মুক্তগদ্যে তপন মন্ডল

আন্দোলনেই মুক্তি
মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক জীব। জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে প্রতিক্ষণে কখনো একাকী, আবার কখনো বা সম্মিলিত প্রয়াসে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মুক্তির উপায় স্বরূপ সংগ্রাম বা আন্দোলনে অবতীর্ণ হতে হয়। আন্দোলন মুক্তির সোপান । আন্দোলন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। মানুষের দীর্ঘদিনের নানাবিধ অভাব , অভিযোগ জন্ম দেয় ক্ষোভের। যার অনিবার্য পরিণতি আন্দোলন। আন্দোলন কোন ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী হয়ে থাকে আবার কোন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন হয়।
আন্দোলন কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। আবার কোন ক্ষেত্রে সফল হয়। আন্দোলনকে একটি অসুস্থ জীবদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। A sick organism is released from the disease in the appropriate ministry.Again death occurs due to lack of proper care.
মানুষকে প্রকৃতির কোপ থেকে রেহাই পেতে বহু পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। তবে মানবতা বিরোধী, স্বার্থান্বেষী মানুষের নানাবিধ বিবেকহীন কৃত্রিম কার্যকলাপের বিরুদ্ধে মুক্তির একমাত্র পথ হলো আন্দোলন। যখন থেকে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি ঘটেছে তখন থেকে দুরাচারী, উৎপীড়নকারী , অত্যাচারী, স্বার্থান্বেষী, সমাজের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘটেছে। আধুনিক পৃথিবীতে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় গণ আন্দোলন ঘটেছে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধেও গণ সংগ্রাম ঘটেছে। এছাড়া বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিসন্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, বর্তমান সময়েপ্রবাহে ঘটে চলেছে। ১৯৬০ এর দশক থেকে আবার ছাত্র আন্দোলন, নতুন সামাজিক আন্দোলন এবং নারীর অধিকার রক্ষার স্বপক্ষে আন্দোলন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও সেখানকার শাসন ব্যবস্থা ইংরেজদের হাতেই থেকে যায়। ১৯৫০ এর দশকে ইংরেজ সরকার Population Registration Act জারি করে দক্ষিণ আফ্রিকায় কালো মানুষদেরকে শ্বেতাঙ্গদের থেকে আলাদা করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু আফ্রিকার কালো মানুষরা শ্বেতাঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় মধ্যমণি নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে। আন্দোলন জঙ্গি রূপ ধারণ করে। বাধ্য হয়ে ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক চাপে তাকে ইংরেজ সরকার মুক্তি দেয়। ৩০ বছর আন্দোলনের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় ম্যান্ডেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন। আর এরই সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার বর্ণবৈষমবাদের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
১৯৬০-এর দশকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী মুক্তি আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে Seneca falls convention এর মধ্য দিয়ে নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়। পুরুষদের সমান বেতনের দাবি, আইনের দৃষ্টিতে পুরুষদের সঙ্গে নারীদের সমান অধিকার, পরিবার পরিকল্পনা বা সন্তান ধরনের সিদ্ধান্তের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, ভোটাধিকার, প্রভৃতি অর্জনের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে।
ভারতবর্ষে বিশ শতকের সত্তরের দশকে নারীরা নিজেদের স্বতন্ত্র মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই শুরু করে। ১৯৮৫ সালে শাহবানো মামলাকে কেন্দ্র করে ভারতে নারীবাদী আন্দোলন গতিশীল হয়ে ওঠে। যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখা হতো আজ তাদের আন্দোলন অনেকাংশই সফল হয়েছে। মালালা ইউসুফজাই এর মত কিছু কন্ঠ প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে নারী – পুরুষের সাম্য প্রতিষ্ঠার
জন্য।
ভারতের চিপকো আন্দোলনে নারী সমাজের যোগদান এটি বিশেষ মাত্রা দান করেছে। যখনই বহিরাগত কোম্পানির লোক গাছ কাটতে আসতো মহিলারা প্রাণপণে গাছকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। তাদের আন্দোলন গাছ কাটা রোধ করতে সফল হয়।
আমেরিকা কর্তৃক ভিয়েতনাম আক্রান্ত হলে ১৯৬৮ সালে The French May আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন সামাজিক আন্দোলন এর সূচনা হয়। ফ্রান্সের এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা।
বর্তমানকালে পরিবেশ দূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন এর বিরোধিতা ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নর্মদা নদীর উপর বেআইনি বাঁধ নির্মাণ রোধ করা গেছে। সেইসঙ্গে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সম্ভব হয়েছে। মোলা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারত প্লাস্টিকের তৈরি ক্যারিব্যাগ ব্যবহারের বিরোধিতা শুরু করেছে। আবার লোকপাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারত দুর্নীতি মুক্ত রাষ্ট্র গঠনে সচেষ্ট।
এছাড়া সমগ্র বিশ্বে বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে।
সম্প্রীতিকালে আরব রাষ্ট্রগুলি স্বৈরাচারী একনায়তন্ত্রের অবসান এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেছে। এই আন্দোলনের নাম দেওয়া হয় আরব বসন্ত আন্দোলন।
এছাড়া বাংলাদেশ শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের মৃত্যুদন্ডের দাবি ও মৌলবাদী জামাত- ই- ইসলাম দলকে নিষিদ্ধ করেছে।
সামাজিক আন্দোলনের আরেকটি দিক হল বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধীদের সামগ্রিক অগ্রগতির আন্দোলন। বর্তমানে এই আন্দোলনও সফল হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ছাত্র আন্দোলন বহু আগেই শুরু হয়েছে। মূলতঃ যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে ছাত্রসমাজ আন্দোলন শুরু করেছিল। বর্তমানে এই আন্দোলনের তীব্রতা বেড়েছে ।
১৯১৯ সালে চীনের মে ফোর্থ আন্দোলন ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শোষণের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই আন্দোলন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শুরু করে চেন -তু- সিউ এর নেতৃত্বে। আন্দোলন অনেকাংশ সফল হয়। চীনে কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানের পথ সুগম করে।
বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন ছিল উর্দুভাষী বঞ্চনাকারী পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে।
প্রতিটি আন্দোলনের স্বরূপ আলাদা। তীব্রতা ভিন্ন। কিন্তু লক্ষ্য মুক্তি। পৃথিবীর অধিকাংশ আন্দোলন, মুক্তি দিয়েছে বঞ্চনার। ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছে সমাজে । প্রতিবাদী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে আগামী প্রজন্মকে। মুক্ত করেছে বৈষম্যের বাঁধ। শান্তির বাতাবরণের মোড়কে পরিবেষ্টিত করেছে সবুজ গ্রহকে। মুক্তির পথ ধরে আগামী দিনে পৃথিবী হয়ে উঠবে সুন্দর ,স্বাস্থ্যবান ও প্রাণবন্ত (On the way of release, the world will become beautiful, healthy and vivid.)