রাও সেদিন বিদ্যা আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে জানাল, ‘একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে আম্মা। আপনি নাহয় এক ঘন্টা পরে বেরবেন’। রাও কবে থেকে যে বিদ্যাকে আম্মা বলতে শুরু করেছে, কেউই খেয়াল করেনি বোধহয়। ‘ম্যাডাম’ ডাকে অস্বস্তি হওয়ায় বিদ্যা ওইভাবে তাকে না ডাকতে বলেছিল শুধু। তারপর থেকেই আম্মা সম্বোধন চলছে। বিদ্যা রাওকে বাজিয়ে দেখেছে নানাভাবে। সে বুঝেছে এই লোকটি আদ্যন্ত সৎ এবং নিজের কাজে দায়িত্বশীল। তাই রাওয়ের কথায় গুরুত্ব দেয় সে ভীষণভাবে। গুছিয়ে বসল নিজের চেয়ারে বিদ্যা। মুরুগানের এই চেয়ার যেন কতকাল অপেক্ষায় ছিল তার জন্য। এই অফিস, অফিসের বারান্দা থেকে পাহাড়ের দৃশ্য যেন কতকাল তারই জন্য উন্মুখ হয়েছিল। দুপুরে বিদ্যা এই বারান্দার ছায়ায় এসে সামনে চোখ মেলে বসে থাকে। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। মাঝেমাঝে ফসল কাটার পর কিছুটা ন্যাড়া হয়ে পড়ে অবশ্য তাদের বাগান। সেই সময়টায় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে। প্রাণের অভাব যেন বড় বেশি করে দেখা দেয়। বিষণ্ণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া তার স্বভাব নয়, তাই ওই কটা মাস সে বারান্দায় যায় না ভুলেও। এখন অবশ্য সেই সময় নয়। সবুজে ছেয়ে যাচ্ছে পাহাড়। জানলা দিয়ে বাইরেটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল বিদ্যা। রাও সামনে একগাদা ফাইল আর কাগজপত্র নিয়ে বসে আছে। তার মুখচোখে ভয়ঙ্কর একটা উদ্বেগের ছাপ। ওকে আর অপেক্ষায় না রেখে বিদ্যা বলল, ‘হ্যাঁ, রাও কী যেন জানাবেন বলেছেন আপনি। শুরু করুন তবে’।
রাওয়ের ওপর শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল বিদ্যার। টাকাপয়সা, সুযোগসুবিধের কোন অভাব রাখেনি কোম্পানি, কিন্তু পেলেই যে মানুষ এই মাপের আন্তরিক ও সুদক্ষ হাতে নিজের কাজকে ভালবেসে দায়িত্ব সামলাবে, এমন তো হয় না সবসময়ে। সেদিন থেকে রাও তাদের এক সম্পদ। ওকে আরও কিছু ভাতা বাড়িয়ে দিতে হবে, মনে মনে স্থির করল বিদ্যা। রাও যা জানাল, তাতে এটা পরিষ্কার যে, তাদের কোম্পানির এক শক্ত প্রতিযোগী এসে গেছে মার্কেটে। এবং তারা কোরাগুর বা দক্ষিণাঞ্চলের কেউ নয়। মাড়োয়ারি ব্যাবসায়ী। ওদের প্ল্যান্টেশন বা প্রোডাকশন অবশ্য স্থানীয়রাই দেখাশোনা করছে। কিন্তু ক্যাপিটাল আর মার্কেটিং তাদের নিজস্ব। আর কে না জানে, ব্যবসাবুদ্ধিতে তাদের কৌশলের সঙ্গে এঁটে ওঠা খুব সহজ কর্ম নয়। প্রাথমিক ভাবে ওরা ধুঁকতে থাকা স্থানীয় বাগানগুলো চড়া দামে কিনে নিয়েছে। অনেকেই এককালীন মোটা টাকার বদলে রুগ্ন বাগানের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে ওদের হাতে জমি তুলে দিয়েছে। এমনকি মুরুগানের প্ল্যান্টও ওরা কিনতে চেয়ে লোক পাঠিয়েছিল। তাকে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই ‘না’ বলে দিয়ে বিদায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু ভবিষ্যতে ওদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নামা বিদ্যাদের পক্ষে সহজসাধ্য হবে না। বিশেষ করে মার্কেটিং-এর দিকটায় ওদের দক্ষতা অপরিসীম। সব শুনে বিদ্যার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা চোরা ভয়ের স্রোত নেমে গেল। গলা শুকিয়ে এল দুশ্চিন্তায়। একে তো এই ভাঙা বাগানকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে লোন নিয়েছে অনেকটা। পরিশোধ করবে সেটা নাকি মার্কেটিং-এ নতুন কৌশল বের করবে নতুন লোক রেখে? ওর মাথা আর কাজ করছিল না। সেদিন আর বাগানে বেরোল না বিদ্যা। সারাক্ষণ গুম মেরে বসে রইল নিজের চেম্বারে।
তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলো সেদিন ও। মুরুগানের মুখোমুখি পড়ে গেল আচমকাই। অসময়ে বিদ্যাকে দেখে, ওর সামনাসামনি পড়ে গিয়ে মুরুগান থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুরুগানকে ওভাবে দেখে বিদ্যার মাথায় আগুন চড়ে গেল হঠাতই। যত নষ্টের গোড়া এই লোকটা! এরই গাফিলতির জন্য আজ বিদ্যাকে এত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। মুরুগান বিদ্যার আগুন ঝরা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকদিন বাদে যেন স্পন্দন ফিরে পেল। যদিও বিদ্যার ওই রূপ দেখে ভয় পেয়েছে সে বিলক্ষণ। এই অসময়ে যখন বিদ্যার আবির্ভাব হয়েছে এমন ঝড়ের গতিতে, নিশ্চই গুরুতর কিছু হয়েছে। কোনরকমে থতমত ভাব কাটিয়ে মুরুগান বিদ্যার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, ‘কী রে, কী হয়েছে? এত তাড়াতাড়ি ফিরলি যে? কিছু হয়েছে?’ বিদ্যা গণগণে আঁচ নিয়ে মুরুগানকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। কুগানও ফিরেছে বিদ্যার সঙ্গে। চোরের মতো মুখ করে সেও নিজের ঘরে সেঁধিয়ে গেছে। বিদ্যা সোজা স্নানঘরে চলে গেছে। মুরুগান জানে, আজ ও অনেকক্ষণ ওখানে কাটাবে। থাকুক তাই। নইলে ওর মাথা ঠাণ্ডা হবে না। কুগানের ঘরের দিকে এগোল ও গুটিগুটি পায়ে। ওর থেকেই জেনে নিতে হবে ঘটনা। কুগানও এই সুযোগে অনেক রঙ চড়িয়ে খবর পেশ করল কাকার কাছে। আজকের ঘটনা যেন শাপে বর হয়ে এসেছে। এই তালে যদি বুড়োবুড়ির মান অভিমান ভাঙে, সেও ভাল। তারপর নাহয় ব্যবসার প্রসঙ্গে জরুরী পরামর্শ বা আলোচনা করা যাবে।
সব শুনে মুরুগান কী বুঝল সেই জানে। তবে ওকে নিজের ঘরে না গিয়ে বাইরে পায়চারি করতে দেখা গেল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে বিদ্যা স্নান সেরে বেরল। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরছে ওর। মুখ দেখে মনে হচ্ছে ঝড় থেমেছে আপাতভাবে। থমথম করছে সেখানের আবহাওয়া। ওর অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়েছিল মুরুগান। বিদ্যাকে ডাকল মুরুগান আলতো করে। বিদ্যাও যেন জানত এই ডাক আসবে আজ। মুরুগানের পিছু পিছু বিদ্যা ওর ঘরে এলো আজ অনেক অনেকদিন বাদে। এই দৃশ্য পর্দার আড়াল থেকে দেখে কুগান আজ নতুন বোতল খুলে বসল মনের আনন্দে। আজ পুরো বোতল উড়িয়ে দেবে ও। ঘরের ভেতরে তখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আবহাওয়া। যেন কোন ছায়া বা দূরত্ব, বা মান অভিমান কিছুই ছিল না, কিছুই ঘটেনি ওদের মধ্যে। এমনকি এর জন্য অতিরিক্ত আবেগ প্রদর্শন বা আদরসোহাগের কোন দৃশ্যের অবতারণাও হল না তখন। বরং মুরুগানকে সেই চিরচেনা ছন্দে বিদ্যার সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়তে দেখা গেল। সেদিন রাতে কুগান সহ ওরা একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসল। রাত গড়িয়ে গড়িয়ে মাঝরাত পেড়িয়ে গেল দেখতে দেখতে। কুগান কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, ওদের খেয়ালই থাকেনি। বাগান নিয়ে এই নতুন ক্রাইসিস বুঝি ওদের কাছে নতুন ভাবে বাঁচার রাস্তা খুলে দিল। এত কথা জমে ছিল ওদের নিজেরাই বোঝেনি হয়ত। আকাশ ফর্সা হয়ে পাখি ডেকে উঠলে ওদের হুঁশ ফিরল। বিদ্যা উঠে পড়ল তখনই। মুরুগানকে পুরনো আদেশের সুরে বলে গেল, ‘নাও, অনেক বকবক করেছ! এবার ঘুমিয়ে নাও কিছুক্ষণ’। মুরুগান লক্ষ্মী ছেলের মতো শুয়ে পড়ল। বিদ্যা ঘর থেকে যাওয়ার আগে ওকে ডাকল একবার। ‘এদিকে আয় একবার!’ মুরুগানের গলায় এমন কিছু ছিল যাতে বিদ্যার শরীর অবশ হয়ে এল। মুরুগানের কপালে হাত রাখল ও। তারপর ওর গালে, ঠোঁটে স্নেহের ছোঁয়া রেখে দিয়ে এসে নিজেও গড়িয়ে নিল খানিক। আজ অনেক অনেকদিন বাদে খুব হাল্কা লাগছে ওর। যেন এক পাথর নেমে গেল বুক থেকে। মুরুগান নিজের ছন্দে ফিরছে বা ফিরেছে, এর থেকে বেশি প্রাপ্তি আর কী হতে পারে তার কাছে! আবেশে চোখ জড়িয়ে গেল ঘুমে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেদিন বিদ্যা নিজের ছেলেবেলার স্বপ্ন দেখল। একটা ইজের পরা মেয়ে খালি গায়ে খেলা করছে একপাল ছেলেমেয়ের সঙ্গে। নাকের নোলক, থেকে থেকে ঝলসে উঠছে তার বিকেলের সূর্যে।