গল্পবাজে সুকন্যা সাহা

ভালোবাসা  ঘরে  ফিরে  নাই…

এক অপূর্ব  মায়াবী আলো খেলা  করছিল মেয়েটির মুখে … ফর্সা নেপালী ছাঁচের মুখ ; খুদে খুদে   চোখ । চ্যাপ্টা নাক , রংটা বেশ ফর্সা । হলুদ ফর্সা । অরূণাচল প্রদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে,তাওয়াং থেকে প্রায় ৮ কিমি দুরে জঙ্গলের মধ্যে ফরেস্ট গেস্ট হাউস , সেখানেই আমাদের থাকার কথা , জঙ্গলে ঢোকার   আগে  একটা ঝুপড়ি চায়ের  দোকানে  চা খেতে গিয়ে যে  কিমের  সঙ্গে এভাবে দেখা  হয়ে  যাবে  আমি স্বপ্নেও ভাবি নি ।
চায়ের  জল বসিয়ে  একমনে ম্যাগি করছিল কিম ; কাস্টমারদের জন্য । এই অসময়ে এত বড়  একটা বেড়ানোর  দল যে এই রুটে  আসবে   তার  জন্য আগাম প্রস্তুতি ছিল না এই ছোট্ট চায়ের  দোকানের মালিক কিমের । কিমকে আমি চিনি অনেক দিন আগে থেকেই …
আজও মনে  পড়ে আট বছর আগের  সেই  দিনটার  কথা , সেবার  চলেছি  ফালুট ট্রেকিং এ । দার্জিলিং থেকে  আমাদের  সহযাত্রী হিসেবে  দলে যোগ দিয়েছিল মোহন সারদুকপেন  আর  কিম লিন।  আলাপ জমে উঠতে দেরী  লাগে নি। মোহন  আদতে  অরুণাচল   প্রদেশের  ছেলে , পেশায় ভারত সরকারের  গোর্খা  রেজিমেন্টের  ৩৪ নং ব্যাটেলিয়ানের  সৈন্য আর নেশায় পর্বোতারোহী । আর কিম? দার্জিলিং এর মেয়ে ।যুক্ত দার্জিলিং মাউন্টেয়ারিং ইন্সটিটিউটের  সঙ্গে । হিমালয়ের মায়াই তাদের  কাছাকাছি এনেছিল। ভালবাসতে  শিখিয়েছিল একে অপরকে ।
সুন্দরী ছটফটে উপকারী মেয়ে কিম  অল্পদিনেই দলের সকলের   নয়নের  মণি হয়ে  উঠেছিল। মোহনই বলেছিল আমাদের   যে কিম  তার  বাগদত্তা ।  ওরা এও জানত  বাড়ি থেকে  মেনে   নেবে না ওদের   এই সম্পর্ক । তবু মোহন বলেছিল সামনের ছুটিতে  সিয়াচেন থেকে  ফিরে  বিয়ে  করে নেবে কিমকে , দরকার  হলে বাড়ির  অমতেই রেজিস্ট্রি করে …
“বাবু  আপনার ম্যাগি …” কিমের  ডাকে   সম্বিত ফেরে আমার । ” কেমন আছ কিম ? ” আমি শুধাই তাকে । অদ্ভুত   এক ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে  আমার মুখের দিকে  তাকিয়ে  থাকে  কিম। এই আট বছরে  কিমের চুলে রূপোলি রেখা , চোখের পাশের চামড়া  কুঁচকে   গেছে  বেশ। গাল বেয়ে নেমে আসা চুলের গুচ্ছে রুপোলি রং। কিম কি তাহলে   আমায়  চিনতে  পারে  নি ? মৃদু স্বরে আবার  জিজ্ঞেস  করলাম , ” কেমন আছ কিম ? ” দেখলাম এবারও উত্তর  করল না কিম । আমার  গলার  কাছে  একরাশ প্রশ্ন দলা পাকিয়ে  উঠে আসছিল …
কিম আমায় চিনতে পারছ  না ? কিম ? আমি লাহিড়ি দা … কিন্তু কিমের  নিস্পৃহ চোখ দেখে  একটা শব্দও বেরোল না গলা দিয়ে  … বুঝতে  পারলাম   কিম   আমায় চিনতে পারে নি  অথবা  খুব আনমনা  উদাসীন রয়েছে … জাগতিক কিছু তাকে   স্পর্শ করছে   না । তাওয়াং এর   এই দূর  জঙ্গলের   মধ্যে বেশ ঠান্ডা এখনও ,যদিও ক্যালেন্ডার  বলছে   এটা মার্চের   শেষাশেষি …  জায়গাটার  নাম  ফরেস্ট গেস্ট হাউস । গতকালই আমরা ঘুরে  এসেছি শোংগা টিসার লেক , স্থানীয় নামে যা  মাধুরী লেক নামেই পরিচিত।  তাওয়াং যে  কি অদ্ভুত সুন্দর  এখানে   না   এলে জানাই হত  না , প্রকৃতি এখানে
উচ্ছ্বল  না , শান্ত  থির ,  নিস্তব্ধ, গাছের পাতা পড়ার ঝিরঝিরে  শব্দ ও যেন   অনুভব  করা যায় , শোনা  যায় । নিস্তব্ধ প্রকৃতির ঘোর লাগানো সৌন্দর্য্য এখানে  লুকিয়ে   আছে  পরতে পরতে … এখানে   এসে  পড়লে  জাগতিক  কথা একেবারে তুচ্ছ মনে হয়…  কোনো কথা বলতে  ইচ্ছেই করে না … নীরবে   প্রকৃতির গান শুনতে ইচ্ছে করে ; আর এই প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতাকে উপভোগ  করার জন্যই আমি ফিরে ফিরে আসি হিমালয়ের  কাছে । তবে   এর আগে বেশ কয়েকবার অরুণাচল প্রদেশে এলেও  তাওয়াংয়ের  দিকটা  এই প্রথম ; ফলে কিমের  সঙ্গে   দেখা  হওয়ার সুযোগ হয়  নি কোনোবারই । এবারে কিমের  আমাকে  না চিনতে  পারাটা তাই মনের মধ্যে খচখচ করছিল কাঁটার মতো…
তাওয়াংয়ের  ওই ফরেস্ট গেস্ট হাউসে   আমাদের  একদিন থাকার  কথা … পরের দিন ভোরবেলা  ঘুম থেকে  উঠে  যখন গেস্ট হাউসের  বারান্দায় এলাম তখন ও সূর্য ওঠে নি ; চারিদিকে সেই ঝিম ধরানো বন্য সৌন্দর্য্য, অজস্র নাম না  জানা পাখির  ডাক । চৌকিদার কাম কেয়ারটেকার  দীনদয়াল ঝাড় দিয়ে  বাংলোর হাতা পরিষ্কার  করছিল । আমাদের  রুমের জানলার  ঠিক নীচে  ফুটে ছিল বেগুনী রঙের গুচ্ছ গুচ্ছ অর্কিড । আলাপচারিতার ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস   করলাম  দীনদয়ালকে  আচ্ছা  কাল যো দুকান পে   হম চায়ে পিয়ে থে উসি মালকিন কো পহেচানতে হো ? কিম কো?
অবাক চোখে  দীনদয়াল প্রশ্ন করল , কৌন কিম ? ও  তো মোহন  ভাইয়াকা  বিবি !  উসে  আপ জানতে হো ?  আমি জোর  দিয়ে  বলে  উঠি হাঁ হাঁ ওহি …কিম লিন … মোহন সরদুকপেন কি বিবি … ক্যায়সে  হ্যায় মোহন ?
দীন দয়াল  অবাক চোখে উত্তর দিল… মোহন তো কব কা গুজর গ্যায়া বাবুজী ! আপ নেহী জানতে ? মোহনের মৃত্যুর খবর শুনে  কেন জানি না মনটা ভীষণ দমে  গেল … এদিকে দীন দয়াল বলে চলেছে  শাদি কে  বাদ বাদই মোহন নে  চলা গ্যয়া সিয়াচেন মে ডিউটি পে … উস টাইম চায়না বর্ডার পে বহোত বম্বিং হো রহা থা … একদিন খবর আয়া মোহন দেশ কে লিয়ে শহীদ হো গ্যয়ে লেকিন  উসকি বডি নেহি মিলি … সরকার নে  বহোত কোশিস কিয়ে … শায়দ  বরফ পে দফনা গ্যয়া … লেকিন কিম নে আজ ভি বিশওয়াস  নেহি করতি কে মোহন মর গ্যয়া … স্রিফ  তিন মাহিনা শাদী হুয়ে থে , কিম আপনি শ্বশুরাল মে   রহে গ্যয়ে … বুড়া শ্বশুর  শাশুড়ি কো সেবা করতি হ্যায় … মাইকে  কভি নহী গ্যয়া… বহোত
আচ্ছা  লেড়কী হ্যায় কিম … বহোত ভোলা … দিল্লি ভি নেহী গ্যয়ে  প্রাইজ লেনে কে লিয়ে … কহেতী হ্যায় জিন্দা ইনসান কো প্রাইজ ক্যায়া ? ও আজ ভি বিশওয়াস  করতা হ্যায় কে মোহন জিন্দা হ্যায় …
আমার   মুখ দিয়ে  আর  কোনো কথা  বেরোচ্ছিল না … চুপ করে শুধু জঙ্গলের পাতা ঝরার শব্দ শুনছিলাম। পরের দিন আমাদের যাওয়া আজ রওনা দেব বমডিলার উদ্দেশ্যে … গাড়ি এসে গেছে । কাল থেকে অনেকবার ভেবেছি যাই একবার কিমের  সঙ্গে দেখা করে আসি । কিন্তু কেন জানি না পা ওঠে নি … মনে হয়েছে আবার যদি চিনতে  না পারে ? গাড়ি ছাড়ার  সময় দীন দয়াল দৌড়ে এসে আমায় একটা কাগজ হাতে দিল ।  বলল কিম বেটি নে আপ কো দিয়া হ্যায় । দেখলাম একটা চিঠি । পরিষ্কার  হাতের লেখায় শুদ্ধ ইংরাজীতে কিম লিখছে  লাহিড়ী দা, আপনি ভাববেন  না আপনাকে  আমি চিনতে  পারি নি । সেদিন দেখা মাত্রই চিনেছিলাম আপনাকে । কিন্তু বলি নি । কারণ আমি এখন সন্ন্যাসীনি লাহিড়ী দা, মোহনের ফিরে আসার তপস্যা করছি … সবাই বলে মোহন  মারা গেছে  , সীমান্তে । কিন্তু আমার  মন  মানে না …
আচ্ছা   লাহিড়ী দা  আপনি বলুন আমাদের  ভালোবাসা কি এত ঠুনকো ছিল ? মোহন আমাকে   এভাবে   একা  ফেলে রেখে চলে  যেতে পারে  না … বলুন  লাহিড়ী দা  পারে ?
গাড়ীর  সামনের সিটে  বসে  আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে   এলো …  অস্ফুটে শুধু বল্লাম…”তোমার  তপস্যা সফল হোক কিম”…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।