T3 || দোল পূর্ণিমা || সংখ্যায় লিখেছেন সুব্রত সরকার

সবুজ বন্ধু
“তুমি কি আসবে আমাদের বসন্ত উৎসবে? জানি তুমি এখন অনেক দূরে চলে গেছো। কিন্তু বহুদূরে তো যাও নি সবুজ বন্ধু! এবারও আমরা রং খেলার আয়োজন করছি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হবে। তুমি কি পারবে আসতে?”… ভেসে আসা মেসেজটা অর্ণা পড়তে পড়তে কেমন আনমনা হয়ে গেল। একবার নয় বারকয়েক পড়ল এই কয়েকটা পংক্তি। কি উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে মোবাইলটা অফ করে দিল।
‘আপনি আজও আমাকে এত ভালোবাসেন!আজও গোপনে এমন সবুজ বন্ধু বলে কথা বলেন!’..অর্ণা বিড় বিড় করে নিজের মনে। ঘরে কেউ নেই। বাড়ি নিস্তব্ধ। দুপুরের এই সময়টা বড় নিজস্ব এক ভালোলাগার সময়। সকাল থেকে কাজ করতে করতে বেলা বয়ে যায়। বর অফিস যাবে। শ্বশুর স্কুলে যাবেন। শ্বাশুড়ি মঠে যাবেন। অর্ণার কোথাও যাওয়ার নেই। সকাল থেকে দুপুর কাজগুলো সারতে সারতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারপর আসে দুপুরের এই নিজস্ব নির্জনতা। ঠিক এই সময়গুলোতেই এমন মেসেজ আসে মাঝে মাঝে!..
আপনিও ঠিক বুঝে গেছেন আমার এই দৈনন্দিনতা! আমার এই নিজস্ব অবসর!..এখন খুব মনে পড়ে, বারবার বলেছিলেন, “একদম সংসারী হয়ে যেও না! তোমার অনেক কিছু দেওয়ার আছে…সংসারকে সব কেড়ে নিতে দেবে না!..”
আপনি আমাকে বরাবরই এমন আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। কত যত্ন করে কথা বলতেন। পড়াতেন। আপনার থেকে কত কিছু শিখেছি। আমি খুব ভীতু ছিলাম। লাজুক ছিলাম। কিন্তু আপনার কাছে পড়তে পড়তে কেমন পাল্টে গেলাম। ভীতু, লাজুক মেয়েটা কেমন ছটফটে হাসিখুশির হয়ে গেলাম। কি করে যে এত তাড়াতাড়ি এভাবে পাল্টে ফেলেছিলাম নিজেকে জানি না!..
আমার যেতে তো ভীষণ ইচ্ছে করে। গ্রামের সেই দিনগুলো খুব মিস করি। আমার শ্বশুরবাড়ি আধা মফস্বলে। শহর খুব দূরে নয়। এরা বনেদি পরিবার। আমাদের সেই পুরোনো গ্রামের বাড়ি। ঘর একদিকে। উঠোন একদিকে। বাথরুম একদিকে। পুকুর, গোয়াল একদিকে। ওর অভ্যাসের মধ্যে এই পরিবেশ পরে না। তাই বাড়ি গিয়ে আমার থাকাও হয় না। আর আপনার সাথে গিয়ে দেখা করাও হয় না।
আপনার কথাই ঠিক। আমি একটু একটু করে কেমন সংসারী হয়ে যাচ্ছি। দু’বেলা পুজো করি। ছাদে উঠে কাপড় মেলি। টিভির সিরিয়াল দেখি। বর অফিস থেকে এলে টিফিন করে দিই। শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে গল্প করি। সবই খুব গতানুগতিক।
“কিছু জানালে না তো!.. ” আবার ভেসে এল মেসেজ।
অর্ণা পড়ল। এবারও কোনও উত্তর দেওয়ার মত কথা খুঁজে পেল না।
কি লিখবে? বিয়ের পর প্রথম দোল। প্রথম বসন্ত উৎসব। শ্বশুরবাড়িতেও খেলা হয়। আত্মীয় কুটুমরা আসে। যাওয়া কি সম্ভব? বরের সাথে আলোচনাও হয় নি। দোল তো আর দু’সপ্তাহ পরে।
গতবছর বসন্ত উৎসবে ভীষণ মজা হয়েছিল। আমরা তো খুব রং মেখে ভূত হয়েছিলাম।আপনি একটুও রং মাখেন নি। কপালে আবীরের ফোঁটা নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন। কি সুন্দর দুটো গান করলেন, “ও মঞ্জুরী, ও মঞ্জুরী আমের মঞ্জুরী / আজ হৃদয় তোমার উদাস হয়ে পড়ছে কি ঝরি”…কি ভালো গেয়েছিলেন এ গানটা।। আমাদের নাচের সময় দেখলাম আবীর উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। সবুজ আবীর! আমার প্রিয় রং সবুজ এটা একবার কি ভাবে যেন আপনি আমার থেকে জেনে নিয়েছিলেন, সেই থেকে আমি হয়ে গেলাম আপনার সবুজ বন্ধু!.. অবশ্যই গোপনে। কেউ আজও জানে না, আমি যে আপনার সবুজ বন্ধু!
আমাদের বয়সের কত ব্যবধান। তবু আপনি আমাকে কি সুন্দর বন্ধু বানিয়ে ফেললেন। আর আমিও আপনার বন্ধু হয়ে গেলাম। সবুজ বন্ধু নামটাও খুব সুন্দর। আমার শুনতে ভীষণ ভালো লাগে!..
“খুব ব্যস্ত আছো বুঝি!..”
আবার ভেসে এল মেসেজ। অর্ণা দেখল। পড়ে নিয়ে মোবাইলটা বন্ধ করে রাখল।
বসন্ত বড় মন কেমন করা এক ঋতু। এই ঋতুতে রং লাগে প্রকৃতিতে। রং লাগে অবুঝ মনে। অর্ণা মনে মনে বলে, ‘জানি আপনি খুব কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। এই বন্ধুত্ব আপনার দেওয়া উপহার। আমি উপহার গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু এর বিনিময়ে আপনাকে কিছু দিতে পারি নি। পারবও না!.. আপনি এভাবে আর কষ্ট পাবেন না। মন খারাপ করে থাকবেন না। তাহলে আমি বড় অসুখী থাকব।…’
অশান্ত মনে ঘরের কাজগুলো করছে অর্ণা। মোবাইলটা আবার জানান দিল বার্তা এসেছে কোনও।
“বেশ। আর জানতে চাইব না। ভালো থেকো।”
ভেসে আসা এই চতুর্থ মেসেজটা অর্ণা এবারও দেখল। পড়ল। কিন্তু কোনও উত্তর না দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
বাড়ির পাশেই একটা ন্যাড়া শিমূলগাছের ডালে ফুল ফুটে আছে অনেক। সেই ফুলের মধু খেতে খেতে একটা নাম না জানা পাখি বড় বেসুরো গলায় কি একটা গান যেন গাইতে শুরু করল। অন্যদিন হলে অর্ণা জানলা খুলে দেখত পাখিটাকে। আজ অর্ণা মেসেজের কোনও উত্তর না দেওয়ার মতই পাখির গানও শুনল না!..
সমাপ্ত