কর্ণফুলির গল্প বলায় তামান্না চৌধুরী

বড় মেয়েটি যদি হয় কৃষ্ণকলি

এটাই বাস্তবতা,বেশিরভাগ মেয়েই নির্মম সত্য লুকিয়ে হাসতে হাসতে নিজের সুখী জীবনের কাল্পনিক কাহিনী সবাইকে শোনায় যা মনের অগোচরে, সে যা লালন করে। যেমন জবা, সারাক্ষণ মুখে তার হাসি লেগেই আছে।অথচ গায়ের রং কালো বলে তার অনেক মানসিক কষ্ট। সে পরিবারের বড় মেয়ে হওয়া স্বত্তেও ওর ছোট বোনটার জন্য শুধু সমন্ধ আসে।জবা অফিসের কাজ কর্মেও স্মার্ট। মা বেঁচে নেই,বয়স্ক বাবা অনেক অসুস্থ। ও বাড়ির বড় মেয়ে বলে হাসিমুখেই সংসার অফিস দুই হাতে সমান তালে সামলায়।কিন্তু বাহ্যদৃষ্টিতে সে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখা “কৃষ্ণকলি “।কিন্তু জবার সহকর্মী আবিরের কাছে কাছে এই কৃষ্ণকলিই সেরা।সে ঠিক করেছে, বিয়ে করলে সে কোন কৃষ্ণকলিকেই করবে।
কিন্তু তার পরিবার তাঁর জন্য দেখছে, আর কেবলই তার জন্য পছন্দ করছে দুধে আলতা মেশানো সুন্দরী, রূপসী।আবিরের দৃঢ় ভাবে মনে হয়, ফর্সা মেয়ে গুলোকে যেনো একবার এক নজর দেখলেই দেখা হয়ে যায়,কিন্তু শ্যামলা মেয়ে গুলাকে বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় তাদের চোখ,নাক,হাসি, এক একটা অালাদা সৌন্দর্যের উৎস। সেটা তার পরিবার মানতে নারাজ।
আবিরের মনে হয় কোন কৃষ্ণকলির সৌন্দর্য দেখার মতো এক জোড়া চোখ বিধাতা তাকে দিয়েছেন। তার জীবনে জবার মতো একটা কৃষ্ণকলি চাই।বিধাতার দেয়া কৃষ্ণকলির সৌন্দর্য দেখার মতো এক জোড়া উজ্জ্বল চোখ তার আছে বলেই সেই অসাধারণ চোখ দিয়ে আবির দেখে অফিসের সব মেয়েদের চাইতে জবা সেরা সবার থেকে আলাদা।কিন্তু জবার অনন্য সুন্দর মার্জিত দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কাছে আবির এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায় না।
অাজ আবার অফিসে জবা শাড়ি পড়ে এসেছে।আবির বেশ মুগ্ধ হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়” আজ পাত্রপক্ষ দেখতে অাসবে নাকি…?”উত্তরে জবা খানিকটা লজ্জাবনত কন্ঠে বলে,”ঠিকই ধরেছেন,অাজ অামায় দেখতে আসবে।কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন?
গত পাঁচ বছর ধরে প্রায় সব পাত্রপক্ষই আমাকে দেখতে এসে আমার ছোটবোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠায়। কারণ ছেলে পক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃষ্ণকলিকে নয় দুধে আলতা মেশানো সুন্দরী পাত্রীকেই বেশী পছন্দ করে।এরপর হঠাৎ লজ্জা ঢাকতে জবা কিছুটা অবনত ভংগিমার ফাইলের কাজ মন দেয়। সুযোগ পেয়ে এবার আর চুপ করে না থেকে আবির প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় জবাকে।যদিও প্রচন্ড অবাক হয়ে, খানিকটা জোরেই বলে ফেলে কথাটা। “এসব কি বলেন?বড় বোনের জায়গায় ছোট বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠানোর কোন অধিকার কোন পাত্র পক্ষেরই আছে নাকি?”
আমতা আমতা করে জবা আস্তে আস্তে কেউ যেনো না শোনে এমন ভাবে প্রায় ফিশ ফিশিয়ে বলে -” জানেন? আমার ছোট বোনটার জন্মের পর পরই ছোট বেলায় আমার কাছের রিলেটিভরা আমার মা বাবাকে সব সময় বলতো,তোদের বড় কাল মেয়েটাকে পার করতে তোদের অনেক কষ্ট হবে।”তখন এর মানে বুঝতাম না, এখন তা হাঁড়ে হাঁড়ে বুঝি। আসলে কালো মেয়েরা প্রেমিকা অথবা বউ হিসাবে সব সময়ই অানফিট।আমাদের সমাজে কালো মেয়েরা কখনোই রুপবতী হয় না,হাজার গুণ থাকলেও তারা সমাজের চোখে একেবারেই আনফিট।আবির, এ দেশে এমন একটা ছেলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে সে কোন কালো মেয়ের হাত ভালোবেসে ধরবে, কিম্বা কোন কৃষ্ণকলির হাত ধরে সমুদ্র সৈকতে হাটার স্বপ্ন দেখবে”।পাত্রপক্ষ আমার ছোটবোনকে প্রস্তাব পাঠানোর পর এবার অবশ্য আমার বাবা প্রথমে রাজি না হলেও, শেষমেশ রাজি হলেন।
আমার ছোট বোনটার বিয়েটা দিতে।কারণ কালো অপয়া বড় মেয়েটার জন্য তার ছোট রূপসী দুধে আলতা মেশানো ছোট মেয়ের বিয়ে অাটকে যাবে, তাতো আমিও চাই না।তবে, কিন্তু…. যে ছেলের সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা,তাকে ছোট বোনের সাথে কিছুতেই মানতে পারছি না আমি।অামার মরে যেতে ইচ্ছে করছে….আবির, সত্যি!
আবির জবার হাতটা ভালোবেসে শক্ত করে নিজের মুঠোয় নেয়।তারপর জবাকে বুঝাতে চেষ্টা করে।দেখুন জবা, অাপনি হতাশ হবেন না,বেঁচে থাকার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা লাগে না। পৃথিবীর কোন একপ্রান্তে ….! তা কেনো? ধরুন,এই টেবিলের এই প্রান্তেই এক জোড়া মুগ্ধ চোখ অাপনার জন্য অপেক্ষা করে অাছে,তা যদি আপনি একটু বুঝতেন!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।