T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় শর্মিষ্ঠা সেন

ঘুড়ির গল্প বলতে গিয়ে

গল্প বলতে বললেই কি আর বলা যায়? সেটা যদি আবার ‘থিম’ নির্ভর হয়? বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে গিয়ে দেখলাম ভান্ডারে আর যাই থাকুক, ঘুড়ির গল্প একেবারেই নেই! এ যাবৎ একখানা ঘুড়িও কেউ কিনে দেয়নি গো! কেউ বলতেই পারেন, ‘কিনে দেয়নি আবার কি? নিজে কিনে ফেললেই ল্যাঠা চুকে যায় কত!’ কিন্তু কেউ না দিলে ঐ বালিকার মতো ঝুঁটি নাড়িয়ে, সাদা ফ্রিলের লাল ফ্রক পরা আমি নাচতে নাচতে পাড়া শুদ্ধ লোকজনকে আমার ঘুড়িটা দেখাতে পারতাম? ঠিক যেমন পাড়ার দাদা/ভাইরা দেখাতো?

ছোটবেলা জুড়ে ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার আর লীলা মজুমদার। আমি দুষ্টু ছিলাম একথা আমার অতি বড় শত্তুরেও বলবে না, তবে কিনা মনে মনে যতদূর যাওয়া যায় তার অনেকটা বেশীই যাতায়াত ছিল এবং দুষ্টুমির যত পাঠ নেওয়া হত এইসব বই থেকে। মনে আছে, ‘যতীনের জুতো’ গল্পে বোঁ বোঁ করে নেমে এসেছিল ল্যাজওয়ালা এক ঘুড়ি? যতবার পড়তাম ততবার আমার মন পাখি হয়ে পাখা মেলে উড়ে যেত ঐ ঘুড়ির পেছন পেছন। ওপর থেকে বাড়ির নারকেল-সুপুরি গাছের মাথা দেখে বেশ ভেবে নেওয়া যেত একমাথা ঝাঁকড়া চুলে দাঁড়িয়ে আছে যত পাজী ছেলের দল! আমিও উড়ছি আর পাশ দিয়ে নীচে নেমে যেত চিল, বাবুই পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করবে বলে!

চাঁদিয়াল, পেটকাটি, মোমবাতি, মুখপুড়ি ঘুড়ির নাম মুখে মুখে শোনা। চোখে দেখেছিলাম কেবল পেটকাটি। মুখপুড়িও। লেজওয়ালা পেটকাটি ঘুড়ি, পেটমোটা লাটাই আর কড়কড়ে মাড় দেওয়া সাদা ধপধপে সুতো এক লহমায় ফেলে আসা পুরোনো পাড়ায় নিয়ে গেল যেখানে পায়ের নীচে নুড়ি-বালি ফেলা কাঁচা রাস্তা; দুধারে শিশির মাখা ঘাসের জঙ্গল…অবশ্য বেলা বাড়লে শিশির উবে যেত। ভাবতে ভালো লাগে সে সময়কার নীল-নির্মল আকাশের কথা। সাদা মেঘের চড়ে বেড়ানো দেখলে আজ অবধারিত ভাবে মনে পড়ে, ‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চড়ে…’ আর তখন মনে হতো গেলবার মৌ দের বাড়িতে তোষক বানানোর পর ওদের উঠোনে এমন তুলো উড়ে উড়ে বেরিয়েছিল…চাঁদের দেশে রাত নামলে ওদের শীত করে, তাই চাঁদের মা বুড়ি চরকা কাটা ছেড়ে লেপ বানায়, যার চিহ্ন রয়ে যায় দিনের বেলাতেও! এইসব আগডুম বাগডুম।

তারপর সেই ‘গোপালের পড়া’ গল্পে গোপাল তে-তলার ঘরে বসে মন দিয়ে পড়া করছিল। কিভাবে? বই দুখানা তক্তাপোষের উপর রেখে, পাতলা কাগজ, আঠা, কাঠি দিয়ে। তারপর মামার হাতে ধরা পড়ে বেচারার কি হেনস্তাই হয়েছিল! তার ওপর ঘুড়ি, লাটাই, সুতো ইত্যাদি আঠের দিনের জন্য মামার জিম্মায়! আর আমাদের লাল্টুদার মা চিল চিৎকার করে পাড়া শুনিয়ে বলতো, ‘তর ঘুড়ি উড়ান আমি বাইর করত্যাছি, খাড়া!’ এদিকে লাল্টুদা হাঁক শুনে পাড়া ছেড়ে বেপাড়ায়, যতক্ষণে বাড়ি ফিরবে ততক্ষণে লাল্টুদার মা বসে গেছে বেসন ফেটাতে। বিকেলের বেগুনী, পেঁয়াজীর জন্য। রাস্তার মোড়ে দোকান ছিল দিদার। আমরা লাল্টুদার মা কে দিদাই ডাকতাম, কারণ মায়েরা ডাকতো মাসীমা। এদিকে লাল্টুদা মা-কাকীমাদের উল্টে কাকীমা ডাকতো ফলে এইসব উৎকট সম্বোধন। আমাদের বোধহয় ঠিক পুজোর আগেই পরীক্ষা হতো, ঠিক মনে নেই, আগেও বহুবার বলেছি, পড়াশোনা আর পরীক্ষার স্মৃতি আমার মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরিতে বন্ধ, তো সেসব একটু মানিয়ে নিতে হবে, যতদূর মনে পড়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে ছেলের দল ঘুড়ি ওড়াতো, আমরা, যারা শুধু দেখার দলে, তারা উঠোনে বা রাস্তায় বেরিয়ে দেখতাম কেমন করে মাটির সাথে সমান্তরাল হয়ে থাকা নিরীহ একটা কাগজের টুকরা রাজার মতো হাওয়া কেটে আকাশের দখলদারি করতে যায়! লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপী কালো রঙের ঘুড়ি শনশন করে উড়ে বেড়াতো। মাঝে মাঝে বিকট গলায় ‘ভোঁওওওওওকাট্টা!’ দেখতে যেতাম কার ঘুড়ি কাটা পড়লো। কাটা ঘুড়ি ধরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে হাঁটু ছুঁলে/কেটে রক্ত গড়াচ্ছে? কারো বাড়ি থেকে একমুঠো গাঁদা পাতা ছিঁড়ে থেঁতো করে বা দুহাতে ডলে লাগিয়ে দাও‌। ব্যাস!
পাড়ার দাদারা সব নিত্য নতুন মাঞ্জার ফন্দি আবিষ্কার করতো। তখন গুগল ছিলনা, ছিল ওয়ার্ড অফ মাউথ। এক দাদা শীলের উল্টো পিঠে কাঁচ গুঁড়ো করে চালুনিতে চেলে আঠা দিয়ে সুতোয় লাগিয়েছিল। গিয়েছিলাম তার টানটান করে রোদে দেওয়া সুতো দেখতে। এক সুপুরি গাছ থেকে আর এক সুপুরি গাছে জড়িয়ে রাখা ছিল সেই সুতো। জেঠিমা বলেছিল, হাত দিসনা, আঙ্গুল কেটে যাবে কিন্তু! মামাবাড়ির দেশে দেখতাম নানান রং এ চুবিয়ে রাখা সুতো সকালের মিঠে রোদে কেমন শুকোতে….সেসব শাড়ি তৈরির সুতো। তাঁত মেশিনে খটাখট আওয়াজ করে সুতো জড়ামড়ি করে কেমন শাড়ি বোনা হয়ে যেতে। ঘুড়ি বার বার দিক ভুল করছে, নয়? ফিরি আবার। তো যেহেতু পুজোর আগে পরীক্ষা তাই বিশ্বকর্মা পুজোর দুটো দিন যেতে না যেতেই কাকীমা জেঠিমার চেঁচাতেন ঘুড়ি রেখে পড়তে বসার জন্য। দুপুরে গল্পের আসরে মায়েরা সেলাই করতো আর বলতে কোন পাড়ার ছেলে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে পা আর মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে! তার এবার পরীক্ষা দেওয়া হবেনা তার। তারপর লাটাই লুকিয়ে রাখার প্ল্যান হতো। সব পাড়ার মতো আমাদের পাড়াতেও স্বঘোষিত অভিভাবক ছিলেন একজন। তিনি সবাইকেই নিজের ছেলে-মেয়ের মতো শাসন করতেন। সানন্দে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রথমেই ঘুড়ি ওড়ানোর সময় বেঁধে দিতেন। স্নানের আগে দুঘন্টা। যদি দুপুরে বসে পাঁচপাতা অঙ্ক করো, তবে বিকেলবেলা আবার। সেটা একসপ্তাহ। তারপর শুরু হতো নরমে গরমে শাসন। ‘এই বাবা, যা বাড়ি যা, ঘুড়ি রাখ। এই রোদে ঘুড়ি উড়ায়ে জ্বরে পড়ার ইচ্ছা?’ ‘আমি যদি ধরতে পারি ছেলে, তাইলে কিন্তু সব পায়খানার ট্যাঙ্কিতে ফেলে দিব!’ আমি ভাবতাম, এহ্ সব গুয়ে মাখামাখি হয়ে যাবে তো! সেসব অবশ্য হতো না। দাদারা গজগজ করতে করতে ধীরে ধীরে ঘুড়ি, লাটাই তুলে রাখতো পরীক্ষা তক।

এখনো ঘুড়ি ওড়ে ভাদ্র মাস পড়লেই। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এখন দেখি পাতলা প্লাস্টিকের ঘুড়ি। ফ্ল্যাটের ছাদে এসে জমা হয় রাশি রাশি চায়না মেড কালো সুতো। চোখে দেখা যায় না চট করে। খুব শক্ত। এখন মাঞ্জা দিতে হয়না বোধহয়। সব রেডিমেড। ভোঁকাট্টা ঘুড়ি নিয়ে ছেলেপুলের দাপাদাপি, দৌড়াদৌড়ি একই রকম আছে। ফি বছর ছাদে এসে পড়ে কেটে যাওয়া ঘুড়ি। লাল-নীল-হলুদ। আস্ত থাকে বেশীর ভাগ। কখনো কখনো ছোট ছেলেরা এসে বলে, ‘কাকীমা , তোমাদের ছাদে একটা ঘুড়ি পড়েছে, দাও না!’ লকডাউনে ছাদে উঠলেই দেখা যেত ঘুড়ির মেলা। তখন তিনটে ঘুড়ি পেয়েছিলাম আমিই। পাশাপাশি তিনটে ঘুড়ি দেওয়ালে সেলোটেপ আটকে রেখেছিলাম প্রায় একবছর। তারপর ঝুল টুল পড়ে যাওয়ায় ছিঁড়ে ফেলতে হয়েছিল।

হয়তো সত্যিই এতসব ভাবতাম অথবা এখন বসে লিখছি আর সেই আপাত শান্ত বালিকার ভাবনায় এখনকার পড়ন্ত বেলার পরিণত ভাবনা বসিয়ে ভাবছি, এমনটাই তুই ভেবেছিলি/ভাবতিস আসলে! দিন যায় নতুন নতুন গল্প আসে স্মৃতির পথ বেয়ে!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।