।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় তন্বী হালদার

মৃত্যুভয় অথবা অলীক স্তনের স্বপ্ন

– নেক্সট – মণিমালা মুখার্জি।
সমর মণিমালার হাত চেপে ধরে – কিচ্ছু হবে না। ভেতরে চলো।
– না না, আপনি বাইরে থাকুন।
মণিমালা উদ্ভ্রান্তের মতো সমরের দিকে তাকায় – বিড়বিড় করে – আমার কিছু হবে না তো সমর?
সমর অভয় দেয় – ভগবানকে ডাকো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মণিমালা বিড়বিড় করতে করতে উঠে দাঁড়ায় – আমাদের যা ব্যাংক ব্যালান্স, যদি কিছু হয় বিনা চিকিৎসায় মরে যাব। অবশ্য সেটা হলেই তোমার উচিত শিক্ষা হবে। তুমি কোনোদিন আমাদের কথা ভাবোনি। শয়তান। আসলে তুমি আস্ত শয়তান একটা।
এতক্ষণ এসি-র মধ্যে থাকার ফলে এখন যেন আরও বেশি বেশি করে শীত-শীত করে মণিমালার। মাঝবয়সির কিছু ওপরে এক ভদ্রমহিলাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে – ভেতরের সবকিছু খুলে অ্যাপ্রনটা পরে নিন। মণিমালাকেও বলা হয় – আপনিও খুলে ফেলুন।
অদ্ভুত শীত বোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে মণিমালা। ভয়, প্রচণ্ড এক মৃত্যুভয় গ্রাস করে অন্ধকার করে দেয় মণিমালার আগামীর দিন। দু-হাতের পাতা দিয়ে চেপে ধরে নিজের দুই স্তন। নারীর শরীরের চরম সৌন্দর্যের উৎসভূমিকে দুটো নিছক মাংসের ডেলা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
বয়স্কা ভদ্রমহিলা অ্যাপ্রন পরতে পরতে জিজ্ঞাসা করে – আপ কো ক্যায়া হুয়া?
মণিমালা চুপ করে থাকে।
তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করে – আপনার কী হয়েছে?
– ইচিং। বহুত ইচিং হয়। লেফট্‌ ব্রেস্ট মে।
ভেতর ঘরের অন্তরকুঠুরি থেকে সুরেলা ডাক ভেসে আসে – আসুন।
ভেতর ঘরের আবছা অন্ধকারে ভালোভাবে কিছু দেখতে পায় না মণিমালা। শুধু একটা ঘরঘর শব্দ বাতাসে ভর করে মণিমালার কানে ভেসে আসে।
মণিমালা উঠে দাঁড়িয়ে ব্লাউজ খুলে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে নেয়। নীল আর সাদা রঙের অ্যাপ্রন পরা দুটো মেয়ে কী নিয়ে যেন হাসছে। ‘হাসি’ যে এত কুৎসিত হতে পারে এই প্রথম দেখল মণিমালা। মেয়ে দুটো যেন মণিমালার নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহসনে মেতে উঠেছে। ভগবানকে ডাকে মণিমালা। ওদের বাড়িতে বজরংবলীর পুজো করা হয়। সংকটমোচন দেবতার প্রতি আস্থা যেন বেশি করে অটুট হয়। একটা ট্রে-র ওপর প্রথমে ডান তারপর বাম স্তন রেখে চেপে ধরে। জান্তব মেশিনটা চলে ঘরঘর-ঘর-ঘর।
মেশিনের আড়ালে লুকোনো নীল অ্যাপ্রন পরা মেয়েটা ধমকে ওঠে – আরে আপনি নড়ছেন কেন?
এক, দুই, তিন-চার-পাঁচ মিনিট ঘর-ঘর শব্দ।
সাদা অ্যাপ্রনের সুরেলা কণ্ঠ শুনতে পায় মণিমালা – যান, ব্লাউজ পরে বসুন। ছবিটা ঠিকমতো এসেছে কিনা দেখে নিই।
মছলন্দপুর থেকে সুকন্যা দত্ত এসেছে। বাড়িতে রেখে এসেছে দেড় বছরের বাচ্চা। ডানদিকে ‘লাম্প’ মতো হয়েছে।
ব্লাউজের হুকে হাত রেখে বলে – লাগল আপনার?
মাথা নাড়ে মণিমালা — না। লাগেনি। খানিকটা এক্স-রে করার মতো ব্যাপার।
সুকন্যা দত্তর কপালে অসহায় দুশ্চিন্তার রেখা।
ভেতর থেকে আবার ডাক আসে – আ-সু-ন আপনারা।
মণিমালা আর আগের বয়স্কা ভদ্রমহিলা এগিয়ে যায়। সুকন্যা দত্তকে ঘিরে মেশিনের শব্দ শোনা যায় ঘর-ঘর ঘর-ঘর।
সাদা অ্যাপ্রন জিজ্ঞাসা করে – আপনাদের বাড়িতে কারও সমস্যা আছে?
ভদ্রমহিলা বলে ওঠে – ইয়েস। মেরি মাম্মি। ছে’ মাহিনা পহলে ব্রেস্ট ক্যানসার হুয়া। এক মহিনা পহলে দুনিয়াসে চলি গয়ি।
সাদা অ্যাপ্রন নীল অ্যাপ্রনের চোখে চোখ রেখে ঠোঁট মুচড়ে তাকায়।
– ঠিক আছে আসুন। রিপোর্ট নিয়ে ডক্টরের কাছে চলে যাবেন।
মণিমালার কাছে প্রশ্ন আসে – আপনার?
– আমার পিসিরও হয়েছে।
– না না, বাবার দিকের নয়। মা, মাসি, বোন, দিদা এদের মধ্যে কারও?
– হ্যাঁ। আমার যে সমস্যাটা হচ্ছে, আমার মায়েরও হয়েছিল।
মহিলা এবার স্পষ্টতই বিরক্ত — আরে ওনার ব্রেস্টে ক্যানসার ফর্ম করেছিল?
– না।
– ঠিক আছে। যান আপনি। ভয়ের কিছু নেই।
সমর উৎকণ্ঠায় ঘেমে-নেয়ে গেছে।
– কী বলল ওরা?
মণিমালা চুপ করে থাকে।
– মণি, তুমি চুপ করে আছ কেন?
খিঁচিয়ে ওঠে মণিমালা। তারপর স্কুলছাত্রীর পড়া বলার মতো গড়গড় করে বলে যায়।
সমর হাসে – তোমাকে বলেছিলাম না, দেখো কিছু হবে না।
দাঁতে দাঁত চাপে মণিমালা – কেন, তুমি ডাক্তার নাকি! আমি মরে গেলে সবথেকে তোমারই তো লাভ – এলআইসি-র নগদ টাকা। ছ-মাসের মধ্যে নতুন বউও জুটিয়ে নেবে।
সমর পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে মণিমালার হাতে দেয়।
– নাও। তোমার মা তিনবার ফোন করেছিলেন। ফোন করো।
মণিমালা ফোনটা হাতে নেয় – হ্যালো, বলো মা …।
ওপাশ থেকে কান্নায় বিকৃত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে – হ্যাঁরে মা, খেয়েছিস কিছু। কোনো ভয় নেই। দেখবি শ্রীশ্রীঠাকুরের আশীর্বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে …।
মণিমালার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে সত্যিই তার কিছু হয়নি। সে ভালো হয়ে যাবে। দোলা আর সমরকে নিয়ে টলটলে নিটোল সংসারের সম্রাজ্ঞী সে। রিনরিন শব্দ তুলে খেলে বেড়াতে চায় মণিমালার জীবন।
চারদিন পর। মণিমালা ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ রেখে সমরকে বলে – কখন যাবে তুমি ম্যামোগ্রাম রিপোর্টটা আনতে?
সমর বলে – এই তো এখন দুটো বাজে, তিনটে নাগাদ বের হব। আশা করি চারটে নাগাদ পৌঁছে যাব।
বয়ে যায় সময় … দীর্ঘ সময় … নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সময়, দমচাপা উত্তেজনার নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সময় … অবশেষে সমরের ফোন – মণি, মণি আমি বলছি, তুমি শুনতে পাচ্ছ, রিপোর্টে ভয়ের কিছু নেই। ডাক্তার বলেছে এটা বিনাইন, ওষুধে সেরে যাবে।
টানা দু-মাস পর – মণিমালা আর সমর এত পাশাপাশি শুয়ে আছে যে একজনের শ্বাস-প্রশ্বাস অন্যজন শুনতে পায়। পাশের ঘরে দোলা ঘুমিয়ে কাদা। মা সন্ধেবেলা ফোন করে বলেছে – তারাপীঠে মানত করেছিলাম তোর জন্য। পুজো দিতে যাব।
সমর মণিমালার কপালে হাত রাখে – ওষুধগুলো ঠিক মতো খেয়ো কিন্তু। তারপর একটু সময় নেয় সমর – মণিমালার মন বোঝে। হাত নামায় সমর মণিমালার ঈষৎ স্ফীত তলপেটে। চোখ বোজে মণিমালা। হাউসকোটের ফিতে খুলে লাল নাইট ল্যাম্পের আলোয় মায়াময় হয়ে ওঠে মণিমালার একজোড়া কবুতর। সমরের সমস্ত সত্ত্বা শুধু সেই অলীক স্বপ্নে পৌঁছে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। মণিমালা বিন বিন করে ঘেমে ওঠে। সম্রাজ্ঞীর মতো মেলে দেয় একজোড়া অলীক স্বপ্নের স্তন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।