ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২২)

সুমনা ও জাদু পালক

নিচের দিকে তাকাতেই আতঙ্কে শিউরে উঠল সুমনা। হাত কয়েক নিচেই দেখা যাচ্ছে বিকট দর্শন অনেকগুলো কুমির হাঁ করে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে। ওদের চোয়াল এর ভেতরের তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো দেখলেই বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। কিন্তু ওরা এখনো নিচের পরিখাতে ওভাবে হাঁ করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে কেন? ওরা কি বুঝতে পারছে না যে সুমনা আটকে গেছে জালের মধ্যে? রক্ষা পেয়ে গেছে বিপদ থেকে ?নাকি সাতরঙা পরীদের সাত পালকের তৈরি করা আলোর সুতোর জাল ওদের নজরে আসছে না?
হ্যাঁ ,তাই হবে। লাল পরীর পালক তো বলেছিল,দুটো গাছের মাথায় বাঁধা সুতোটা শুধু সুমনা দেখতে পাবে, আর কেউ না। এটা বোধহয় ঠিক তাই হচ্ছে। সে ছাড়া আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না সূক্ষাতিসূক্ষ জালটাকে।
যাক সেসব কথা। এখন সুমনাকে যেমন করে হোক উপরের দড়িটা ধরতেই হবে। কিন্তু কিভাবে? হঠাৎ সুমনা শুনতে পেল সাত পরীর সাতরঙা পালক একসঙ্গে বলছে ,অত চিন্তা কোরোনা সুমনা ,আমরা তো আছি।
সুমনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তোমরা আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালে, আমি সারাজীবন তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু এখন আমি যে চিন্তা টা করছি সেটা হল, ঐ উপরে থাকা দড়িটা আমি ধরবো কি করে?
সাত পরীর সাতরঙা পালক একসাথে বলে উঠল, তুমি খুব ভালো মেয়ে সুমনা ,তাই আমরা তোমাকে সাহায্য করছি। আমাদের পরীরানী কি বলেন জানো?
——কী?
——- পৃথিবীতে যে সমস্ত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ফুল ভালবাসে ,গাছ ভালোবাসে পশু পাখিকে ভালোবাসে, মানুষকে ভালোবাসে– তারা সবাই আমার প্রিয় । আমি এবং আমাদের পরী রাজ্যের সবাই ঐ সমস্ত ছেলে মেয়েদের সব ব্যাপারে সাহায্য করব।
—— বাহ! তোমাদের পরিরানি তো খুব ভালো। তা তিনি কোথায় থাকেন? তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না? তাঁকে দেখতে পেলে আমি নমস্কার জানাবো।
সাত রঙের পালকেরা কোন উত্তর দেয় না। সুমনা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কথা বলছো না কেন? পরীরাণী কোথায় থাকেন?
লাল পরীর পালক বলল, সে খুব দুঃখের কথা!
—-কিরকম?
——- অনেক বছর আগে এক পূর্ণিমা রাতে পরী রানী স্নান করতে এসেছিলেন দুধ সাগরে।সাগরে নামার আগে তিনি তাঁর ধবধবে সাদা ডানা দুটো পাড়ে খুলে রেখেছিলেন। আর হাতের জাদু দন্ডটা নামিয়ে রেখেছিলেন ঠিক তার পাশে।
——- দাঁড়াও দাঁড়াও, ধবধবে সাদা ডানা মানে —পরীরানীর রং কি ধবধবে সাদা?
——-হ্যাঁ ,একেবারে দুধের মত ধবধবে সাদা।
——- বেশ,তারপরে কি হলো বল?
——- পরীরানী তো বেশ আনন্দে দুধ সাগরে সাঁতার কাটছিলেন। ঠিক সেই সময়ে আকাশপথে উটপাখির পিঠে চেপে যাচ্ছিল এক দুষ্টু জাদুকর। জাদুকর পরী রানীর খুলে রাখা ডানা দুটো আর জাদুদণ্ড দেখতে পেয়ে দ্রুত নেমে এসেছিল নিচে ।
—–কেন?
——- কেন আবার , পরী রানীর ডানা দুটো আর জাদু দন্ডটা চুরি করার জন্য।
—– তারপর?
—— সাঁতার কাটতে কাটতে ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিলেন পরী রানী। উনি দুষ্টু জাদুকরের মতলব বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি দ্রুত সাঁতার কেটে তীরের দিকে আসছিলেন। কিন্তু তার আগেই দুষ্টু জাদুকর পরী রানীর জাদুদণ্ড টা তুলে নিয়েছিল হাতে। পরী রানী অনেক অনুরোধ করেছিলেন জাদুদণ্ড ফেরত পাওয়ার জন্য। কিন্তু দুষ্টু জাদুকর তার কথায় কান দেয়নি। পরীরাণী বলেছিলেন যে ওই
জাদুদন্ড তার হাতে ছাড়া কাজ করবে না।
জাদুকর তখন পরীরানীকে জানিয়েছিল , জাদু দন্ডের উপর তার কোন লোভ নেই। সে শুধু চায় যে পরীরানী তার দেশে একবার পা রাখুন।তার একমাত্র ছেলে দীর্ঘদিন ধরে খুব অসুস্থ। দেশ-বিদেশের বদ্যি, হেকিম কেউ কিছু করতে পারেনি ।পরীরাণী যদি তাঁর জাদুদন্ড নিজের হাতে একবার তার ছেলের মাথায় বুলিয়ে দেন, তাহলে সে ভালো হয়ে যাবে ।এই কথা তার গুরু তাকে বলেছে। তাই সে পরী রানীকে তার দেশে একবার নিয়ে যেতে চায়।তার ছেলে সুস্থ হয়ে গেলেই পরীরানী তার নিজের রাজ্যে ফিরে আসতে পারবে।
—–তারপর কি হল? পরীরাণী গেলেন জাদুকরের সঙ্গে?
—– হ্যাঁ ,বাধ্য হয়ে গেলেন। কারণ জাদুদন্ড ছাড়া পরীরাণী তার নিজের রাজ্যে ফিরতে পারতেন না।
——- পরীরাণী ফিরে এসেছেন?
——–না। অনেক বছর হয়ে গেল পরীরানী কে বন্দি করে রেখেছে দুষ্টু জাদুকর। তবে পরীরানী যাওয়ার আগে তার ডানার একটা সাদা পালক থেকে মন্ত্র পড়ে সাত রংয়ের সাত জন পরী তৈরি করে গেছেন পরী রাজ্য চালানোর জন্য ।তাঁদের দেখেছো তুমি।
—— তোমরা পরীরানী কে উদ্ধার করছ না কেন?
কমলা রঙের পালক বলল, সে ক্ষমতা আমাদের নেই। সেই কাজ একজন ই পারে।
—–কে?
——-তুমি।
——কিভাবে?
—— সময় হলেই জানতে পারবে। এখন তুমি দড়ি ধরে পরিখার ওপাশে আগে যাও।
—— কিন্তু কিভাবে?
——– সে ব্যবস্থা আমরা করছি।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।