সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ২৩)

দেবমাল্য

ভদ্রমহিলা বললেন, কয়েক জন মিলে ধরাধরি করে তোমাকে খাটে শুইয়ে দেওয়ার পর, তোমার মুখে বারবার জলের ঝাপটা দিয়েও যখন তোমার জ্ঞান ফিরল না, তখন ও ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসেছিল। সে-ই তো ইঞ্জেকশন দিয়ে গেল। ওষুধ লিখে দিয়ে গেল। বলল, ভয়ের কিছু নেই। খানিক পরেই জ্ঞান ফিরে আসবে।

— আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম! কোথায়?

রণো বলল, আপনি তো আমাকে দাঁড়াতে বলে বউদিকে খোঁজার জন্য ঠেলেঠুলে ট্রেনে উঠে গেলেন। খানিকক্ষণ পরেই দেখি দরজাটা ফাঁকা। ওদিকে সিগনাল হয়ে গেছে। এক্ষুনি ট্রেন ছেড়ে দেবে। অথচ আপনি নামছেন না। আপনি না হয় পুরুষ মানুষ, ট্রেন ছেড়ে দিলেও লাফ দিয়ে ঠিক নেমে পড়তে পারবেন। কিন্তু বউদি? তার লাগেজ? যখন এ সব ভাবছি, ভাবছি কামরার ভেতরে ঢুকে একবার দেখব কি না। কামরার গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে একটার পর একটা জানালায় উঁকি মেরে দেখছি, আপনি কোথায়! হঠাৎ একটা জানালা দিয়ে দেখি, কামরার ভেতরে হইচই। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এ তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া দিচ্ছে, তো সে বলছে, মির্গি হয়েছে বোধহয়। কারও কাছে চামড়ার চটি আছে? ও বলছে, কেউ একটা চামচ দিন না, দাঁত লেগে গেছে মনে হচ্ছে। আর একজন তো বোতল থেকে হাতের তালু ভরে জল নিচ্ছে, আর তার মুখে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে। আবার কেউ চিৎকার করে বলছে, কী করছেন কী? সরে যান, সরে যান। ফাঁকা করে দিন। একটু হাওয়া আসতে দিন। এই সব দেখেই আমার মনে হল, নিশ্চয়ই কারও কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কার? লোকটা যে কে, অত লোক তাকে ঘিরে হিমড়ি খেয়ে পড়ায় তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। ছেলে না মেয়ে, তাও বোঝা যাচ্ছিল না।

জানালার ধারে যিনি বসেছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে দাদা? তিনি বললেন, একটা লোক অজ্ঞান হয়ে গেছে।

— কে?

প্রশ্ন শুনে তিনি যেন একটু বিরক্তই হলেন। বললেন, কী করে বলব? আমি কি চিনি? আমি বললাম, না না, তা বলছি না। বলছি, উনি কি প্যাসেঞ্জার?

বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই তিনি বললেন, অত বলতে পারব না। দরকার হলে ভেতরে এসে দেখে যান।

তার পর বিড়বিড় করে বললেন। ট্রেনে প্যাসেঞ্জার উঠবে না তো কি ভূত উঠবে! যত্তসব—

আমি আর কথা বাড়়াইনি। লাফ মেরে ট্রেনে উঠে, ‘দেখি দেখি, সরুন’, বলে একে ঠেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনে গিয়ে দেখি, আপনি নীচে পড়ে আছেন। মাথা-মুখ জামাটামা ভিজে জবজব করছে। আপনার কোনও জ্ঞান নেই।

আমাকে ওরকম করতে দেখে ভিড়ের মধ্যে থেকেই কে যেন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি চেনেন নাকি? আমি বললাম, হ্যাঁ।

ট্রেন তখন নড়ে উঠেছে। এই ছাড়ল বলে। একজন জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাবেন? আমি বললাম কোথাও না। এখানেই নামব।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।