাধি দেন। সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখার কথা এবং বিখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের কথা বলতে গিয়ে তাই বারবার বলবো বনারস ঘরানার কথা।
এবার বলি পন্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্রজীর কথা। ১৯৫০ এর দশক। গঙ্গার তীরে বনারস বা কাশী এক মন্দিরময় প্রাচীন শহর। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বিখ্যাত মন্দিরগুলি আর সেখানে সর্বদাই চলে পূজা পাঠ ভজন কীর্তন। দুটি বালক, একজনের বয়স বছর এগারো, আর একজন মাত্র পাঁচ বছর। বনারসের ঘাটে বসেছিলো। ছোটজন, সাজন প্রতিদিন দেখে মন্দির থেকে গান করে ফেরেন পিতাজী পন্ডিত হনুমান প্রসাদ মিশ্র, সঙ্গে থাকে প্রসাদের লাড্ডু, টাকা, নানা উপহার। তারও খুব ইচ্ছে হয় এসব পাওয়ার। সে বড়ে ভাইয়া রাজনকে বললো “ভাইয়া তুমি তো বড়ে রামদাসজীর গন্ডে বাঁধা শিষ্য! তুমি মন্দিরে গান শোনাতে পারো না? তাহলে পিতাজীর মতো আমরাও লাড্ডু পাবো!” কথাটা মনে ধরলো বড়ো ছেলেটির। কিন্তু গুরুজী যদি বকেন? সবে তো একটা রাগ পুরিয়া ধনেশ্রী শিখেছে সে! যদিও পিতাজীর কাছে শুনে শুনে অনেক বন্দিশ, ভজন, কীর্তন গলায় তুলে নিয়েছে সে। ভয়ে ভয়ে গিয়ে গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করলো। গুরুজী হেসে বললেন “লাল্লা, রিওয়াজ বহোত বাকী হ্যায়। অভী বাহার মত গা, লেকিন মন্দির মে দেওতা কে সামনে গানে সে দেওতা খুশ হোতা হ্যায়। বাচ্চোঁকো ভগবান কা রূপ মানা যাতা হ্যায়। মন্দির মেঁ গানে সে কোঈ দোষ নহী।“ খুশী হয়ে ভাইকে বলে রাজন “তু ভী মেরে সঙ্গ গায়েগা! দোনো ভাই মিলকে গায়েঙ্গে তো মুঝে ভী ডর নহি লাগেগা।“ ভয় পেয়ে সাজন বলে “লেকিন ভাইয়া ম্যায় তো আভি সিখা হি নহী! ম্যায় ক্যা গাউঙ্গা! মুঝে ডর লাগতা!” রাজন বললো “ডর মত! ম্যায় জো ভী গাউঙ্গা আচ্ছি তরাহ সে সুনতে রহনা। জব বোলুঙ্গা, মেরে পিছে সুর লগা, তাল মিলা, মুখড়া পাকড়!” ভয়ে ভয়ে রাজী  হয়ে গেলো সাজন। এরপর কোনদিন সোমবার কাশী বিশ্বেশ্বর মন্দিরে, মঙ্গলবার হনুমান মন্দিরে ঢুকে গাইয়েদের সঙ্গে বসে যেতো দুই ভাই। ছোট বাচ্চা দেখে সবাই উতসাহ দিতেন। প্রথমে গাইতো দুই ভাই তারপর বড়ো পন্ডিতরা। খুব জনপ্রিয় হতে শুরু করলো দুই ভাইয়ের গান । গানের শেষে তারা কোনদিন পেতেন লাড্ডু, আবার কখনো কপালে পাঁচ দশ টাকাও জুটে যেতো। খুব খুশী দুই ভাই। শুরু হলো এক জীবনভরের সঙ্গীত জুটি।
এই সময় হঠাত মারা গেলেন বড়ে রামদাসজী। তখন রাজন শিখতে শুরু করলেন তার পিতা হনুমান প্রসাদজী এবং কাকা গোপাল প্রসাদজীর কাছে। পিতাজী তাদের শেখাতেন বনারস ঘরানার বৈশিষ্টগুলি, বনারস ঘরানার রসসিক্ত খেয়াল গায়কীর কথা, যার মধ্যে মিশে আছে ধ্রুপদ ধামারের গাম্ভীর্য, খেয়ালের কৌশল এবং ঠুংরীর লালিত্য। তবে তিনি সব সময় বলতেন “বেটা ইয়ে মত সমঝো কি হমারে ঘরানাই সবসে আচ্ছা হ্যায়। হর সময় সব ঘরানা কি সঙ্গীত সুনো ঔর উনকী আচ্ছি চিজোঁ কো আপনে গানে মে উপয়োগ করো। শিখনে কি কোশিশ করো নঈ চিজোঁকো।“ এই শিক্ষা তারা আজীবন মেনে এসেছেন। রাজনজীর ছিলো ঈশ্বর প্রদত্ত কন্ঠ। আর সাজনজী মূলত রাজনজীর থেকেই শিখতেন। এইভাবেই কয়েক বছরের মধ্যেই তৈরী জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে উঠলেন পন্ডিত রাজন মিশ্র এবং স্টেজে তাকে অনুসরণ করেই রাগের শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে লাগলেন। তারা সবসময়েই জুড়ি হিসাবে গাইতেন। দুজনের গায়কী একে অপরের পরিপূরক হিসাবে বিশিষ্ট করে তুলতো তাদের অনুষ্ঠান। তাদের প্রথম বিখ্যাত অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি ছিলো বনারসের সংকটমোচন মন্দির সমারোহ, যেখানে রবিশংকরজী বাজাতে এসেছিলেন, সেদিন ছিলো তার জন্মদিন। অনুষ্ঠান শুরুর বেশ খানিকক্ষণ পর এসে পৌছন তিনি। তখন রাজন সাজন মিশ্রর গান চলছিলো। শুনে এতো ভালোলাগে রবিশংকরজী যে গান শেষ হওয়ার পর তিনি তাদের প্রথম থেকে আবার সব গাইতে অনুরোধ করেন। তার কথায় আবার প্রথম থেকে পুরো অনুষ্ঠান করেন রাজন সাজন মিশ্রজী। রবিশংকর মুগ্ধ হন এবং ভ্রাতৃদ্বয়কে কলকাতায় নিয়ে আসেন! নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে প্রায় ৩০০০০ মানুষের সামনে রবিশংকরজী তাদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং সেদিন অনুষ্ঠান শেষে গোটা হল উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানায় শিল্পীদ্বয়কে। এরপর দেশে বিদেশে সঙ্গীত পরিবেশন করে খ্যাতি অর্জন করেন ভ্রাতৃদ্বয়। ১৯৭৪ সালে পুণেতে সওয়াই গন্ধর্ব সম্মেলনের কথা। তাদের গান শুনে মুগ্ধ হন শ্রোতারা। তার মধ্যে ছিলেন পন্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন এবং তার পুত্র। পটবর্ধনজীর পুত্র খুশী হয়ে তাদের বড়ে গুলাম আলি খানের এক বিখ্যাত বন্দিশ “আ এ মন্দিরবা” শিখিয়ে দেন। তার মনে হয়েছিলো যে এরাই এই বন্দিশের প্রকৃত সমাদর করতে পারবে। এরপর পাতিয়ালা ঘরানা এবং পন্ডিত ভীমসেন জোশীজীর কিরানা ঘরানা ও আমীর খানের গায়কী বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে রাজন সাজনজীকে এবং তারা এই সমস্ত সঙ্গীত আত্মীকরণ করে তাদের নিজেদের স্টাইল তৈরী করেন, যা বনারস ঘরানা থেকে ভিন্ন।
রাজনজী সবসময় নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন এবং নতুন কিছু নিয়ে আসতে চাইতেন তার গানে। প্রথমদিকে নিজেদের শেখা পনেরো কুড়িটি রাগ গাইলেও পরে নানা অপ্রচলিত রাগ, যেমন ছায়ানট, নন্দ, বেশ বড় করে কেদার ইত্যাদি গাইতে শুরু করেন। নিজের দাদাকে যুগপুরুষ বলে বর্ণনা করেছেন সাজন মিশ্র। বলেছেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ না থাকলে এমন গায়কী হয় না। পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমী, তানসেন সম্মান ইত্যাদি বহু সম্মানে ভূষিত হন এই পন্ডিতদ্বয়। ২০২১ যখন সামান্য অক্সিজেনের অভাবে দিল্লীর এক হাসপাতালে মারা যান রাজনজী, তখন এমন দুঃখের ঘটনা ভারতীয় সঙ্গীতে আর আসেনি এবং এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয় এমনি বলেন ভারতীয় সংগীত জগত। কিন্তু তার ভাই সাজন মিশ্র ছিলেন শান্ত। তিনি বলেন এ ঈশ্বরের ইচ্ছা। জীবনের শুরু থেকে তিনিই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ঠিক করে দেন। জীবন মৃত্যু তারই হাতে। কিন্তু তবু এমন একজন শিল্পী যিনি নিজের ঘরানাকে ছাপিয়ে গেছিলেন বহুগুণ, তাকে কি ভোলা যায়?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।