সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে তনিমা হাজরা (পর্ব – ১)

ছড়িয়ে জড়িয়ে
বাংলার লোক মুখে বহু ছড়া ও গান প্রচলিত আছে দৈনন্দিন কথাবার্তায়, মায়েদের ঘুম পাড়ানি গানে,গ্রাম শহরের হাটে বাটে ছড়ানো মানুষের মুখে মুখে। বিভিন্ন কাজের বর্ণনায়, বিভিন্ন বারব্রত, পাঁচালির মধ্যে বহুদিন ধরে এগুলি মর্মে গেঁথে রয়েছে আমাদের।এর প্রকৃত রচয়িতা কে, উৎপত্তি কোথায় সঠিকভাবে জানার উপায় আর নেই।অথচ প্রতিটি ছড়ার মধ্যেই বাংলার জীবন, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক শোষণের কাহিনী, উত্তরণের ভাবনা সুন্দর ভাবে চিত্রিত আছে।
বিশ্বায়নের প্রভাবে যত বৈদেশিক সংস্কৃতি দ্বারা আমরা প্রভাবিত হয়ে পড়ছি ততই হারিয়ে যাচ্ছে এইসব ছড়া, ব্রতপাঁচালি এবং লোকগান। অথচ এগুলির সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরী। যদি এইসব পংক্তিমালার গভীরে সন্ধান করি তবে দেখব কতো বিচিত্র রঙের ইতিহাসের আলো জড়িয়ে আছে এদের গায়ে
লুকিয়ে থাকা এইসব ছোট ছোট কাহিনী খুঁজতে চেষ্টা করেছি আমি এই লেখায়।
একটি একটি ছড়া, গান, পাঁচালি এবং তার আভ্যন্তরীণ মর্ম নিয়ে একটি গবেষণামূলক অনুসন্ধান থাকবে প্রতিটি পর্বে।।
🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱
এমনই একটি ছড়ার গল্প দিয়ে শুরু করছি আজ……
আই কাম মানে আমি আসছি। বাই কাম মানে ভাই তুমিও এসো কারণ রেল গাড়ি প্রায় ঝমাঝম করে এসে পড়ল বলে।এখানে ঝমাঝম কোন ব্রীজ পেরিয়ে আসার ধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।আমাদের সাথে যদুমাষ্টার ও আছেন। তিনি সেজেগুজে প্রস্তুত হ য়ে এসেছেন শ্বশুরালয় যাবেন বলে।কিন্তু মহাবিপদ। একে হুড়োহুড়ি তায় বর্ষার কর্দমাক্ত গ্রাম্য পথ। ফলে তিনি পড়লেন পা পিছলে।একেবারে কাদায় মাখামাখি অবস্থা আলুর দমের কাই এ আলুগুলি যেমন লাগে অনেক টা সেইরকম। ফলে তার যাওয়া পন্ড হলো।কোমরে চোট পেয়ে শয্যা নিলেন।ডাক্তারবাবু এলেন।দেখেশুনে ঔষধ পথ্যির ব্যবস্থা করলেন।জলসাবু,পাতিলেবু এবং ইষ্টিশানের থেকে মিষ্টি কুল।এই বর্ষার মরশুমে নানা দেশ থেকে না না রসালো ফলের আমদানি রপ্তানি চলে রেলযোগে।
কিন্তু যাদুমণি প্রাণাধিকা প্রিয়তমা আমার আমাকে যেতেই হবে আমার হাত ধরে বৃথা অনুরোধ কোর না।নানাদেশে ব্যবসাসূত্রে ভ্রমনই আমার বৃত্তি। আমি তোমার জন্যে কলকাতা থেকে মাথার কাঁটা আর মিদনাপুরের থেকে চিরুনি নিয়ে আসব। তোমার পরিচারিকারা তোমাকে বেল ফুল খোঁপা বেঁধে দেবে।
এখানে উল্লেখ্য, সেকালে যশোর ও মেদিনীপুর চিরুনি শিল্পের জন্য সুপ্রসিদ্ধ ছিল।যশোরের মোষের শিং এর চিরুনি সেকালে বিখ্যাত ছিল। এক রকম চিরুনি পাওয়া যেত যাকে বলা হত “তেলকম” চিরুনি। এর ভেতরে তেলভরা থাকত।চুল আঁচড়ালে তেল ছিদ্রপথে চুলের গোড়ায় গিয়ে পৌছত।ভাবুন কি অভূতপূর্ব প্রযুক্তি।এটি পাওয়া যেত মেদনীপুরে। এগুলিই আমাদের গ্রাম বাংলার হারানো ঐতিহ্য। আর নানা আর্ট যা সব মহিলাদের অন্ত:পুরে চলত বংশপরম্পরায়।এই বেলফুল খোঁপা,খেজুরছড়ি খোঁপা।কোথায় হারালো এসব।আসুন আবার সন্ধান করি সেইসব রত্নখচিত সংস্কৃতির।
এবার বলুন তো ছড়াটি কি?
আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি
যদুমাষ্টার শ্বশুরবাড়ি
রেল কম ঝমাঝম
পা পিছলে আলুর দম
বলে গেছেন ডাক্তারবাবু
জল সাবু পাতিলেবু
ইষ্টিশানের মিষ্টি কুল
সখের বাদাম গোলাপফুল
হাত ছেড়ে দাও যাদুমনি
যেতে হবে অনেকখানি
কলকাতার মাথার কাঁটা
মিদনাপুরের চিরুনি
এমন খোঁপা বেঁধে দেব
বেল ফুলের গাঁথুনি।।
বাংলাদেশে প্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৫৪ সালের ২৮শে জুন হাওড়া থেকে পান্ডুয়া পর্যন্ত।এই ছড়াটি সম্ভবত তারপর রচিত হয়।
🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱
বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদে এল বান
শিব ঠাকুরের বিয়ে হল তিনকন্যে দান
এক কন্যে রাঁধেন বাঁড়েন এক কন্যে খান
এক কন্যে গোঁসা করে বাপের বাড়ি যান।
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা মধ্যিখানে চর
তারি মাঝে বসে আছেন শিবসওদাগর।
শিব গেলেন শ্বশুরবাড়ি, বসতে দিল পিঁড়ে
জলপান করতে দিল শালিধানের চিঁড়ে।
শালিধানের চিঁড়ে নয় রে বিন্নি ধানের খই
মোটা মোটা সবরি কলা কাগ মারে দই।।
তৎকালীন গ্রাম বাংলার সরল চিত্র।শিব অর্থে স্বামী। চিরদিন এই শিক্ষা স্বামীই মোক্ষ।তাকে পাবার জন্য নানা ব্রত উপবাস।নানা জপ তপ।
তা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কুলীন পাত্র পেয়ে একপাত্রেই তিন কন্যা দান করে দায়মুক্ত হলেন।
তা সংসারে তো বড়দিদিটির কতৃত্বই চলে বেশি তাই তিনি সংসারের হালদন্ডটি নিজের কব্জায় রেখেছেন।
কথায় বলে না খুন্তি যার রোয়াব তার।
মেজটি নিজের অদ্দেষ্ট মেনে নিয়ে নির্বিবাদী।
কিন্তু ছোটরা বরাবরই একটু আহ্লাদী হয় তাই সে স্বামী একচোখোমি সহ্য করতে না পেরে সোজা বাপের বাড়ি হাঁটা লাগিয়েছে।
কিন্তু হলে কি হয়, কথায় বলে না বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা।বুড়োর প্রাণ ভোমরাটি তো ওই সুন্দরী গালফোলানি ছোটবউ এ তেই আটকে আছে।
কিন্তু রাশভারী বড়টিকে চটালে তো চলবে না। তিন বিয়ের কি জ্বালা তা সে যে করেছে সেই বোঝে। নারী চরিত্র যে বেজায় জটিল।
নাও বেয়ে গিলে পাঞ্জাবি সৌখিন ধুতিতে সেজে চললেন তিনি আদরিনি সোহাগিনীকে মান ভাঙিয়ে ঘরে আনতে।
জামাইকে পেয়ে শ্বশুরের ও দুশ্চিন্তা দূর। ভাজ ভাজালদের ও বুকের পাথর নামলো।
না হলে নায়রী মানে বিয়ে হওয়া ননদ কে ঘরে রেখে খাওয়ায় কে? তাই জামাই বাবাজীবন কে তুষ্ট করার জন্য বিপুল আয়োজন।
খই, দই, কলা। দিব্যি ফলাহার। তদুপরি দ্বিপ্রাহরিক ভোজন তো আছেই।
ননদ বিদায় দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচে গালে এক খিলি পান গোঁজে নিশ্চিন্দি ভাজের দল।
যাক শত্তুর পরে পরে
নক্কী আসুক আমার ঘরে।।।তনিমা।।।