মুক্তগদ্যে তপন মন্ডল

দ্বন্দ্ব নয় সংসার গঠনে চাই বিশ্বাস
কোনো একটি পরিবার বিশ্বাসের উপরেই টিকে থাকে। বিশ্বাস এক ধরনের মানসিক অবস্থা। পরিবারের প্রত্যেকের উপর বিশ্বাস থাকা মানেই পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া। আর যখন পরিবারের উপর কোন বিশ্বাস থাকে না বা প্রতিক্ষণে সন্দেহের প্রবণতা বাড়ে তখন সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবারগুলি ভেঙে যাওয়ার মূলেই হল সন্দেহ। একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তুলতে গেলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের উপর আস্থা বা বিশ্বাস থাকতে হয়।
‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’ – সমাজে এমন একটি বাক্য প্রচলিত আছে কিন্তু এমন কথা একটি সুন্দর সংসার গঠনে উপযুক্ত শর্ত নয়। সুন্দর সংসার গঠনে নারীকে যেমন সমস্ত স্বার্থ ত্যাগ করে সর্বস্ব দিতে হয় ঠিক তেমনি পুরুষদেরকেও সর্বশেষ ত্যাগ করতে হয়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ভালোবাসা এবং তাদের উপর বিশ্বাসই পারিবারিক শান্তি ও স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
একটি পরিবার একটি রাষ্ট্রের সমতুল্য। একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন বিষয়ে বৈষম্য থাকে, সামাজিক স্বার্থপরতা থাকে। তবুও রাষ্ট্র একটি বিশ্বাসের বাতাবরণ চাপিয়ে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে। অনুরূপ একটি পরিবারে একাধিক বিষয়ে দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও যৌথভাবে বসবাস করতে সক্ষম হয় শুধুমাত্র বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। তবে যখন বিশ্বাসের পরিবর্তে অবিশ্বাস বেশি মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে তখন সংসারের ভাঙ্গন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমান সমাজে একান্নবর্তী পরিবারগুলি ভেঙে যাচ্ছে। এর একটি প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। পরিবারের কেউ একজন বা কয়েকজনের ব্যবসা বা চাকরিসূত্রে আর্থিক সঙ্গতি ঘটালেই সে যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন ছোট সংসার গড়ে তোলে। আসলে তাদের মনের সংকীর্ণতা প্রকট হয়। তারা ভাবতে থাকে নিজের অর্থ ব্যয় করে কেন এমন একটি যৌথ পরিবারের ভরণপোষণের ব্যয় সে বহন করবে। কোনো কোনো পরিবারে সম্পত্তির অংশ নিয়ে এমন বিবাদ বাঁধে যে, শেষমেষ পৃথকভাবে ছোট সংসার গড়ে তুলতেই হয়। এমন স্বার্থপরতা, এমন আত্মদ্বন্দ্ব, সংকীর্ণ মনোভাব পরিবার ভাঙ্গনের জন্য দায়ী।
প্রাচ্যের তুলনায় পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে সংসার ভাঙ্গনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এখানে পুরুষ বা মহিলা অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হয়। তাছাড়া লিভটুগেদারের প্রবণতা এখানে সর্বমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় নারী-পুরুষের সম্পর্ক তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। তাদের দূরত্ব বাড়ছে। একাধিক বিষয়ে দ্বন্দ্ব বেড়েছে। নতুন করে জীবনসঙ্গী খুজে নেওয়ার ঝোঁক বেড়েছে।
ভারতের মতো দেশগুলিতেও অবশ্য বর্তমানে পাশ্চাত্যের মত লিভটুগেদার বা পরকীয়া বেড়েছে। সর্বদা চলছে পাশ্চাত্যেকে অনুকরণ করার প্রয়াস। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসের ব্যাপ্তি কমেছে। বিয়ের কিছু দিন পর থেকে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে নতুন বউয়ের বিভিন্ন বিষয়ে মনোমালিন্য, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস বেড়েছে। এমন যৌথ পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোট নতুন সংসার গঠন করার ঝোঁক অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ভুলে, একে অপরের উপর হিংসা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস পরিত্যাগের মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলা সম্ভব। সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন, যৌথভাবে এর মোকাবেলা করতে পারলেই সংসারে শান্তি অটুট থাকবে। একটি পরিবারে সকলের উপর ভালোবাসার অধিকার থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। এই অধিকার যখন অবিশ্বাসে পরিণত হবে তখনই পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। শুধুমাত্র বিশ্বাস এবং ভালোবাসার মাধ্যমে পরিবারের মানুষগুলোর মন জয় করতে পারলেই পরিবারগুলি আনন্দময় স্বর্গীয় অনুভূতি ও সুখ লাভ করবে। গড়ে উঠবে আদর্শ পরিবার।