ক্যাফে কাব্যে সুব্রত সরকার

অরুণাচলের চিঠি
…তবে একলা চলো রে!”.. অনেককে বলেছিলাম অরুণাচলের এই দুর্গম উপত্যকা, পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর সুন্দর সুন্দর সব নদী ভরা অঞ্চলে বেড়াতে যাওয়ার কথা। না, তেমন কাউকে রাজি করাতে পারি নি। সবাই পরিচিত সার্কিটে ঘুরে বেড়াতে চায়। অর্থ্যাৎ ভালুকপং, বমডিলা, দিরাং, তাওয়াং। অগম্য অফবিটে যাওয়ার সঙ্গী পাই নি!..
আজ দু’সপ্তাহ হল একা একাই ইটানগর, জিরো, দাপোরিজো, আলং, মেচুখা, পাসিঘাট হয়ে শিলাপাথরে এসে পৌঁছেছি। এবার একটা রাত বিশ্রাম নিয়ে কাল বগিবিল সেতু দিয়ে ব্রক্ষ্মপুত্র পেরিয়ে ডিব্রুগড় থেকে কলকাতার ট্রেন ধরব।
পাসিঘাট থেকে শিলাপাথর এসে প্রথমেই মনে হল, এটা তো আসাম। সামনেই ব্রক্ষ্মপুত্র। নিশ্চয়ই নদীর মাছ পাওয়া যাবে এখানে। লোকাল মাছ যাকে বলে।
হোটেলের ম্যানেজার আমার মনের দুঃখের কথা শুনে বললেন,” এই পনেরোদিন মাছ খান নি!.. কেন? অরুণাচলে তো মাছ পাওয়া যায়!..”
“যায় তো। ” আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আরে সেগুলো সব সেই অন্ধ্রের চালানি রুই। আর নয়তো আসাম থেকে যাওয়া বড় বড় পাঙ্গাস। আমার এমাছ একদম ভালো লাগে না। আমি একটু লোকাল মাছ খেতে চাইছি।”
শিলাপাথর সদরেই পেয়ে গেছি এই মৎসময় হোটেল। নাম পাঁকঘর। আমি লোকাল মাছ খেতে চাই শুনেই ম্যানেজার বললেন, “আমাদের এখানে ভালো বোরলি মাছ পাওয়া যায়। আপনি ছোট বোরলি খাবেন না বড় বোরলি?”
“বোরলি মাছ!..” চাঁদ ধরিয়ে দিলেন যেন ম্যানেজার আমার হাতে! আমি তো জিভের জল সামলে নিয়ে বললাম, “এখানে বোরলি পাব!.. আরে এটা তো আমার হট ফেভারিট ফিস। ডুয়ার্সে গেলেই খুঁজে পেতে খাই। তবে বড় বোরলি কোনওদিন খাই নি।”
“আমাদের বড় বোরলির ডিশ ও ছোট বোরলির ডিশ দুটোই পাবেন।”
ম্যানেজার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দি বাংলায় কথা বলছেন দেখে বললাম,” আপনি আসামের বাঙ্গালী নন?”।
সে লাজুক হেসে বলল, “আমি ইউ পির। বাবা পঞ্চাশ বছর ধরে এখানে আছে। আমার জন্মও এখানে। ”
“তাই!. উওরপ্রদেশের লোক আপনি!..”
“এখন আমি আসামেরই হয়ে গেছি।”
“এই হোটেল কি আপনাদের?”
“না। না। মালিক আসামের লোক। জোনাইতে বাড়ি। আমি এই হোটেলের ম্যানেজার।”
আশ্চর্য এখানে ইউ পির লোক পঞ্চাশ বছর ধরে সুন্দর বসবাস করছেন। আমি মনে মনে ভাবছি। ম্যানেজার বললেন, “এখানে বিহারের লোকও অনেক আছে। আপনাদের বেঙ্গল থেকেও এসে আছে কিছু লোক। সবাই আমরা মিলেমিশে আছি।”
“বাহ। খুব ভালো ”
” স্যার, তাহলে কোন মাছ খাবেন? ”
আমি হেসে বললাম, “বড় বোরলি মাছের ঝাল খাব। আর ছোট বোরলি ভাজা দিন এক প্লেট।”
আজ অনেকদিন পর মাছে ভাতে বাঙালি হল!.. সত্যিই কি তৃপ্তি ভরেই না খেলাম ছোট বোরলি ভাজা ও বড় বোরলির ঝোল। মেনুতে উচ্ছে ভাজা,শাক ভাজা ও মোচার ঘন্টও পেলাম!..শিলাপাথর জিন্দাবাদ!…
হাতে সময় অল্প। শিলাপাথরটা একটু ঘুরে বেড়িয়ে দেখে নিতে চাই। ম্যানেজার বলল, “স্যার, সামনেই একটা বড় মন্দির আছে, জায়গাটার নাম মালিনিথান। ওটা আবার অরুণাচল। ঐ মন্দিরটা ঘুরে আসুন।”
মালিনিথান মন্দিরের একটা পৌরাণিক গল্প আছে। কথিত আছে, কৃষ্ণ দ্বারকা ফেরার সময় রুক্মিণীকে নিয়ে এখানে বিশ্রাম নেন। আর তখন তাঁদের সাদর আমন্ত্রণ জানান স্বয়ং পার্বতী। সেই কারণে এটা একটা প্রসিদ্ধ ধর্মস্থান।
শিলাপাথর থেকে রেললাইন পেরিয়ে প্রথমে কিছুটা বাসে, তারপর অটোয় করে পৌঁছে গেলাম মালিনিথান। রাস্তার বেহাল অবস্থা। অটোওয়ালা খিস্তি করতে করতেই চালাল পথটুকু। বুঝলাম বহুদিন ধরে এই রাস্তাটা হচ্ছে না। পুরোটাই খেয়োখেয়ি। টাকা আসছে, কিন্তু পকেটে পুড়ে নিচ্ছে নেতারা!.. পাবলিক ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু দেখছে!…
দু’ সপ্তাহ ধরে অপরুপ সুন্দর সব উপত্যকা, পাহাড়, নদী, জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে চোখ অন্যরকম হয়ে গেছে। এখন আর এই শেষে এসে নিছক একটা মন্দির দেখে মন মজল না। তবু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মিউজিয়ামের টিকিট কেটেও দেখতে পেলাম না। লোডশেডিং। বিকল্প আলোর কোনও ব্যবস্থা নেই। পাহাড়ের চূড়োয় রুক্নিনী মন্দির ঘুরে দেখে বেশ ক্লান্ত হয়ে নেমে এলাম। এবার ফেরার পালা। অনেকটা নিচে নেমে অটো ধরতে হবে। তাই বেশ ধ্বস্ত হয়ে নামছিলাম, হঠাৎ দেখি রাস্তার বাঁকে দাঁড়িয়ে একটা অটো। কোনও প্যাসেন্জার নেই। অটোওয়ালা আপনমনে মোবাইল ঘাঁটছে।
“ভাইয়া যায় গা!..”
অটোওয়ালা আমার দিকে চেয়ে একটু থেমে বলল, “আপ কাহা যায়েঙ্গে?”
” আভি নিচে যাকে ফির শিলাপাথর যায়েঙ্গে।”
” অটো নিচে যায়েঙ্গে লেকিন…”
“কি?”
“একজন আছে। সে থানায় গেছে, সে এলে আমি যাব।”
“আমি তাহলে একটু ওয়েট করি।”
“হা হা। বসুন। নিয়ে যাব।”
বসে আছি অটোতে। জল খেয়ে একটু গলা ভেজালাম। ক্লান্ত শরীরটা জুড়িয়ে এল।
অটোওয়ালাকে বললাম, “থানা কতদূর?”
“সামনেই।”
“কখন আসবেন কিছু বলে গেছে?”
“বড়বাবুর সাথে দেখা করেই আসবে বলল তো। ঝুট ঝামেলার কেস আছে, তাই দেরী হচ্ছে বোধহয়।”
“ঝুট ঝামেলার কি আছে?”
অটোওয়ালা বলল,” আরে এই আওরৎ বহুত দুঃখী হ্যায়। ওর স্বামী ওকে মারধোর করেছে। ভাগিয়ে দিয়েছে। ও তাই থানায় এসেছে সব জানাতে।”
আমি একটু থমকে গেলাম। এই অটোয় করেই মহিলা এসেছেন থানায়, আবার ফিরে যাবেন। আমিও যাব তখন নীচে। এমন একজন নির্যাতিতা মহিলাকে সহযাত্রী রুপে পাব ভাবি নি। আমি এবার বললাম, “এই মহিলা কি লোকাল।”
“হাঁ হাঁ। গালো আছে।”
গালো একটা উপজাতি আমি জানি। এই কদিন অরুণাচলে ঘুরতে ঘুরতে অনেক উপজাতি মানুষজনদের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে। তারা কেউ কেউ নিশি, কেউ আপাতানি, কেউ মেম্বা, কেউ গালো, কেউ তাগিন, কেউ আদি। এই মহিলা গালো শুনেই আমার ইটানগর বাজারে শূয়োরের মাংস বিক্রি করা সেই গালো মহিলার মুখটা মনে পড়ে গেল। কি দীপ্ত চোখমুখ তার। পরিশ্রমী সুঠাম সুশ্রী চেহারা। নাম ছিল বোমসা লিকর। আমি মাংস কিনতে আসি নি, শুধু বাজার ঘুরে ঘুরে দেখছি শুনে সে খুব মজা পেয়েছিল। কি সুন্দর হেসে বলেছিল, “ট্যুরিস্ট আদমী আছেন!.. বঙ্গালি!..”
ওর স্বামী এমন করেছে কেন তুমি জানো?”
“আরে উ বহুত ফালতু আদমী শালা। এ লেড়কি লাভ ম্যারেজ করেছিল ওকে। এখানকার ছেলে নয়। বিহারি আছে। শালা আপনা ভাই কা বহুর সাথ ঘরমে মজাকি লুটছে। ভাই বাহার গিয়া কামকে লিয়ে। বহু একেলে হ্যায়। ই শালা হারামখোর উনকো চাটতে হ্যায়। ইসলিয়েই তো ঝামেলা।”
আমি এ গল্পকথা শুনে কিছু আর বলতে পারি না। গালো এই মহিলাকে দেখি নি এখনো। কিন্তু একটু পরেই তো দেখতে পাব। সে এসে বসবে অটোতে। তারপর আমরা নিচে নামব একই অটোয় চড়ে। সে আজ কতখানি অসহায় হয়ে থানায় চলে এসেছে, যাকে ভালোবেসে নিজের জাতির বাইরে গিয়ে বিয়ে করেছিল, সে বিশ্বাস ভঙ্গ করে নিজের ভাইয়ের বউয়ের সাথেই পরকীয়া করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তাই তার এত রাগ! প্রতিবাদীকে মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।
আমি থানার দিকেই মুখ করে বসে আছি। অটোওয়ালা বিড়বিড় করে আরও অনেক কথা বলে যাচ্ছে। আমার আর কিছুই যেন শুনতে ইচ্ছে করছে না। শরীর খুব ক্লান্ত। হেঁটে হেঁটে আর নামতে ইচ্ছে করছে না। নাহলে হয়তো চলে যেতাম। সহযাত্রী এই মহিলার সাথে যেতে এখন ভীষণ খারাপ লাগছে। দুঃখী একটা মনমরা মানুষ পাশে চুপ করে এসে বসবে, আমি একটা কথাও বলতে পারব না! আমার বেড়ানো মানেই মানুষের সাথে কথা বলা আর বন্ধুত্ব বাড়ানো!.. কিন্তু এই গালো উপজাতির নির্যাতিতা মহিলার সাথে আমি কি কথা বলব!..
থানার গেট থেকে বেরিয়ে আসছেন মাথা নীচু করে একজন মহিলা। পিঠে পুটুলির মধ্যে তাঁর সন্তান। উপজাতি মহিলারা পিঠের মধ্যে তাদের সন্তানকে কাপড়ে বেঁধে দিব্যি হাঁটাচলা করেন দেখলাম এই কদিনে। চেহারা দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না, ইনিই সেই গালো মহিলা!..
অটোর কাছে এসে ড্রাইভারকে শান্ত ভাবে বললেন, “চলিয়ে।”
আমি অটো থেকে নেমে এসে তাঁকে আগে বসতে দিয়ে বললাম, “আপ আন্দার যাইয়ে।”
“থ্যাঙ্ক ইয়ু।”
অটো গড়াতে শুরু করল। সেই ভাঙা রাস্তা। অটো লাফাচ্ছে। টাল খাচ্ছে। গালো মহিলার পুটুলিতে থাকা বাচ্চাটা হাসছে। অটোর নাচ দেখে ওর বুঝি মজা লাগছে। মহিলা গম্ভীর। শান্ত। আমরা কেউ কোনও কথা বলছি না।
একসময় হঠাৎ এই নীরবতা ভেঙে মহিলাই বললেন, “আপ বাহারকা আদমী?”
আমি থতমত খেয়ে বললাম, “হাঁ। ট্যুরিস্ট।”
“কাঁহা সে আয়া?”
“কলকাতা। ওয়েস্ট বেঙ্গল। ”
“স্যার আপ তো পড়ালিখা আদমী হ্যায় না?”
আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। মহিলার মুখের দিকে চেয়ে আছি দেখে সেই বলল, “স্যার,এক লেটার লিখ দিজিয়ে না। ”
” লেটার? চিঠটি?”
” হাঁ স্যার। আমি আপনাকে সব বলছি, আপনি শুধু একটু লিখে দিন। পুলিশ বলল, চিঠি লিখে জমা দাও। তবে আমরা হারামজাদাকো লে আয়েঙ্গে থানা মে।”
অটো চলছে। ড্রাইভার রাস্তাকে সামলাচ্ছে। পিঠে পুটুলির বাচ্চাটা এবার আমার মাথার টুপিতে হাত রেখে খুব হাসছে। মহিলা হঠাৎ কেমন কাতর স্বরে বললেন, “স্যার, প্লিজ হেল্প মি!..”
অটো একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। মহিলা কাগজ কিনতে গেলেন। আমাকে চিঠিটা লিখে দিতে হবে। সে আমাকে তাঁর করুণ কাহিনি শোনাবেন। আমি নতুন করে আবার সেই সব শুনব। তারপর তাঁর বয়ানে আমি লিখতে শুরু করব… টু দ্যা অফিসার ইনচার্জ অফ পুলিশ,….
একলা চলো রে!.. কাউকে সঙ্গী না পেয়ে একাই চলে এসেছিলাম অরুণাচলে বেড়াতে। অনেক বেড়ানো হলো। মন ভরে গেছে। চোখ জুড়িয়ে গেছে। বাকি ছিল এইটুকুই বোধহয়!.. তাই সেই অরুণাচলের চিঠি এখন আমি লিখব!..এই গালো মহিলাকে আমাদের রবি ঠাকুরের গানটা এখন যদি একবার শোনাতে পারতাম… তবে একলা চলো রে!..” মনে মনে বললাম, আজ থেকেই তো তোমার লড়াই শুরু হল!..একলা বাঁচার লড়াই!..
সমাপ্ত