সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৯)

দেবমাল্য

— সে তো অবশ্যই। ওই তো ট্রেন আসছে। আসছে মানে এখনও মিনিট দশেক লাগবে, না?

— হ্যাঁ, তা তো লাগবেই। এখন ক’টা বাজে?

দেবমাল্য মোবাইল বের করে দেখল, চারটে একত্রিশ। তাই বলল, সাড়ে চারটে বেজে গেছে।

— সাড়ে চারটে তো? তা হলে ঠিকই আছে। ট্রেনটার ঢোকার কথা ছিল চারটেয়। পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেট। তার মানে চারটে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ নাগাদ ঢুকবে। এখন সাড়ে চারটে তো? হ্যাঁ, আর ওই মিনিট দশ-বারো।

কথাটা ড্রাইভার বললেও দেবমাল্য বুঝি ওর কথায় ঠিক ভরসা করতে পারল না। মন ছটফট করছে তার। মনে মনে বলছে, হে ভগবান, তখন ওই জিপে যা দেখেছি, সেটা যেন ভুল দেখে থাকি। তোমাকে একশো এক টাকার পুজো দেব মা। আমার বউ যেন এই ট্রেনেই থাকে। ভগবানের কাছে বারবার মিনতি করলেও কিছুতেই সুস্থির থাকতে পারছে না ও। তাই প্ল্যাটফর্মের একদম ধারে গিয়ে বারবার উঁকিঝুঁকি মেরে ও দেখে আসছে, ট্রেনটার হেড লাইটের আলো দেখা যাচ্ছে কি না।

সামশের বলেছিল, তানিয়া যে কোচে উঠেছে, তার নম্বর এস ফোর। কোনখানটায় পড়বে ওটা? যাকে জিজ্ঞেস করে, সে-ই বলে সামনে। এমন সময় কালো কোট পরা এক টিকিট পরীক্ষককে দেখতে পেয়ে দ্রুত পা চালাল দেবমাল্য। জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, এই তো এখানে পড়বে।

ও আর ড্রাইভার দাঁড়িয়ে পড়ল। এক মিনিট গেল। দু’মিনিট গেল। তিন মিনিট গেল। হঠাৎ দূর থেকে তীব্র আলো আছড়ে পড়ল রেল লাইনের ওপরে। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্পষ্ট থেকে জোরে, আরও জোরে হতে লাগল ট্রেন ঢোকার শব্দ।

হু-হু করে লোক নামছে। নামছে তো নামছেই। কিন্তু তানিয়াকে দেখা যাচ্ছে না। ও কি বুঝতে পারেনি বহরমপুর এসে গেছে। নাকি এখনও ঘুমিয়ে আছে! ও এস ফোরেই উঠেছিল তো! যত দূর মনে পড়ছে, সামশের ওকে এস ফোরের কথাই বলেছিল। কিন্তু ও কান শুনতে ধান শোনেনি তো!

কামরার গায়ে তখনও রিজার্ভেশনের তালিকাটা আঠা দিয়ে সাঁটা। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সেই তালিকায় চোখ বোলাতে লাগল ও। কোথায় তানিয়া! কোথায়! হঠাৎ মনে পড়ে গেল, সামশের বলেছিল, ওর সিট নম্বর তেইশ। দেবমাল্য সঙ্গে সঙ্গে তালিকার তেইশ নম্বরে চোখ রাখল। দেখল, সেখানে জ্বলজ্বল করছে তানিয়ার নাম।

হ্যাঁ, এ কামরাতেই ও আছে। তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। ও আগেই জেনেছে, এখানে অনেকক্ষণ ট্রেন দাঁড়ায়। ফলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। তালিকা দেখে ড্রাইভারের সামনে এসে তাকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই, কামরাটার দরজার দিকে তাকাতেই ও দেখল, নামা নয়, এ বার ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি করছে যাত্রীরা।

তা হলে কি লাগেজটা ভারী দেখে ও টেনে নিয়ে আসতে পারছে না! নাকি সহজে তোলা যায় এ রকম ছোট ছোট অনেকগুলো ব্যাগ নিয়ে এসেছে ও! দু’হাতে দুটো দুটো করে দরজার কাছে এনে জড়ো করছে। এই লোকগুলো উঠে পড়লে ও ধীরেসুস্থে নামবে। তাই-ই কি? একবার গিয়ে দেখি তো!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।