ক্যাফে গল্পে তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য

হারানো প্রাপ্তি

ঘন ঘন আজি গরজিছে ঘন মনের দশা করুণ।
ঘনাইয়া তিমির অশ্রুর নীর নিভৃতে গেলা অরুণ।।

পরেশবাবু একমনে চেয়ে আছেন আকাশের দিকে। বহুবছরের সাথী হঠাৎ ছেড়ে চলে গেছে। সরোদবাদক পরেশবাবুর তবলচির আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি মর্মাহত। পঞ্চায়েত ভোটের দিন ভোট দিতে গিয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষের জেরে নিহত হয়েছেন তিনি। গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। কয়েকটা তবলার টিউশনি করে আর তবলা বাজিয়ে দিন চালাতেন। নিরুপদ্রব মানুষটির বয়স হয়েছিল সত্তরের কাছাকাছি। পরেশবাবুর সাথে সঙ্গৎ করতেন প্রায় তেরো বছর।
বাবার একাকিত্ব ঘোচাতে ছেলে ইন্টারনেটে আরেকজন তবলচি র খোঁজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিয়েছে। কতদিনে পাওয়া যায় কে জানে।

আকাশে বর্ষাকালের মেঘ। মেঘেদের গতিবিধি সততই গগনের প্রেক্ষাপটে নূতনত্বের সঞ্চার করে। মনে হয় দিগন্তে একটি রামধনু দেখা দেব দেব করেও দিচ্ছে না। শুধু হাল্কা আভাস চোখে ধরা পড়ছে। আকাশে ত নিরন্তর পালাবদল চলে। এক পুঞ্জ মেঘ এদিক থেকে ওদিক চলে গেল, আবার ওপাশ থেকে এক পুঞ্জ ছিঁড়ে এদিকে এসে মিশল। মেঘেদের মধ্যে কি দলাদলি আছে মানুষের মত?

দূরে সরোদটা রাখা। একবার সেদিকে হাত বাড়িয়েও হাতটা সরিয়ে আনলেন পরেশবাবু। মেজাজটা ঠিক নেই।
ফোনটা বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে উঠলেন পরেশবাবু।
‘হ্যালো’
‘ হ্যালো পরেশবাবু বলছেন?’ ওধার থেকে প্রশ্ন এল। কণ্ঠ বলে চলল ‘ আমি আপনার তবলা সঙ্গতের বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করছি।’
-‘ আচ্ছা বলুন, কোথা থেকে বলছেন?’
-‘ আমি বলছি সল্টলেক থেকে। আপনার সঙ্গে সঙ্গৎ করতে চাই।’
-‘ অনেকটা দূর হয়ে যাচ্ছে। আমি থাকি বাঘাযতীন।’
-‘ আমি চলে আসব। আমার গাড়ি আছে।’
-‘ গাড়ি করে আসবেন? কিন্তু আমার ত অত পারিশ্রমিক দেওয়ার মত সঙ্গতি হবে না। উপযুক্ত সঙ্গতের ত সঙ্গতি লাগে।’
-‘ আরে শুনুন, আমার পারিশ্রমিক লাগবে না’।
হতবাক হয়ে গেলেন পরেশবাবু। এ আবার কি কথা! এ কি শখের বাজিয়ে নাকি! ওদিক থেকে ভেসে এল ‘ আমি চাকরি করতাম বিদেশে, রিটায়ার করে ফিরেছি কলকাতায়। তবলা ভালবাসি, তাই আর কি …’
এবার বোঝা গেল। পরেশবাবু জিজ্ঞাসা করলেন -‘ দাদা আপনার নামটা ত জানা হল না।’
-‘বারীন্দ্র, বারীন্দ্র মজুমদার।’
-‘ আপনি কবে থেকে তবলা বাজাচ্ছেন?’
-‘ আমি ত ছোটবেলায় শিখেছিলাম। বড় বয়সে একজনের কাছে তালিম নিয়েছি। অনেকদিন পর আবার চর্চা শুরু করেছি।’
-‘ছোটবেলায় কি ইস্কুলের অনুষ্ঠানে তবলা বাজিয়েছেন কখনো?’
কিছুক্ষণ চুপ। তারপর ‘ হ্যাঁ, তা বটে বার দুয়েক বাজিয়েছি।’
-‘ যন্ত্রসঙ্গীতের সাথে সঙ্গৎ করার অভিজ্ঞতা আছে?’
-‘ তা আছে’।
-‘ইস্কুলের অনুষ্ঠানে সঙ্গৎ করেছেন কখনো?’
-‘ তা তো মনে পড়ছে না’।
-‘ মাথাটা কী ভাই একেবারে খেয়ে ফেলেছেন নিজের?’
-‘ হ্যাঁ? কি বললেন?’
-‘ কিছু না। আমি রাজি। কাল আমাকে একবার ফোন করুন। জানিয়ে দেব- কবে এসে বসা যাবে একসাথে।’
বলে ফোন রেখে দিলেন পরেশবাবু। মেজাজটা বেশ ফুর্তি ফুর্তি হয়ে গেছে। বারীন্দ্র ছেলেটাকে মনে পড়ে গেছে ওঁর। ইস্কুলে পরেশবাবুর চেয়ে দুই ক্লাস নিচে পড়ত। তবলা বাজিয়েছিল ইস্কুলের অনুষ্ঠান গুলোতে। একবার ইস্কুলের এক মাস্টারমশায়ের বিদায় সংবর্ধনার দিন পরেশবাবুর সরোদের সাথে বারীন্দ্র তবলার সঙ্গৎ করেছিল। সেদিনের কথা একেবারে ছবির মত মনে পড়ে গেল পরেশবাবুর।

বেশ মজা লাগছে। ফিকফিক হাসি সামলানো যাচ্ছে না। এবার জমবে ভালো। রামধনুটা দূরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। বারীন্দ্র আসুক, ওকে বেশ চমকে দেওয়া যাবে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।