দেখতে দেখতে এমন হল যে, সন্ধে আটটার পরে দোকান বন্ধ করে রোজ গৌতমের সঙ্গে দেখা করা একটা রুটিন হয়ে গেল মুরুগানের। গৌতম অপেক্ষায় থাকত তার মুরুগান আংকেলের জন্য। একদিন না এলে খুব রাগ করত, কান্নাকাটি করত অবুঝের মতো। ওর জন্মদিনের পরের দিন মুরুগানের ওবাড়িতে যাওয়ার কোন কথা ছিল না। কিন্তু বাধ্য হয়ে যেতে হল ওকে। বেখেয়ালে দোকানের চাবিটা ফেলে এসেছিল ওখানে। ফলে সকালেই যেতে হয়েছিল ওবাড়ি। তখন মা-ব্যাটা স্কুলে বেরচ্ছিল। চাবি নিয়ে চলেই আসছিল মুরুগান, কিন্তু গৌতম নাছোড়বান্দার মতো জেদ ধরেছিল—আংকেলকে সন্ধেবেলা আসতেই হবে। সেই শুরু! এই কয়েক মাসে গৌতমের ওপর এমন টান জন্মেছে মুরুগানের যে, ছেলেটাকে না দেখলে তারও আর চলে না। যেন কতদিনের সম্পর্ক তাদের। মুরুগানের বাইকের আওয়াজ পেলেই গৌতম দরজা খুলে একগাল খুশি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর চলে তার অনর্গল কথা। সারাদিনে স্কুলে কী করল, কে কী বলল, মায়ের সঙ্গে মানঅভিমান হল কী হল না…নিজের ভুলত্রুটি কিছু হলে অবশ্য তার সপক্ষে যুক্তির বদলে চিৎকার করে প্রতিষ্ঠা পেতে চায় ছেলেটা। এও তো স্বাভাবিক, এই বয়সের ছেলের পক্ষে। এদিকে আবার খুব রাগ পুষে রাখে দুনিয়ার ওপর। তার ছোট্ট দুনিয়ায় সে যখন নিজেকে অসম্পূর্ণ রূপে আবিষ্কার করে, নিজের ভেতরে কুঁকড়ে যায়। কিছু লোকের ঠাট্টা, বিদ্রূপ তো নিত্য সঙ্গী তার। ফলে অভিমান আরও সুতীব্র হয় গৌতমের। সকলের প্রতি। এই কারণে সে বন্ধুহীন। তার মতো অসম্পূর্ণ যারা, তার বয়সী বা সহপাঠী, তাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব জমে ওঠেনি ওর। মায়ের ওপর তার সব, রাগ, অভিমান উগড়ে দেয় মাঝেমাঝেই। গৌতমী সব সহ্য করে মুখ বুজে। ও জানে, এছাড়া ছেলের হাল্কা হওয়ার উপায় নেই। যদিও সেও তো মানুষ। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে কখনও কখনও ক্লান্ত শরীর, মনে গৌতমের ইচ্ছাকৃত চেঁচামেচি বা অবুঝপনা সহ্য করতে পারে না। সেও চেঁচিয়ে বকাঝকা করে। এতে আবার ফল হয় উলটো। কাঁদতে কাঁদতে না খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে ছেলে। হাজার ডাকলেও আর ওঠে না।
এই ছিল তাদের মা-ব্যাটার রোজনামচা। এর মধ্যে মুরুগান যেন খোলা হাওয়ার মতো উড়ে এলো। গৌতমের হাবভাব এখন অনেক বদলে গেছে। অনেক শান্ত হয়েছে সে। বোঝালে বোঝে। অকারণ ক্ষেপে যায় না। পড়াশুনোয় মন বসেছে তার। আর গৌতমীর? তার কি কোন পরিবর্তন হয়নি মুরুগানের প্রভাবে? তার দীর্ঘ পুরুষ বর্জিত জীবনে এমন এক দামাল পুরুষ এসেছে আর সে স্থির হয়ে বসে আছে তারপরেও—এমন কি হয়েছে কখনও? সম্ভব? জীবন সবসময়ে দুর্ঘটনা ঘটাবে বলে প্রস্তুত থাকে। আর মানুষ তারই ফাঁদে পা জড়িয়ে আটকে পড়ে বারবার। একদিন মুরুগান ওবাড়িতে গিয়ে দেখে দরজায় গৌতমের বদলে গৌতমী দাঁড়িয়ে। তাকে যেন একটু বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। মুরুগান আসতে সে জানাল—ছেলের জ্বর এসেছে। শুয়ে আছে ঘরে। মুরুগান চলে যেতে উদ্যত হলে, গৌতমী বাধা দেয়। ছলের ঘরে নিয়ে আসে তাকে। গৌতমের গায়ে তখন বেশ তাপ। জ্বরের ঘোরেও আংকেলকে দেখে হাসি ফোটে ওর মুখে। একটা টুল টেনে বসে ওর সামনে মুরুগান। তারপর গল্প শোনাতে থাকে ওকে। গল্প শুনতে শুনতে ছেলেটা ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যায়। ড্রয়িঙে ফিরে এসে বসে মুরুগান আর গৌতমী। ক্লান্ত মেয়েটাকে দেখে মায়া হয় মুরুগানের। বলে ওঠে—আজ একটু গরম স্যুপ বানিয়ে খেয়ে নেবেন আপনারা। সঙ্গে দুএকটা টোস্ট। চাইলে আমিও বানিয়ে দিতে পারি, যদি আপনি অনুমতি দেন। গৌতমী যেন বেঁচে গেল এটুকুতে। মাথা নেড়ে সায় দিল। কিচেনে গিয়ে তিনজনের মতো চিকেন ক্লিয়ার স্যুপ বানালো। আর টোস্ট সেঁকে নিল কড়া করে। তারপর ঘুমন্ত ছেলেকে তুলে কোনমতে একটু খাইয়ে দিল গৌতমী আর মুরুগান। সে আবারও ঘুমিয়ে পড়ল একটু খেয়েই। এরপর দুজনে বসল ওই সামান্য আয়োজন নিয়ে। গৌতমী যেন এখন একটু রিল্যাক্স হয়েছে। গা ছেড়ে বসেছে সোফায়। একথা, সেকথার পরে মুরুগানকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল ও। ‘আচ্ছ আপনার কথা কখনও শোনা হয়নি। এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার পরিবার সম্বন্ধেও আমি কিছু জানি না। এতদিনের আলাপ আমাদের, আপনি আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছেন আপনারই মহানুভবতায়। এ আমারই স্বার্থপরতা যে, আপনার কোন কিছুই জানার চেষ্টা করিনি আমি’। হাতদুটো কোলের ওপর রেখে যেন খুব গর্হিত অন্যায় করে ফেলেছে সে, এমন ভঙ্গীতে বসে রইল গৌতমী। মুরুগান আচমকা স্থির হয়ে গেল এই কথায়। কী উত্তর দেবে সে? তার পরিচয় জানাবে মেয়েটাকে? তারপর যদি সে বিরূপ ভাবনায় ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়? নাম ভাঁড়িয়ে রয়েছে সে—এ তো একপ্রকার অন্যায়। দ্বিচারিতা!
হঠাৎ বিদ্যার মুখটা চোখের সামনে ভেসে আসে। আর অস্থির হয়ে ওঠে মুরুগান। এক মুহূর্ত আর এই বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করে না ওর। এক ঝটকায় উঠা দাঁড়ায় মুরুগান। হনহন করে বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে বলে—অন্য আরেকদিন বলব আমার কথা। আজ আসি। দরজায় তখন যে গৌতমীর ছলছল চোখ স্থির হয়ে রয়েছে, সে দেখার আর সময় হয়নি মুরুগানের। পরদিন সন্ধেয় ওবাড়ি যায়নি মুরুগান। গুম মেরে বসেছিল ঘরে। আর গৌতমী ভাবছিল, হয়ত সে একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছে। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল বারবার। এদিকে গৌতম আংকেল না আসায় খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছে। মা ওকে অনেক বোঝাতে চেয়েছে, হয়ত আংকেলের শরীর খারাপ, হয়ত কোন কাজে আটকে গেছেন উনি। ছেলেটার আজ জ্বর ছেড়েছে। দুর্বল হয়ে নেতিয়ে আছে বিছানায়। মনমরা ছেলেটাকে দেখে নিজের ওপর আরও রাগ হল গৌতমীর। কোনরকমে তাকে কিছু খাইয়ে, শুইয়ে ফোন করল মুরুগানকে।
‘শুনুন, আমি আপনার কোন কথাই জানতে চাইব না আর। এ আমারই ভুল। কারুর ব্যক্তিগত সত্তাকে জানতে চাওয়ার মতো ততটাও আমি বা আমরা কাছের হয়ে উঠতে পারিনি এখনও—এ আমার বোঝা উচিত ছিল। যাই হোক, অন্তত ছেলেটার মুখ চেয়েও নাহয় আসবেন, এটুকুই বলার…’ এই পর্যন্ত বলেই ফোন রেখে দিয়েছিল গৌতমী। মুরুগানকে বলার কোন সুযোগ দেয়নি আর।