প্রবন্ধে তপন মন্ডল

মানবতার বিকাশে রোজা

পৃথিবীতে মনুষ্য জাতি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে দুটি সম্প্রদায়ের হয়। আস্তিক এবং নাস্তিক। আস্তিক সম্প্রদায় ঈশ্বরে অনুগত। আবার নাস্তিক সম্প্রদায় ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী। নাস্তিক সম্প্রদায় ভোগ-বিলাসে বিশ্বাসী। তারা আধ্যাত্ম বিরোধী। আবার ঈশ্বরের অনুগত আস্তিক ঈশ্বরে সমস্ত কিছুই সমর্পণ করে। তারা মনে করে জগতের সমস্ত সৃষ্টির মূলে আছে ঈশ্বর। পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব কিছু নিয়ম নীতি আছে। মুসলিম ধর্মীয় আচরণের একটি মুখ্য দিক হলো রোজা। ইসলামের প্রধান পাঁচটি ধর্মীয় স্তম্ভের একটি হল রোজা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার সময়কাল নির্ধারিত হয়। এ সময় ধর্মপ্রাণ মানুষ সমস্ত পাপকর্ম থেকে বিরত থাকেন। কামাচার ও সকল প্রকার ভোগ বিলাস এমনকি পানীয় জল থেকেও বিরত থাকে। ৩০ দিন পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রোজা পালন আবশ্যিক কর্তব্য ।

মানবতা বা মনুষ্যত্ব বিকাশে রোজার গুরুত্ব আছে। মানুষের ভিতরে দয়া-মায়া প্রেম ভালোবাসার উৎপত্তিতে রোজা সার্থক ভূমিকা পালন করে। মানুষ উদার হয়। ধর্মীয় অনুশাসনের শিক্ষায় শিক্ষিত করে। সমস্ত ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গঠন করে ।ধনী গরিবের বিভেদ দূর করে সততার সঙ্গে বসবাসের উদ্যোগী হয়। মানুষ মিলেমিশে থাকতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। ধর্মপ্রাণ উচ্চশিক্ষিত ও দয়ালু ব্যক্তিরা ইফতারে বহু গরিব দুঃখী বা দুস্থকে খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ দিয়ে মানবতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
রোজা পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি একাকী আত্মসমালোচনা এবং আত্মশুদ্ধির চরম সুযোগ পায়।

মানুষের ভিতরে নিষ্ঠাবোধ তৈরি হয়। নিষ্ঠুরতা এবং অমানুষিক পশুত্ব রোধ হয়। লোভ লালসা ত্যাগ করে মানুষ সংযমী হয়। শুদ্ধ বিচার বুদ্ধির উন্মেষ ঘটে। মানুষের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতার উন্মেষ ঘটে। শুদ্ধতার পরিমণ্ডলে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। কোরআনের শুদ্ধ বানীগুলি অনুসরণে বদ্ধপরিকর হয়। আত্মকেন্দ্রিকতা বা অহংসর্বস্ব ত্যাগ করে মানুষ হয়ে ওঠে বহুজনসেবায়।

রোজা মানুষকে আরও বেশি করে আধ্যাত্মিক করে তোলে। নৈতিক চরিত্রের পরিশুদ্ধতা ঘটায়। পরিবার, আত্মীয় , সমাজ ,জাতিকে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার পাঠে আকৃষ্ট করে। পরাভূত করে হিংসা ,দলাদলি, অন্যায়, অবিচার, লোভ লালসা, ব্যক্তিস্বার্থ ,হানাহানি, পরস্ত্রী কাতরতা ইত্যাদি।
মানুষ ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ হিংস্র পশুর ন্যায় দৈহিক শক্তিশালী নয়। তবে নৈতিক সামর্থের গুণে সে সর্বশ্রেষ্ঠ। আর এই গুণটি আসে রোজার মত আধ্যাত্মিক চেতনা থেকে। আগামী প্রজন্মের কাছে একটি আধ্যাত্মিক, মানবতাবাদী ও গঠনশীল সমাজের ভিত্তি প্রস্তুত করে রোজা।

অর্থশালী মুসলিম পরিবার রোজা পালন করেন পরিবারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে, ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের উদ্দেশ্যে। তবে রোজা করতে হয় অভুক্ত থেকে। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে হয় সকলকে। বিত্তশালী পরিবার গুলি বুঝতে শেখে অসহায় গরিব-দুঃখীরা কিভাবে ক্ষুধা নিয়ে জীবন সংগ্রাম করে। রোজা এই চরম ও বাস্তব শিক্ষার বার্তা বহন করে।
ধর্মপ্রাণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তির অনুপ্রেরণায় বহু দুরাচারী অসামাজিক জঘন্যতম হিংস্র পশু রুপী মানুষও ইসলাম নির্দেশিত শুদ্ধতার পথ অবলম্বন করে নিজের আত্মশুদ্ধিতে মনোনিয়োগ করে। পাপাচার পরিত্যাগ করে শুদ্ধ সমাজ গঠনে অংশগ্রহণ করে। সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশ তৈরি করে। সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ দূর করে সুস্থ সমাজ গঠনে বদ্ধপরিকর হয়।

তবে বেশ কিছু কালোবাজারি নাস্তিক মানুষেরা রোজার সময় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে মদত দেয়। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা অত্যন্ত সমস্যায় পড়ে। অসৎ উপায় অবলম্বন করে কালোবাজারীর মাধ্যমে বেশ কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের মানবতা বিসর্জন দিয়ে গরিবের সর্বস্ব লুট করে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।