সাপ্তাহিক উপন্যাসে সপ্তর্ষি মণ্ডল (পর্ব – ৮)

অজ্ঞাত

৩৪।।
অপেক্ষা আর তপস্বার মধ্যে বড় অদ্ভুত মিল । দুটিই মানুষকে ধীর স্থির হতে শেখায় । দুটি থেকেই লব্ধ যে প্রসাদ , তা বড়ই মিষ্ঠ আর মধুর ; অমৃত বললেও কম হয় । অপেক্ষমান ব্যক্তি আর গুণী তপস্বী নিজের ফল লাভের ঔৎসুক্য সকলকে প্রদর্শিত করে না , ফলে সেই পরম মুহূর্তে দুয়ের হাতেই নেমে আসে চরম সুখ । সাফল্য বিরাজ করে অপেক্ষা আর তপস্বার ছত্রছায়ায় ।
সত্যবতীর সাথে আজ বহুদিন ভালোভাবে কথা হয়নি সন্দীপনের । ভালোবাসার জন্মদিনে কিছু তো দিতে পারেইনি , শুভেচ্ছা জানাতে পারেনি সে । তবু সে দিকভ্রান্ত না হয়ে তপস্বী একজন অপেক্ষমান । দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলো আর অবশেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা , তবু সত্য ডাক না দেওয়ায় মনের ভেতর অস্থির হয়ে উঠছিল তার । তবু ওই যোগির মত তপস্বায় মগ্ন সে , সমস্ত মানসিক অবস্থা তাই ক্রমাগত হজম করে চলেছে নিজের ভেতরে , শুধু পাতা জুড়ে কিছু অক্ষরের সারি ফুটে উঠলো সন্ধ্যা তারা হয়ে ,
” অনন্ত এ তপ , বসে চেয়ে মেঘের দিকে
মৃদু বাতাসে বুঝি ডাক এই এলো ধেয়ে
আসে না , তবু অপেক্ষায় যোগির সন্ধানি হৃদয়
সত্যের অমৃতকুম্ভ ” ।
তবু সকাল থেকে অনেকগুলো ঘন্টা কেটে গেছে এভাবেই যখন প্রতীক্ষার পারদ ভেঙে পড়ল বরফের বর্ষায় । শীতল মেঘলা বাতাসের আগমনী সংগীত বেজে উঠলো ওই ছোট মুঠোফোনে । তখন সন্ধ্যা প্রায় আটটা ।
—— হ্যালো গলু ।
এটুকু বলেই মিষ্টি হাসির শব্দে কেঁপে উঠলো সত্য ।
উত্তর গেল বিন্দু বিলম্ব ছাড়াই ,
—— হ্যালো । জন্ম দিনের ও পরীক্ষার অনেক অনেক শুভেচ্ছা ।
—— বাবা এত উৎকণ্ঠা কিসের ! আমি কি পালিয়ে গেছি নাকি কোথাও ! তোমার সাথেই তো রয়েছি বলো । তোমার মতো ছেলে পাওয়া আমার অনেক জন্মের পুণ্যের ফল গো । এখন আমিও বলতে পারি আমি খুশি , এখন আমিও সুখি হয়ে দেখিয়ে দিতে পারি ।
সত্যবতী এক বুক আদর মিশিয়ে বলে চললো ।
—— তোমার সাথে কথা বলতে না পেরে আমিও মুচড়ে গেছিলাম গো । আর তাই আজ পরীক্ষা দিয়ে ফিরেই একটু বাজার যাওয়ার নাম করে ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়েছি । জানো তোমার লেখাগুলোর মধ্যে প্রাণ আছে । ওই জন্মদিনে লেখা কবিতাটা আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ উপহার । থ্যাংক ইউ গলু ।
——- এ আর এমন কি । কি পেরেছি দিতে তোমার প্রথম জন্মদিনে বলো ।
সত্যবতীকে মাঝপথে থামিয়ে সন্দীপন বলে উঠলো ।
সত্যবতী একদম নিচু গলায় , রীতিমতো আদর ভরে জবাব দিলো তাকে ,
——- তুমি ভালোভাবে বাংলায় ফিরে এসো । এর থেকে বেশি কিছু চাই না । তবু যখন তুমি আমায় কিছু দিতেই চাইছো তখন সেটা না হয় যেদিন তুমি প্রথমবার দেখা করতে আসবে আমার সাথে , তার আগে চেয়ে নেবো । যা চাইবো দেবে তো আমায় ?
সন্দীপন ধীর স্বরে উত্তর দিলো ,
—— তুমি চেয়েই দেখো ।
—— বেশ । তাই কথা রইল তাহলে । আজ আসি । শরীর ভীষন ক্লান্ত । ঘুমাবো একটু ।
—— এসো । ভালো থেকো ।
এই বলে মোবাইলের লাইনটা কেটে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ নিজের জায়গায় বসে রইল সন্দীপন । রামায়ন ভীষন স্মরণে আসছে তার । রাজা দশরথ সম অবস্থা তার । প্রতিজ্ঞা , ভবিষ্যতের কোন অজানা প্রতিজ্ঞার জন্য , দশরথকে বহু হারা করেছিল । এখানে সে খুশি হয়েও , সেই অধ্যায়েই বিচরিত বারবার । প্রেমিকার চাওয়া সেই না চাওয়া উপহার আজ শুধুই বিধাতা জানেন আর বিধাতা হাসছে ঘুরে চলা চাকার দিকে তাকিয়ে ।
৩৫।।
সকালের রোদ্দুর , দুপুরের অফিস আর রাতের ঘুম সবই ঠিক চলছিল সন্দীপনের জীবনে । এক নতুন উদ্যমে জীবন এগিয়ে চললো সন্দীপনের জন্য । এর পাশাপাশি সাহিত্য , ম্যাগাজিন সব মিলিয়ে এক অন্য সন্দীপনকে দেখছিল সবাই । কর্ম যার জীবনের শর্ত সেও যে কি করে নিজের ভালোবাসার জন্য সময় বের করে আনে এই ভেবেই সকলে অবাক ।
আজ সন্ধ্যা থেকে চরম ব্যস্ততা সন্দীপনের জন্য । অপরজেয়র পক্ষ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজ । এরই মাঝে সত্য ফোন করলে সে বলে ,
——- দেখো । আজ এই ম্যাগাজিন এর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিন । তাই নিয়ে আমি একটু ব্যস্ত । কাল ফোন করবো তোমায় , প্রমিস ।
সত্যবতী ঘ্যান ঘ্যান করে ওঠে এতে ,
—— কি এসব ম্যাগাজিন , বই নিয়ে পড়ে থাকো । দেখো আমাকে বিয়ে করতে হলে এসব ছাড়তে হবে তোমায় ।
সন্দীপন , সত্যের কথায় বেশ অবাক হয়ে উত্তর দেয় ,
——- এসব কি বলছো তুমি ! সাহিত্য ছেড়ে দেবো । দেখো বাবু এসব আমার কাছে প্রচণ্ড দামি জিনিস । তবু …. তুমি যখন বলছ , এসব ছেড়ে দেবো । তবে এই কাজটা করে নিয়ে ।
সত্যবতী ফোন কেটে দেয় ” বেশ , বেশ “বলতে বলতে ।
সন্দীপন নিজের কাজে ডুবে যায় আবার । ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে । ঘন ঘন ফোন আদান প্রদান চলে এরই মধ্যে । প্রচুর তর্ক বিতর্কের পর , অপরাজেয়র পক্ষ থেকে প্রায় রাত ৯ টায় পোস্ট করা হয় ,
” শীঘ্রই আসছে দুঃশাসন ধরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ; প্রকাশক সারমেয় , সহযোগিতায় অপরাজেয় ” ।
শুভেচ্ছা বার্তার বর্ষায় শীঘ্রই ভিজে উঠলো চারপাশ । সন্দীপনের আনন্দ এবার দ্বিগুন হলো , চতুর্গুন হলো , পঞ্চগুলো হলো ; যখন জেগে থাকা ওই রাতে মেঘ পিয়নের চিঠি এলো নেমে ; শুভেচ্ছা অফুরান। সাথে ডাক দিয়ে উঠলো বোকা মুঠো বন্দি যন্ত্রটা । সত্যের ডাকে সত্যটুকু উপেক্ষা করেই বন্ধ হলো ফেসবুক ; চললো কথা বাইরে আর ভেতরে উঠলো ঝড় যার আভাস সে রাতে পায়নি সম্পাদক । তখন শুধুই কথা বলা ।
——- সরি । আমি একটু বেশিই রেগে গেছিলাম তখন
ওপাশ থেকে বললো সত্যবতী ।
—— সরি বলতে নেই গো । তোমার ভালো লেগেছে , এই তো অপরাজেয়র জন্য শ্রেষ্ঠ । কবিতা , সাহিত্যের এই পৃথিবীও মানুষের জন্য । ওদের শিক্ষা দেওয়া , এ কি খারাপ কাজ বলো ।
রাতের নীরবতা ভেদ করে ফিসফিসিয়ে ভেসে এলো সন্দীপনের বাক ।
—— তবে নিজের দিকটাও দেখতে হবে তো গলু । সংসার ধর্ম পালন করা এক অতীব কঠিন কাজ । আমাদের বিয়ে , তারপরের প্রজন্ম এসবের প্রতি দায়িত্ব তো কম নয় বলো । সাহিত্যের সেবক হও , নিশ্চিন্তে হও ; কিন্তু যে লাল সিঁদুর পড়িয়ে আমার দায়িত্ব তুমি নিতে চাইছো তার দিকটাও তো ভেবে দেখা উচিত তোমার , তাই না । ভালোবাসার প্রতি আমার যে দায়িত্ব তার পালন করতে গিয়েই এত কিছু বলতে হচ্ছে তোমায় । আমাদের সংসার সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে , আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন যে সন্তান আসবে আমার গর্ভে তার ভবিষ্যৎ সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে । সাহিত্যর প্রতি তোমার যেমন দায়িত্ব আছে , তেমনই স্বামী হিসাবে দায়িত্ব , বাবা হিসাবে দায়িত্ব ; এসব উপেক্ষা তুমি করতে পারো কি ?
তাই , বাঁধা দেবো না তোমায় । শুধু বলবো হিসাবি হও । এবার ঘুমিয়ে পড়ো সোনা । অনেক খাটনি খেটেছো আজ । শুভ রাত্রি ।
সত্যবতী ফোন কেটে দিলেও , সন্দীপন বাকহীন পড়ে রইল দীর্ঘক্ষণ । মনে মনে ভাবনার স্রোত তার মধ্যে উত্থাল পাতাল করছে এখন । সত্যের কথার মধ্যে এক অন্য সত্য খুঁজে পাচ্ছে সে । সময়ের সাথে সাথে সত্য হয়ে উঠছে তার ভবিষ্যৎ , সত্যের কথাতেও তাই খুঁজে পেয়েছে সে । তবু সাহিত্য ! স্বপ্ন ! ভ্রমন দেশ দেশান্তরের পথে , মানুষের জীবন সভ্যতা — এসবের কি হবে এমন দোলাচলের মধ্যে কখন নিদ্রা দেবী তার চোখে নেমে এসেছে সে টেরও পাইনি আজ ।
৩৬।।
” একটা ভোর যখন আবার বাঁচতে শেখায় । শুধু খেয়াল রেখো ভোরটুকু না সমাধিস্থ করে দেয় কেউ মাঝরাতে । অপেক্ষায় থেকো অক্ষরেরা , ফিরবো আবার মানুষের মন্দিরে । ফিরবো তবে আগে অপেক্ষাকে বলে এয়েছি গো
অপেক্ষায় বেঁচে থেকো ” ।
আজকের সকালের মিঠি মিঠি হাসি বড়ই রহস্যময় । ঘুম চোখ বন্ধ করেও সন্দীপন দিব্বি শুনতে পাচ্ছে তাদের আগমনি । তারই মাঝে সকালের চা হাতে গরম গরম ডাক আসে ,
——- গুড মর্নিং গলু ।
চোখ খুলে কানে টেনে নেওয়া মোবাইলটা হাই তুলে উত্তর দেয় ,
—— গুড মর্নিং ।
—— এখনো ওঠো নি । আর কত ঘুমাবে শুনি । এবার কিন্তু ভোপালের জলের ট্যাঙ্ক উল্টে দেবো মাথায় ।
উত্তর আসে দূর থেকে । ধরমরিয়ে উঠে বসে সন্দীপন ।
—— নাআআআআ ।
চিৎকার করে জানায় সে ।
সত্যবতী হা হা করে হাসতে শুরু করে এবার । তারপর হাসি থামিয়ে নিয়ন্ত্রিত উত্তর দেয় ,
——- বাবা । এত ভয় ….
সত্যবতীর কথা শেষ না হতেই উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে ভয়ের এক স্বর ,
—– আমায় মেরে ফেলবে । মেরো না । মেরো না । আমি কিছু করিনি ।
সত্যবতী সন্দীপনের চিৎকার শুনে বেশ ভয় পেয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে ,
——- কি হয়েছে গলু ! কারা মেরে ফেলবে ! কি হয়েছে বলো ।
কিছুক্ষণ কোন শব্দ আসে না ফিরে । তারপর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় , ধীরে ধীরে আওয়াজ ফিরে আসে আবার ,
—— কিছু না । স্বপ্ন …. কিছু জন আমায় মারবে বলে তাড়া করেছে । আমি দৌড়াচ্ছি আর পিছনে ওরা । এখন কেউ নেই কোথাও …. স্বপ্ন ছিল …. স্বপ্ন বাস্তব হয় না কোনদিন ।
সন্দীপন থেমে থেমে হলেও বলে চলেছে ,
—– অফিস বেরোবো গো । আসি এখন ।
—– হ্যাঁ এসো । দুগ্গা দুগ্গা । সাবধানে যেও ।
মন না চাইলেও সত্য ফোনটা কেটে দিয়ে বই নিয়ে পড়তে বসে নিজের কামড়ায় । ওদিকে সন্দীপন স্নান সেরে তৈরি হয়ে অফিস বের হয় ঠিকই ; তবে একটা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে , ” সব স্বপ্ন সত্যি হয় না , কিন্তু , সকালের ???
অফিসের চার দেওয়ালের মধ্যে আজ উৎকণ্ঠা পিছু ছাড়ে নি তার । বারবার মনে হচ্ছে যেন এক অশুভ কিছু হতে চলেছে । তার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ট্রেনিং চলাকালীন মন আজ অন্যমনস্ক । এসব কিছুই নজর এড়ায়নি ট্রেনার মিস্রাজির । তবু সব সইছিল এতক্ষন সব । এবার আর না পেরে সন্দীপনকে ভরা ক্লাসের মাঝেই জিজ্ঞাসা করলেন ,
—– দাদা কেয়া বাত হ্যায় ! আজ বড়ে বেচয়ন লগ রহে হো ।
বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও , সন্দীপন নিজের খেয়ালেই এড়িয়ে গেল সব ।
তখন সন্ধ্যে ৭ টা । নিজেকে একটু হালকা করতে একটা সিগারেট ধরিয়ে সবে দু টান দিয়েছে সে , মোবাইল বেজে উঠলো হঠাৎ । সন্দীপন নিজেকে শান্ত রাখতে বেশ কয়েকবার ফোনটা এড়িয়ে গেলেও , দশম কলের পর ধৈর্য চ্যুতি হলো তার । মোবাইলটা পকেট থেকে বের করতেই নিজামের নাম স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করতে দেখলো সে । আস্তে করে সবুজ বোতামটা টিপতেই প্রচন্ড চিৎকার ভেসে এলো ওপার থেকে ,
—– এ তুমি কি করলে সন্দীপন দা ? উই হ্যভ বিন রুইন্ড । ফেসবুক দেখো এখনি ।
নিজামের কথাগুলো সন্দীপনকে প্রায় অর্ধেক মেরে ফেলেছিল , আর বাকিটা ফেসবুক পোষ্ট পূরণ করে দিল । সারা রাত ধরে আগুনে ছারখার হওয়া অপরাজেয় তার মন ভেঙে চুরমার করে দিল । এ ভয়ানক অগ্নি কাণ্ডের উৎস , সারমেয় প্রকাশনীর কর্ণধার রূপময় ঘোষের পোষ্ট ,
” অপরাজেয় পত্রিকা তরুণদের ভুল বুঝিয়ে লেখা নিচ্ছে । দুঃশাসনকেও লেখা দিতে বাধ্য করা হয় । আমাদের অনুমতি ছাড়াই আমাদের নাম প্রকাশক হিসাবে ব্যবহার করা হয় । ফেসবুকে সেটি পোস্ট করে জানিয়েও দেয় অপরাজেয় কর্ণধার সন্দীপন দত্ত । অথচ লেখকের প্রাপ্য কি সে নিয়ে তারা আমাদের সাথে কোন আলোচনা করে নি । লেখককেও এ বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হয় । আইনত ব্যবস্থা নিতে পারতাম , তবে সন্দীপনের সাথে আমাদের সম্পর্কের খাতিরে আমরা সে পথে হাঁটছি না । লেখকের কাছেও আমার অনুরোধ তারা এ পথ থেকে বিরত থাকুন । তার বই তার সম্মতি নিয়ে সারমেয় ভবিষ্যতে নিশ্চই প্রকাশ করবে ।
ধন্যবাদ ” ।
৩৭।।
সারাটা শরীর জুড়ে আজ শুধুই ব্যর্থতার প্রতীক । হতাশ হয়ে বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা । আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে , সে চলে গেলে সত্যবতীর কি হবে । আবার মনে হচ্ছে সত্য এতে মুক্তি পেয়ে যাবে এই দায়িত্ব হীন মানুষটার থেকে । কাল কি কি হয়েছিল তার প্রমান তো নেই যে সে কোন আওয়াজ তুলবে , ওই রূপময়ের বিরুদ্ধে । কিন্তু এও তো ঠিক , আজ সে চুপ করে গেলে কাল এই একই জিনিস অন্যের সাথেও হবে । কিছুই মাথায় আসছে না তার আর তাই সত্য থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় মনে হলো তার । আস্তে আস্তে ম্যাসেজ করে লিখে পাঠালো সে , যেন আজ তাকে একটু একলা ছেড়ে দেয় সত্যবতী ।
অন্যদিকে সত্যবতী মুঠোফোনে আসা ম্যাসেজটি পড়েই আঁতকে উঠলো । মনে এক অদ্ভুত চিন্তা স্থান করে নিলো তার । পড়ার টেবিলে বসে থাকলেও মন এক অন্য দিকে প্রবাহিত হচ্ছে । সুযোগ বুঝে এক দু বার ফোন করলো কিন্তু কেউ তুললো না । এতে চিন্তা আরও গভীর হলো । হোয়াটস এপ থেকে ম্যাসেজ করলেও আজ শুধুই ব্যর্থতা ফিরে এলো । একদিকে ভেঙে পড়া ছেলেটা যখন নীরব বসে আছে তখন অন্যদিকে সত্যের মনে এক অদ্ভুত ছটফটানি । ফেসবুকের পাতা খুলে ভেবেছিল একবার শুভ দা কে জানাবে , কিন্তু সেখানে ইতিমধ্যেই ছেড়ে যাওয়া সন্দীপনের লেখাটি তাকেও স্ট্যাচু করে দিলো এই ভর সন্ধ্যায় ,
” আমি বিদ্রোহী
বিদ্রোহ করেছি নিজের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করেছি নিজের বস্তা পচা আদর্শের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করেছি এমন হাজার হাজার
নীতির বিরুদ্ধে যা এতদিন ধরে জন্ম দিয়েছে
এক পঙ্গু সমাজ , পঙ্গু সংস্কৃতির ।
আমি বিদ্রোহী
হাজার হাজার অভিশাপ তাই আমার মাথায়
সিঁদুর হয়ে জড়িয়ে থাকে
সত্যি , সমাজের কাছে বরাবরই দায়
অসহায় করে দেয় যে অসহ্য দাওয়াই ।
বন্ধুগন , আমি জানি
এই সমাজ আমাকে নাম দেবে না ,
সম্মান দেবে না
কোন মনে আমি আশ্রয় পাবো না
হৃদয়ের ভালোবাসা পাবো না
সবাই আঙ্গুল তুলবে আর চিৎকার করে
আমায় পাগলের শ্রেণীতে স্থান দেবে —
কারন
তারাও ভীত আমার এই সামন্তী আগ্রাসনে ।
তাই আমি বিদ্রোহী , কলম আমার অস্ত্র
স্বপ্ন ভালোবাসাময় সংসার ” ।
সত্যবতী কিছুই বুঝতে পারছে না , শুধু সকালের স্বপ্ন সত্যি হলো না তো ছাড়া । সাহস করে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে হতাশ যখন সে , তখন হঠাৎই মোবাইলে ভেসে উঠলো একটা ম্যাসেজ , সন্দীপনের । রূপময়ের পোস্টটা পাঠিয়েছে সে , সাথে লেখা ; আই নিড হেল্প প্লিস । প্রতিটি অক্ষর সত্যবতীর দুচোখ ভিজিয়ে দিয়ে গেলো বারবার । সে বিশ্বাস করে ওই অক্ষরগুলো এক বিন্দুও সত্যি । আর তাই সন্দীপনকে ফোন করে বসলো সময় নষ্ট না করে । সন্দীপন কিছু বলার আগেই বললো ,
—— আজ বিশ্রাম নাও । তুমি সত্য যখন , তখন সত্য বলছে তোমার কিছু হবে না । আর শোনো , নিজের আনন্দের পাশাপাশি এবার থেকে নিজের উড বি কে দুঃখগুলো শেয়ার করতে শেখো । আর কোন কথা নয় । চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়ো । কাল সব শুনবো । সকালে ফোন কোরো , দশটার পর । গুড নাইট গলু ।

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।