T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় তনিমা হাজরা

অথ তর্পণকথা
অনেক ক্ষেত্রেই আমরা না বুঝেই কেবলমাত্র বিধি নির্ঘন্ট অনুযায়ী কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করে চলি নেহাতই সামাজিক ও ধার্মিক দায়বদ্ধতা থেকে।।
কিন্তু প্রতিটি আচারের গভীরে ঢুকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, যে প্রয়োজনীয়তা থেকে আচার গুলির উদ্ভব আমরা তার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে কেবলমাত্র জড় কাঠামোটিকেই আগলে ধরে বসে আছি, ফলে যে কারণে বা উদ্দেশ্যে আচারগুলির প্রচলন সেই মূল উদ্দেশ্য গুলিই আর সাধিত হচ্ছে না।।
সব আচার নেহাতই দায়সারা আচরণে পরিণত হয়েছে।।
মহালয়ায় পিতৃপক্ষের অন্তে এবং দেবীপক্ষের সূচনায় যে তর্পণ অনুষ্ঠান তা আসলে কি? কেন? এর মূল উদ্দেশ্য কি?
শুধুমাত্র জলাশয়ে গিয়ে তিল ও কুশ সহকারে মন্ত্র পড়েই কি তর্পণের দায়িত্ব আমাদের শেষ? বিস্তারিত আঙ্গিকে ব্যাপারটিকে অনুধাবন করার জন্য একবার চলুন প্রচলিত বিধান এর বাইরে গিয়ে একটু প্রশস্ত দিগন্তে শব্দটির উপর আলোকপাত করি বাস্তবিক তত্ত্ব ব্যবহার করে। বিষয়টিকে ভাবতে ও বুঝতে চেষ্টা করি খুব স্বাভাবিক এবং বাস্তবানুগভাবে।।
তিল কেন?
তিল হচ্ছে আদি শস্যবীজ। এটি শস্য আহুতি বা শস্যপূজার প্রতীক অর্থ্যাৎ শস্য উৎসর্গ বা বপন।
কুশ হচ্ছে একপ্রকার চিরহরিৎ ঘাস যা মাটির ভাঙ্গন ও ক্ষয় রোধ করে। এছাড়া এর অনেক ঔষধি গুণও আছে।।
তর্পণ ভঙ্গিমায় তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মাঝখানে কুশাঙ্গুরীয় ধারণের রীতির কথা বলা হয়েছে। এর কারণ জানতে হলে আগে আমাদের জৈব বৈজ্ঞানিকভাবে পাঁচটি আঙ্গুলের সাথে আমাদের মূল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যোগাযোগগুলি জানতে হবে।
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ = Ether = Brain = ব্যোম
তর্জনী = Air = Lungs = মরুৎ
মধ্যমা = Fire = Intestine = তেজঃ
অনামিকা=Water= Kidney =অপ
কনিষ্ঠা= Earth= Heart = ক্ষিতি
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুযায়ী আমাদের শরীরের ভিতর এই পঞ্চভূতের নিয়ন্ত্রণ দ্বারাই জীবনের আবাহন বা বিসর্জন।।
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের ও তর্জনীর মধ্যে কুশাঙ্গুরীয় ধারণ তাহলে বলা যেতেই পারে ইথার তরঙ্গে অনন্তে বার্তা প্রেরণ। মানে কি আকাশে মৃত আত্মার খোঁজ? আমার মনে হয় তা নয়। এ হচ্ছে মস্তিষ্কের সচলতার জন্য নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, যার নাম হচ্ছে জীবন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিন্তু brain death মানেই মৃত্যু।
ঐস্থানে কুশাঙ্গুরীয় ধারণ সজীবতার ইঙ্গিত।
নিজেকে জীবিত রাখতে পারলে তবেই তো অন্যের তৃপ্তি সাধনের দায়ভার কাঁধে তুলে নেওয়া সম্ভব। তাই না??
তৃপ( তৃপ্ত হওয়া) ধাতুটির সাথে সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয় অনট যুক্ত হয়ে তর্পণ শব্দটির জন্ম। তৃপ+অনট >অন= তর্পণ।।
অর্থ্যাৎ কিনা তর্পণ শব্দের অর্থ হলো তৃপ্তি প্রদান করা।
এই তৃপ্তিপ্রদানের দায়বদ্ধতা কার প্রতি?
সামবেদীয় তর্পণবিধিতে বলা হচ্ছে ,
১.দেবতর্পণ
২. মনুষ্যতর্পণ
৩.ঋষিতর্পণ
৪.দিব্যপিতৃতর্পণ
৫.যমতর্পণ
৬.ভীষ্মতর্পণ
এইরূপ নানাপ্রকার তর্পণ এর কথা।
পরবর্তীকালে লৌকিক আচারের হাত ধরে রামতর্পণ, লক্ষণতর্পণ, শূদ্রতর্পণ এর সাথে সংযোজিত হয়ে গেছে।। কিন্তু এগুলো মূল বৈদিক রীতিতে ছিল না।।
দেবতর্পণ
দেবতা এখানে প্রকৃতি এবং তদ্ভুত বিবিধ শক্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু,রুদ্র,প্রজাপতি। তার সাথে প্রকৃতিজ সমস্ত জীবন কুল যথা, যক্ষ, নাগ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, অসুর, হিংস্র জন্তু, সর্প, সুপর্ণ বা গরুড় জাতীয় পক্ষী, বৃক্ষ, সরীসৃপ, খেচর, জলচর, উভচর সমস্ত প্রাণী।
মন্ত্র বলছেঃ-
দেব-তর্পণ—ওঁ ব্রহ্মা তৃপ্যতাম্।। ওঁ বিষ্ণুস্তৃপ্যতাম্।।
ওঁ রুদ্রস্তৃপ্যতাম্।। ওঁ প্রজাপতিস্তৃপ্যতাম্….
ওঁ নমঃ দেবা যক্ষাস্তথা নাগা, গন্ধবর্বাপ্সরসোহসুরাঃ।
ক্রুরাঃ সর্পাঃ সূপর্ণাশ্ঢ, তরবো জিহ্মগাঃ খগাঃ ।।
বিদ্যাধরা জলাধারা-স্তথৈবাকাশগামিনঃ ।
নিরাহারাশ্চ যে জীবাঃ পাপে-ধমের্ম রতাশ্চ যে ।
তেষাং আপ্যায়নায়ৈতৎ, দীয়তে সলিলং ময়া ।।
অর্থ্যাৎ এই প্রকার তর্পণে উক্ত সকলপ্রকার প্রাণীকে দেবসমাদরে তৃপ্ত করাই লক্ষ্য। খেয়াল করলে দেখা যাবে এগুলির প্রকৃতি ও প্রকৃতিজ সমস্ত কিছুর সংরক্ষণ এর কথাই বলছে।।
মনুষ্যতর্পণ
ওঁ নমঃ সনকশ্চ সনন্দশ্চ, তৃতীয়শ্চ সনাতনঃ .
কপিলশ্চাসুরিশ্চৈব, বোঢ়ুঃ পঞ্চশিখস্তথা ।
সর্বেব তে তৃপ্তিমায়ান্তু, মদ্দত্তে-নাম্বুদা সদা ।।
বাংলা অনুবাদ—সনক, সনন্দ, সনাতন, কপিল,আসুরি, বোঢ়ু ও পঞ্চশিখ প্রভৃতি সকলে মদ্দত্ত জলে সর্বদা তৃপ্তিলাভ করুন।
তা এই সনক, সনন্দন, সনাতন, সনৎকুমার এঁরা আসলে কে? ভাগবতপুরাণ বলছে এঁরা সৃষ্টির আদি মানব।এঁদের বাহন গুলিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এর মধ্যে মানুষের অন্তর্গত স্বভাব বৈশিষ্ট্যগুলো কি অদ্ভুতভাবে প্রোথিত।
সনকের বাহন ঈগল, যা ঊর্ধাকাশে ওড়ে, অর্থাৎ এটি উচ্চাকাঙ্খাকে নির্দেশ করে,
সনন্দনের বাহন শকুন, যা মৃত্যুকে ভক্ষণ করে জীবনের সৌন্দর্যকে আহ্বান করে,
সনাতনের বাহন চাতক, চাতক অর্থে তৃষ্ণা, এই তৃষ্ণা সর্বার্থে, জ্ঞানের, লোভের, মোহের, কামের, ক্ষমতার, আধিপত্যর, স্নেহের, প্রেমের….
সনৎকুমারের বাহন চড়ুই। এর অর্থ চঞ্চলতা, ক্ষুদ্রতা।
কপিল হলেন অনার্যদের প্রতিনিধি,তাঁর সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে অসুর ও অনার্থদের পূজন ও সম্মানদানপূর্বক তৃপ্ত করা।
আর এই পঞ্চশিখ বা পাঁচটি শিক্ষা কি?
এই পাঁচটি শিক্ষা হল প্রেম, দয়া, ভক্তি, বিনয়, সততা। তৃপ্তির সাথে এই পাঁচটি শিক্ষাকে জীবনবোধের অভ্যন্তরে অভ্যাস করা। সেও তো একপ্রকার তর্পণ। এ যেন অন্তরাত্মার তৃপ্তি সাধন।।
#ঋষিতর্পণ
ওঁ মরীচিস্তৃপ্যতাং, ওঁ অত্রিস্তৃপ্যতাং, ওঁ অঙ্গিরাস্তৃপ্যতাং, ওঁ পুলস্তস্তৃপ্যতাং,
ওঁ পুলহস্তৃপ্যতাং, ওঁ ক্রুতুস্তৃপ্যতাং, ওঁ প্রচেতাস্তৃপ্যতাং, ওঁ বশিষ্ঠস্তৃপ্যতাং,
ওঁ ভৃগুস্তৃপ্যতাং, ওঁ নারদস্তৃপ্যতাং।।
মন্ত্র জানাচ্ছে মরিচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতু, প্রচেতস, বশিষ্ঠ, ভৃগু এবং নারদ এই দশজন ঋষিকে তৃপ্ত করার মন্ত্র।।
উল্লেখ্য এখানে কোনো নারীর আবাহন নেই। নারী সেখানে কেবলমাত্র ধরিত্রী অর্থ্যাৎ ধারণকারিনী।
পুরুষ এখানে স্রষ্টা। সৃষ্টির কারণ। মনুসংহিতায় এদের বলা হচ্ছে দশম প্রজাপতি বা প্রজাদের পতি বা নেতা। কিন্তু এঁরা কি একজন, আমার মনে হয়, এগুলো এক একটি পদবিশেষ, যারা বংশানুক্রমিক বা নেতানুক্রমিক ভাবে শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। তাই তর্পণে তাঁদের উদ্দেশ্যেও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।। এ হচ্ছে জনগোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য এবং ঐক্যের প্রকাশ করে তৃপ্তি সাধন।।
#দিব্যপিতৃতর্পণ
১। ওঁ অগ্নিষ্বত্তাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
২। ওঁ সৌম্যাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
৩। ওঁ হবিষ্মন্তঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
৪। ওঁ উষ্মপাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
৫। ওঁ সুকালিনঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
৬। ওঁ বর্হিষদঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
৭। ওঁ আজ্যপাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
নিজ বংশের প্রতি আনুগত্য, শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বশীলতার প্রকাশ। পিতা বা পিতাতুল্য, পূর্বসূরীর ওজস বা শক্তিকে নিজের মধ্যে অনুভব তার প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন।।
ওঁ নমঃ যে বান্ধবা অবান্ধবা বা, যে অন্য জন্মনি বান্ধবাঃ ।
তে তৃপ্তিং অখিলাং যান্ত, যে চ অস্মৎ তোয়-কাঙ্খিণঃ ।।
বাংলা অনুবাদ–যাঁহারা আমাদের বন্ধু ছিলেন, এবং যাঁহারা বন্ধু নহেন, যাঁহারা জন্ম-জন্মান্তরের আমাদিগের বন্ধু ছিলেন, এবং যাঁহারা আমাদের নিকট হইতে জলের প্রতাশা করেন , তাঁহারা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্তিলাভ করুন ।
এখানে বান্ধব অবান্ধব ভেদে সবার প্রতি সমদর্শীতায় যে পরম তৃপ্তি তার উল্লেখ।।
।।যম- তর্পণ।।
ওঁ নমঃ যমায় ধর্ম্মরাজায়, মৃত্যবে চান্তকায় চ, বৈবস্বতায় কালায়, সর্ব্বভূতক্ষয়ায় চ ।
ঔডুম্বরায় দধ্নায়, নীলায় পরমেষ্ঠিনে, বৃকোদরায় চিত্রায়, চিত্রগুপ্তায় বৈ নমঃ ।।
যম হলেন মৃত্যুর দেবতারূপে অভিহিত।। আর মৃত্যু কি? মৃত্যু হচ্ছে জীবনের পরিণতি। মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলাই জীবনের ধর্ম। তাই মৃত্যুর দেবতা হলেন ধর্মরাজ।।
মৃত্যুকে এড়িয়ে চলে জীবনের মুক্তি নয়, জীবনের মুক্তি মৃত্যুকে স্বীকৃতি দিয়ে। তাই তার মধ্যে যদি তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যায় সেই হচ্ছে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া। সেই তর্পণই যমতর্পণ।। এ যেন এক মৃত্যুবোধকে অনুধাবণ।।
।। ভীষ্ম- তর্পণ।।
**************
ওঁ নমঃ বৈয়াঘ্রপদ্য- গোত্রায়, সাঙ্কৃতিপ্রবরায় চ ।
অপুত্রায় দদাম্যেতৎ সলিলং ভীষ্মবর্ম্মণে ।।
ভীষ্ম শব্দের অর্থ ভীষণ। ভীষণ অর্থে দৃঢ় এবং স্থিরপ্রতিজ্ঞ। এই প্রতিজ্ঞা ক্ষমতার প্রতি অনীহা, মৃত্যুর প্রতি ঐচ্ছিকতা। এই দুটি বিরল ও মহৎ শীল বা গুণের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হচ্ছে ভীষ্মতর্পণ।।
মনুষ্যত্বের এই তর্পণ বা তৃপ্তি সাধনের জন্য কোনো ক্ষণ বা নির্দিষ্ট দিবসের প্রয়োজন নেই।। তর্পণ তাই প্রতিক্ষণের।।
আন্তরিক এই তৃপ্তিই আমাদের জাগতিক দায়বদ্ধতা। আর এই দায়বদ্ধতায় পুরুষ নারী কোনো বিভেদ নেই। শুভাশুভ বিচারের আবশ্যকতা নেই।। এই তৃপ্তিই আত্মিক মুক্তির আলো।।
এই তর্পণের সাথে মৃত আত্মারও কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তুত মৃত্যুময়তার ভিতর জীবনের তৃপ্তিসাধনই হল আসলে তর্পণ।।