(২০১৮ সালের ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে গেছিল কোরাগুর বিস্তির্ণ জঙ্গল। প্রায় আঠেরো দিন পরে আগুন আয়ত্ত্বে এসেছিল, যদিও তারপরে অন্যান্য অঞ্চল, যেমন তুরাহালি, লাক্কাবল্লীকে আগুন ছাড়েনি। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সেখানে। কোরাগু বেঁচে গেছিল, এই যা। কোরাবারা তো যোদ্ধার জাত দুএকটা প্রাণ গেলেও রক্তবীজের মতো ওরা পুনরায় বেঁচে উঠেছিল। কফিবাগানে আবার বীনসের চাষ শুরু করেছিল কুগান। সে আর অপরিণত নেই। সবাইকে হারিয়ে সে যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছিল একা একাই। স্বয়ংসিদ্ধ!)
লম্বা বিনুনি দুলিয়ে একটি মেয়েকে দুটো বাচ্চার পিছনে দৌড়তে দেখা গেল বিকেলে। বাচ্চাদুটির বয়স এক বছর। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে, যমজ তারা। ওদের বাবার বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। মেয়েটি ঘনঘন রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। তার বেণীতে টাটকা জুঁই ফুলের মালা জড়ানো। কপালে লাল টিপ আর চোখে কাজলের ছায়া। দেখতে দেখতে কুগান গেট খুলে ঢুকল বাড়িতে। দুজনেই কোলে চেপে বসল বাপের। মেয়েটির চোখে আহ্লাদ আর খুশি। বাচ্চাদের ছিনিয়ে নিয়ে ছদ্ম রাগে কুগানকে বলল, ‘কতবার বলেছি, বাইরের কাপড়ে ওদের ছোঁবে না! যাও, হাতমুখ ধুয়ে এস’। জলখাবার তৈরি করতে গেল সে এবার। কুগান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ডাক দিল—বিদ্যা কই রে…আমার মুরুগান বাবু কই? দুটিতে হুটোপাটি শুরু করল এবার বাবার সঙ্গে। ভানু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল ওদের। খুশিতে চোখের জল ছাপিয়ে এলো যেন ওর। চোখের কোণ থেকে কাজল নিয়ে আঙুলে করে লাগিয়ে দিল ছেলেমেয়ের গালে। ভানুপ্রদাকে বিয়ে করাও এক আশ্চর্য ঘটনা কুগানের জীবনে। এর পেছনে লম্বা হাত রয়েছে অবশ্য গৌতমীর। গৌতমী না থাকলে ভানুপ্রদার সঙ্গে দেখা বা আবার নতুন করে প্রেমে পড়া, সংসার করা—এসব স্বপ্নেও ভাবেনি কোনদিন কুগান। চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে এই কাজটাই তাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে ওপরওলা। হ্যাঁ, সে সুখি হয়েছে এই জীবন পেয়ে। নতুন কাজে, মানে বাগানকে আবার নতুন করে গড়েপিঠে নেওয়ার স্পর্ধাও দেখাতে পেরেছে।
বিদ্যা আর মুরুগান ওদের যমজ ছেলেমেয়ের নাম। এছাড়া আর কোন নাম রাখার কথা কুগান ভাবেইনি। ওদের সঙ্গে খেলতে খেলতে মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। সেই অভিশপ্ত রাতকে যত ভুলতে চায় ও, ততই বারবার মনে এসে পড়ে। সেই রাতে কুগানের যখন চোখ খুলল, সবে অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। নাকি আগুনের হল্কায় অমন মনে হয়েছিল, আজ আর মনে নেই। বিদ্যা, মুরুগানকে হাঁক দিয়েও কোন সাড়া পায়নি। ওদের ঘরের দরজা দুহাট করে খোলা পড়েছিল। হইচই লক্ষ্য করে ছুটেছিল সে পড়মড়ি করে। আর লোকের ভিড় সরিয়ে সামনে গিয়ে দেখেছিল, ঠিক যেখানে মুরুগানের এলাচগাছটা ছিল, সেইখানে আগুন লেগেছে। আর ধোঁয়া আর আগুনের ভেতর থেকে যেন দুটো মানুষের ছায়া ওকেই ডাকছে! এক মুহূর্ত সময় লেগেছিল ব্যাপারটা বুঝতে। লাফ দিতে গেছিল ও আগুন লক্ষ্য করে। কিন্তু একদল লোক ওকে জাপটে ধরে রেখেছিল। আর বিদ্যার চুলের তেলের গন্ধ যেন দ্বিগুণ হয়ে বাতাসে সুবাস ছড়াচ্ছিল সেই সময়ে। জল ঢালা, কম্বল, বস্তা ছুড়ে দেওয়া, ইত্যাদি সবরকম উপায়েই চেষ্টা চালানো হয়েছিল ওদের বাঁচানোর। হাসপাতালে যখন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওদের শরীরের আশি শতাংশ পুড়ে গেছে। লোকমুখে শুনেছিল মুরুগান এলাচ গাছটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল আপ্রাণ, আর বিদ্যা বাঁচাতে গেছিল মুরুগানকে। দুদিনের মধ্যেই দুটো প্রাণকে কষ্ট সহ্য করা থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল বিধাতা। স্বয়ং বিশ্বনাথের বুকে আশ্রয় পেয়েছিল ওরা।
গৌতমীর কথা মুরুগানের মুখেই শুনেছিল ফোনে। একদিন ওর ফ্ল্যাটের চাবিটা হাতে পড়ায় কুগানের মনে হল একবার গৌতমীর কাছে ওর যাওয়া উচিত। ফ্ল্যাটেরও বিলি, বন্দোবস্ত করে আসতে হবে এই ফাঁকে। কোরাগুর জঙ্গল থেকে আগুন নিভে গেছে তখন। চারিদিকে ছাইয়ের স্তূপ। তাদের বাগানও পুড়ে কালো হয়ে রয়েছে। এই মৃত্যুপুরী থেকে না বেরলে মন ভালো হবে না ওর। এই ভেবে একদিন বেরিয়ে পড়ল কুগান। গৌতমীর ফোন নম্বর মুরুগানের মোবাইল থেকে পেয়েছিল কুগান। যোগাযোগ করেছিল ওর সঙ্গে। প্রথমটায় বিশ্বাস করতে চায়নি গৌতমী। তার প্রথম অভিঘাত ছিল দেখার মতো। কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল ও। তাকে স্থির করেছিল কুগান সেদিন। একথা, সেকথার পরে মুরুগানের কফি বাগানের কথাও সব খুলে বলেছিল কুগান। বলেছিল বিদ্যার কথা। অবশ্যই একদিনে নয়। কয়েকদিন ধরে বলেছিল মুরুগানের ইতিবৃত্ত। বলেছিল ওর নিজের কথাও। গৌতমী কুগানের থেকে কিছুটা বড়ই বয়সে। অবধারিত ভাবে স্নেহ জন্মেছিল ওর কুগানের প্রতি। গৌতমের স্কুলে একজন এনজিও কোম্পানির মেয়ে আসে, ওর বন্ধুর মতোই, যদিও বয়সে কিছুটা ছোটই। একদিন আলাপ করিয়ে দিয়েছিল কুগানের সঙ্গে সেই মেয়েটির, অর্থাৎ ভানুপ্রদার। ভানুপ্রদাকে দেখেই প্রথম প্রেমের স্মৃতি ফিরে এসেছিল কুগানের মনে। অবিকল যেন সেই মুখের আদল! এরকম আরও কত আশ্চর্য ঘটনা সাজিয়ে রেখেছেন যে ওপরওলা! ভানুর সাহায্যে কুগানের বাগানে একদিন ওর এনজিও কোম্পানি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখে যায়। স্থির হয়—ওরা অনেকখানি সহায়তা করবে। আর সেই শুরু! ভানুপ্রদা এসে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কুগানের। প্রেম, বিয়ে, নতুন ভাবে বাগানকে তৈরি করা—সব নিজে একা হাতে সামলাতে থাকে কুগান। সে এখন অন্য মানুষ। হ্যাঁ, গৌতম আর গৌতমীও এখন এই বাগানের কাছেই নিজের বাড়িতে থাকে। ওদেরও দূরে রাখেনি কুগান। গৌতমকে ভানুর সাহায্যেই কাছাকাছি এক স্কুলে ভর্তি করিয়েছে, আর গৌতমীকে দিয়েছে ম্যানেজারের পদ। ওই ছোট্ট শহরে একটি এক কামরার ফ্ল্যাট আর একটি বাগান ঘেরা বাড়ি এখন খালি পড়ে থাকেনি অবশ্য। সেখানেও স্কুল খুলেছে কুগান। সেই ছেলেদের গ্রামের স্কুলে গিয়ে, সেই স্কুলকে তুলে এনেছে গৌতমীর বাড়িতে। আর মুরুগানের ফ্ল্যাট আর দোকান রেখেছে স্কুলের অফিস হিসেবে। কুগানের বাগানের কফি এখন আর লোকাল মার্কেটের ভরসায় থাকে না। এনজিওরাই ব্যবস্থা করে দিয়েছে—কুগানের কফি এখন আরবীয় দেশগুলোতে রপ্তানী হয়। যে দেশ থেকে বাবা বুদান কফির বীনস চুরি করে এদেশে কফি চাষের পত্তন করেছিলেন, সেই দেশেই যায় তার কফি! এত শত ভাবার সময় নেই অবশ্য কুগানের। সমস্ত দায়, দায়িত্ব, এর জন্য গুছিয়ে চলার বুদ্ধি বিবেচনা কুগানের মাথা থেকেই বেরিয়েছে। ভানুপ্রদা তাকে নতুন জীবন দিয়েছে যে! আর ওদের যমজ সন্তানকে মুরুগান আর বিদ্যা ছাড়া অন্য কোন নাম কি ওরা দিতে পারত? আপনারাই বলুন!