আন্তর্জাতিক || পাক্ষিক পত্রপুট || এ তনিমা হাজরা

ভাষা নিয়ে ডুবে যাওয়া নয় ভেসে চলা
আহা গো!! ইংরেজদের ছেলেপুলেদের ভাগ্যি বড় ভালো। তারা কী সুন্দর টকাটক ইংরিজিতে কথা কয়। তাদের মা ইংরিজিতে কথা কয়, তাদের বাপ ইংরিজিতে কথা কয়, তাদের চোদ্দগুষ্টি ইংরিজিতে কথা কয়। তাদের দেশের চূড়ান্ত গন্ডমূর্খকেও ভাষাসংক্রান্ত ইনফিরিয়ররিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে হয় না, জোর করে অন্যের ভাষা শিখতে হয় না কারণ এই ডিজিটাল বিশ্বে তথ্যযোগাযোগ প্রযুক্তিতে ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ট্যুইটার, হোয়াটসএ্যাপ সর্বত্রই তাদের ভাষা ব্যবহার করে।
তাদের বাপ ঠাকুদ্দারা পৃথিবীর নানা দেশে কয়েক শতকের ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে তাদের জন্য আজন্মের এই মহা উপকারটুকু করে গেছেন।
এখন গ্লোবালি চলিয়ে বলিয়ে হতে গেলে আমাদের ইংরেজি ছাড়া গতি নেই।
অথচ মাতৃভাষায় কথা বলার নিরিখে বিশ্বে সর্বোচ্চ জনসংখ্যার স্থানে আছে চিনা ভাষা, দ্বিতীয় স্প্যানিশ ভাষা, ইংরেজি তৃতীয়, আরবি ভাষা চতুর্থ, পঞ্চমে বাংলা, ষষ্ঠ হিন্দি, তারপর অন্যান্য ভাষাগুলি।।
তবুও যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি ছাড়া অন্যকিছু তাদের হয় ইংরেজি শিখে পৃথিবীব্যাপী গ্রহণযোগ্য হতে হয়, কিংবা সাথে দোভাষী নিয়ে ঘুরতে হয়। আমরা ক’জন নিতান্ত প্রয়োজন না হলে চিনা বা স্প্যানিশ বা আরবি ভাষা শিখবার জন্য ব্যস্ত হচ্ছি?
ইংরেজি ভাষার গ্রহণযোগ্যতা এত বেশি হবার কারণ হচ্ছে সরল বর্ণমালা, অক্ষর এবং উচ্চারণ বিধি। যে ভাষার বর্ণমালা যত কম সরল ও শব্দের মধ্যে যুক্তাক্ষর যত বেশি তার গ্রহণযোগ্যতা স্বভাবতই তত কম। সেই কারণে চিনা ভাষাভাষী মানুষেরা সংখ্যায় বেশি হলেও চীনাভাষা পৃথিবী ব্যাপী জনপ্রিয় কিছুতেই হতে পারবে না।
গত একশো বছর ধরে ইংরেজি হচ্ছে আমাদের কাছে একটি নিরাপদ এবং গ্রহণযোগ্য ভাষা।
সম্ভবত এই ঔপনিবেশিক আগ্রাসন থেকেই আমাদের ছেলেপুলে পেট থেকে পড়লেই আমরা তাদের কানের কাছে ‘A for apple, B for bat, C for cat’ শেখাতে উঠে পড়ে লেগে যাই। মা কে mom আর বাবাকে dad বলতে শিখিয়ে চূড়ান্ত আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। কেউ বাড়িতে আসলে “Twinkle twinkle little star” অথবা “Humpty Dumpty sat on a wall” শুনিয়ে নিজস্ব পারিবারিক উচ্চতা প্রমাণ করি। প্রথম থেকেই তাকে শিখিয়ে ফেলি বাংলা পরে, ইংরেজি আগে, জন্মমুহূর্ত থেকেই এই যে মাতৃভাষার প্রতি একটি বৈমাত্রেয় মনোভাব আজকাল আমরা শিশু মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছি সেটাই সম্ভবত বাংলা ভাষা হত্যার পক্ষে আমাদের সম্মিলিত চক্রান্ত।
যারা ফড়ফড়িরাম অবতারে ফটর ফটর করে হিন্দি বা ইংরেজি বলেন আমরা তাঁদের সামনে কেমন যেন ইনফিনিয়রিটি কমপ্লেক্সে গুটিয়ে যাই, আমাদের আভ্যন্তরীণ বিদ্যার পরিধি যত বেশিই হোক না কেন। এই ভাবেই অপেক্ষাকৃত বেশিসংখ্যক মানুষের বলা ভাষাটির কাছে অপেক্ষাকৃত কম মানুষের বলা ভাষাটি ক্রমশঃ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত কুন্ঠায়।
মেক্সিকোর আদিবাসীদের ভাষা কী ছিল এখন আর কেউ জানে না, আমেরিকার কালো মানুষদের আদিভাষা আর সংরক্ষিত নেই, হারিয়ে গেছে কলোনিয়াল গ্রাসের দাঁতের ফাঁকে।
ক্রমশ হ্রস্ব থেকে হ্রস্বতর হয়ে পড়ছে যে কোনো কম মানুষের বলা ভাষাগুলো। একেই বলে একটি রাক্ষুসে ভাষার পেটে ঢুকে গিয়ে অনেক ক্ষুদ্র পরিসর ভাষার মৃত্যু। এই ভাবেই হারিয়ে গেছে ডুমি, ডুসনার, কাইজানা, কাসনা, লেমেরিগ, অঙ্গোটা, প্যাটউইন, পাজেহ, পুয়েলচি, কাওয়াস্কার, তানিমা, তাওসিরো, তিনিগুয়া, তলোয়া, ভিলেলা, ক্ল্যালাম, বিস্যু ভাষাগুলি।
ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো হারিয়ে যাবার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ ভাষাটির মৌখিক পরম্পরা থাকা সত্ত্বেও কোনো সংরক্ষিত লৈখিক বর্ণমালা না থাকা। অল্প কিছু মানুষ সে ভাষায় কথা বললেও সে ভাষা নিয়ে তারা লেখা পড়া করবে না, সাহিত্য সৃষ্টি করবে না, ফলে লিখিত নথি সংরক্ষিত না থাকার ফলে ভাষাটি আস্তে আস্তে ভাষাহীন হয়ে যাবে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে মোটামুটি ২৬ কোটির কিছু বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু এইসংখ্যক মানুষ যাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন তাঁরা সবাই বাংলা লিখতে বা পড়তে জানেন কি? তাঁদের মধ্যে কতজন চর্চার ভাষা হিসেবে অন্য কোনো ভাষাকে নিয়মিত ব্যবহার করেন? তাঁদের মধ্যে কতজন বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন? তাঁদের মধ্যে কতজন পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা ভাষা শেখাবার ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু বাংলা ভাষার বেঁচে থাকা অথবা মরে যাওয়ার জন্য সচেতন অথবা অবচেতনে দায়ী।
বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যেমন আমাদের মা বাবারা বাংলা মাধ্যম স্কুলে আমাদের নির্দ্বিধায় দাখিল করাতেন, আমরা কি আমাদের ছেলেমেয়েদের দাখিল করিয়েছি বা আমাদের নাতি পুতিদের তা করাবো বলে ভেবেছি?
এই যে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বদল আসছে তার কারণ আমাদের এখন প্রতিযোগিতার রণক্ষেত্র একটি রাজ্যে বা একটি দেশে সীমাবদ্ধ নেই, গোটা পৃথিবীব্যাপী হয়ে পড়েছে। সেখানে শুধু বাংলা নিয়ে পড়ে থাকা মানে নিজের চারিদিকে একটা গন্ডি টেনে ফেলা। আর এটাই তো কঠিন বাস্তব।
এবার আসছি দ্বিতীয় ভাষা গ্রহন করার বিষয়ে। আমরা যারা বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের অন্য রাজ্যে বাস করি তাদের কাছে দুটি অপসন থাকে, এক: যে রাজ্যে বাস করি সেই রাজ্যের ভাষা। দুই: হিন্দি ভাষা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা তখন হিন্দি ভাষাটিকেই গ্রহণ করছি। বৃত্ত একটু ছোট হয়ে গেল বটে কিন্তু কারণ সেই একই, সমগ্র দেশে ভাষাটির গ্রহণ যোগ্যতা। ফলে হিন্দি ভাষা গিলে খাচ্ছে আঞ্চলিক কিছু অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে।
একে অস্বীকার করি কি করে, আগে ভাত, পরে ভাষা। ভাত জোগাড় করতে আমাদের যখন ছুটতে হচ্ছে অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলে তখন স্বভাবতই তাদের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য আমাদের একটি কমন ভাষায় কথা বলতে বাধ্য হতে হচ্ছে। যেমন ধরুন একটি বাঙালি ও একটি পাঞ্জাবি কিংবা ওড়িয়া কিংবা মারাঠি কিংবা তেলেগু বা তামিল বা মালায়লম ভাষি মানুষ কথা বলেন হিন্দি ভাষায়, যেটা তাঁদের কারুরই মাতৃভাষা নয়।।
এরপর ভাবুন তো খুব কম মা বাবাই আছেন, ক্ষ্যাপা পাগল টাইপের যারা অত অত রাশি রাশি সিলেবাসের বাইরেও নিজের মাতৃভাষাটা ঠিক করে আয়ত্ত করাবার জন্য ছেলেপুলেদের পিছনে ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে বাংলা ভাষার রূপ রস গন্ধ চেনাবার দুর্নিবার অত্যাচারে। অঙ্কের বিচারে অনেকের কাছেই তাঁরা একটি হাস্যকর প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রাণী।
মাতৃভাষার জন্য যারা লড়েছিলেন, শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের সংগ্রাম কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটি ভাষার আগ্রাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার লড়াই। নিজের ভাষাটিকে জ্যান্ত রাখার জন্য মৃত্যুবরণের কাহিনী।
এই ইন্টারনেটের যুগে বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে অনুশীলন ও আত্তীকরণ করেছে, বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষীদেরকেও সেভাবেই ডিজিটাল যন্ত্রে বহুমাত্রিকভাবে ব্যবহার করার জন্য কীবোর্ড, বাংলা লিখন পদ্ধতি, ফন্ট ও ইউনিকোড প্রমিতকরণ ও গবেষণা করে আরও সরলীকৃত করার কথা ভাবতে হবে। বিএলপি গবেষণার সাফল্যের মাধ্যমে ফন্টের নকশা, অপ্টিক্যাল ক্যারেক্টার রেকগনিশান, বাংলা লেখা প্রক্রিয়াকরণ, স্বরধ্বনির বিশ্লেষণ ও সংস্থাপন-এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে ইন্টারনেটের একটি জোরালো ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা ও প্রচার ও ব্যবহার করা খুব জরুরী, যাতে তথ্যপ্রযুক্তির সাথে যুক্ত মানুষদের মধ্যে এই ভাষা ব্যবহার করার ব্যাপারে আগ্রহ জন্মে।
সরকারী বা বেসরকারি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফর্ম এক পিঠে বাংলায়, আদালতের বাদানুবাদ ও রায় বাংলায়, রাস্তা ঘাটের নির্দেশিকা ইংরেজির সাথে বাংলায়, দোকান এবং ফেষ্টুন এর সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা খুব জরুরী। কোনো বিজ্ঞাপন অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করে লেখার সময় দেখতে হবে অনুবাদ সঠিক আছে কিনা, অনেক সময় অন্য ভাষার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনুবাদ অদ্ভুত এক বিকৃত ভাষার জন্ম দেয়।
আসলে প্রত্যেক মানুষকে আগে বুঝতে হবে যে বিদ্যার পরিধি আর ভাষাজ্ঞান ও তার ব্যবহার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তুলাদণ্ড দিয়ে মাপার বস্তু।
কোনো ভাষা বহুল প্রচারিত বলে আমাদের জনসংযোগার্থে তাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়, কিন্তু তাই বলে আপনার মাতৃভাষা যত সামান্য মানুষের বলার ভাষাই হোক না কেন তা আপনার লজ্জা নয়, আপনার গর্ব এবং তাকে বংশানুক্রমিকভাবে সংরক্ষণ করা আপনার একটি নৈতিক দায়িত্ব। একথা যেদিন থেকে আপনি বুঝবেন সেদিন থেকে আপনার মাতৃভাষাটিও সংকট মুক্ত হয়ে আরও কিছুকাল বেঁচে থাকবে বিপন্নতা জয় করে এই পৃথিবীর ইতিহাসে।