ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৯৭)

সুমনা ও জাদু পালক

উড়ন্ত দুধরাজের পিঠে বসেই সুমনা দেখল, হাসিখুশি দ্বীপের কনকনগর রাজ্যের রাজপ্রাসাদের চারধারে সেই যে ঘাসে ভর্তি পরিখা ছিল, সেই যেখানে অল্প জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল দুরন্ত সব কুমির, সেগুলো হঠাৎ যেন কোন জাদু বলে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার বদলে সেই পরিখা ভর্তি হয়ে গেছে টলটলে পরিষ্কার জলে। আর সেই জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় মাছ। একি তবে জাদুকর হূডুর মায়াজাল ছিন্ন হওয়ার ফলে হচ্ছে? বিস্মিত হবার পালা এখানেই শেষ নয়। সুমনা সবিস্ময় দেখল, রাজপ্রাসাদের চারধারে যে গাছগুলো হয়ে পড়েছিল রুক্ষ,শুষ্ক ,পত্রহীন, সেগুলো সব সবুজ হয়ে গেছে। কিশলয়ে ভরে গেছে গাছের শাখা প্রশাখা।কিছু কিছু গাছ বিচিত্র বর্ণের ফুলে সেজে উঠেছে। কিন্তু পাখিগুলো ?ওরা কোথায়? ওদের ডাক তো শোনা যাচ্ছে না?
এবারে ঘটলো আরো মজার ব্যাপার। আগেরবার দুধরাজ পরিখা পার হতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু এবারে ও অনায়াসে পরিখা পার হয়ে উড়ে চললো রাজপ্রাসাদের দিকে। আর উপর থেকে সুমনা লক্ষ্য করল,রাজপ্রাসাদের বাগানের সমস্ত ফুলগুলো মনে হচ্ছে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নানা বর্ণে ওরা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মাথা দোলাচ্ছে বাতাসে। কিন্তু পাখি প্রজাপতি সব আগের মতই নিশ্চুপ, নিষ্পন্দ।
শুধু তাই নয় রাজপ্রাসাদের প্রবেশদ্বারের দুপাশে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী, বাগানের মালী সবাই তো আগের মতই পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। তবে কি হাসিখুশি দ্বীপের এই কনকনগর রাজ্য প্রাণ ফিরে পাবে না?
ভাবতে ভাবতেই রাজপ্রাসাদের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেল দুধরাজ। থামলো এসে শিব মন্দিরের সামনে সেই বিশাল শিবপুকুরের পাড়ে।

অদৃশ্যকন্ঠ বলল, এবার দুধরাজের পিঠ থেকে নেমে, শিবপুকুরের জলে ভালো করে হাত পা ধুয়ে মন্দিরে এসো রত্নমালা। আর সঙ্গে নিয়ে এসো লাল কাপড়ে মোড়া হূডুর ভাঙা জাদুদন্ড।
এতদিনে সুমনা অভ্যস্ত হয়ে গেছে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে । ও লাফিয়ে নামলো দুধরাজের পিঠ থেকে। হাতে ধরা সেই লাল কাপড়ের পুটুলিটা। সুমনা পুটুলিটা পুকুরের পাড়ে নামিয়ে জলে নামতে যাচ্ছিল।
অদৃশ্য কণ্ঠ প্রায় চিৎকার করে উঠলো, খবর্দার!
এরকম ভুল কোরোনা রত্নমালা।হূডুর ওই জাদু দন্ড সম্পূর্ণ বিনষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ওটা সাবধানে রাখতে হবে।
——তাহলে কী করবো আমি?
——দুধরাজকে অনুরোধ করো ওটা পাহারা দিতে।
—- বেশ ,তাই করছি।
সুমনা দুধরাজ এর কাছে গিয়ে ওর গলা জড়িয়ে
কেশর নেড়ে দিয়ে বলল, ভাই দুধরাজ, আমি শিবপুকুরে নামছি হাত-পা ধুতে। তুমি কি একটু কষ্ট করে ওই লাল পুটুলিটা পাহারা দিতে পারবে?
দুধরাজ উপর-নিচে দুবার ঘাড় নাড়িয়ে আর মুখে বিচিত্র শব্দ করে বুঝিয়ে দিল ,সে পারবে।
সুমনা শিবপুকুরের ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো হাত পা ধুতে। একটু পরে উপরে এসে দেখল, দুধরাজ পুটুলিটার উপর সামনের ডান পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন সে সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে পুটুলিটা চেপে ধরে আছে।
সুমনা মনে মনে শঙ্কিত হয়। তবে কি জাদুকর হূডুর জাদুদণ্ড টুকরো করে ভেঙে ফেলার পরেও শক্তিশালী? তাই কি বারে বারে অদৃশ্য কন্ঠ সাবধানে রাখতে বলছিল ওটাকে। তাহলে তো এক্ষুনি বাবা ভোলানাথের মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। ধ্বংস করতে হবে ওই জাদুদণ্ড।
দুধরাজকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওর পায়ের নীচে থাকা পুটুলিটা হাতে তুলে নেয় সুমনা।
একটু দ্রুত পা চালিয়ে সুমনা মন্দিরে পৌঁছে যায়।
মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার আগে অদৃশ্য কন্ঠ বলল, মন্দিরের ভিতরে গিয়ে বাবা মহাদেব কে প্রণাম জানিয়ে শিবলিঙ্গের সামনেই লাল কাপড়ের বাঁধন খুলো রত্নমালা, অন্য কোথাও নয়।
লাল কাপড়ের বাঁধন খোলার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত কিছু দেখতে পাবে। যাইহোক না কেন,একদম ঘাবড়াবে না।
লাল কাপড়ের বাঁধন খুলেই তুমি ভাঙা জাদু দন্ডের টুকরো দুটোকে বাম হাত দিয়ে ধরে রাখবে আর ডান হাত বুকে ঠেকিয়ে জোরে জোরে ওম নমঃ শিবায় মন্ত্র পাঠ করবে।
—–তারপর?
—–আমি ঠিক সময়ে বলে দেবো।
মন্দিরের গর্ভগৃহে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুমনার মনে হল যে, লাল কাপড়ের পুটুলিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। সুমনা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পুটুলিটাকে আঁকড়ে ধরল। কিছুক্ষণ পরে তার হঠাৎ মনে হল, পুটুলিটা হালকা, সেটার ভিতরে যেন কিছু নেই।
সুমনা অবাক হয়ে গেল। তা কি করে হয়? তবে কি ওটা কোনভাবে খুলে জাদুদন্ডের টুকরো দুটো পড়ে গেছে? তাহলে তো মুশকিল।
সুমনা কি পুটুলিটা খুলে একবার দেখবে?
পরমুহূর্তেই তার অদৃশ্য কণ্ঠের সাবধান বাণী মনে পড়ে গেল। শিবলিঙ্গের সামনে ছাড়া পুটলি খোলা যাবে না। সুমনা দুহাতে পুটুলিটা আঁকড়ে ধরে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করল।
বিশাল শুভ্র বর্ণের শিবলিঙ্গের সামনে বসে দেবাদিদেবের উদ্দেশ্যে অন্তরের শ্রদ্ধা ভক্তি নিবেদন করল। তারপর বাবা শিবের নাম স্মরণ করে ধীরে ধীরে পুটুলিটা খুললো। খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সবুজ পাখির পালক টা পুটুলি থেকে বেরিয়ে উপরে ভাসতে লাগলো। খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সেটা।
আর‌ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জাদু দন্ডের ভাঙ্গা টুকরো দুটো আস্তে আস্তে উপরে উঠতে শুরু করলো। সুমনার মনে পড়ে গেল অদৃশ্য কণ্ঠের বলা সাবধান বাণী।
সুমনা বাম হাত দিয়ে জোর করে চেপে ধরল জাদুদন্ডের ভাঙ্গা টুকরো দুটোকে। তারপর ডান হাত বুকে ঠেকিয়ে জোরে জোরে ‘ওম নমঃ শিবায়’ মন্ত্র জপ করতে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো।
শিব লিঙ্গের ভেতর থেকে একটা উজ্জ্বল আলোক রশ্মি বিদ্যুৎ চমকের মত বেরিয়ে এলো।
অদৃশ্য কণ্ঠ চিৎকার করে বলল, বাম হাত সরিয়ে নাও রত্নমালা। সুমনা হাত সরিয়ে নিতেই
সেই আলোক রশ্মি এসে পড়ল ভাঙ্গা জাদু দন্ডের উপরে। মুহূর্তের মধ্যে তা ভস্মে পরিণত হলো। আলোক রশ্মি ফিরে গেল শিবলিঙ্গের দিকে এবং অদৃশ্য হোলো।
অদৃশ্য কন্ঠের নির্দেশ মত সুমনা এবার শিবলিঙ্গের সামনে হাত পেতে দাঁড়াতেই শিবলিঙ্গের গলা থেকে একটা আকন্দ ফুলের মালা আর লিঙ্গের উপর থেকে একটা বেল পাতা আর নীলকন্ঠ ফুল যেন উড়ে এসে ওর হাতে পড়ল।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো, রত্নমালা,তুমি ওই বেলপাতাটা জাদুদন্ড-ভস্মের উপর চাপা দাও। তারপর নীলকন্ঠ ফুল আর আকন্দ ফুলের মালাটা নিয়ে দোতলায় রাজপুত্রের ঘরে যাও। প্রথমেই নীলকন্ঠ ফুলটা রাজপুত্রের কপালে দেবে,তারপর আকন্দ ফুলের মালাটা রাজপুত্রের পরিয়ে দেবে রাজপুত্রের গলায়।
—–তারপর?
—–তারপর দেখবে একটা ম্যাজিক হবে। রাজপুত্রের ঘরে কিভাবে যেতে হবে , রাস্তাটা মনে আছে তো?
——সব মনে আছে আমার।
সুমনা বেল পাতাটা ভস্মের উপর চাপা দিতেই
সেটা বৃহৎ আকার ধারণ করে সম্পূর্ণ ভস্মকে ঢেকে দিল।
সুমনা পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় রাজপুত্রের ঘরে।
রাজপুত্রের কপালে রাখে নীলকন্ঠ ফুল আর গলায় পরিয়ে দেয় আকন্দ ফুলের মালা।
সত্যি ম্যাজিক হয় একটা। রাজপুত্রের সারা দেহটা উজ্জ্বল আলোয় ভরে যায়। ওর পাথুরে শরীরটা স্বাভাবিক মানুষের মত হয়ে যায়।
একটু পরেই চোখ মেলে রাজপুত্র হীরক কুমার।
রাজপুত্র চোখ মেলে সুমনাকে দেখেই বলল, দিদি ,এসেছিস তুই?
——দিদি! তুমি কে ,কি নাম তোমার?
—-সেকিরে দিদি, আমাকে চিনতে পারছিস না?
সুমনা চুপ করে থাকে।
রাজপুত্র বলে, আমি তো হীরক, তুই আমার দিদি রত্নমালা। কিচ্ছু মনে নেই তোর?
——কী মনে রাখার কথা বলছো?
——অনেকদিন আগে একটা দুষ্টু জাদুকর আমাদের রাজ্যের সবাইকে পাথর করে দিয়ে তোকে চুরি করে নিয়ে চলে গেছিল। আমি জানতাম, তুই ফিরে আসবি একদিন।
—–কিন্তু আমি তো কিচ্ছু……?
—–দাঁড়া দিদি ,একটা জিনিস দেখাই তোকে।
——কী দেখাবি?
——-একটা হাতির মুখোশ।
রাজপুত্র হীরক ঘরের কোণ থেকে একটা মস্ত বড় তোরঙ্গের ঢাকনা খুলে একটা সুন্দর হাতির মুখোশ বের করে আনলো। ওটা সুমনার হাতে দিয়ে বলল, কিরে দিদি, চিনতে পারছিস এটা?
সুমনা ওটা হাতে নিয়ে নাড়াচড়া করতে লাগলো।

হীরক বিস্মিত কন্ঠে বলল, সেকিরে, এটাও চিনতে পারছিস না দিদি?এটা নিয়েই তো তুই রোজ আমার সঙ্গে ঝগড়া করতিস।

হঠাৎ সুমনার কানে ভেসে এলো অনেক পাখির কলকাকলি, নিচের থেকে ভেসে এলো অনেক মানুষের গলার আওয়াজ। অবাক হয়ে গেল সুমনা। এইতো একটু আগে সে নিচ দিয়ে এলো। সবাইতো পাথর হয়ে ছিল। তাহলে?
হীরক বলল, অবাক হোস না দিদি। আমার মতই সবাই পাথর হয়ে ছিল এতদিন। আমি ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই আগের মত হয়ে গেছে।
চল না দিদি, মা ,বাবার সঙ্গে দেখা করে আসি।
সুমনার হাত ধরে টানতে টানতে হীরক উপস্থিত হলো সেই বড় ঘরে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।