হাসির গল্পে তুষ্টি ভট্টাচার্য

ব্যাটেল অফ ওয়াটার্লু

২৭শে জুলাই ২০১৯-এর খবরে প্রকাশিত হল এক লন্ডলওলার ছবি। তা যেমন তেমন ছবি নয় গো! খালি গায়ে বাছা আমার ৩৭.৭ ডিগ্রিতে লন্ডনের টিউবের এসিতে দাঁড়িয়ে আছে খালি গায়ে, প্যান্টেলুন তো খুলে পড়ে যায় যায় অবস্থা তার! গরমের ঠেলায় বাবাজীবন আবার কাগজ দিয়ে হাওয়া করছে নিজেকে। এইসন দেখে শুনে কী বলতে ইচ্ছে হয় তোমাদের বল! বল, বল, বলতে থাক এক এক করে! তারই মধ্যে আমিও বলে রাখি আমার কথা। ৩৭/৩৮/৪০ ডিগ্রি গরম তো পড়েই আমাদের হামেশা। তা আমরা কি জামা খুলে মেট্রোয় যাতায়াত করি নাকি একে অপরের বগলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে নির্বিকার মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি? কাগজ, জাপানি পাখার মতো কিছু দিয়ে কেউ কেউ হাওয়া খায় বটে…কিন্তু সে আর কতক্ষণ! এখন তোমরা বলতে পার, ওদেশে গরম পড়ে না তো, তাই বেচারারা গরমে এত কাহিল হয়ে পড়েছে। আমি কিন্তু ফোঁস না করে পারলাম না একথা শুনে। আমরা কাহিল হই না? আমাদের ডিহাইড্রেশন হয় না? গরম লাগে না? ঘামাচি হয় না? তাই বলে কি আপিসে যাওয়ার সময়ে বা ফেরার সময়ে খালি গায়ে মেট্রোয় চড়ি? ছি, ছি, ছিঃ! ধিক্কার দিবসের আয়োজন করা উচিত ওদের বিরুদ্ধে। যখন তারা এল আমাদের দেশে, আমাদের কী বলত মনে নেই? সব ভুলে বসে আছ তোমরা? আমাদের খালি গা, হেটো ধুতি/লুঙ্গি, ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি দেখে না বলেছিলে, অসভ্য, ন্যাংটো লোকজন! তা এখন বুঝেছ তো, কেন আমরা আলগা থাকতাম জামাকাপড়ের থেকে? আমাদের লোকেদের শার্ট, কোট, প্যান্টেলুন শিখিয়ে শেষে কিনা তোমরাই অসভ্য, আধান্যাংটো হলে!!  হায় গো সাহেব! কোথা গেল লন্ডনের ফগ, শীত আর আহ্লাদে সামার!  তা, আমি বলি- বেশ হয়েছে! দ্যাখ কেমন লাগে এবার! ধর্মের কল বাতাসে নড়ে গো সাহেব। এই কলের মার, বেদম মার। আমাদের অনেকের পিঠ ফাটিয়েছে তোমাদের চাবুক, এবার তোমাদের পিছন ফাটাতে এসেছে স্বয়ং গ্রীষ্মের দেবতা। আহা মধুসূধন আমার! দে ওদের পিঠে একরাশ ঘামাচি চুল্কে!

এইসব দেশাত্মবোধক ভাবনায় নিজের ভেতরে একটা বিদ্রোহী ক্ষুদিরাম, বিনয়, বাদল, দীনেশ টাইপের ভাব এসে গেছিল। ধিক্কার দিবস, কালাদিবস, বিদ্রোহী দিবস…এমন বেশ কয়েকটা দিবসের ছুটি পেলে এখন খুব কাজে দিত। কী কাজ, সেসব অবশ্য পাবলিকলি বলা যাবে না। সে যাই হোক, নিজের মনে এইসব হ্যাজাতে হ্যাজাতে সকাল শুরু হয়েছিল। পরে ওই লন্ডনের সাহেবের কথা বেমালুম ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু সে ব্যাটা যে আমাকে ভোলেনি, রাতে ঘুমতে গিয়ে মালুম হল। ঘুমের ঘোরে যেই পাশ ফিরেছি, কে যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল আমাকে। আমার বরাবরই একা শোওয়ার অভ্যেস। তাহলে ধাক্কা দিল কে! ঘুম চোখ খুলে দেখি সেই ব্যাটাচ্ছেলে সাহেব রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমাকে শাসাচ্ছে!

-টুই টোড় এই ঘেমো ঘা লইয়া হামার ঘায়ে আসিস!! টোড় টো সাহস কম না!

আমি চোখ কচলে আবার তাকিয়ে দেখলাম। নাহ! সত্যি সত্যি সে ব্যাটা আমাকেই চমকাচ্ছে দেখছি। ঘুমটুম ছুটে গেল। সে বিদ্রোহী ভাবটা ফিরে এল যথারীতি।

-দেখ, সাহেব, তোমার ওই মরা টিকটিকির মতো গায়ের চামড়া ছুঁয়ে ফেলেছি ভুলে, এটা ভাবতেই ওয়াক উঠছে। সুদল দিয়ে চান করলে তবে যদি গা ঘিনঘিনে ভাবটা একটু কমে। তার ওপর তোমার যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা! আমাকে তুই তোকারি করছ কোন সাহসে! সে জমানা আর নেই হে! আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক।

-নিখুছি খড়েছে টোড় নাঘড়িকেড়! হামায় ঠিখঠিখি বলিয়াছ! এট্ট বড় সাহস হইয়াছে! ডাঁট টোড়কে টোড় হাটে  ধড়াইয়া দিব, প্রোটিজ্ঞা কড়িটেছি। আর হাট, পা ভাঙিয়া, ফিঠের ছাল টুলিয়া ঢুগঢুগি যোডি না বাজাইয়াছি, টো হামার নাম সট্টি সট্টি ঠিখঠিখি ড়াখিও।

রাগে সাহেবের ফর্সা গা লাল হয়ে উঠেছে। তার মূর্তি দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। যতই হোক, সাহেবসুবো বলে কথা! ভয় ভক্তি একটু না পেলে হয়। তারপর ভাবলাম, ধুর ধুর! আমারই ঘরে, আমারই বিছানায় এসে আমাকে তড়পাবে, আর আমি ভয় পাব এত ডরপোক আমি কবে থেকে হলাম! বীর বিক্রমে তেড়ে গেলাম সাহেবের দিকে।

-ওরে টিকটিকি, বের হ এক্ষুনি আমার ঘর থেকে। আমার দাঁত ভাঙবে, আমার হাত, পা ভাঙবে!! আয় দেখি তোর কত্ত গায়ের জোর বেড়েছে দেখি!

আমিও ঘুষি বাগিয়ে তেড়ে গেলাম ওর দিকে। সেও বক্সিং করার মতো লাফাতে লাফাতে এগিয়ে এল দু হাত পাকিয়ে আমার দিকে। এই মুহূর্তে আর একটা ব্যাটেল অফ ওয়াটার্লু শুরু হতে চলেছে। অথচ কোন মিডিয়া এর সাক্ষী হয়ে থাকল না, এ কী কম আফসোসের! এখন মিডিয়ার যুগ। নইলে কেউ বিশোয়াসই করবে না। তাই যুদ্ধে নামার আগে হাত তুললাম।

-রোসো সাহেব। আগে মিডিয়াকে খবর দিই। ঘন্টাখানেক সে এসে আমাদের সঙ্গে থাকুক। নইলে আর যুদ্ধ করে কী লাভ কও!

-এঠা টুই ঠিখই বলিয়াছিস। শ্যুমনখে খবড় পাঠা।

-হে মা! জোড়া পাঁঠা দেব এ যুদ্ধে জিতলে। অন্তত এক ঘন্টার জন্য জিতিয়ে দাও।

-উল্লু খে পাট্টহে শালে! টোর মা’ড় টোড় খঠা শুনিটে বয়েই গেছে। টুই বরং এখঠা কাজ কর। মিডিয়াড় সামনে হামড়া খুউব যুড্ডহ করিব। এখবার টুই পড়িয়া যাইবি, এখবার হামি প্রায় মড়িয়া যাইব। এইরূপে এখ ঘন্ঠা কোণক্রমে খাটাইয়া ডিলেই খাম ফটে!

-মানে? এ আবার কী প্যাঁচ চাললে গুরু?

-ওই জন্যই বলি, তোডেড় বুড্ডহি খোনদিনই হইবে না। হামড়া শুঢুই ঢঙ খরিব ক্যামেরার সামনে। আই মিন অ্যাকঠিং। উহাটেই ঠু পাইস খামাইয়া বাড়ি চলিয়া যাইব। ফিফটি/ ফিফটি বখরা।

-আমার দাঁতের সবকটা ‘অল আউট’ হয়ে গেল সাহেবের বুদ্ধির তোড়ে। এই নাহলে সাহেবসুবো। সত্যিই মাথা বটে একখান।

তারপর আর কী! এই গরমে আমরা দুজনে খুব কুস্তি করলাম। একঘন্টা কেটে গেল সুমনের সঙ্গে দেখতে দেখতে। একবার ক্যামেরা জুম হয়ে সাহেবের চিমসে মুখের দিকে যায় তো একবার প্যান করে আমার ক্যালানে চেহারার দিকে। ক্রমশ টিভি সিরিয়াল জমে ক্ষীর পুরো। আমাদের দুপক্ষের দুদল সাপোর্টারও জুটে গেল টিভির ওপারে। পাড়ায়, পাড়ায়, মোড়ে মোড়ে, ক্লাবে ক্লাবে, টিভিতে আমাদের লাইভ দেখাচ্ছে। যুদ্ধ করতে করতেই শুনতে পেলাম, বুম নিয়ে সঞ্চালক একবার একেক পক্ষের সাপোর্টারদের কাছে গিয়ে আরও বেশি বেশি মারামারি করার জন্য তাদের আরও উত্তেজিত করে তুলছে। দুদলের সাপোর্টাররাও টিভি ক্যামেরার সামনে যুদ্ধ করতে করতে ‘লাইভ’ প্রাণ বিসর্জন পর্যন্ত দিতে রাজি। এদিকে একবার আমি পড়তে পড়তে ক্যামেরার দিকে আর্তি ভরা দু চোখ নিয়ে তাকাচ্ছি, ওদিকে কিন্তু সাহেবের পড়ে যাওয়া দেখে, স্রেফ সাদা চামড়ার সুযোগে আরও বেশি সহানুভূতির ভোট পেয়ে যাচ্ছে। আমি প্রায় ভিলেনে পরিণত হতে চলেছি। যা বুঝছি, অবস্থা সুবিধের নয়। আমাদের সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে গিয়ে না আমাকেই প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। তাহলে ওই সাহেব পুরো টাকাটাই মেরে দিয়ে কেটে পড়বে নিশ্চিন্তে। নিজেকে ওই অবস্থাতেই বোঝালাম—কুল থাকতে হবে। কুলকুল করে ঘামার সময়ও মাথা যেন কুল থাকে হে ঠাকুর! শুধু ওই মরা টিকটিকির মতো রঙের জোড়ে ও আমাকে এভাবে মেরে দেবে! চিরকটাকালই কি কালো মানুষদের এমনভাবেই শোষিত হতে হবে? আর সেটাও নিজেদের লোকের এমন দেশদ্রোহিতার ফলে? সবকটা সিরাজদৌলার নাতিপুতি নির্ঘাত! এমনটা আমি হতে দিতে পারি না। কিছু একটা করতেই হবে এবার। ফলে মরিয়া হয়ে যেই ক্যামেরা আমার মুখের দিকে তাক করেছে, আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম—জনগণ! আপনারা এতক্ষণ যা দেখলেন, এ কোন ব্যাটেল অফ ওয়াটার্লু নয়। এ হল নিছক অ্যাকটিং। আর এই প্ল্যানের পুরোটাই ওই সাহেবের করা। উদ্দেশ্য—স্রেফ আমাকে ভিলেন বানিয়ে মেরে ফেলা। এবার আপনারাই বিচার করুন।

ব্যাস! বোমা ফাটল যেন! দুদলের সাপোর্টারদের মারামারি বেড়ে গেল দশ গুণ। সুমন আরও এক ঘন্টা সঙ্গে থাকতে এক পায়ে রাজি হয়ে গেল। সাহেব সত্যি সত্যিই রেগে গিয়ে বোঝাতে চাইল, এমন কোন প্ল্যান তার ছিল না কস্মিনকালেও। প্রচণ্ড রেগে সাহেব বলে উঠল, ‘ট্টট্টট্টটূইঈঈ ট্টিট্টিহি মিঠ্যুউউউক্ষক্ষক্ষ…’ সুমন জিজ্ঞেস করল, ‘ক্ষমা করবেন, আপনি যদি আরেকবার আমাদের জানান…’। সাহেব আবার বলে উঠল তড়বড় করে, ‘শ্যুউউম্মোণ্ণ…ওট্টা অ্যাট্টহা চোট্টহা…মিঠ্যুক্ষক্ষ…’। বেগতিক দেখে সুমন অন্য কথায় চলে গেল।

ফলে এবার সাহেব ভিলেন, আমি হিরো হয়ে গেলাম। দ্যাখ ব্যাটা, কেমন লাগে এবার! বেগতিক দেখে সাহেব আমাকে ইশারা করল—কান কামড়ে দেওয়ার নাটক করতে এসে কানে কানে বলল, ‘হামাডেড় ফিফটি ফিফটি ভুলিয়া যাইলে? হামাডেড় ডিড কি মিঠ্যা হইয়া যাইবে?’ আমি তখন পুরো কাছা খুলে ফেলেছি। সাহেবকে চিৎকার করে বললাম, ‘স্টিং অপারেশনের নাম শুনেছ? তুমি ওই ফিফটি ফিফটি নিয়ে যা যা বলেছিলে, সব রেকর্ড করে রেখেছে ওই হুলধারীরা। সময় মতো বের করবে। ওদের আমিই খবর দিয়ে রেখেছিলাম কিনা ঠিক সময়ে!’ এই পর্যন্ত শুনে সাহেব ইংরেজিতে একটা হিক্কা তুলে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। সেই দেখে সুমন ক্যামেরা গুটিয়ে বাড়ি চলে গেল। মারামারি করা সাপোর্টাররা চা খেতে খেতে অন্য ইস্যু ভাঁজছে তখন।

এরপরের ঘটনা এইরূপ—আমরা যে আদৌ ব্যাটেল অফ ওয়াটার্লু চালু করিনি, পুরোটাই ঢপ ছিল, ঢপ দিতে গিয়ে আমরাই প্রায় মরতে বসেছিলাম, আর আমাদের ফিফটি ফিফটি নিয়ে গোপন কথোপকথন, সেও ওই স্টিংওলাদের থেকে কিনে নিয়ে গেছিল কোন এক ফেরেব্বাজ চ্যানেল। তারপরে তো পুরোটাই হিস্ট্রি। ইতিহাস বই খুলে দেখে নিও, কত কত মিমসের জন্ম আমরা দিয়েছিলাম। আর এ গল্পের উপসংহার আরও করুণ। সম্ভবত ওই ফেরেব্বাজ টিভিওলারাই আমাদের কাটমানি খাওয়ায়র গপ্পটা ফাঁস করে দিয়েছিল মিডিয়ায়। যত টাকা দিয়ে ওরা হুলধারিদের থেকে টেপ’টা কিনেছিল, এই কাটমানির প্রসঙ্গে তার তিনগুণ টাকা ওরা বেওসা করে নিল। শেষ পর্যন্ত সাহেবকে এখন লন্ডন ছেড়ে গোবি মরুভূমির বুকে গরু পুজো করানোর টুপাইস ধান্দায় নামতে হয়েছে। সাহেব এখন ইন্ডিয়া ফেরত যোগী। গেরুয়া পরেন আর কপালে লাল তিলক কাটেন সবসময়ে। আর আমি হনলুলুতে লু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজে লেগে পড়েছি। লু লাগলে কী কী করণীয়, এই বিষয়ে বক্তিমে দিয়ে কিছুমিছু পাইটাই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।