ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৮)

আলাপ

দিল্লি, আগ্রা ও গোয়ালিয়র উত্তর ভারতের এই তিনটি জায়গাকে তিনটি বিন্দু ধরে সরলরেখায় যোগ করলে একটি ত্রিভুজ হয়। এই ছোট্ট ত্রিভুজের মধ্যেই গড়ে উঠেছিলো দু দুটি বড় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরানা। এর একটি যদি গোয়ালিয়র ঘরানা হয় তবে অপরটি হলো আগ্রা ঘরানা। ইতিহাসের পথ ধরে সুদূর অতীতে গেলে দেখা যায় এই গোয়ালিয়র ঘরানার সৃষ্টিকর্তা এবং আদিপুরুষ যেমন স্বামী হরিদাস এবং মিয়াঁ তানসেন, তেমনি আগ্রা ঘরানার সূচনা করেন নায়ক গোপাল! তাঁদেরই বিভিন্ন বংশধারার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দুই ঘরানা। গোয়ালিয়র ঘরানা যেমন ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কী নিয়ে পূর্ণ বিকশিত হয় মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে, আগ্রা ঘরানায় খেয়াল গায়ন শুরু হয় আরো পরে। দুটি ঘরানাই অনেক প্রনম্য শিল্পির জন্ম দিয়েছে যারা প্রায়শই এই ত্রিভুজের মধ্যে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করেছেন এবং সেই অঞ্চলে নিজেদের সঙ্গীত ছড়িয়ে দিয়েছেন। অতএব একটি ঘরানার ওপর অন্যটির প্রভাব থাকা খুবই স্বাভাবিক! অথচ এতো কাছাকাছি দুটি অঞ্চলে গড়ে ওঠা ঘরানাদুটির গায়নশৈলীর মধ্যে কিন্তু প্রচুর পার্থক্য। তার মূল কারণ দুটি ঘরানা ধ্রুপদের দুটি আলাদা স্টাইল থেকে তাঁদের গায়নপদ্ধতি গ্রহণ করে।
গোয়ালিয়র ঘরানার কথা আগেই বলেছি। আজ তবে বলি আগ্রা ঘরানার কথা। আগ্রা বললেই মনে হয় তাজমহল! কিন্তু আগ্রা ঘরানার সূচনা যখন হয়, তখন তাজমহল তৈরীই হয়নি। এমনকি মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনাও হয়নি। গোয়ালিয়র ঘরানার মতোই আগ্রা ঘরানার সূচনাও হয় মূলত ধ্রুপদ ও ধামার গায়নের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে খেয়াল গায়ন প্রবর্তিত হয় ঘরানায়। তাই আগ্রা ঘরানার গায়নশৈলী নিয়ে বলার আগে ধ্রুপদ সম্বন্ধে দু একটি কথা বলা প্রয়োজন। ধ্রুপদ কথাটি এসেছে ধ্রুবপদ কথা থেকে। ধ্রুব মানে যা চিরস্থায়ী এবং পদ অর্থাৎ কবিতা । কথিত আছে ধ্রুপদের আদি রূপ শোনা যায় শামবেদের সময় থেকে, যখন ঋষিরা মুখে মুখে সুর করে বেদপাঠ করতেন! তাই ধ্রুপদকে আদি সঙ্গীতও বলা হয়। ভার্গবপুরান ও নাট্যশাস্ত্রেও ধ্রুপদের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০ শতাব্দী থেকে। ধ্রুপদ গানের সঙ্গে সাধারণত তানপুরা এবং মৃদঙ্গ বা পাখোয়াজ বাজে। তবলা বাজে না। ধ্রুপদ শুরু হয় আলাপ দিয়ে। সেই আলাপে নানাধরণের বানী বা আলাদা আলাদা স্বর উচ্চারণ করা হয়। যেমন রি রে না না – তা না না তা – নোম তোম তা না না না ইত্যাদি। আলাপ, জোড় ও অতি দ্রুত ঝালা (নোম তোম) এর পর গানের বন্দিশ ধরা হয়, যার চারটি ভাগ। স্থায়ী অন্তরা সঞ্চারী ও আভোগ। এর পর গানের বানী নিয়ে নানা কায়দার পর দ্বিগুণ, তিনগুণ ও চারগুণে গানটির স্থায়ী অংশটি গাওয়া হয়।
ধ্রুপদ গায়নের নানা স্টাইল বা বানীর মধ্যে পড়ে গৌহর, খান্ডার, নৌহর ও ডাগর। ঐতিহাসিক বিভিন্ন লেখনী থেকে জানা যায় যে গোয়ালিয়র ঘরানার পূর্বপুরুষেরা গায়ন শুরু করেন ধ্রুপদের গৌহর বানী স্টাইল নিয়ে এবং আগ্রা ঘরানার পূর্বপুরুষেরা বেছে নেন নৌহর বানী। এটাই দুই ঘরানার স্টাইলের পার্থক্যের অন্যতম কারণ।
নৌহর বানী ব্যবহার করে গায়নের সূচনা হয় যখন দিল্লির সিংহাসনে আলাউদ্দিন খিলজীর শাসনকাল অর্থাৎ ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দে। আগ্রা ঘরানায় তখন শুধু ধ্রুপদ ধামারই গাওয়া হতো। পরে ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে ঘাগগে খুদাবক্স এই ঘরানায় খেয়াল গায়নরীতি নিয়ে আসেন।
আগ্রা ঘরানার বিখ্যাততম শিল্পিদের মধ্যে আছেন ফৈয়াজ আহমেদ খান যাঁকে আমরা উস্তাদ ফৈয়াজ খান বলেই জানি এবং পন্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতনঝঙ্কার। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে আগ্রা ঘরানার গায়নশৈলীর প্রতিভূ বলা যায়, অর্থাৎ তাঁর গায়ন শুনলে অনায়াসে বোঝা যায় আগ্রা ঘরানার বৈশিষ্টগুলি কী কী?
কিন্তু আগ্রা ঘরানার গায়নশৈলী এবং উস্তাদজীর কথা বলার আগে এই ঘরানার একটি মজার ব্যাপার না বলে পারছি না। সেটি হলো এই ঘরানার প্রায় সব বিখ্যাত শিল্পিই গীতিকারও ছিলেন, অর্থাৎ খেয়ালের বিভিন্ন বন্দিশ রচনা করেছেন। এই বন্দিশ রচনা করার সময় তারা ছদ্মনাম, যেগুলি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই হিন্দু নাম, ব্যাবহার করতেন। সেই সব ছদ্মনাম কতো গানে যে আমরা শুনেছি, কিন্তু তার পিছনের মানুষটি অর্থাৎ রচয়িতার কথা জানতেই পারিনি। অনেক সময় আবার একই বন্দিশে দুজন শিল্পির নামও থাকতো।
যেমন, কালে খান (সরসপিয়া), গুলাম আব্বাস খান (সবরঙ্গ), বিলায়েত হুসেন খান (প্রান পিয়া), আনোয়ার হুসেন খান (রসরঙ্গ), লতাফত হুসেন খান (প্রেমদাস), শরাফত হুসেন খান (প্রেমরঙ্গ) এবং ফৈয়াজ হুসেন খান (প্রেম পিয়া)।
ভাটিয়ার রাগে দ্রুত একতাল একটি বন্দিশের উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। সর্বদাই গাই বন্দিশটি –
নিসদিন কছু না সুহাওয়ে
নিসদিন জিয়া কল ন পাওয়ে
যব উনকি ইয়াদ পড়ত, নয়নন সো নীর বহত
প্রেমরঙ্গ ইয়া হি রটত প্রেমপিয়া নাহি আয়ে।
দেখুন কী কৌশলে গানের বানীর অংশ হিসাবে দুজন বিখ্যাত শিল্পির ছদ্মনাম একসাথে ব্যাবহার হয়েছে! আর সবরঙ্গ-এর নাম দিয়ে যে কতো বন্দিশ আছে তার শেষ নেই। যেমন একটি বন্দিশের শেষ লাইনটি হলো “সবরঙ্গ মনকি ইয়েহি ইচ্ছা”।
সামনের পর্বে আসছি এই ঘরানার গায়নের বৈশিষ্ট এবং সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পি ফৈয়াজ খান সাহেবের কথা নিয়ে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।