গল্পে তপোব্রত মুখোপাধ্যায়

আলো


রাতের কথা বলার হলেই একটা শূন্য ইচ্ছে জ্যান্ত হয়। ভয়ের না ভক্তির, সে কথা মাথায় বড় আসে না। আমার শ্যামনগরের বাড়ির গায়ে একটা বড় আম গাছ ছিল। তার পাশের দিকে এখনও হলুদ হ্যালোজেন ল্যাম্প আছে (ওটা হ্যালোজেনই বলে মনে হয়), সেইটার আলো সেই সেদিনের আম গাছটার পাশ দিয়ে এসে মশারি পেরিয়ে বিছানায় পড়তো। আমি জেগে গিয়ে দেখতাম বাবা পাশে শুয়ে, হয়ত মা কোন কোন দিন (সেদিন হয়ত নাইট ডিউটি থাকতো বাবার), আর জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে আমগাছ। বাবার বলা একানড়ে কি বস্তু ওইখানে খুঁজতে বসতাম। খানিক পর পর রাস্তা দিয়ে ঝুমঝুমি আর বাঁশির আওয়াজ পেতাম। আমগাছের আড়ালে সেসব চলে যেত। জানতাম, ওদের কেউ একানড়ে দেখেনি। কারণ ওরা রাত্তির তো দেখেনা, আলোর নীচে থাকে।

শীত এলে আলোর বাইরে, অন্ধকারের বাইরে ভরসা থাকতো কিসের উপর যেন। ভয় শরীরে থাকতো, মনে নয়। ভয় বিষয়টা হয়ত শারীরিক, মানসিক বিষয়টা বিস্ময় বা কৌতূহল হয়ত। যেটা নতুন বাড়িতে এসে জেগে রাত দেখার মধ্যে ছিল। মাটিতে প্রথম শোয়ার সময় পায়ের কাছে চাঁদের আলো পড়লে পা গুটিয়ে নিতাম। অন্ধকারের চোখ আছে, ঢাকা দেবার মত আব্রু। একটা সহজ আবরণ যেটা অভ্যস্ত হয়ে আসে হয়ত জন্মের ক’বছর পর থেকেই, তাকে পেরিয়ে যাবার ভয় আছে, মেনে নেবার অভ্যাস হলে আলো নেহাত অস্বস্তি বাড়ায়।

যে সময় উপরতলায় একলা থাকা যেত, তখন প্রথম দেখতে পাবার আরাম আসে রাত নামলে। ছাদের উপর থেকে, গঙ্গার দিকে ইঁটভাটার চিমনী, কৃষ্ণচূড়া গাছ, নিম, আরও ওপারে একটা বট না অশ্বত্থ রথবাড়ির মাঠে। অন্ধকারে সব কথা বলত। আরও ছিল পূর্ব দিকের আম গাছ, পাশে একটা লাল-পাতার বাহারি গাছ, তার ওপারে আরও খান দুই গাছ। আলো আসতো সেসবের ফাঁক গলে। আলোর অভ্যেস ছিল না বোঝা যেত, আলো চোখে পড়ত না। পাতায় আলো পড়ে জ্যান্ত হওয়া রাত দেখার পর স্বপ্ন খুঁজতে না ঘুমোলেও চলে। অনিদ্রা বিভোর-প্রাসঙ্গিক।

একদিন ঝড়ে আম গাছখানা উল্টে গেল। দিন পাঁচেক পর সেটা কাটতে হল। আরেকখানা পোঁতার আশা ছিল, কিন্তু মাটি ছিল বাল্মীকি। দায় ঘাড়ে সবুজ সাফ হয়ে গেল। গোটা দিন একটা বড় চত্বর ঘিরে ভব্যতার ধ্বজা-মুড়ো এক করে রোদে মাটি পোড়ালো। আমাদের বাড়ি ছিল কল্কে গাছ, শিউলি, নারকেল। সেসবের মধ্যে কল্কের সরু পাতায় কিছুটা আব্রু আটকাতো। রাতে পূর্ব দিকের বাকি গাছগুলো কেমন বিদ্রোহ করত। একটা জোর আলোর পিছনে থাকা সবকটা গাছ বিদ্রোহ করত গোটা রাত। তারপর রাস্তার ধারের হ্যালোজেনের গোড়ারখানা বাদে সেগুলো সব কাটা পড়ল। কল্কে গাছটাও। শেষ পাতাটা উঠেছিল একটা মোটা অংশ থেকে, গোড়ার মাথা কাটা গেছিল একদিন আলো-র অজুহাতে। শেষ অব্দি কোপ মারল ওই পাতাটার গোড়ার কাছেই। নরম, তেলতেলে পাতা ছিল একটা।
এসবের পর লজ্জা হত। বাবা যাবার আগে নারকেলের পাতার ছায়ায় বসতো। সে ছায়াটাও আর ছিল না। একটা কাঁঠালগাছ গোড়ার কাছে, শুধু গোড়ার দিকে বলে কোনপারে হেলবে সে ভরসা না থাকায় নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। খোলা আকাশে সপ্তর্ষিমন্ডল, না হলে চাঁদ, এরা ছাড়া অন্ধকারের দায় বোঝার দায় নেওয়া সব মাথা পরিষ্কারের দায়ে কাটা পড়েছিল।

পূর্বদিকের গোড়ার কাছের গাছখানা সেই হ্যালোজেনের আলো বেঁধে এখনও স্পষ্ট। হ্যালোজেনখানা কখনও জ্বলে, কখনও জ্বলে না। উপড়ে পড়া আম গাছের গোড়ার কাছে আরও আরও অনেক গাছ হয়েছে এযাবৎ। হয়ত আবার উপড়ে যাবে, তবু হতেই থাকে। সবুজ থেকে, অন্ধকার থেকে একটা অন্য আলো আসে এখন। সকাল বা রাত, একটা অন্যরকম আলো। ঔদ্ধত্য নেই কোথাও।

শুরুতে বলা সেই আমগাছখানা কাটা পড়েছে অনেকদিন। সেটার এক সন্তান এখন বংশের মান রাখে। আলো পেরিয়ে আসার আগে ছায়ায় আটকে যায়। কল্কে গাছখানার জায়গায় এবাড়িতে একটা আম গাছ উঠেছে। ঔৎসুক্য আছে, ঔদ্ধত্য নয়। আপাততঃ আর কিছুই কাটা পড়বে না। যা থাকার, তা তার নিজের মতো থাকবে।

একটা গোটা রাত শব্দ শেখায়। চুপ বলতে নিজের বাইরে অনেক আরও শব্দের গায়ে কান পাতার কথা থাকে। নারকেল পাতা ছুঁয়ে দিলে চাঁদের আলোয় একটা একটা করে গোটা গাছের পাতার থেকে আরও গাছে ছড়িয়ে পড়া কাঁপন থেকে নরম হাওয়া পেয়েছি। বাইরের কথায় সয়ে এলে নিজের মধ্যে কান পাতার অভ্যেস আসে। ঔদ্ধ্বত্য নয়। আমি বাদ দিয়ে আমার কথা বলতে গেলে সবার আগে একলা পড়ে আমি। এইখানেই হেরে যাই সবাই, একা একা।

মানুষ প্রথমে ভয় পেতে শিখল। ভক্তি করতে শিখল। সুন্দর শিখল তারপরে। সুন্দরের প্রতি ভক্তি, মুগ্ধতা প্রথম চিরকালের ধারণা তৈরি করে দিল। তারপর সেইসব সে একদিন ধ্বংস হতে দেখল। ভয়ের ভক্তি এলো। সুন্দরের ধ্বংসের ভয়ে ধ্বংসের সুন্দর মরে গেল। পুজো করতে এসে এলো ভয়ের তুষ্টি, তুষ্টির পূর্ণতার মাঝে আবার মানুষ এসে বসলো। সব ছন্দের মিল খুঁজতে গিয়ে সুন্দরের বিভাজন চিনল না। এক পাতায় সব ফেলে নিজের মতে বিচারে বসলো। বারবার জিতে যাওয়ার ভ্রমে হেরে যাওয়ার অভ্যাস হল। সব গল্পের একটা শেষ থাকতেই হবে, এমন ভাবতে বসে মানুষের এক জন্ম পেরিয়ে যায় কিন্তু আসলে যে শূন্য মাত্রে ফাঁকা নয়, সে কথা বোধে থাকে না। শূন্য থেকে এক পেরিয়ে আবার শূন্য শেখা শুরু না হলে টের হয় না যে কখন অনেক কথা বলার ভিড়ে সব কথাই না বলা রয়ে গেছে। যা বলার ছিল তা নিজেরই শোনা হয়নি। সূর্যে চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধ হলে খেয়াল পড়ে, চেনাই হয়নি রাতের এতো আলো আছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।