ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৪০)

আলাপ

তবলা ঘরানার কথা শেষ করবো বেনারস ঘরানা দিয়ে। কিন্তু তার আগে তবলায় যে কলকাতা ঘরানার কথা বলেছিলাম, যা কিনা ফারুখাবাদ ঘরানা থেকেই উদ্ভব হয়েছিলো, তার একজন বিশিষ্ট শিল্পীর কথা না বললেই নয়, যাকে আমরা এই কোভিড প্যাডেমিকে হারিয়েছি ২০২১ সালে। তিনি এমন একজন শিল্পী যিনি অত্যন্ত অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ জোরালো, কারুকার্য সম্বলিত এবং বৈচিন্ত্রপূর্ণ বাজনায় সবাইকে মুগ্ধ করে এক অন্য উচ্চতায় উঠে গিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় গায়ক, বাদক এবং নৃত্যশিল্পী সবার সঙ্গে সঙ্গতে তিনি ছিলেন অনন্য। খুব কম তবলিয়া সমান সফল ভাবে এই তিন ধরণের শিল্পীদের সঙ্গে বাজাতে পারেন। তিনি হলেন পন্ডিত স্বপন শিবের ছাত্র পন্ডিত শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। পন্ডিত স্বপন শিব আবার ছিলেন ফারুখাবাদ ঘরানার বুজুর্গ কেরামতুল্লা খাঁ সাহেবের শিষ্য। সুতরাং শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ও পরম্পরার দিক থেকে ছিলেন ফারুখাবাদ ঘরানার শিল্পী। কিন্তু নিজ সৃজনশীলতা দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিজের বাজ ও স্টাইল তৈরী করেছিলেন যা সমস্ত ঘরানার শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলি নিয়ে তৈরী। পন্ডিত শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় এমন একজন তবলিয়া ছিলেন যিনি সদা সর্বদা তবলা নিয়ে চিন্তা করতেন। কী করলে নতুন কিছু দেওয়া যায়, নতুন কিছু পাওয়া যায় শেখা যায় সেই দিকে মন প্রাণ ও কান দিয়ে রাখতেন। সর্বদা তবলার কায়দা নিয়ে, টুকরা নিয়ে, চক্রধার নিয়ে প্রশ্ন করতেন। নতুন চিজ পাওয়ার জন্য সমস্ত উস্তাদদের কাছে ঘুরে বেড়াতেন। নিজে সৃষ্টি করতেন। তাঁর হাত ছিলো অত্যন্ত পরিষ্কার, জোরালো, তবলার ডাঁয়া ও বাঁয়া দুটিতেই কথা বলতো তাঁর হাত। যখন যার সঙ্গে সঙ্গত করতেন তাঁর গান বা বাজনা বা নৃত্যকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতো তাঁর বাজনা। সাথ সঙ্গত করার সময় সঙ্গের শিল্পীকে স্টেজেই চ্যালেঞ্জ করতে ভালোবাসতেন। বাজাতে বাজাতে হঠাত এমন একটি কায়দা বা টুকরা বা তালফেরতা ছুঁড়ে দিতেন যে খুব মনোযোগ না দিলে শিল্পী সমে ফিরতে পারবেন না ঠিক মতো। তাই তাঁর সঙ্গে পারফর্ম করার সময় সহশিল্পীকেও সেই উচ্চতায় এবং সেই মনোযোগ দিয়ে পারফর্ম করতে হতো। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একথা বলেছেন বিদুষী কৌশিকী চক্রবর্তী। তাঁর এই অনন্য বাজনার কথা এবং তাঁকে অতি অসময়ে হারানোর দুঃখ তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন কলকাতার তাঁর সব সমসাময়িক গায়ক বাদক ও বিশিষ্ট তবলিয়ারা। ডোভার লেন মিউসিক কনফারেন্সে কত শিল্পির সঙ্গে তাঁর গা শিউরে ওঠা ঝড় তোলা বাদন শুনেছি কতবার। সঙ্গতশিল্পী হিসাবে তাঁর নামটি শুনলেই উৎসাহে উঠে বসতে দেখেছি হলশুদ্ধ মানুষকে। প্রণাম জানাই এমন এক তবলিয়াকে।
এবার চলে আসি বেনারস ঘরানার কথায়। বেনারস ঘরানা তবলার প্রাচীনতম ঘরানাগুলির মধ্যে একটি। যেমন আগে বলেছি, বেনারসের রাজা ছিলেন গানবাজনার সমঝদার এবং শিল্পীদের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক। তাই গায়ন বাদন ও নৃত্যের বিরাট এক শিল্পীর দল এসে জড়ো হয়েছিলেন বেনারসে। গঙ্গার তীরে মাটির সৌরভ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক অপূর্ব ঘরানা, যেখানে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী শিল্পীও যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন সেতার, বাঁশী, সানাইয়ের বড়ো বড়ো শিল্পীরা এবং কত্থক নৃত্যশিল্পীগণ। আনুমাণিক দুশো বছর আগে ১৭৮০ – ১৮২৬ সালের মধ্যে পন্ডিত রামসহায় বেনারস তবলা ঘরানার স্থাপনা করেন। মাত্র নয় বছর বয়সে লক্ষ্ণৌ ঘরানার মধো খানের কাছে লক্ষ্ণৌতে তাঁর শিক্ষার শুরু। কিন্তু কিছুদিন এই স্টাইলে বাজানোর পর, তাঁর মনে হয় তাঁর বাজনায় অনেক পরিবর্তন আনা দরকার। তিনি ছয় মাসের জন্য সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে নির্জনে চলে যান এবং নিজের একটি আলাদা বাজ তৈরীর দিকে মন দেন। তাঁর মূল ইচ্ছা ছিলো যে এমন একটি বাজ তৈরী করবেন যেটির বৈচিত্র হবে এমন যে সেটি একক তবলাবাদন এবং যে কোন ধরণের সঙ্গীত ও নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গতের জন্য সমান উপযুক্ত হবে। খেয়ালের সঙ্গে সঙ্গতের সময় সেটি সূক্ষ্মভাবে বাজবে, আবার ধ্রুপদ বা কত্থক নৃত্যের সঙ্গে পাখোয়াজের মতো জোরালো ভাবে বাজবে। রামসহায় তবলায় আঙ্গুল ফেলার নতুন কায়দা আবিষ্কার করেন এবং বিশেষতঃ “না” বোলটি বাজানোর সময় অণামিকাটি গোল করে ফেলে ডাঁয়ার আওয়াজ সবচেয়ে জোরালো করেন। তিনি অনেক নতুন কম্পোজিশন তৈরী করেন, যেমন নতুন গৎ, ছন্দ, পরণ ও টুকরা। এ ছাড়াও বেনারস ঘরানার মূল বৈশিষ্ট “উঠান” (অর্থাৎ রাইসং, যেখানে বাঁয়া ও তবলায় যুগল চাঁটি মেরে শব্দকে আরো উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে একটি কায়দা বাজানো হয়), “বেনারসী ঠেকা” এবং “ফর্দ” তৈরী করেন। বেনারস ঘরানার অনেক বৈশিষ্টই নেওয়া হয়েছে পাখোয়াজের বাজ থেকে। আজকের বেনারস ঘরানার পূর্বী অঙ্গের বাজনা তার জোরালো আওয়াজের জন্য খ্যাত। তবে এই ঘরানায় অনেক সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল কারুকার্যও করা হয়।
এই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে আছেন পন্ডিত আনোখেলাল, শামতা প্রসাদ, কন্ঠে মহারাজ, কিষণ মহারাজ ও মহাপুরুষ মিশ্র। কলকাতায় বেনারস ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে আছেন মহাদেব প্রসাদ মিশ্রের ছাত্র পন্ডিত আনন্দগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পন্ডিত কিষণ মহারাজের ছাত্র পন্ডিত কুমার বোস ইত্যাদি।

এবার এই ঘরানার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সেই অর্থে পৃথিবী বিখ্যাত তবলিয়া কিষণ মহারাজ সম্পর্কে কিছু কথা।
কবির চৌরা বেনারসে ১৯২৩ সালে কিষণ মহারাজের জন্ম। তাঁদের পরিবার ছিলো সঙ্গীতের পরিবার। পিতা হরি মহারাজের কাছে কন্ঠসঙ্গীতে শিক্ষা শুরু হয় কিষণ মহারাজের। তবে অল্প বয়সে পিতার মৃত্যু হলে কাকা কন্ঠে মহারাজ তাঁকে দত্তক নেন এবং অত্যন্ত আদরে মানুষ করতে শুরু করেন। কন্ঠে মহারাজ ছিলেন বিখ্যাত তবলিয়া। কিষণ মহারাজকে তিনি আদর করে এক সেট ছোট্ট তবলা তৈরী করে দেন এবং সেটি নিয়ে খেলতে খেলতেই তবলা শেখার শুরু। পাশের বাড়িতেই থাকতেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী সিতারা দেবী। তাঁরা দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। শিশু বয়স থেকে তিনি ছিলেন কিষণ মহারাজের খেলার সাথী। ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে সিতারা দেবী বলেছেন, কাকা কন্ঠে মহারাজ কিষনজীকে অতিরিক্ত আদর আহ্লাদে মানুষ করেছিলেন। তিনি কোথাও বাজাতে গেলে সে সময়ের সবচেয়ে দামী ও নতুন খেলনাটি কিষণজীর জন্য নিয়ে আসতেন, যা আর কারো ছিলো না। সেই সব খেলনার প্রতি সিতারা দেবীরও খুব নজর ছিলো এবং সেগুলি নিয়ে খেলতে তিনি কিষণজীর বাড়ি যেতেন। কাকার আনা সেই সুন্দর ছোট্ট তবলাটি ছিলো কীষণজীর খুব গর্বের বস্তু। সেটি নিয়ে সে এতো গর্ব করতো যে অন্য বাচ্চাদের খুব হিংসে হতো। একদিন রেগে সিতারা দেবী সেই তবলার বাঁয়াটি ছুঁড়ে ফেলে দেন। কিষণজী পাগলের মতো রেগে গিয়ে সিতারা দেবীর মাথা এতো জোরে দেওয়ালে ঠুকে দেন যে মাথা ফেটে প্রচুর রক্তপাত হতে শুরু করে। তিনি নিজের মায়ের কাছে নালিশ করে ভেবেছিলেন কিষণজী খুব বকা খাবেন, তাঁর মা যখন কন্ঠে মহারাজকে এসে বলেন, উলটো কন্ঠে মহারাজ খুব আদর করে কীষণজীকে জিজ্ঞাসা করেন “বাবা কিষণ, তুমি বন্ধুকে এরকম করেছো কেন বেটা…” সিতারা দেবীর মা রেগে বলেন যে তাঁর মেয়ের মাথা ফেটে এতো রক্ত পড়ছে আর বকাঝকা না করে এমন আদর? কন্ঠে মহারাজ শুধু হেসে বলেন “বাচ্চে হ্যায়! ছোড়িয়ে, ঠিক হ্যায়”
কিষণ মহারাজ ছিলেন অপূর্ব সুন্দর পুরুষ, তাগড়া শক্তিশালী লম্বা ছিলো তাঁর চেহারা। তিনি এতো শক্তিশালী ছিলেন যে তাঁকে বেনারসের গুন্ডা বলতো স্থানীয় লোকেরা। সিতারা দেবীও ছিলেন শক্তপোক্ত চেহারার। দুজনে অবহেলায় গঙ্গায় এক তীর থেকে অন্য তীর সাঁতরে পেরিয়ে যেতেন! সবাই বিস্মিত হয়ে যেতো! দুজনের বয়সের তফাত ছিলো ছয় মাস। কিষণ মহারাজের যখন আঠেরো বছর বয়স তখন তিনি বেনারসে তবায়েফদের কোঠায় বাজানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। কোঠার মধুর সঙ্গীত ও নাচ তাঁর খুব ভালো লাগতো । কিন্তু সিতারা দেবী তাঁকে বহু বুঝিয়ে বিরত করেন। বলেন যে কোঠায় বাজালে কেউ সঙ্গীতজ্ঞ হিসাবে সম্মান করবে না। বড়ো বড়ো শিল্পীদের সঙ্গে স্টেজে বাজালে তবেই তিনি যোগ্য সম্মান পাবেন। তিনি কিষণ মহারাজকে মুম্বইতে নিয়ে আসেন। মুম্বইতে তিনি বিভিন্ন সিনেমায় বাজানোর সুযোগ পান এবং স্টেজে রবিশংকর, আলি আকবর এবং আরো বহু বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে বাজাতে শুরু করেন। তিনি তিন বছর সিতারা দেবীর মুম্বইয়ের বাড়িতেই থাকতেন। শুরু হয় তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
এই সময় আফগানিস্থানের মহারাজা মুম্বই এলে তাঁর সম্মানে এক জলসার আয়োজন হয়। তবলাবাদকের মেঝেতে বসার আয়োজন হয়েছিলো। কিন্তু মহারাজ নিজে চেয়ারে বসেছিলেন। তা দেখে কিষণজী বলেন যে তাঁর কলা স্বর্গীয়। তাই মহারাজের পায়ের কাছে বসে তিনি একে ছোট করতে পারবেন না। তখন মহারাজ তাড়াতাড়ি সেই হলের মধ্যেই স্টেজের ব্যবস্থা করে দিলে তবেই কিষণজী বাজান।
কিষণ মহারাজের সঙ্গে সিতারা দেবী, যাকে সত্যজিত রায় নৃত্যের দেবী বলেছিলেন, তাঁর কত্থক নাচের যুগলবন্দী সেই সময় খুব জনপ্রিয় হয়। এক একটি অনুষ্ঠান তিন চার ঘন্টা লম্বা হতো। লোকে ধৈর্য ধরে বসে শুনতো সেই অনুষ্ঠান এবং করতালিধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতো হল! এক অন্য উচ্চতায় পৌছতো সে সব অনুষ্ঠান! শুধু শহরেই নয়। বিভিন্ন জায়গায় গ্রামে গঞ্জে ঘুরে অনুষ্ঠান করতেন তাঁরা! কোথাও বা খোলা এবরোখেবরো মাঠে, কাদা আর পাথরের ওপরেই বসে যেতো আসর, তাতে হাজার হাজার মানুষ! একবার বিহারের গ্রামে গোরুর গাড়ি চড়ে হাতে লাঠি নিয়ে অনুষ্ঠান শুনতে এসেছে বহু মানুষ! অনুষ্ঠানের মাঝখানেই আলো চলে গেলো! ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে হাজার হাজার টর্চ জ্বলে উঠলো! সেই আলোতেই কিষণ মহারাজের জোরালো তবলার সঙ্গে নাচলেন সিতারা দেবী!
সিতারা দেবীর সঙ্গে কিষণজীর এই বিশেষ সম্পর্ক ক্রমে প্রেমের রূপ নেয়, কিন্তু তা বিবাহ পর্যন্ত পৌছয়নি, কারণ তার আগেই বাড়ির পছন্দের পাত্রীর সঙ্গে কিষণজীর বিয়ে দিয়ে দেন তাঁর বাড়ির লোক। সেই সময় পুরুষরা একাধিক বিবাহ করতে পারতেন এবং কন্ঠে মহারাজ সিতারা দেবীকে অনুরোধ করেন কিষণজীকে বিবাহ করতে। কিন্তু তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে বাঁচতে চাননি এবং অন্য এক মহিলার সংসার নষ্ট করতে চাননি।
এবার আসি কিষণ মহারাজ ও রবিশংকরের কথায়। মুম্বইতে রবিজীর সঙ্গে দেখা হয় কিষণজীর এবং এক দীর্ঘ বন্ধুত্বের সূচনা হয়। সেটি পঞ্চাশের দশকের কথা। রবিজী সদ্য মাইহারের শিক্ষা শেষে অন্নপূর্ণাজীকে বিবাহ করে মুম্বই গেছেন। কিষণজী এবং রবিজী দুজনেই তখন সদ্য যুবক এবং দুজনেরই অপূর্ব সুন্দর চেহারা। বিশেষতঃ কিষণজীর চেহারা ছিলো অপূর্ব সুন্দর! বিশাল লম্বা চৌড়া ফর্সা চেহারা, সুন্দর উজ্জ্বল মুখকান্তি! কপালে বড়ো লাল তিলক! কিষণজীর স্টেজ প্রেসেন্স ছিলো অসাধারণ! দুজনে স্টেজে এসে বসলে, বিশেষতঃ মেয়েরা তাঁদের বাজনা শুনবেন না তাঁদের দেখবেন তা ভেবে পেতেন না। তার সঙ্গে রবিজীর চোস্ত স্মার্ট ইংরাজী কথাবার্তা! দর্শক শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার জন্য তা ছিলো যথেষ্ট! দুজনেরই মহিলা ভক্তের সংখ্যা ছিলো অগণ্য! তাঁদের একসাথে রাম লক্ষ্মণের জুড়ি বলা হতো। দুজনেই অসাধারণ পারফর্মার, প্রবল রোম্যান্টিক ও সুদর্শন ছিলেন। দুজনেই ছিলেন অদ্ভুত সৃজনশীল! স্টেজে বসে তাৎক্ষণিক এমন সব বোল ও কায়দা বাজাতেন কিষণ মহারাজ আর তার জবাব দিতেন রবিশংকরজী যার কোন তুলনা হয় না।
সেই সময় অনেক বিখ্যাত তবলাবাদক ছিলেন, কিন্তু কিষণ মহারাজকে সবাই বলতেন “মাস্টার”।১৯৪৫ সালে মুম্বইতে দুজনের দেখা হওয়ার পর, প্রথম দুজনে একসঙ্গে বাজান অল বেঙ্গল মিউজিক অনফারেন্সে। সেটি অত্যন্ত সফল ও বিখ্যাত হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পন্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর স্টেজে লাফিয়ে উঠে দুজনকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন “ইয়ে দো বচ্চে হমারে সঙ্গীত জগতকি ভবিষ্য কে দো সিতারে হ্যায়!”
উস্তাদ আল্লারাখাজীর সঙ্গে কিষণ মহারাজের তুলনা করে রবিজী বলেছেন, দুজনে দুই বিপুল ব্যক্তিত্ব কিন্তু দুজনে দুজনের মতো। কিষণজীর বাজনায় ছিলো বেনারস ঘরানার সুগন্ধ! তিনি স্টেজে এসে বসতেন একেবারে অন্যরকম ভাবে। সবাই বসে পদ্মাসনে, তিনি হাঁটু মুড়ে অদ্ভুতভাবে বসতেন। তাঁর বাজনায় চাঁট ও উঠান, যেটি তাঁর কাকা কন্ঠে মহারাজেরও বৈশিষ্ট্য, সেটি অধিক ব্যবহার করে পাখোয়াজের ঢঙে জোরালো বাজনা বাজাতেন। বড়ো মুখের তবলা ব্যবহার, গম্ভীর আওয়াজ এবং অনেক সময়েই ষড়জের বদলে পঞ্চমে তবলা বাঁধা ছিলো তাঁর বৈশিষ্ট। আল্লারাখাজীর বাজনাতেও পাখোয়াজের বৈশিষ্ট ছিলো, কারণ তিনি ছিলেন পাঞ্জাব ঘরানার, কিন্তু তিনি নিজের মতো এক বাজনার স্টাইল তৈরী করেছিলেন। আল্লারাখাজী বিদেশে প্রচুর বাজিয়েছেন এবং সেখানে কিষণ মহারাজের তুলনায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অনেক বেশী। তবে কিষণ মহারাজ কারো সঙ্গে তুলনীয় নন। শোনা যায় কিষণ মহারাজ খুবই মেজাজী মানুষ ছিলেন এবং নিজের শর্তে নিজের মতো তবলা বাজাতেন। তাঁর সঙ্গে কোন শিল্পী বাজাচ্ছেন, তাঁর সুবিধা হচ্ছে কি না এ সব দেখতেন না। কিন্তু রবিজী বলেছেন কিষণজী তাঁর সঙ্গে কখনো এমন করেননি। একটি মজার ঘটনার কথা বলেছেন রবিজী। একবার রাজস্থানে মার্গসঙ্গীতের আসর বসেছে এক খোলা মাঠে। শ্রোতারা বেশীরভাগ গ্রামের মানুষ। তাঁরা শত শত উট ও গরু নিয়ে এসেছেন। চারিদিকে প্রবল হই হট্টগোল! এমন গোলমালে বাজাবেন কী করে ভেবে যখন রবিশংকর অস্থির, এমন সময় হাতে দেশী বন্দুক নিয়ে সভায় এলেন কিষণ মহারাজ। বসে, যেন বন্দুকটি পরিষ্কার করছেন এমন ভাবভঙ্গী করতে লাগলেন! রবিজী তো অবাক! তারপর বন্দুকের নল ওপরে করে বেশ কটি ফাঁকা ফায়ার করলেন আকাশের দিকে! মূহূর্তে সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলো! কোনরকমে চটপট বাজনা শেষ করলেন দুজনে!
রবিজী আরো মজা করে বলেছেন, যথারীতি নিজের হাঁটু মুড়ে, পা পিছনে করে বিশিষ্ট ভঙ্গীতে বাজাতে বসতেন কিষণজী! তারপর তবলায় প্রচুর পাউডার ছড়িয়ে জোরে “ধা” লাগাতেন! পাউডার উড়ে চারিদিক সাদা ধোঁয়ায় ভরে যেতো! রবিজী তাঁর এই কীর্তিকলাপ দেখে হেসে অস্থির হতেন, কিন্তু দর্শককে মূহূর্তে আকর্ষণ করে নিতো এই সব। তারপর বাজানো অনেক সহজ হয়ে যেতো।
তবলিয়া ছাড়াও কিষণ মহারাজ ছিলেন ছবি আঁকিয়ে, ভাস্কর ও কবি। উস্তাদ আমজাদ আলি খান স্মরণ করেছেন একবার একটি অপূর্ব গণেশ মূর্তি বানান কিষণজী এবং তাঁর বাড়িতে সেটি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে পন্ডিত রবিশংকর, আলি আকবর, আমজাদ আলি প্রভৃতি সবাইকে আমন্ত্রণ করেন।
১৯৪৫ সালে থেকে ১৯৯০ এর দশক অবধি রবিজীর সঙ্গে কলকাতা, মুম্বই থেকে শুরু করে লন্ডন অবধি বিভিন্ন জায়গায় বাজিয়েছেন কিষণজী। তিনি লয়ে অত্যন্ত পাকা ছিলেন। নানারকম ছন্দ ও লয়কারী ছিলো তাঁর বৈশিষ্ট। বিভিন্ন কঠিন ও অন্যরকম তালের গৎ কিষণ মহারাজের সঙ্গে বাজিয়ে তৃপ্তি পেতেন রবিজী, যেমন বিলম্বিত তিনতাল, ধামার, ঝাপাল, রূপক, পঞ্চম-কি-সওয়ারী ইত্যাদি।
রবিজী বলেছেন “কিষণ মহারাজ এমন এক উচ্চস্তরের বাজিয়ে ছিলেন যে আর একজন কিষণ মহারাজ আর হবে না।“

রবিশংকর ছাড়াও বিলায়েত খান, ইমরাত খান, পন্ডিত শিবকুমার শর্মা, পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া এবং আমজাদ আলি খানের সঙ্গে দীর্ঘকাল বাজিয়েছেন কিষন মহারাজ। আমজাদ আলি স্মরণ করেছেন, একবার ইন্দিরা গান্ধীর বাড়িতে আমজাদের সঙ্গে বাজাতে যান কিষণ মহারাজ। সেই অনুষ্ঠান এমন উচ্চতায় ওঠে যে খুব খুশী হয়েছিলেন সঙ্গীত ও সংস্কৃতিপ্রিয় ইন্দিরাজী।
অপূর্ব রূপবান ও রোম্যান্টিক কিষণ মহারাজ তিনবার বিবাহ করেছিলেন। শেষবার ছিলেন এক বিখ্যাত সেতার শিল্পী, যিনি তাঁর ক্যারিশমায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করেন।
তবলা বাজিয়েদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন কিষণ মহারাজ। কোন একসময় তবলিয়াদের যোগ্য সম্মান দেওয়া হতো না। মূল শিল্পীদের সঙ্গে এক স্টেজে বসার অধিকার ছিলো না তাঁদের। পুরো কনফারেন্সে বাজানোর জন্য একবারেই সাম্মানিক দেওয়া হতো তাঁদের। তিনি এই সব প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং সম্মান উদ্ধার করেন। তারপর থেকে তবলিয়ার সাথে মূল শিল্পীর সওয়াল জবাব, এক আসনে বসা এবং প্রতি অনুষ্ঠানে বাজানোর আলাদা সাম্মানিকের প্রচলন হয়। কিষণ মহারাজ ছিলেন সর্বোচ্চ সাম্মানিক প্রাপ্ত তবলিয়া।
আমেরিকায় বিখ্যাত মহিলা উকিল শ্যামলা রাজেন্দর স্মরণ করেছেন পন্ডিত যশরাজের সঙ্গে কিষণ মহারাজের বাজনা। সেখানে নব্বই মিনিট গায়নের মাঝখানে সোলো তবলা বাজানোর কথা কিষণজীর। শ্যামলাজী ভেবে পাননি, গায়নের মাঝখানে এতো লম্বা তবলাবাদন কিভাবে নেবেন শ্রোতারা, কিন্তু অপুর্ব রাজকীয় চেহারার কিষণ মহারাজ যখন স্টেজে এসে বসলেন এবং সামান্য হারমোনিয়াম এবং সারেঙ্গীর সঙ্গে বাজাতে শুরু করলেন, দর্শক নড়তে ভুলে গেলো এবং কোথা দিয়ে যে নব্বই মিনিট চলে গেলো কেউ বুঝতেও পারলো না। দর্শকরা তাঁকে ছাড়তেই চাইছিলেন না!
সন্তুর মায়েস্ত্রো শিবকুমারজী স্মরণ করেছেন, একবার বেনারসে তিনদিনের এক উৎসবে বাজাতে গেছেন তিনি। উৎসব শেষে কিষণজী তাঁকে অনুরোধ করলেন আরো দুদিন থেকে যেতে। তাঁর বাড়িতে তিনি সদ্গুরু জগজিত সিংজীকে ডেকেছিলেন। সেখানে শিবজীকে বাজাতে হবে। সদগুরু অত্যন্ত সঙ্গীতজ্ঞানী! তাঁর সামনে বাজাতে বসে দুরুহ জয়তালে একটি গৎ বাজাতে শুরু করেন শিবজী। তবলায় কিষণ মহারাজ, পাশে বসে তাঁর পাশে বসে তাঁর ছেলে পূরণ মহারাজ হাতে তাল রাখছেন। তেরো মাত্রার অতি জটিল তাল। হঠাত চিৎকার করে উঠলেন কিষণজী। ছেলে ধমকে বললেন “তুঝে তাল রাখনা নহী আতা!” তারপর বললেন এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল একটি তাল, যা ঠিক মতো রাখতে না পারলে বাজনা নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি পাঁচরকম জয়তাল জানেন এবং সন্তুরের সঙ্গে মানানসই হবে যেটি সেটিই বাজাবেন! কিষণজী জানতেন কোন ধরণের যন্ত্রের সঙ্গে কেমন বাজাতে হয়। একবার মুম্বইতে এক অনফারেন্সে একজন দুঃখ করে তাঁকে বলেন যে আগের দিনের অনুষ্ঠানে বাজনা নষ্ট হয়ে গেলো শামতাপ্রসাদজী এমন জোরে বাজালেন। কিষণ মহারাজ কিন্তু জানতেন সন্তুরের মতো মিষ্টি সূক্ষ্ম যন্ত্রের সঙ্গে কেমনভাবে সঙ্গত করতে হয়।
কলকাতায় তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে একজন হলেন পন্ডিত কুমার বোস। পিতা বিশ্বনাথ বোসের কাছে শিখলেও, পিতার মৃত্যুর পর তিনি কিষণ মহারাজের ছাত্র হন এবং তাঁর বিশেষ প্রিয় হয়ে ওঠেন। কিষণজী তাঁর বাজনা, তাঁর জীবন, তাঁর ভালোমন্দ লাগা সবই কুমারজীর সঙ্গে আলোচনা করতেন। সপ্তাহে দু তিনবার সুদীর্ঘ ফোনালাপ হতো তাঁদের। কিষনজী বলেছেন তাঁর এতো ফোন বিল আসে শুধু কুমারজীর সাথে কথা বলতে গিয়ে।
একবার বেনারসের রবিশংকরজীর সঙ্গে বাজাচ্ছেন কিষণজী। বাজাতে বাজাতে তাঁর মুড হঠাত পরিবর্তন হয়ে গেলো। স্টেজে কোন একটি বিষয় তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলো। সম্ভবতঃ মাইক ঠিকভাবে কাজ করছিলো না। তিনি প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। কুমারজী যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে গেলেন যে কিছু অসুবিধা হচ্ছে কি না, তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে তাঁকে লাঠি নিয়ে মারতে ছুটলেন প্রায়! ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন কুমারজী। হোটেলে ফিরে তাঁর খুব অস্বস্তি হতে লাগলো! পরের দিন রবিজীর ফোন এলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কুমারকে যে তিনি কী করতে চান। তিনি কিষণজীর কাছে যেতে চাইলেন। আশ্চর্য ব্যাপার সেদিন কিষণজী আগের দিনের ঘটনার উল্লেখ পর্যন্ত করলেন না। দিব্যি হেসে কথা বলতে লাগলেন। এমনি খেয়ালি ও মুডি ছিলেন। খুশী হয়ে বললেন “আও আও, দুধ ঔর জিলাবি খাও!” তারপর একসঙ্গে টাঙ্গা রেস দেখতে চলে গেলেন! ঘোড়ার রেস দেখা তাঁর আর এক নেশা ছিলো। নিজে ঘোড়া চড়তেও পারতেন।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে কিষণ মহারাজের একেবারে শেষ বয়সের বাজনা শুনি। সেটি হয়তো দু হাজার পাঁচ বা ছয় সাল। বিখ্যাত তবলিয়া সমর সাহা তাঁর বাবার সম্মানে একটি দুদিন ব্যাপি তবলা সম্মেলনের আয়োজন করেন। গোটা ভারতের কোন বিখ্যাত তবলিয়া ছিলো না, যিনি সেই অনুষ্ঠানে বাজাননি। সেখানেই কিষণ মহারাজের একক বাদন শোনার সৌভাগ্য হয়। ঘিয়ে পাঞ্জাবী ধুতি পরিহিত সুউচ্চ চেহারার মহারাজ। তাঁর শ্বেত কেশরাশি কাঁধ ছাড়িয়ে পড়েছে! মুখে পান, ঠোঁটে মৃদু হাসি, কপালে বিরাট রক্তবর্ণ বিরাট রক্তবর্ণ তিলক! তাঁর দেশী বিদেশী ছাত্রের দল স্টেজে আগে থেকেই আসীন। অন্ততঃ ছয় জোড়া তবলা সাজিয়ে রাখা হয়েছে তাঁর জন্য। স্টেজে বসে পরিষ্কার বাংলায় দর্শকদের সম্বোধন করলেন তিনি। ঐ বয়সেও হাতের জোর আর চাঁটি অবাক করার মতো! অত্যন্ত জটিল লয়কারী ও বোলকারী করেছিলেন। বড়ো মুখের তবলায় সেদিন বিশুদ্ধ বেনারস ঘরানার বাজনা শুনেছিলাম যা চিরদিন মনে থাকবে।
পদ্মবিভূষণ পন্ডিত কিষণ মহারাজ ২০০৮ সালে চুরাশি বছর বয়সে মারা যান।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।