‘কফি পাহাড়ের রাজা’ সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে তুষ্টি ভট্টাচার্য (পর্ব – ৩ ।। খন্ড – ৯)

কফি পাহাড়ের রাজা

তৃতীয় পর্ব:

৯)
জীবন বেঁচে থাকার জন্য অনেকখানি মূল্য ধরে নেয়। এটুকু আজ একান্তে এসে বুঝেছে মুরুগান। সে তো বরাবরই আপন মর্জির মালিক। যা ইচ্ছে হয়েছে করেছে। কারুর পরোয়া করেনি কোনদিন। দিন নেই, রাত নেই সারাক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছে। আবার বাগানের জন্য প্রাণপাত করে দিয়েছে। নাওয়া, খাওয়া ভুলে বাগানেই কাটিয়েছে দিনের পর দিন। আজ না জানি কত বছর পরে সে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে, এই শহরে বসত গড়েছে। কুগান ছাড়া রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই তার। হয়ত সন্তান থাকলে এতখানি বেপরোয়া জীবন সে কাটাতে পারত না। হয়ত ঈশ্বর বুঝেসুঝেই তাকে স্ত্রী, সন্তান থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন এই কারণে। আর আছে বিদ্যা। বিদ্যা, বিদ্যা…তুই যে কে আমার…কেন এলি সেই রাতে। এলিই যদি, ফিরে গেলি না কেন শরীরের নেশা কাটার পর! কী এক বন্ধনে ওই মেয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল আমায়! কিছুতেই তাকে অস্বীকার করতে পারেনি ও এতকাল। বিদ্যা ছাড়া তার কোন অস্তিত্ব ছিল কিনা, ভুলে গেছিল মুরুগান। প্রতি মুহূর্তে লক্ষ্যে, অলক্ষ্যে একজোড়া চোখ যেন তাকে খেয়াল করত। একজোড়া দৃষ্টি যেন্ তার আত্মা ফুঁড়ে দেখে নিত এক লহমায়। কিছু লুকোবার জো ছিল না ওর কাছে। ঠিক বুঝে নিত! অন্তর্যামী বিদ্যা। অন্তর্মুখীও বটে। বিদ্যাকে বুঝতে মাঝেমাঝে কেন প্রায়শই দ্বন্দ্বে ভুগত মুরুগান। তবে বোঝার চেষ্টা একরকম ছেড়েই দিয়েছিল পরের দিকে। যেন বিদ্যাকে না বুঝলেই ওর স্বস্তি। অনেক সময়ই তাই বিদ্যার প্রতি অবিচার করেছে ও। এখন এই দূরে এসে কেমন যেন গ্লানিতে ভুগছে এই নিয়ে। তবে ওকে বা ওদের ছেড়ে আসতে তার একটুও অপরাধবোধ হয়নি। মুরুগান যেন বোঝার মতো ওদের ঘাড়ে চেপে ছিল এতদিন। ওদের বরং মুক্তি দিয়েছে ও। তারও নিজেকে বোঝার দরকার আছে। সে ঠিক কতটা অনিয়ন্ত্রিত মানুষ, কতখানি স্বার্থপর বা কতখানি আত্মসুখী, সেও বোঝার আছে।
সেদিন ওই ছেলেদের স্কুল থেকে ফিরে দোকানে এসে সবে বসেছে মুরুগান, একটি মেয়ে এলো। টুকিটাকি কিনে দাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছিল। মুরুগানের যেমন অভ্যেস, ভালো করে খেয়াল করেনি মেয়েটিকে। আবার ফিরে এসে সেই মেয়ে যখন ওকে ডাকল, তখন তার মুখোমুখি হল মুরুগান। বয়স হয়েছে কিছুটা। পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। বেশি হতে পারে বা কম। মুখে একটা আলগা লালিত্য আছে, সরলতা যাই যাই করেও যায়নি এখনও। কিশোরীর মতো এক চিলতে হেসে মেয়েটি ওকে জন্মদিনের কেকের জন্য জিজ্ঞাসাবার্তা করতে লাগল। তারপর ক্যাটালগ দেখে, একটা কেক অর্ডার দিয়ে গেল। তবে যেদিন লাগবে, অর্থাৎ পরশু, সেদিন কিন্তু কেকটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে, এই ছিল মেয়েটার আসল বক্তব্য। হোম ডেলিভারি করে না মুরুগান। তার তো কোন কর্মচারী নেই। সে একাই সামলায় এই ছোট দোকান। মেয়েটিকে সে জানাল, ও বাড়িতে দিয়ে আসতে পারবে, তবে সন্ধে আটটার পরে। এই শর্তে রাজি থাকলে তবেই অর্ডার নেবে মুরুগান। কিছুক্ষণ দোনামনা করে মেয়েটি ভাবল কী যেন, তারপর ওর শর্তেই রাজি হয়ে অর্ডার দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময়ে বাড়ির ঠিকানা, নাম, ফোন নম্বর লিখে দিয়ে গেল বিস্তারে। ঠিকানা দেখে মুরুগান বুঝল, খুব বেশি দূরে নয় ওদের বাড়ি। আর নাম লিখেছে গৌতমী।
দেখতে দেখতে মাঝের দিনটা কেটে গেল। মুরুগানের ড্রয়িং খাতায় সেদিন ফুটে উঠেছিল একটা মেয়ের মুখের স্কেচ। এক গুছি চুল এসে বারবার কপালে পড়ছিল মেয়েটার। হার দিয়ে বারেবারে সরাচ্ছিল সে…ঠিক এইটুকু মুগ্ধতা মনে বসে গিয়েছিল মুরুগানের। চেহারা তার স্বাভাবিক। কোথাও কোন বাড়তি প্রলোভন ছিল না। একটা সাধারণ সালোয়ার কুর্তাই পরে এসেছিল সে। পাড়ার দোকানে কে আর সেজেগুজে আসে! অনেকদিন বাদে একটা ভালোলাগার রেশ কেন জানি মুরুগানের মনে মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। গৌতমীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য ও উন্মুখ হয়েছিল সেদিন। পরের দিন একটা কাচা শার্ট পরে নিয়েছিল মুরুগান। যতই হোক, একজনের বাড়িতে যাবে, নোংরা জামা পরে তো আর যাওয়া যায় না! সে এখন ভদ্রসমাজে বাস করে, তাই সেই সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হবে বৈকি! এসবই আসলে যেন নিজেকে প্রবোধ দেওয়া মুরুগানের। যথারীতি আটটা বেজে গেল। ডেলিভারি ভ্যান আসতে আজই যে কেন দেরি করছে কে জানে! ওর খুব টেনশন হচ্ছিল। যদি কেকটা ওরা না দিয়ে যায়! লজ্জায় মাথা কাটা যাবে ওর। ঘনঘন ঘড়ি দেখছিল মুরুগান। মিনিট দশেকের মধ্যে অবশ্য কেক দিয়ে গেল ওরা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মুরুগান। দোকানের শাটার নামিয়ে বেরিয়ে পড়ল গৌতমীর বাড়ির দিকে। খুব একটা বেগ পেতে হল না খুঁজে পেতে। একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি। সামনে বাগানে বেশ যত্নের ছাপ রয়েছে। মাঝখানে মোরাম বিছানো সরু রাস্তা। তার পায়ের শব্দে দরজা খুলে গেল কলিং বেল বাজানোর আগেই। গৌতমী! আজ একটু সেজেছে যেন। একগাল হেসে বলল, ‘ভাবলাম বুঝি আর কেক পাব না!’ মুরুগানও স্মিত হেসে বলল, ‘কেন পাবেন না? অর্ডার দিয়েছেন যখন নিশ্চই পাবেন’। মুরুগানকে ঘরে আসতে বলল গৌতমী। ড্রয়িংটা বেলুন দিয়ে, জন্মদিনের কার্ড, ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। টেবিলে কেকটা নামিয়ে রাখল মুরুগান। পেমেন্ট দিতে যাচ্ছিল গৌতমী। মুরুগান তার আগে বলে বসল, ‘কই, কার জন্মদিন, তাকে একটু দেখি আগে! জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে যাই’। একটু যেন ইতস্তত করল গৌতমী। তারপর ভেতরে গিয়ে নিয়ে এলো ছেলেকে। মুরুগান কেকের ওপর নাম দেখে বুঝেছিল পনেরো বছর বয়সের এক ছেলের জন্মদিন। আলাদা করে ওকে গিফট দেওয়ার জন্য কিছু চকোলেট নিয়ে এসেছিল ও লুকিয়ে। কিন্তু ছেলেটাকে দেখে সে প্রথমে থমকে গেছিল। বয়সে বা মাথায় একটি কিশোরের মতোই। কিন্তু তার মুখচোখ আর হাঁটা বা কথাবার্তা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সে আর পাঁচটা ছেলের মতো সুস্থ, স্বাভাবিক নয়। মানসিক বৈকল্য আছে। যদিও প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ছেলেটিকে হাত ধরে শুভেচ্ছা জানাল মুরুগান। আর পকেট থেকে চকোলেটও দিল। একগাল হাসি নিয়ে ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে রইল। যদিও চোখেমুখে সন্দেহ আর অবিশ্বাস স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল তার। গৌতমী যখন অভয় দিল, হাত বাড়িয়ে নিল চকোলেট।
এরপর চলে আসছিল মুরুগান। গৌতমী তাকে এক কাপ কফি খেয়ে যেতে অনুরোধ করল। বসল মুরুগান। গৌতমী আবার ভেতরে চলে গেল। ছেলেটি তখন ওর সামনে বসে। মুরুগান ভাবছিল, এর বাবা কোথায়? জন্মদিনের দিন নিশ্চই তাঁর বাড়ি থাকার কথা। যদিও এই বাড়িতে আর কোন প্রাণের লক্ষণ আছে বলে ওর মনে হল না। কফি নিয়ে এলো গৌতমী। জড়তা কাটাতে মুরুগানই জিজ্ঞেস করল ছেলের নামধাম, কোথায় পড়ে, এইসব। গৌতমী ম্লান হাসল একটু। তারপর জানালো, ছেলে পড়ে এক মানসিন প্রতিবন্ধীদের স্কুলে। রোজ সে নিজেই নিয়ে যায় ছেলেকে, নিয়েও আসে। সে নিজেও একটা স্কুলে পড়ায়। কেন জানি, অভদ্রের মতো মুরুগানের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, ‘কেন ওর বাবা হেল্প করে না আপনাকে?’ বলেই অপ্রস্তুত হয়ে ক্ষমা চাইল মুরুগান। গৌতমীর মুখ দেখে কিছু বোঝা গেল না অবশ্য। একটু চুপ করে থেকে জানাল, ‘আমি সিঙ্গল পেরেন্ট। ওর বাবার সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে বারো বছর আগেই’। এইরকম একটা দিনে ঘরের আবহাওয়া বিষণ্ণ করে দেওয়ার জন্য মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছিল মুরুগান। বারবার ক্ষমা চেয়ে নিল সে গৌতমীর কাছে। তারপর ছেলেটির সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করল। খুব সহজেই ছেলেটি, যার নাম গৌতম, মায়ের নাম অনুসারে, মুরুগানের সঙ্গে মিলে গেল। গৌতমী খুব অবাক হল ছেলেকে দেখে। আজ পর্যন্ত ছেলে গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া সহজে কারুর সঙ্গে মেশেনি। আনন্দে ওর চোখ চিকচিক করছে তখন।
বাড়ি ফেরার সময়ে মুরুগানের বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছিল খুব। যেন এই প্রথমবার ওর অপ্রকাশিত পিতৃত্ব জেগে উঠেছে। সন্তানের অভাববোধের স্বরূপটা কিরকম, আজ যেন কিছুটা হলেও ও বুঝতে পারছে। গৌতমীর জন্য না হোক, এই গৌতমের জন্যই ওকে আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে। আজ যদি সত্যিই ওর নিজের সন্তান থাকত, তবে কি ও এভাবে নিজের পরিচয় লুকিয়ে একা একা পড়ে থাকতে পারত?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।