‘কফি পাহাড়ের রাজা’ সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে তুষ্টি ভট্টাচার্য (পর্ব – ৩ ।। খন্ড – ১২)

কফি পাহাড়ের রাজা

তৃতীয় পর্ব:

১২)
মুরুগান রোজকার মতো নিজের কাজ করে নিল একে একে। সকালে দোকান করল, দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ছেলেদের কাছে গেল। সন্ধেয় আবার দোকানে বসল। এবং যেই আটটা বাজল, দোকান বন্ধ করে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল ও। আজ স্যুপ নয়, বরং একটু মাংস রাঁধবে। পানড়ি কারি! দেখা যাক পারে কিনা! রেসিপি তো জানাই আছে, মাংসও নিয়ে এসেছিল সকালে বাজার থেকে অল্প করে। অনেকদিন খাওয়া হয়নি। যদিও কারুমবুট্টু করার আর ধৈর্য নেই মুরুগানের। একার জন্য অত পোষাবে না। প্লেন ভাত দিয়েই খেয়ে নেবে। তাই যেমনই হোক না কেন, পানড়ির স্বাদ কোনভাবে নষ্ট করতে দেওয়া চলবে না। আগে রান্না হবে, তারপর পান। নইলেই ঢিমে আঁচের রান্না করতে ধৈর্য ফুরিয়ে যাবে, আজ বিদ্যাকে হারিয়ে দিতে হবে যে করেই হোক। ধৈর্য জিনিসটা খুব জরুরি—এতদিনে অনুভব করেছে মুরুগান। তার আগে একফোঁটাও ছিল না, এখনও যে খুব বেড়েছে তাও নয়। তবু এখন সে চেষ্টা করে কোন কিছু নিয়ে ভাবার। কোন কাজে মন লাগানোর। নইলে ওই ড্রয়িং খাতার আঁকুবুঁকি হত না। হত না এই পানড়ি রান্না করা। বেশ ভাল গন্ধ ছেড়েছে। তেল ভেসে উঠেছে প্যানে। কালচে লাল রঙের কষা মাংসের রূপ দেখে তার এখনই খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। নাহ! বিদ্যার কথা ভাববে না সে আর। ওই মেয়ের কথা আর ভাববে না কিছুতেই! বোতল খুলে ফেলে একটা ডবল নিট মেরে দিল মুরুগান এক ঢোঁকে। জ্বলতে জ্বলতে আগুন তরলের প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ছে তার শরীরে। অনেকটা আরাম হল যেন এবার। মাথা পরিষ্কার হয়ে এলো। বিদ্যা রে! তোকে আজ খুব মিস্‌ করছি… কী করছিস এখন তুই? আমার কথা মনে পড়ে তোর, নাকি ভুলে গেলি কাজের চাপে? তোর রামলাল কোম্পানি তোকে ঠকিয়ে ভূত বানাবে—মিলিয়ে দেখে নিস তুই! তখন বুঝবি, আমি সবসময়ে বাজে কথা বলি না। অন্তত কফি বাগানের কাজে আমার ধৈর্য ছিল অসীম। আমার এলাচসখী কেমন আছে, খবর রাখিস তুই?
কুগান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যার সামনে। আর বিদ্যা একটানা ওকে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে খ্যাচখ্যাচ করেই যাচ্ছে। অনর্থক। কুগান বুঝেছে, বিদ্যার সব রাগ হজম করতে হবে তাকেই। ব্লটিং পেপারের মতো ওর রাগ শুষে নিতে থাকল কুগান। বেশ খানিকক্ষণ পরে বোধহয় বিদ্যার হুঁশ ফিরল। থামল ও। সম্বিত ফিরে পেল যেন! আর তখনই কুগানের দিকে তাকালো পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে। সামনে কুগান চুপ করে দাঁড়িয়ে তখনও। ওর মুখ থমথম করছে। বিদ্যার মাথার ভেতরের দপদপানি এখনও থামেনি সেভাবে। তবে স্থিমিত হয়েছে। কুগানের কাছে গেল ও। মাথায় হাত রাখল ওর। আর কুগান তখনই আচমকা হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওকে জড়িয়ে ধরল বিদ্যা। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ফিরিয়ে নিয়ে আয় ওই লোকটাকে। ওর দুগাল বেয়ে অশ্রুধারা নামছে…যেন আচমকা কোন হিমশৈল গলে গিয়ে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল জলপ্রপাতের মতো। এই রকম পরিস্থিতির সামনাসামনি হতে হবে—কুগানও ভাবেনি। কিছু না বলে সেও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। হনহন করে চলে গেল রাস্তায়। আর ফোন করে বসল মুরুগানকে। মুরুগান তখন দিব্য ঘোরে রয়েছে। পানড়ির কিছু অংশ পেটে চালান দিয়ে বুঝেছে, বিদ্যার মতো হয়নি। তবুও নিজেকে প্রবোধ দিয়েছে—পরের বার হবে। এ তো প্রথমবারের চেষ্টা। এই রকম সময়ে কুগানের ফোন দেখে অবাক হল কিছুটা। তারপর ফোন ধরবে না ভাবল। ওদের প্যাঁচাল শুনতে আর ইচ্ছে করছে না। কুগানের ফোন থামতে না থামতেই গৌতমীর ফোন বাজতে থাকল। এটাও ধরল না মুরুগান। এরপর আবার কুগানের ফোন…একের পর এক ওরা ফোন করেই চলেছে…একঘেয়ে রিংটোন শুনতে শুনতে মাথায় রক্ত উঠে গেল মুরুগানের। দেওয়ালে আছড়ে ফেলে দিল ফোনটা। মোবাইলের কটা টুকরো এদিক সেদিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল। ঘরে এবার শান্তি নেমে এলো। আহ! এইবার তবে বাকি পানড়িটা শেষ করা যাক! মুরুগান যে কত রাত পর্যন্ত মদ আর মাংস নিয়ে বসেছিল, সে নিজেও জানে না। অনেক বেলায় ঘুম ভাঙলো যখন, নিজেকে মেঝেতে ভাঙা মোবাইলের পাশে পড়ে থাকতে দেখল ও।
  অনেক অনেকদিন বাদে হাহাহাহা করে অট্টহাসিতে কেঁপে উঠল মুরুগানের ফ্ল্যাটের মেঝে। পাশের বিল্ডিঙের জানলা দিয়ে ঘুম ভাঙা উৎসুক চোখ এদিকে তাকাল। ভাঙা মোবাইলের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে মেঝেতে থেবড়ে বসে বসে মুরুগান হেসেই চলেছে, হেসেই চলেছে একা একা। ফ্ল্যাটের ছাদে, দেওয়ালে সেই হাসির প্রতিধ্বনি ধাক্কা মেরে ফিরে আসছে আবার। এখানে পাহাড় নেই, খোলা হাওয়া নেই, নেই তার সঙ্গী কুকুরগুলো…কে আর মুরুগানের হাসির সঙ্গে তাল মেলাবে! নেই তার এলাচসখি, যেও কিনা দুলে দুলে হেসে উঠবে মুরুগানের হাসির তালে। নেই বিদ্যা, কুগান, আর তার আরও পরিচিত মানুষজন, পথঘাট, যারা মুরুগানকে চেনে, জানে বা বলা ভাল চিনত, জানত অনেকটা। এখুনি টাটকা কেকের গন্ধমাখা ওর দোকানে গিয়ে মুখ বুজে বসে দোকানদারি করবে মুরুগান। হয়ত নিচে অনেকেই ওর দেরি দেখে উশখুশ করছে। কাজে যেতে হবে সবাইকে। কে আর মুরুগানের হাসির শব্দে কেঁপে উঠবে এখানে? নিঃসঙ্গ লাগে মাঝেমাঝে আজকাল। আর তখনই মুরুগান বোঝে, ওর বয়স হয়েছে। ওর বয়স এমন এক প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে, যখন মানুষ মানুষের সঙ্গ চায়। একলা থাকব, নিজের মতো করে বাঁচব, যা ইচ্ছে তাই করব—এসব বুলি হয়ত এই বয়সের জন্য নয়। মেঝেতে শোয়ার জন্য গা-হাত-পায়ে ব্যথা হয়েছে খুব। কোনরকমে শরীরটাকে টেনে তুলল মুরুগান বাইরে যাওয়ার জন্য।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।