রেষ্টহাউসের বারান্দার ইজিচেয়ারে সামনের বালিটুকুর ওধারে চঞ্চল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম । আকাশ এতো ঝকঝকে যেন ছুঁলে আঙুলে নীল রং লেগে যাবে । ক’টা গাঙচিল উড়ছে ।এলোমেলো হাল্কা হাওয়ায় পিছনের ঝাউবনে একটা কেমন ঘুম ঘুম সরসর ঝরঝর শব্দ সবসময় । উইকএণ্ড কাটানোর জন্য আদর্শ জায়গা । শুধু সুমন্ত্রটা যদি…
ভেতর থেকে অনসূয়া বেরিয়ে এসে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লো । হাই তুলে, খাটো কোঁকড়া চুলে হাত বুলিয়ে বললো, “কাল রাত্রেও ঘুমোতে পারিনি…কি রে কঙ্কা, সুমন্ত্রদা ফোন করেছিলো ?”
“হুমম্ । কাল রাত্রে ।”
“বাঁচা গেলো ! এতো দেরী করলো কেন, আর রাত্রে কেন ?”
“বললো কানেকশান পাচ্ছিলো না । সব ব্যবস্থা করছে নাকি, চিন্তা করতে বারণ করলো ।”
“কানেকশান তো আমরাও পাচ্ছি না এখানে । টাওয়ারই নেই, ওয়াই ফাই নেই… আর দ্যাখ ফোনগুলোর কি যেন হয়েছে, সময় তারিখ কিচ্ছু দেখাচ্ছে না, সেই শুক্রবার বিকেলের সময়টা দেখাচ্ছে শুধু, ফ্রীজ করে গেছে ।” দারুণ বিরক্ত হয়ে অনসূয়া হাত নাড়লো ।
সত্যিই চিন্তা হচ্ছিলো ভীষণ । ছুটির কদিন কাটতে এসে কি যে দুর্ভোগ, নইলে জায়গাটা তো ভালোই । সোমবার একটা ছুটি আছে, তাই শনি রবি মিলিয়ে তিনদিনের ছুটি কাটাবো আমরা তিন দম্পতি, সোমবার দুপুরে ফিরবো । মানে সেটাই প্ল্যান ছিলো, কিন্তু শুক্রবারের বিকেলে পৌঁছানোর আগেই ঝড়বৃষ্টিতে গাড়িটা…
“সত্যি গাড়িটা হঠাৎ খারাপ হওয়ার সময় আর জায়গা পেলো না !” অনু চেয়ারের পিঠে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে গলা তুলে ডাকলো, “এই মনুয়া-আ-আ ! চা-আ-আ !” ওপাশের রান্নাঘর থেকে এখানকার কেয়ারটেকার প্লাস রাঁধুনি মনুয়ার অস্পষ্ট সাড়া পাওয়া গেলো । ওর হেল্পার, মাঝবয়সী গাছকোমর করে শাড়িপরা হাসিখুশি তারামণি বারান্দা ঝাঁট দিচ্ছিলো, ওদিকে চলে গেলো । ওরা কাছেই বস্তিতে থাকে ।
“গাড়িটা খারাপ হয়নি ঠিক রে অনু, ভিজে রাস্তায় চাকা পিছলে পাশের নিচু জমিতে পড়ে বোধহয় অ্যাক্সেল ট্যাক্সেলের কিছু ড্যামেজ হয়েছিল ।” আমি যোগ করলাম, “…আমার মনে হয় ।”
বালি পেরিয়ে দেবল বারান্দায় উঠে এলো, ছোট তোয়ালের রোব পরা, হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের ভিজে বালি ঝেড়ে নিলো । অনসূয়া বললো, “এই জানো সুমন্ত্রদা ফোন করেছিলো কঙ্কাকে ।”
“ওঃ, থ্যাঙ্ক গড – গাড়িটার কোনো ব্যবস্থা করতে পারলো ? ওকে একলা যেতে দেওয়াই আমার উচিত হয়নি । ওই গাছের সঙ্গে ধাক্কাটা লাগার পর, সুমন্ত্র বললো…”
হ্যাঁ, সুমন্ত্রই চালাচ্ছিলো, আমি বসেছিলাম পাশে, অন্যরা পেছনে । গাড়িটা অচল হওয়াতে বলেছিলো, এখনো মোড় পেরিয়ে বেশি এগিয়ে আসা হয়নি, ও চট করে গিয়ে চায়ের দোকানটা থেকে কোনো গ্যারাজে ফোন করে একটা ব্যাবস্থা করবে, রেষ্টহাউসটা তো বেশী দূরে নয়, আমরা গাড়িতে বসে না থেকে হেঁটে চলে যাই যেন । আমরা বলেছিলাম কেউ সঙ্গে যাবো ওর, তা সে শুনলে তো ! তার পর থেকে বাবুর আর পাত্তা নেই, চিন্তায় মরে যাচ্ছি, তার পর কাল রাত্রে ফোন, ভাঙা ভাঙা কানেকশান, সব কথা ভালো শোনা যাচ্ছিলো না, তবুও…
আমি বললাম, “গাছের সঙ্গে আবার কখন ধাক্কা লাগলো ? চাকা স্কিড করলো তো ।”
দেবল কাঁধ নাচিয়ে বললো, “ওই গাছের একটা ডাল ঝোড়ো হাওয়ায় এনজিনের বনেটের ওপর পড়েছিলো , ওটার ধাক্কা ।” আমি মনে করার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম । যাকগে ।
মনুয়া এসে চায়ের ট্রে রেখে গেলো । বেশ চটপটে ভদ্র মৃদুভাষী লোকটি । অনু বললো, “ওই যে আমাদের কপোত কপোতী আসছেন ।”
ওধারের সিঁড়ি দিয়ে ঋতম আর সুর্মা উঠে এলো । সমুদ্রের হাওয়ায় লাল টিশার্ট পরা ঋতমের একটু লম্বা চুল উড়ছে আর সুর্মার সবুজ শাড়ির আঁচল এলোমেলো, চুলগুলো একটা স্কার্ফে বাঁধা । আমি লক্ষ্য করলাম ঋতমকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে । ও আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট, আমাদেরই আর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছোট ভাই সম্পর্কে । বেশিদিন বিয়ে হয়নি, কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ওর মা ক্যানসারে কষ্ট পেয়ে কিছুদিন হলো মারা গেছেন, ও-ই দেখাশুনো করতো বেশী, এখন ও মানসিক অবসাদে ভুগছে । কেমন যেন নার্ভাস হয়ে থাকে সব সময় । এত ছবি তোলার শখ, তাতেও মন দেয়না আজকাল ।
দেবল বলছিলো সুমন্ত্রের ফোনের কথা, সুর্মা একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললো, “যাক বাবা…কঙ্কাদি তুমিও ভীষণ দুশ্চিন্তা করছিলে…আমি চা ঢেলে দিচ্ছি তোমাদের ।”
দেবল বললো, “কিন্তু আর কি বললো সুমন্ত্র…কখন আসবে ?”
আমি একটু থেমে থেমে বললাম, “ঠিক পরিষ্কার করে শোনা যাচ্ছিলো না…বললো সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে…।”
“কিন্তু, মানে, ও কখন আসবে কিছু বললো না ?”
“বলেছিলো…” আমি আর কিছু বলতে পারলাম না, কেমন যেন আবছা হয়ে আসছিলো স্মৃতিটা । ঠিক কি বলেছিলো সুমন্ত্র, কখন…কাল অনেক রাত্রে, হ্যাঁ রাত্রেই তো…আমি ঘুমিয়ে ছিলাম ।
অনসূয়া হঠাৎ বললো, “আচ্ছা আমাদের ফোনগুলো কাজ করছে না কেন বল তো ? ওয়াই ফাই নেট কিচ্ছু নেই, ফোন কানেকশান হচ্ছে না, ইলেকট্রিসিটিও চলে যাচ্ছে থেকে থেকে ।”
“মনুয়া তো বললো যে ঝড়বৃষ্টির জন্য হয়েছে..”।
ঋতম বললো, “শুক্রবারে বিকেলে ঝড়বৃষ্টি হলো তাই তো, মানে গাড়িটার কি যেন হলো…আমি, আমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তো…জেগে দেখি…।” কেমন অস্থির ভাবে রেলিংএর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ।
সুর্মা চায়ের কাপ নামিয়ে একটা বিস্কুট তুলে নিয়ে বললো, “তারপর তো সুমন্ত্রদা চলে গেলো, আর আমরা হেঁটে হেঁটে এই রেষ্টহাউসে পৌঁছলাম, উঃ কি বৃষ্টি ।এখন আবার কতোদিন ধরে কি সুন্দর রোদ…।” সুর্মা হঠাৎ ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল রেখে চুপ করে গেলো, কি একটা ভুল না জেনে করে ফেলেছে যেন ।
বেলা হয়ে গেছে বেশ । মনিয়া আর তারামণি খাবারের ট্রে নিয়ে এলো, আমরা দেরী করে ব্রেকফাস্ট খাই, ভারী গোছের কিছু, দুপুরের খাওয়ার ঝামেলা থাকে না । বাঃ, আজ এনেছে কচুরি আর আলুর দম, প্রথম দিন টোষ্ট অমলেট দিয়েছিলো, আমাদের পছন্দ হয়নি, তারপর থেকে লুচি মোহনভোগ, পরোটা ডিমের ডালনা, চিঁড়ের পোলাও বেগুনী এইসব দেয়, দিব্যি রান্নার হাত, শুধু একদিন সকালে মাংসের ঘুগনিতে খুব ঝাল ছিলো । কি একটা অসংগতি যেন আমার মনের মধ্যে নাড়া দিলো, আমি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “মনুয়া !” চারধার কেন থমথমে হয়ে গেল, কেমন চুপচাপ, ঢেউয়ের আওয়াজ, ঝাউবনে হাওয়ার সর-সর সব বন্ধ । আমি দেখলাম যেন সমুদ্রটা আঁকা ছবির মতো স্থির হয়ে গেছে । মনুয়া আর তারামণি যেতে যেতে ফিরে তাকালো, আমি দেখলাম ওদের সাধারণ মুখগুলো বেঁকেচুরে কেমন তেকোণা মতো হয়ে গেলো, চোখগুলো সবজেটে, আমি বোধহয় মাথাটা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলাম, দেবল আর অনু আমায় ধরে ফেলে বসিয়ে দিলো ।
“এই কঙ্কা কি হল তোর ?”
“সেই সক্কালে উঠে থেকে অব্দি কিচু খাওয়া দাওয়া হয়নি কো, তাই অমন হইচে, এট্টু গরম দুধ নিয়ে আসি ।” তারামণির গলা । সকলের চিন্তিত মুখ আমার ওপর ঝুঁকে পড়েছে । সব কিছু স্বাভাবিক, যেমন থাকার কথা । আমি সোজা হয়ে বসে বললাম, “না না কিচ্ছু হয় নি, দুধ টুধ দরকার নেই, শুধু এই মাথাটা কেমন…।”
অনসূয়া আমার হাতে একটা প্লেট দিয়ে বললো, “খেতে শুরু কর তো । কাল রাতে তো প্রায় কিছু খাস নি, চিন্তায় বোধহয় ঘুমোস নি ভালো ভাবে…।”
“না রে, খুব ঘুম হচ্ছে জানিস, খুব গভীর । এর আগে অফিসের সেই প্রজেক্টটা নিয়ে এতো চাপে ছিলাম, ঘুমোতো পারছিলাম না, ডাক্তারই বলেছিলো ক’দিন রিল্যাক্স করতে, এখানে এসে অবধি মরার মতো ঘুমোচ্ছি ।”
দেবল বললো, “অনু কিন্তু ঘুমোতে পারছে না । এমন ছটফট করছে, আমিও জেগে যাচ্ছি ।”
আমি অনুর দিকে তাকালাম, “আবার সেই স্বপ্নটা দেখেছিস ।” ও অন্যমনস্ক ভাবে সমুদ্রের দিকে চেয়ে বললো, “প্রতি রাতেই দেখি । ঠিক স্বপ্ন নয় । খালি মনে হয়, কারা যেন আমার খাটের চারপাশে ঘিরে আছে, কিসব বলছে ফিস ফিস করে । মাথায়, পিঠে খুব যন্ত্রণা হয়, আর একটা কেমন গন্ধ…।”
“কিসের গন্ধ ?”
“কি রকম অ্যান্টিসেপটিক, ওষুধ ওষুধ গন্ধ ।”
“দূর, স্বপ্নে তো গন্ধ পাওয়া যায় না । আর স্বপ্নে মাথা ধরে নাকি ।” অনু অসহায়ভাবে বললো, “তাই তো হচ্ছে আমার ।” আমি লক্ষ্য করলাম ওর চোখের নিচে কালি পড়েছে ।
ঋতম নিজের প্লেটটা নামিয়ে রেখে হঠাৎ বললো, “আমিও এখানে এসে অবধি রোজ স্বপ্ন দেখছি । আমার মা’কে ।”
আমরা সবাই চুপ করে গেলাম । ঋতম বলতে লাগলো, “মা কি সব বলছে আমায় কিন্তু আমি মা’র কাছে যেতে পারছি না ।পা দুটো…বাঁধা, খুব ব্যথা । আর, আর, অনসূয়াদি, আমিও ওই ওষুধ ওষুধ গন্ধটা পাচ্ছি, জানো ।”
সুর্মা নিচু গলায় বললো, “ঋতম, প্লীজ । ওটা স্বপ্নই, কেন আপসেট হচ্ছো বলো তো ।” তারপর গলাটা একটু তুলে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে ফেলতেই বোধহয় বললো, “এই জায়গাটা কিন্তু চমৎকার, যা-ই বলো । ঠিক আমি যেমন ভেবেছিলাম, তেমনি ।”
আমি বললাম, “আমিও ঠিক এমনিই ভেবেছিলাম, পেছনে ঝাউবন, ওপাশে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, সামনে সমুদ্র, গাঙচিল উড়ছে আকাশে । শুধু একটু বেশী যেন নির্জন, তাই না ।”
অনসূয়া অপ্রত্যাশিতভাবে বললো, “হ্যাঁ, যেন কেউ কোত্থাও নেই, শুধু আমরা আছি । আমার কেমন যেন লাগছে, মানে এই জায়গাটা…আচ্ছা এই সমুদ্রে জোয়ার আসে না নাকি ? ঠিক একরকম ঢেউ সবসময় ।”
“আসে নিশ্চয়ই, রাত্রের দিকে, মানে যখন ঘুমোই আমরা ।”
আমি জোর করে হেসে বললাম, “অনু তুই কি ভাবছিস জায়গাটা ভূতুড়ে ? তাহলে আগেই জানতে পারতাম । দেবলদা, তোমার অফিসের সেই অনিন্দ্যবাবু না অচিন্ত্যবাবু, মানে যার জন্যে রেষ্টহাউসটা আমরা পেলাম, কি বলেছিলো যেন ?”
“অনন্যবাবু । আমাদের পারচেজ সেকশানে কাজ করেন, ওঁরা এখানে আসেন তো প্রায়ই, সপরিবারে । তিনটে রুমই বুক করেছিলেন, তার পর ওঁদের দুই ছেলে মেয়েরই একসঙ্গে চিকেনপক্স হলো । আমি শুনে বললাম আমরা নিতে পারি তাহলে । তোমাদের বলেছি তো সব আগেই । ভূত টুতের কথা কিচ্ছু বলেন নি ভদ্রলোক । বলেছিলেন বেশ ভালো জায়গা, ওই মনুয়া আর তারামণি সব কাজ টাজ করে দেবে । বুকিংএর অফিস এই শহরেই, উনি ফোনে কথা বলে সব ঠিক করে দিলেন ।” দেবল এসে একটা আরাম চেয়ারে বসলো ।
খাওয়া হয়ে গিয়েছিলো । মনুয়া আর তারামণি প্লেট বাটি বাসন সব তুলতে এলো । সুর্মা বললো, “জানো আজ আমি আর ঋতম ওই দিকে গিয়েছিলাম, যেদিকে আসার রাস্তাটা । এখনো গাছপালা পড়ে আছে ।”
পরশু না কবে যেন আমরা একটু ঘুরে আসতে গিয়েছিলাম ওদিকে, গাড়িটা উদ্ধার করার কোনো ব্যবস্হা হয়েছে কিনা দেখতে । তা এগোতেই পারলাম না, যা অবস্হা । আচ্ছা, এতোটাই ঝড়বৃষ্টি হয়েছিলো সে রাত্রে ? মনে করার চেষ্টা করছিলাম ।
“…আমি না, ভাবছিলাম এখানে একটা লাইটহাউস হলে কি ভালো হতো, ওমা দেখি রয়েছে একটা ! আরেকটু ওদিকে গিয়ে দেখি সমুদ্রের একটু ভেতরে একটা পাথুরে গুহা উঁচু হয়ে আছে, কিরকম মন্দিরের মতো । ভেতরে মনে হলো একটা লম্বা মতো কালো মূর্তি, কিসের গো, মনুয়া ?”
আমি একটু অবাক হয়ে দেখলাম মনুয়া আর তারামণি দুজনেরই মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো । জিনিসপত্র হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো । সুর্মা লক্ষ্য করেনি, বলে যেতে লাগলো, “….ঢেউ এসে পড়ছিলো গুহার গায়ে, কি জোরে, আচ্ছা ওখানে যাওয়া যায় না ?” মনুয়া মাথা নেড়ে না বলে দ্রুত চলে গেলো, তারামণি শিউরে উঠে বললো, “ওসব কতা মুখেও এনো নি দিদিমণি”, গলায় সুতোর সঙ্গে বাঁধা কি একটা মাথায় ঠেকিয়ে ঘুরে চলে গেলো ।আমরা কেউ কিছু বললাম না, তার পর অনসূয়া অবাক হয়ে বললো, “কি হলো ব্যাপারটা ?”
দেবল বললো, “ও কিছু না, স্হানীয় কোনো কুসংস্কার বা বিশ্বাস হয়তো । এই ঋতম…ছবি তুলেছিলি মন্দিরটার ?”
“আমি দেখিই নি ওটা । আমি বাতিঘরটা দেখছিলাম, সুর্মা একটা পাথরের টিলামতোর ওধারে ঘুরে একটু গিয়ে আমায় ডাকলো, কিন্তু…” ঋতম কেমন আচ্ছন্নভাবে বলতে লাগলো, “…আমার কাঁধে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছিলো, ঐ যেখানে গাড়ির জানলার কাঁচটা ভেঙে ঢুকে গিয়েছিলো, উঃ, কি রক্ত…”।
সুর্মা দ্রুত উঠে পড়ে ওকে ঝাঁকুনি দিলো একটা, “এই ঋতম, আবার ঐ সব বলছো ? কিচ্ছু হয় নি তোমার কাঁধে !” আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, “কি যে করি ! দেখো ওর চিন্তায় আমারও রাত্রে ভালো ঘুম হয় না, কি সব স্বপ্ন দেখি, খুব শীত করে । মাথা ব্যথা করে সব সময় ।”
আমি বললাম, “ঋতম, যা গিয়ে একটু ভালো করে ঘুমিয়ে নে । চলো সবাই ঘরে যাই, তার পর রোদটা পড়লে একটু বেড়িয়ে আসা যাবে ।”
ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম, আধোঘুমে তলিয়ে গেলাম আবার, এখানে এসে অবধি কেমন যেন ঘুম ঘুম লাগে সারাক্ষণ । প্রতিদিনের ক্লান্তি, কাজের চাপ, একঘেয়েমি – এসব থেকে দুদিনের মুক্তি পেতেই তো আসা এখানে আমাদের । কিন্তু এতো ঘুম আসে সবসময়, কিচ্ছু ভাবতে ইচ্ছে করে না যেন…চোখটা একটু খুললাম । সামনের দেওয়ালে টাঙানো একটা বেশ সুন্দর নিসর্গচিত্র, সমুদ্রের, এখানকারই বোধ হয় । হ্যাঁ ঐ তো বাতিঘরটা, সুর্মা যেমন বলেছিলো, আর একটু দূরে সেই পাথরের গুহা, না মন্দির, কি যেন, ভেতরে লম্বা কালো কিসের যেন মূর্তি…হঠাৎ চটকা ভেঙে গেল । নিসর্গচিত্র ? এখানে তো একটা ফলের স্হিরচিত্র ছিলো, আমার বেশ ভালো করে মনে আছে । নিজেও একটু আধটু আঁকি বলে খুঁটিয়ে দেখছিলাম, আঙুরগুলো বেশ দক্ষ হাতে আঁকা । সারা ঘরে আর কোনো ছবি নেই । এরকম ভুল তো হবার কথা নয় । ছবিটার দিকে তাকিয়ে দেখি, সমুদ্রের ঢেউগুলো দুলছে, আর গুহাটার গায়ে আছড়ে পড়ছে, তার শব্দ স্পষ্ট শুনছি, কেমন ঘোরের মধ্যে চেয়ে রইলাম । আমার মনে হতে লাগলো ছবিটা ধীরে ধীরে যেন বড়ো হয়ে উঠছে, আমাকে ঘিরে ফেলছে, আমার পায়ের নিচে বালি আর সামনে গুহার মধ্য আধোঅন্ধকারে এক দীর্ঘ মূর্তি ।
কখন যেন অনসূয়া ঘরে এসে ঢুকেছিলো, আমার কাঁধে নাড়া দিয়ে বললো, “কঙ্কা..এই, কি দেখছিস ওদিকে হাঁ করে ?” ঘোরটা কেটে গেলো ।
চোখদুটো ঘষে নিয়ে বললাম, “ও তুই । দ্যাখ এখানে একটা ফলটলের ছবি ছিলো মনে হচ্ছে, এখন দেখছি একটা সীস্কেপ । এই জায়গাটারই ।”
আমি ভেবেছিলাম অনু বোধহয় বলবে, “ভুল দেখেছিলি” বা ঐরকম কিছু । কিন্তু কেমন শুকনো মুখে বললো, “এই জায়গাটা যেন কিরকম অদ্ভুত রে কঙ্কা । এসে অবধি দেবল ঘুমের মধ্যে কি সব বিড়বিড় করে, আগে কক্ষণো করতো না । আচ্ছা, এই বইটা দ্যাখ, আমি পড়ছি ক’দিন ধরে, সঙ্গে করে এনেছিলাম ।”
অনুর একধরণের ইংরেজী পেপারব্যাক মোটা মোটা বই পড়ার নেশা আছে । ঐতিহাসিক রোম্যান্টিক গোছের, যার প্রচ্ছদে থাকে লেসের কুঁচি দেওয়া লো-কাট জামা পরা সুন্দরী বিবশা নায়িকা, আর পেশীবহুল রাফ টাফ নায়ক, বেশীর ভাগ সময়ে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত । এই নিয়ে প্রচুর ক্ষ্যাপানো হয়েছে অনুকে, কিন্তু ও বলে অঙ্কের অধ্যাপিকা হলেও এটা নাকি ওর বিনোদন । এখন দেখি ওর হাতে ঐরকম একটা বই, গাড়িতে পড়ছিলো মনে পড়লো ।
অনু বললো, “এটা ওই চ্যাপটার ফোর অবধি পড়েছিলাম, তারপর এখানে এসেও মাঝে মাঝে পড়েছি । আজ দুপুরে পড়তে গিয়ে মনে হলো, এখানে এসে অবধি কি পড়েছি কিচ্ছু মনে নেই । অদ্ভুত না ? তারপর বইটা খুলে দেখি, ওই পরিচ্ছেদ মানে চ্যাপটার ফোরের পরে আর কিচ্ছু নেই ।”
“কিচ্ছু নেই মানে ?”
অনসূয়া বইয়ের পাতা উলটে আমায় দেখালো, চ্যাপটার ফোরের পর শুধু শূন্য পাতা শেষ অবধি । সাদা । কিচ্ছু নেই । আমরা দুজনে সেদিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলাম ।
দেবল দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের ডাকলো, “চলো সবাই একটু ঘুরে আসি বাইরে থেকে ।”
বারান্দায় বেরিয়ে দেখি সুর্মা ঋতমকে কি যেন বোঝাচ্ছে, আর ঋতম অস্থিরভাবে আমাদের দেখে, সুর্মা উদভ্রান্ত ভাবে বললো, “দেখো না অনুদি, কঙ্কাদি, কি সব উলটো পাল্টা বকছে ।”
“…বলছি তো, এ জায়গাটা নেই । কোথাও নেই ।”
“নেই তো আমরা আছি কি করে ? কি সব বলছিস ?”
“এই দেখো এখানে এসে অবধি কতো ছবি তুলেছিলাম, একটাও আসেনি । আর ঘরের ছবিগুলো বদলে যায় । শেলফের বইগুলো বদলে যায় । আর ওই গাছপালাগুলোও বদলে যায় ।”
আমি আর অনু চুপ করে রইলাম । দেবল বললো, “আর মনুয়া আর তারামণি, ওরাও নেই নাকি ? রোজ রান্নাবান্না করে দিচ্ছে যে ?”
“জানি না !”
“আচ্ছা চল, মনুয়ারা বলেছিলো না, ওইদিকে ওদের বস্তি আছে, দেখে আসি ।”
বাঁদিক ঘুরে হাঁটতে লাগলাম আমরা, ডানদিকে সমুদ্রের ঢেউ ফেনায় ভেঙে পড়ছে । অলস ভাবে ঝিনুক কুড়োতে লাগলাম । আশ্চর্য সব ঝিনুক, এতো রকম রঙের আর আকারের, আগে কখনো দেখি নি । সামনে পাথর আর গাছপালা সমুদ্র অবধি নেমেছে, বালি কাঁকরের পথটা আবার বাঁদিকে বেঁকে গেলো, ডানদিকে কি ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল । জায়গাটা অচেনা, জঙ্গলের ভেতরটা কি রকম অন্ধকার, যেন দম বন্ধ করা, একবার মনে হলো কাকে যেন দেখলাম । কেমন আচ্ছন্ন লাগছিলো, যেন কতোকাল ধরে এভাবে হাঁটছি । তারই মধ্যে শুনলাম দেবল সুর্মাকে চাপা গলায় বললো, “ওই অ্যাক্সিডেন্টের সময়ে লেগেছিলো বোধহয়, ডিলেড শকে অমন হচ্ছে মনে হয়, ফিরে গিয়ে ডাক্তারকে একবার…।”
অনসূয়া হঠাৎ বললো, “এ কি ! এটা তো রেষ্টহাউসের পেছন দিকটা । আমরা ঘুরে এসেছি, তাহলে মনুয়াদের বস্তিটা কোনদিকে ?”
আমরা এদিকওদিক তাকাচ্ছিলাম । আমি অনিশ্চিত ভাবে বললাম, “তাহলে নিশ্চয়ই ওই জঙ্গলের মধ্যে কোথাও পথ ছিলো, আমরা লক্ষ্য করি নি ।” নিজের কানেই কথাটা অসঙ্গত ঠেকলো । আমরা আরো খানিকটা এগোলাম । বাতিঘরটা দেখা গেলো, তার এধারে পাথরের টিলামতো, সুর্মা যেমন বলেছিলো…অনসূয়া বললো, “কি রে তোর সেই গুহা না মন্দির সেটা কোথায় গেল ?”
সুর্মা অবাক হয়ে বললো, “এখানেই তো ছিল, সমুদ্রের একটু ভেতরে । সকালে দেখলাম তো ।”
ঋতমের হাসির শব্দে চমকে উঠলাম আমরা । বলছে , “…নেই, নেই, সব বদলে যায় দেখছো তো, আসলে কোথাও কিচ্ছু নেই, এটা কোনো জায়গা নয়, কোনো সময় নয়…।”
দেবল ভ্রূ কুঁচকে কি যেন ভাবছিলো, বললো, “আচ্ছা চলো রেষ্টহাউসে ফিরে যাই সকলে ।”
বারান্দায উঠে দেখি মনুয়া চায়ের ট্রে সাজিয়ে রাখছে বেতের টেবিলে । আমাদের দেখে একগাল হেসে কি যেন বলতে যাচ্ছিলো, বাধা দিয়ে অনসূয়া বললো, “আচ্ছা মনুয়া তোমাদের বস্তিটা ঠিক কোন দিকে বলো তো ?”
মনুয়া অবাক হয়ে বাঁ দিকে হাত তুলে বললো, “কেন উই দিকে, বলিচি তো দিদিমণি আগে ।সোজা পথ আচে।”
আমার মনে হলো সবকিছু কেমন যেন দুলে উঠলো, মুহূর্তর জন্য বিকেলের উজ্জ্বল রোদ মুছে গেলো, সব যেন নিঃঝুম…তারপর দেখি সব আবার ঠিক, তারামণি বড় প্লেটে করে বিস্কুট আর নিমকি এনে রাখছে । সুর্মা হঠাৎ বললো, “আচ্ছা, ওই দিকে সমুদ্রের মধ্যে যে গুহার মতো মন্দির আছে, সেটা…।” মনুয়া অকৃত্তিম বিস্ময়ে বললো, “কিসের গুহা দিদিমণি, ওরকম কিচু তো নেই এখানে ?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে কি, তারামণি, তোমরা সকালে বললে যে ?” ততোধিক অবাক হয়ে তারামণি বললো, “কিচু তো বলি নি আমরা ! কিসের মন্দির !”
ওরা দেখলাম কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে । মাথাটা ঝিমঝিম করছিলো আমার । মনুয়া আবার বললো, “আজ রাতে কি খাবেন আপনারা ? মুরগির ঝোল করবো ? আপনারা মাছ খেয়ে খুশি হলেন সেদিন, তারপর পাঁঠা রাঁধলাম, কাল বিরিয়ানী হলো…।”
দেবল আমাদের দিকে ফিরে বললো, “আচ্ছা, আমরা কতোদিন হলো এসেছি এখানে ? কবে এসেছি ?” আমরা কেউ কিছু বলতে পারলাম না । দেবল বললো, “মনুয়া ?” মনুয়া বললো, “অতো জানিনা দাদাবাবুরা । দিনের হিসেব নেই এখেনে । যাই মুরগির ঝোল রান্না করি ।” রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো, তারামণিও কখন এক ফাঁকে চলে গিয়েছিলো । ঋতম নিচু গলায় হাসছিলো । সুর্মা কেঁপে উঠে বললো, “আমার ভীষণ ভয় করছে ।”
দেবল কেমন অসহায়ভাবে বললো, “কিছু বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা কি হচ্ছে ।”
আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, সেই দুর্ঘটনার পর আমরা রেষ্টহাউসে কি ভাবে ঠিক এলাম ? হেঁটে ? বৃষ্টি পড়ছিলো, ঝড় হচ্ছিলো, তারপর ? তারপর ঠিক কি হলো ?
অনসূয়া বললো, “আমাদের জিনিসপত্র সব গাড়ি থেকে এতদূর কি করে নিয়ে এলাম আমরা কিছুতেই মনে করতে পারছি না । না কি মনুয়ারা এনেছিলো ।” একটা অদ্ভুত অবাস্তব বৃত্তের মধ্যে যেন আটকা পড়ে গেছি আমরা, পরিষ্কার করে ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে । দেবল মুখের ওপর দিয়ে হাত চালালো, সুর্মা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ।
আমার হাতের ফোনটা হঠাৎ বাজতে শুরু করলো । ভয়ঙ্কর চমকে দেখি ঝিনুকগুলোর বদলে আমার হাতে ফোনটা ।সুমন্ত্র…সুমন্ত্র ফোন করছে । স্পিকারে দিয়ে আমি কোনরকমে বললাম, “কোথায় তুমি ? এটা কোন জায়গা, সুমন্ত্র, খুব ভয় করছে আমাদের ।”
শুনতে পেলাম ওপাশে সুমন্ত্র হাসছে । বললো, “ভয়ের কি আছে ! বলেছিলাম না ব্যবস্হা করে দেবো সব । শোনো, ওদের বলো ওদের জন্য জীপ আসছে ।”
“কিন্তু রাস্তা বন্ধ যে !”
“পিছনে, ওই ঝাউবনের মধ্য দিয়ে পথ আছে । ওদের বলো এক্ষুণি ওখানে গিয়ে দাঁড়াতে । তাড়াতাড়ি, একটুও সময় নেই আর । শুধু ওদের চারজনের জন্যে জীপ । তোমার জন্য আমি নিজে আসছি, কঙ্কা ।”
“মা-মানে ?”
“যা বললাম তাই করো সবাই, দেরী কোরো না ।”
ঝাউবনের সরসর শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেলো জীপের আওয়াজ । সকলে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, যুক্তি দিয়ে কিছু বুঝতে পারছি না । জীপটা অদ্ভুত দেখতে, সাদা, ভেতরটাও সাদা, নীল আলো জ্বলছে । একটা তীব্র ওষুধ ওষুধ গন্ধে ভরে গেল চারদিক । কারা যেন কথা বলছে । ড্রাইভারের পাশের লোকটা ধাতব কণ্ঠে বলে উঠলো, “চারজন ! শুধু চারজন ! দেবল বসু, অনসূয়া বসু, ঋতম চৌধুরী, সুর্মা চৌধুরী…তাড়াতাড়ি!” গলাটা যেন বহুদূর থেকে আসছে । মুহূর্তের মধ্যে দেখি ওরা চারজনেই জীপের ভিতরে । শুনলাম ডাকছে, “কঙ্কা, কঙ্কা, কঙ্কাদি !” ঝাউবনের মধ্যে মিলিয়ে গেলো ।
“কঙ্কা, কঙ্কাবতী !” সুমন্ত্রের গলা । শুধু ও-ই আমায় পুরো নামটা ধরে ডাকে মাঝে মাঝে, আদর করে । ফিরে দেখি ও রেষ্টহাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে । হাতছানি দিয়ে ডাকলো, আমি প্রায় দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম । আমার হাত ধরে বললো, “চলো, এইবার ।”
“কোথায় যাবো ?”
“জানি না, সামনে । ওটাই পথ । ওই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে ।”
“কিন্তু, ফিরবো না আমরা ?” দেখি, অজানা জঙ্গলটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি ।
“না, কঙ্কা । চলো, এগিয়ে যাই ।”
পিছন ফিরে দেখি ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে সবকিছু । সমুদ্র, বালি, রেষ্টহাউস সব যেন ইরেজারে ঘষে মুছে দিচ্ছে ।
সুমন্ত্র বললো, “ওদিকে আর তাকিও না কঙ্কা । ঋতম ঠিকই বুঝেছিলো, ওটা কোনো জায়গা নয়, সময় নয় । ওসব ওদের মনেও থাকবে না ।”
“আমাদের ?”
“কে জানে । চলো ।”
ডাক্তার নিচু হয়ে কঙ্কাবতী মিত্রকে পরীক্ষা করছিলেন । সোজা হয়ে মনিটারের ফ্ল্যাট লাইনের দিকে তাকালেন । মাথাটা নাড়লেন ।
পাশের ডাক্তার নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আশা তো ছিলোই না এঁর বেলা । ইনি তো প্রথম থেকেই প্রায় একেবারেই রেসপণ্ড করছিলেন না । বড্ড বেশী আঘাত, এতোদিন শুধু প্রাণটুকুই ছিলো ।”
হেড নার্স বললেন “কি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সেভেনসিটারটা পুরো উলটে…এঁর স্বামী স্পটেই মারা গেলেন। ইনি তো পাশেই বসেছিলেন শুনেছি । অন্যরা যে কিভাবে বেঁচে গেলেন…”
“তবে ওঁরা মোটামুটি রেসপণ্ড করছেন, আবছা চেতনা ফিরে আসছে মাঝে মাঝে । ইমপ্রুভ করবেন আশা করা যায় ।”
ইনটার্নি অল্পবয়সী ডাক্তারটি বললো “কথা বলার তো অবস্থা নয়, তবে এ সময় কি সেন্সগুলো কাজ করে কিছুটা, স্যার ?”
“সম্ভবত…ওই ধরো সামান্য অনুভূতি, শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ, এসবের । মস্তিষ্কের ক্রিয়া বড়ো অদ্ভুত । কি যে চলে তার গভীরে, কে জানে ! নিজের মতো করে কিসের সৃষ্টি কেমন করে করে, তা আমরা আজও সবটা বুঝি না ।