একটিপ নস্যি নিয়ে নতুন পিসেমশাই আবার জাঁকিয়ে বসলেন ৷ নতুন পিসেমশাই এর বয়স সত্তর কিংবা পঁচাত্তর ,এবং উনি মোটেও নতুন নন ৷ সাত পুরোনো বুড়োমানুষ ৷
বয়স শুনে ভিরমি খেলে? খেয়ো না ৷ আগেকার দিনে আকছার এমন হতো ৷ পিসেমশাই যখন চাকুরীতে ঢুকেছিলেন আঠাশ বছর বয়সে তখন রেলের খাতায় কলমে তাঁর বয়স লেখা হয়েছিল তেইশ ! বোধহয় স্কুলের খাতাতেও কমানোই ছিল ৷ সেসব অবশ্য পিসেমশাই এর মা বলতে পারবেন ৷ কিন্তু তাঁর কাছে এই কচি বয়সে তো আর জিজ্ঞেস করতে যাওয়া যায় না , তাই আমরা জানি নতুন পিসেমশাই এর বয়স সত্যিই সত্তর কিংবা পঁচাত্তর!
পিসেমশাই বাড়িতে এলে আমাদের ছোটদের অলিখিত ছুটি , সে যখনই হোক না কেন ৷ আমাদের মানে, আমি , বুল্টি, ছোটন, টুপাই আর পুক্কুন ৷ পুক্কুন হলো ছোটকাকার মেয়ে, সবচেয়ে বিচ্ছু ৷ ওরা থাকে তেতলায় ৷ আমরা আর মেজকাকারা থাকি দোতলায় ৷ একতলায় থাকেন অতিবৃদ্ধা ঠাকুরমা , ঠাকুরঘরের পাশে ৷ আর আছে বৈঠকখানা ৷ লোকজন সবাই এখানেই আসেন, বসেন , গল্পগাছা হয় ৷ ঠাকুরমা তো তেমন নড়তে পারেন না, অথচ তাঁর টনটনে জ্ঞান ৷ সবার কথা শুনতে ভালোবাসেন , কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেসও করেন ৷ বাড়ির বাঁধা মাছওয়ালা বসন্ত যে আসলে দাদুর আমলের পরেশ জেলের নাতি , সেটাও যেমন ঠাকুমা জানেন তেমন রামায়ণের মতো পুষ্পক বিমানে চড়ে নিমেষেই কলকাতা থেকে বেনারস যাওয়া যায় সেটাও জানেন৷
আজও পিসেমশাই প্রথমে এসে একপ্রস্থ শাশুড়ীর পায়ের ধূলো নিয়ে চা দিয়ে মালপোয়া খেয়েছেন , তারপর দ্বিতীয় রাউন্ডে বৈঠকখানায় বসেছেন জুত করে, আরো এক কাপ চা হাতে ৷ সন্ধ্যে বেলা এবাড়িতে আসা মানে রাতের খাবার না খাইয়ে কেউ ছাড়বেনা ৷ আমাদের পিসিমণি বেঁচে না থাকলেও পিসেমশাই এর এখনও এবাড়ির সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক কাটান ছাড়ান হয়নি ৷
পুক্কুন বলল , “নতুন পিসে , এবার কী গল্প এনেছ বলো ৷ বেশ লম্বা- চওড়া দেখে বলবে ৷ আজ আর যেন পড়তে বসতে না হয় ৷ একদম সাড়ে নটা পর্যন্ত,যাতে গল্প শেষেই খেতে বসতে পারি নইলে মা কে বলে দেব সেদিন তুমি সোফার কভারে নস্যির আঙুল মুছেছিলে ৷”
নতুন পিসেমশাই অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, আহা এর মধ্যে আবার মা কে টানছ কেন ? আর আমার পকেটে দ্যাখো এই রুমাল রয়েছে, বলে তিনি পকেট থেকে নস্যিমাখা এক বিকট গন্ধের রুমাল বার করলেন ৷ আমরা একযোগে চেঁচিয়ে উঠতেই পিসেমশাই আবার রুমাল পকেটে চালান করলেন ৷ তারপর বললেন , তোদের সেই নাইরোবির মুখোশের গল্পটা বলেছি ? আমরা বললাম , না শুনিনি ৷
পিসেমশাই বললেন , “সে অনেককাল আগের কথা ৷ তোদের বাবা মায়েরা তখন মাত্র মাটির সাথে কথা বলে ৷ সে সময় আমি জাহাজে চাকরি করি বার্মাদেশে ৷”
আমি বললাম তোমার বয়স কত ছিল তখন ? আর তাহলে পিসিরই বা বয়স কত ? পিসি তোমার চেয়ে কত বছরের ছোট ?
পিসেমশাই শুরু করলেন, ” সময়টা ভালো ছিল না ৷ দু নম্বর বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র একবছর ৷ আমরা যারা বেঁচে আছি তারা এবার প্রাণটা নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারলে বাঁচি ! একদিন খবর এল ভি এস মালঞ্চ বলে এক জাহাজ চট্টগ্রাম ফেরত যাচ্ছে ৷ আসার সময় কয়লা নিয়ে এসেছিল এখন মানুষজন, গরুছাগল , আন্ডা বাচ্চা যা আছে সব নিয়ে ফিরবে ৷ “
পিসেমশাই বিশ্বযুদ্ধে তুমি লড়াই করেছিলে ? আমরা তো কই শুনিনি কখনও ? পুক্কুন বলল ৷
পিসেমশাই বললেন,” সব কথা কী সবাইকে বলতে আছে? এসব অভিজ্ঞতা কেবল ছোটদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় ৷ তারপর শোন ৷ আমাদের জাহাজ বর্মীজ সেনারা লুটপাট করে আর কিছু রাখেনি ৷ কাপ্তেন সাহেব সহ আমরা যে কজন ছিলাম পোঁটলা পুটলি আর প্রাণ হাতে করে মালঞ্চতে গিয়ে উঠেছি ৷ ওখানেই আলাপ হয়েছিল বোবোর সাথে ৷ বোবো নাইরোবির ছেলে, ভাঙা ভাঙা ইংরেজী বলতো ৷”
নাইরোবি থেকে বার্মাদেশে গেল কী করে ? বুল্টি জিজ্ঞেস করল ৷
“সে আমার আর এখন মনে নেই , কেনিয়াও বৃটিশ কলোনী ছিল, হয়তো সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল ৷ সেই বোবোর কাছে একটা অদ্ভুত মুখোশ ছিল ৷ একদিন গভীর রাতে সমুদ্রে দোল খেতে খেতে দেশের কথা মনে করে সে তার পিঠের ব্যাগ থেকে মুখোশটি বার করে দেখিয়েছিল ৷ দেখেই গা ছম্ ছম্ , পিলে চমকানোর মতো ব্যাপার ৷ মিশমিশে কালো রঙের কোনো কাঠের ওপরে খোদাই করা অসাধারণ নকশা, তাতে লাল আর সাদায় রঙ করা দাঁত , চোখের জায়গায় গোল গর্ত করা ৷ এমনিতে বেশ সাধারণ কিন্তু কালো রং থেকে যেন আলো পিছলে বেরোচ্ছে, আর যেখানে সেখানে অযত্নে থেকেও কোথাও রং চটেনি, যেন সদ্য বড়বাজার থেকে কেনা ৷ ওজন নেই মোটেও, যেন শোলার কাগজে তৈরী অথচ হাতে নিয়ে দেখেছিলাম অসম্ভব শক্ত আর বললে বিশ্বাস করবিনা তেমনই ঠান্ডা….যেন মৃত মানুষের শরীর ! বোবো বলেছিল গ্রামের ছেলে দেশের বাইরে গেলে সবাই এই মুখোশ নিয়ে আসে, এতে ওদের পূর্বপুরুষের আত্মা থাকে এবং বিপদে আপদে ওদের রক্ষা করে ৷ আমি ভেবেছিলাম হবেও বা , সেই কোন মুলুক থেকে যুদ্ধ বিগ্রহ এড়িয়ে বেঁচে থাকা চাট্টিখানি কথা নয় ৷”
এবার আমাদের ভয় ভয় করতে লাগল, সবাই বেশ একজায়গায় জড়সড় হয়ে বসলাম ৷
নতুন পিসেমশাই বললেন, ” কিন্তু তাও শেষরক্ষা হলোনা ৷ চট্টগ্রাম পৌঁছবার আগেই বোবো তিনদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গেল ৷ দেহটা সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হলো ব্যাগ সমেত ৷ শুধু ঐ মুখোশটা আমি নিয়ে এলাম আমার সাথে ৷ বোবোর স্মৃতি হিসেবে ঠিক নয়…আসলে ফেলে দিতে পারিনি ! তারপর কত ঘটনা ঘটে গেছে ৷ এদেশে ফিরেছিলাম আরো দু তিন বছর পর ৷ তারপর রেলের চাকুরীটা হলো, তোদের পিসির সাথে বিয়ে থা হলো , ছেলেপুলে হলো , রিটায়ার করলাম ….এখনও দিব্যি আছি ৷ বলতে নেই , অসুখ বিসুখও তেমন হয়না ৷”
সত্যিই তাই ৷ কখনও শুনিনি পিসেমশাই ভুগছেন ৷ আর আমাদের বাড়ী এসে যা খাবার খান তা বাবা-কাকারা খেতে পারেনা ৷ সব তো অ্যাসিড অম্বলের রুগী ৷ পুক্কুন বলে পিসেমশাই এর দুটো পাকস্থলী ৷
গল্পে গল্পে নতুন পিসেমশাই আর আমরা ভাইবোনেরা খেয়ে নিলাম ৷ হাঁসের ডিমের ডালনা, রুটি আর পিসেমশাই তার সাথে একবাটি পায়েস ৷ জামাই বলে কথা ৷ সে যতই পুরোনো হোক ৷
নতুন পিসেমশাই চলে যেতে এবার যার যার ঘরে ঢুকে যাওয়ার পালা ৷ দশটা বাজেনি এখনও ৷ কাল স্কুলের কাজও বাকী আছে ৷ আমরা দোতলায় যেতে চাইলেও পুক্কুনি কিছুতেই একা তেতলায় থাকবে না ৷ ও বোবোর মুখোশ দেখতে পাচ্ছে বললো ৷ যদি বোবোর আত্মাটা গল্পের মধ্য দিয়ে এ বাড়িতে এসে গিয়ে থাকে , তবে ? কি বিপদ ! আমরা সবাই মিলে বোঝাতে লাগলাম ৷
ছোটকাকা গোলমাল শুনে এসে ধমক লাগালেন আমাদের , ” উফ্ ! চুপ কর তোরা ৷ এতক্ষণ জামাইবাবুর বকবক আর এখন আবার তোরা চেঁচামেচি শুরু করেছিস ! কী হয়েছে টা কী ?”
পুক্কুন সুর করে কেঁদে বলল, “বাবা, ওপরে নিশ্চই নাইরোবির বোবো আছে ৷ ওর মুখোশে আত্মা আছে , জানো ? ৷ যদি এসে আমাকে ধরে ! কিঁ হঁবে বাঁ…বাঁ..আঁ !”
ছোটকাকা বললেন, “কে বোবো? কিসের মুখোশ ?”
আমি সংক্ষেপে বলতে ছোটকাকা বিরক্ত হয়ে বললেন , “আরে ধুর ! জামাইবাবু কোনোকালেই বার্মা যায় নি ! সারাজীবন যে শুধু শ্বশুরবাড়ি আর নিজের বাড়ি ছাড়া কোত্থাও গেলনা সে যাবে বার্মা ! যতসব গাঁজাখুরি গপ্প ! “
“আর ওদের বাড়িতে একটা কালো মুখোশ আছে বটে, কিন্তু ওটাতো সে বার বড়দা এনে দিয়েছেন , পুরুলিয়া থেকে ! আমাদের জন্য একটা গণেশ আর ওদের জন্য একটা অসুর ! তোরা জানিস না বলে বার্মার গল্প খেয়ে গেলি ৷ যা পালা এবার ৷”
আমরা বেকুবের মতো এর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে যার যার ঘরে ঢুকে গেলাম ৷ পুক্কুন শুধু গেলনা ৷ ও নীচেই থেকে গেল ৷ হতেই পারে ওর বাবা কিছু জানে না , নতুন পিসেমশাই তো সবাইকে সব গল্প বলেন না, না ! এত বড় মানুষ খামোখা মিথ্যে কথা বলতে যাবেনই বা কেন ?