আগাডোম বাগাডোম ঘোড়াডোম সাজে
ঢাক ঢোল ঘাঘোর বাজে,
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি
ঢুলি গেল কমলাপুরি
কমলা পুরির কি এটা
সূর্যিমামার বিয়েটা।
হাড় মর মর কালো জিরে
উন্ডুম কুসুম পানের খিলে,
একটি পান ফোঁপরা
মায়ে ঝিয়ে ঝগড়া।
হলুদ বনে কলুদ ফুল
মামার নামে টগর ফুল।
ডোম মেয়েরা অত্যন্ত কামকলা পটিয়সী ছিল।সেকালে ভাল যৌতুকের লোভে ভার তের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ এসে রাঢ়ের নিম্নবংশীয় মেয়েদের বিবাহ করতো।কাহ্নপাদ রচিত চর্যাপদে দেখি ডোম তনয়া জেম্বিকে বিবাহ করে উচ্চবংশজ ব্যাক্তি তাঁর কুল খোয়ালেন কিন্তু বিনিময়ে যৌতুকে পেলেন অনুত্তর ধাম।
ডোম জাতির মানুষেরা সেকালের সামন্ত রাজাদের পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যদলে কাজ করতো।নানা প্রকার রণবাদ্য বাজাতে বাজাতে তারা যুদ্ধে যেত।রাঢ়ব ঙ্গে র নানা ম ন্দির টেরাকোটাগুলিতে ডোম সৈন্যদের যুদ্ধযাত্রা ও শিকার যাত্রার ছবি গুলি সেই সাক্ষ্য দেয়।
ডোমসমাজের এই বাদ্যযন্ত্র বাজানোর রেওয়াজ বংশ পরম্পরায় ঐতিহ্যগত ছিল।তারা নানা রাগ রাগিনী বাজাতে পারতো।এটা অনেকাংশে তারা পেশা হিসেবেও গ্রহন করেছিল।রাঢ়বঙ্গের বিয়েবাড়িতে বাঁশি,সানাই বাজানো বা বিভিন্ন জায়গায় দুর্গাপুজায় নবপত্রিকাকে আনার সময় আজ ও ডোমদের বাদ্যদল দেখা যায়।
এই ছড়াটিতে একটি বৈবাহিক শোভাযাত্রার বর্ণনা রয়েছে। বরের সাথে ডোমসম্প্রদায়ভুক্ত বাজনদার তথারক্ষীর প্রেরণ।সেকালে অনেকদূরে ভিন গাঁয়ে বর যেত পাল্কি করে বিয়ে ক র তে।ফিরতো কনে নিয়ে।কনের গা ভর্তি গহনা।তাই অবধারিত ছিল ডাকাতির ভয়।তাই আগে পিছে রক্ষীর এই ব্যবস্থা।
আগাডোম মানে আগে ডোম, বাগাডোম মানে বাগে বা পিছে ডোম। ঘোড়াডোম মানে ঘোড়ায় চড়া ডোম বাহিনী। তারা সজ্জিত হয়ে চলেছে। ঢাক, ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ ও হল এক প্রকার রক্ষাব্যবস্থা এবং তৎসহ সমারোহ।
বাজাতে বাজাতে বর যাত্রি চলেছে কনের বাড়ি।
এবার হচ্ছে আপ্যায়ন। যাত্রা জনিত ক্লান্তি দূর করার জন্য কালোজিরে সহকারে তেল মালিশ করে আরামের বন্দোবস্ত। হলুদবরণ কলুদফুল দিয়ে বিবাহআসর সাজানোর ব্যবস্থা।
কমলা বরন ফুলের মত মনোহারিনী বধু।আগেই বলা হয়েছে বধু নিম্নবর্গীয়া তাই গাত্রবর্ণ কিঞ্চিৎ শ্যাম তুলনায় বর সূর্যের ম ত উজ্জ্বল ও প্রভাময়। সূর্য উঠলে যেমন সব অন্ধকারের অবসান তেমনি নারীর জীবনে তার প্রিয়তম পুরুষের আগমনে জীবন আলোকময়।
গুয়াপান দিয়ে শ্বাশুড়ী বরণ করছে জামাইকে।শ্যালিকারা ঠাট্টাতামাসার ছলে একটি পান ফোপরা দিয়েছে। তাতে মা রাগারাগি করছেন আর ঝগড়া করছেন নতুন জামাইএর হয়ে।
টগরফুলের মালিকায় বধু গ্রহন করছে তার চিরসাথীকে।।
ছড়া আসলে লোকসাহিত্যের অন্তর্গত এক অনায়াস সৃষ্টি। কখনো এটি একক রচনা, কখনো এটি দলগত। কিন্তু এর মধ্যে যেন বুনে রাখা আছে সমাজের এক দিগন্ত বিস্তারিত শস্যভূমি। আর এই টুকরো টুকরো অক্ষর পুঞ্জ নিয়ে সৃষ্ট এই অপরূপ ভান্ডার এ যে সব সময় সচেতনভাবে সৃষ্টি কলা তাও নয়। অভিজ্ঞতা,তিক্ততা অথবা স্বপ্নদর্শী মনের সাবলীল ভাবপ্রকাশ। সব ক্ষেত্রে যে তা মনোজ্ঞ তাও নয়। অনেক ক্ষেত্রে রসকটু বা অশ্লীল শব্দোচ্চারণের দ্বারা গ্লানির দিকটিও প্রকটিত। লঘু বা চটুল রস, বেদনা বা উচ্ছ্বাস, দিনগত জীবন বা সামাজিক শোষণ সব কিছুই কিন্তু এইসব ছড়ার উপজীব্য।।
এটি সম্ভবত নীলকর সাহেবদের কুঠিবাড়ির অত্যাচার এর উপরে লিখিত। চাষি তার জমিজমা ঋণের দায়ে নীলের দাদনে দিয়ে স্বামী স্ত্রী দুজনায় আজ নিজের জমিতেই কামিন মুনিশ।। সাহেব সারাদিন সেই জোড়া জোড়া কামিন মুনিশের কাজের তদারকি করে বেড়ায় দ্রুত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে। কাজে গাফিলতি হলেই পিঠে পড়ে চাবুকের প্রহার।। প্রহারের ভয়ে সারাদিন বিরামহীন শ্রম।। এখন শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করে সাহেব মেম নিশ্চিন্তমনে চা বিস্কুট খেতে ব্যস্ত।
এইরকম একই অত্যাচারের ছবি চা বাগানের শ্রমিকদের উপর প্রচলিত একটি ছড়াতেও ব্যক্ত।। ছড়াটি গানেও সুর বাঁধা। সে সুর খুব করুণ।। পেটের দায়ে কাজের তল্লাশে দূর দেশে যাত্রা। তাই দাম্পত্য বিচ্ছেদ। ভারি মন খারাপ।। টাকার আশ্বাস দিয়েও সঠিক প্রাপ্য জোটে না। সাহেব সর্দারের হাতে নিগৃহীত, নির্যাতিত আদিবাসী মজুরের দল। তাদের বেদনা মথিত ছড়ায় সেই করুণ ভাগ্যের বেদনার অভিযোগ নিষ্ঠুর বিধাতার প্রতিও।।
আল কিনারে নহর ধারে
বগা বগা ফুল,
ফুল কে দেখিয়ে ছোঁড়ি
ঢ্যাচাকে চামড়ায়।
আমপাতার শিরে শিরে কাজলেরই রেখা,
কুন পথে গেলে সাঙাৎ পাবো তুমার দেখা,
মনে করি আসাম যাবো,
জোড়া পঙখা টঙ্গাইব,
বাবু বলে কাম, কাম,
সর্দার বলে ধরি আন,
সাহেব বলে লিবো পিঠের চাম,
হে যাদুরাম, ফাঁকি দিয়্যে চলিলি আসাম।
চিঠিতে কি ভুলে মন বিনা দরিশনে,
শিশিরে কি ফুটে ফুল বিনা বরিখনে,
গাছের মইধ্যে তুলসী,
পাতার মইধ্যে পান,
ফাঁকি দিয়্যে সাদা সাহিব আনলি আসাম।
বানাই দিলি কামিন কুলি,
টাঙ্গাই দিলি পিঠে ঝুলি,
ঝুলি টাঙ্গাই ভিখারি বানাইলি,
নিঠুর শাম, জনমে জনমে কাঁদাইলি।।