ক্যাফে আলোচনায় তন্ময় কবিরাজ

বিষয়: মলয় রায়চৌধুরী: বর্তমান কবিতা

লোরকা লিখেছিলেন,”ইউ উইল নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট আই লাভ ইউ বিকজ ইউ স্লিপ ইন মি…”মলয় রায়চৌধুরী ক্ষেত্রে কথাগুলো ধ্রুব সত্য। তাঁর মূল্যায়ন হয়নি যথার্থ। ব্রিটিশ সাহিত্যে শেক্সপিয়ার যুগে চাপা পড়ে গিয়েছিল জন ডান নেতৃত্বাধীন মেটাফিজিক্যাল কবিরা, মলয় রায়চৌধুরীর মত কবিরাও চাপা পড়ে গেছে কালের স্রোতে, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হবার কারনে। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবহেলার যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে মৈত্রেয়ী দেবী যেমন ক্ষমা চেয়েছিলেন, মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি উৎপল কুমার বসু লিখেছিলেন,”আক্রান্ত হয়েছেন অনেক।”তবু শিরদাঁড়া ছিলো সজাগ, শত অভিযোগও নিজের উপর বিশ্বাস ছিলো অগাধ। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। মার্কসবাদের উত্তরাধিকার শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, সোভিয়েত ভেঙে পড়তে পারে। নিজের মতো করে বক্তব্য রেখেছেন। লিটিল ম্যাগাজিন নয়, বরং পত্রিকাতেই বেশি জোর দিতেন। বিদেশি হলে হয়তো খ্যাতি জুটতো আরোও। বাঙালি ঘরের মানুষকে কোনদিন সম্মান দিতে শেখেনি। বাঙালির যখন চেতনা হয় তখন সে মারা যায়। সেটা জীবনানন্দের থেকে শুরু করে হালফিলের সন্দীপ দত্ত, মলয় রায়চৌধুরী ক্ষেত্রেও সত্য। প্রতিষ্ঠানের বিরোধী হওয়া অপরাধে তিনি অবহেলিত। বর্তমানে একশ্রেণীর কবিরা গিরগিটির মত আদর্শ বদল করে, মিছে সহানুভূতির জন্য রাস্তায় মোমবাতি নিয়ে “ক্যাটওয়াক” করে তবু সত্য কথা বলতে তাঁদের বিবেকে বাঁধে। বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁদের অনেকে চিন্তা অথছ লেখার সময় বদেলিয়ার, সিলভিয়া প্লাথ, মার্কস ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। বর্তমানে একশ্রেণীর প্রতিষ্ঠিত কবিদের উদাসীনতার জন্য কবিতা আজ আমজনতার ঘরে যাচ্ছে না। কবিতার গুরুত্ব কমছে। শঙ্খ ঘোষের কবিতার ডাকে কলকাতার রাজপথে মিছিল করেছে মানুষ,সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে। কিন্তু আজ রাজনীতির বায়রণের মত কেউ এসব কবিদের বিশ্বাস করে না, জানে সরকার বদল হলে সুবিধাভোগী একশ্রেনীর কবিরা ডিগবাজি খাবে। আজ তারা স্বঘোষিত কবি। মানুষের আবেগের সঙ্গে প্রতারনা। বাংলা কবিতার পতনে এঁরাই দায়ী। কবির কাজ দালালি করা নয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বুঝতে ডিগ্রি লাগে না, সবাই বুঝতে পারে এ কবিতা আমার। আজ বাঙালি বলতে পারবে না তার প্রাণের কবি কেউ আছে কিনা? মলয় রায়চৌধুরী ভাষা সহজ।তিনি বলতে পারেন,”একাধিক চুমু খেলে আমার গা গুলোয়/… সব ভেঙে চুরমার করে দেবো শালা।”জীবনের প্রতি মাঝে মধ্যে এতো বিতৃষ্ণা জন্মায় যে তিনি বলে ফেলেন,”আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই।”

মলয় রায়চৌধুরী লিখেছিলেন,”ভীতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন।”। সেই মানুষটাই ২০০৩সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন। জীবন তাঁকে অস্থির করে তুলেছে। জখম কবিতায় তিনি হাংরী আন্দোলনের কথা বলেছেন,”প্রতিহিংসা আমাকে জেরবার করে তুলেছে”,”আক্রমণের আগে তাই দুদণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছি।”সমাজ যে ভাষা ব্যবহার করে সেই আদিম শব্দে তুলে ধরেছেন ক্ষত। যাতে সমাজ মলম লাগিয়ে দেয়।তিনি একজন লেখকের সামাজিক দায় পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অন্দ্রুজকে পাঠিয়েছিলেন পাঞ্জাবে। বর্তমানে সদা জাগ্রত কবি নেই। ভিন রাজ্য হলে প্রতিবাদ করে,আর রাজ্যে হলে নীরবতার বিজ্ঞাপন দেয়। অপরাধ কিন্তু এক। কবি যখন তার আদর্শ বিক্রি করে ওরা _আমরা রাজনীতি করে তখন সে বিবেকহীন, মননশীলতার ধর্ষক। কবির সৎ, নিরপেক্ষ আবেগ জনমানসে আনবে আন্দোলন। কবি মলয় রায়চৌধুরী লিখছেন,”পদ্যের ভিতরে পুরে পাঠাচ্ছি তোর যত প্রেমিকের ভিড়ে।”আবার সেই মানুষই লেখেন,”বারো দিনের স্বামীর ভয়ে যে কারণে আওয়াজ দেন ঢেঁকি।”নবাডে চাকরি করতেন। ১৯৬১সালে সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, দেবী রায়ের সঙ্গে বানিয়ে ফেলেন হংরি আন্দোলনের দলিল। পরে তাতে যোগ দেন বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু, ফাল্গুনী রায় প্রমুখ। প্রফেসর হাওয়ার্ড মাককর্ড বলেছিলেন, মলয় রায়চৌধুরী ছিলেন হাংরি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তবু তার কথা কেউ বলে না। মির্জা গালিবের কথা ধার করে বলা যায়,”কয়ী উমিদ বর নেহি আতি/কয়ী সুরত নজর নেহি আতি।”

১৯৬৪সালে”প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার “প্রকাশ পেলে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাশে দাঁড়ালেও পরে আন্দোলনের ধরন দেখে নিজেকে সরিয়ে নেন। তাঁর “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” লেখাতে তিনি জাতপাত বর্ণ বিদ্বেষের নির্মম ছবি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, তাঁর নামগন্ধ উপন্যাস কলকাতার প্রকাশকরা ফিরিয়ে দেন। যেখানে বই প্রকাশ করার দোহাই দিয়ে প্রি বুকিং বলে নতুন লেখকদের কাছে টাকা হাতিয়ে নেবার চক্রান্ত চলে সেখানে এমন ঘটনা স্বাভাবিক। তথাকথিত বড় পত্রিকায় নতুন কবিদের জায়গা পাওয়া মুশকিল তাই প্রকাশকরা নতুন লেখকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে দেদার ব্যবসা করছে। সবাই সব জেনেও চুপ। বুদ্ধদেব বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যেভাবে নতুন কবিদের পাশে দাঁড়াতেন, বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা এক শ্রেণীর কবিদের সেই সাহায্য দেখা যায় না। তারা প্রচার সুখী। তাই কবিতা আজ কোমায়। নবারুণের মত সত্য কথা বলতে জানতেন মলয় রায়চৌধুরী।” ভোর রাতে দরজায় গ্রেপ্তারের টোকা পড়ে… পাড়ার লোকেরা তাকে কুপিয়ে মেরেছে।”নিজেকে বিচার করেছেন সবার মাঝে,”রবীন্দ্রনাথ, আপনি কখনও বাসন মাজেন নি সেটা জানি…. আমি ,আমার দাদা শৈশব থেকে শিখেছি..।”অনুবাদ করেছেন উইলিয়াম ব্লেকের দা ম্যারেজ অফ হেভেন অ্যান্ড হেল, আর্থার রিম্বায়দের এ সিজন ইন হেল, হেনরি মিলার, জেমস জয়েসের লেখা। সাহিত্যকে প্রসারিত করেছেন বহুদূর।”মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিল,”চলুন পালাই।”

তসলিমার মত বিতর্ক মলয় রায়চৌধুরীর ছায়াসঙ্গী। তিনি লিখতে পারেন,”নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকের ভ্যালেন্টাইন দিনে… উলংগ দেখার আতঙ্কে ভুগতে হবে না।”তাঁর জীবনে ডক্টর ফস্টাসের ছায়া। অশ্লীলতার দোষে অপরাধী হয়েছেন যখন তিনি লেখেন,”আমি কখনও কোনো প্রেমিকার স্তনে দাঁত বসাইনি/প্রথম প্রেমিকারও নয়…. দাঁতকে ঝকঝকে করে তোলে ওদের দুধ”। আবার কখন মনে করিয়ে দেন,”কপিরাইট লঙ্ঘন করলে চলবে না”কারন তিনি দেখতে পান,”প্রতিটি মানুষের মাথা তার ধর থেকে খসে পড়ে গেল।”তাঁর গল্পে তিনি উপলব্ধি করেছেন, মৃতরা জীবিতদের থেকে বেশি শিক্ষিত। অভিমান, ভাঙা গড়া আড়ালে রেখে গেছেন আইরণী। বানার্ড শো এর মত তিনি আইকনক্লাস্ট। তিনি “কল্লোল”। তিনি ঠিক না ভুল সেতো সময় বিচার করবে। হিন্দোল ভট্টাচার্য লিখছেন,”বাংলা কবিতা তার আবহমানতাকে নিয়েই আধুনিকতার দিকে এবং উত্তর আধুনিকতার দিকেও এগিয়ে চলেছে।”

কিন্তু যে প্রশ্নটা উত্তর পাবার লোভে লিউ টলস্টয়ের জারেরের মত মলয় রায়চৌধুরীর কথা বললাম, সেটা হলো, বাংলা কবিতা কি এলিটের হয়ে যাচ্ছে? কবিতা বিশ্বাস হারাচ্ছে? যতোই কবিতা ব্যবসা হোক, বিজ্ঞাপন দিক, বাংলা কবিতার মোহভঙ্গ হচ্ছে জনমানসে। উইলিয়াম দেমিং বলছেন,”একটা খারাপ সিস্টেম ভালো মানুষকে প্রতিবার পরাজিত করে।” কবি শঙ্খ ঘোষ তাই লিখছেন,”সব সময় কি ভালই বলবে লোকে?/মন্দ কোথাও শুনতে হবে কিছু/তাই বলে কি ভেঙে পড়বে শোকে?”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।