ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৪৪)

সুমনা ও জাদু পালক
ওদের সবাইকে দাঁড়াতে দেখে দুধরাজ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বানর সেনাধ্যক্ষ প্রাচী সুমনার কাছে এসে হাতজোড় করে বলল, “হে রাজকুমারী রত্নমালা, নিরাপত্তার কারণে বানররাজ মহামতি মহাগ্রীবের রাজপুরীতে প্রবেশের মূল দরজা বন্ধ আছে। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দরজা খোলার ব্যবস্থা করছি। আপনি দয়া করে একটু সময় অপেক্ষা করুন।”
সুমনা বলল, বেশ, আমি অপেক্ষা করছি।
এরপর বানর রাজ্যের চার সেনাধ্যক্ষ মস্ত পাহাড়টার কাছে এগিয়ে গেল।
সুমনা দেখতে পেল, পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট্ট গর্ত আছে।
ওরা চারজন গর্তের কাছে এক এক করে গিয়ে, গর্তের ভিতর হাত ঢুকিয়ে কি যেন করল। আর সেইসঙ্গে জোরে জোরে কি যেন বলতে শুরু করল। এত দূর থেকে শব্দগুলো ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। শব্দগুলো পরিষ্কার বোঝা না গেলেও ওরা যেটা বলছে, সেটা গানের মত সুর করে বলছে। একটানা একঘেয়ে।
এভাবে কিছুক্ষণ কাটার পর ওরা চারজন গর্তের কাছ থেকে সামান্য সরে এসে পাশাপাশি দাঁড়ালো । তারপর চারজন একসঙ্গে তিনবার হাততালি দিয়ে বলে উঠলো,” বানররাজ মহামতি মহাগ্রীবের জয় হোক।”
আর তার পরেই ঘটল একটা অদ্ভুত কান্ড। সুমনা সবিস্ময়ে দেখলো, চারজন বানর সেনাধ্যক্ষ দুই হাতে নিজেদের বুকে সজোরে চাপড় মারতে লাগলো। আর একটু পরেই ওদের দেখে হাজার হাজার বানর, যারা এতক্ষণ গাছের ডালে বা এখানে ওখানে বসে ছিল, তারাও দুই হাতে নিজের বুক চাপড়াতে লাগলো।
ব্যাপারটা কি হচ্ছে সুমনা বুঝতে পারলো না ।
হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল, বাবার মুখে শুনেছে যে, আফ্রিকা বলে নাকি একটা বিরাট দেশ আছে। আর সেখানের গভীর জঙ্গলে গরিলা নামে এক বিশাল আকৃতির বানর শ্রেণীর জীব আছে।
তারা নাকি এভাবে বুক চাপড়ায়। বিকট নাকি তার আওয়াজ। পশুরাজ সিংহও নাকি ভয় পায় সেই আওয়াজে। কিন্তু বাবা তো বলেছিল, গরিলারা খুব রেগে গেলে অথবা প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে এভাবে বুক চাপড়ায়।
এখানে তাহলে ওরা ওরকম করছে কেন? এখানে ওরা কার সঙ্গে লড়াই করবে?
হাজার হাজার বানর একসাথে যখন বুকে চাপড় মারছিল, তার সম্মিলিত আওয়াজে চারদিক গমগম করতে লাগলো।
এভাবে কিছুক্ষণ চলতেই সুমনা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল যে, পাহাড়ের গায়ে যেখানে গর্ত ছিল, সেখানে লম্বালম্বি একটা ফাটল সৃষ্টি হল। সেই ফাটলটা চওডায় বাড়তে লাগলো । দেখে মনে হল যেন মস্ত বড় দুটো পাথর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দুপাশে।
দুই পাথরের মাঝখানের ফাঁকটা প্রশস্ত হতেই চারজন চতুরানন সেনাধ্যক্ষ বন্ধ করলো বুকে চাপড় মারা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল বিশাল বানর বাহিনী।
প্রাচী এবার সুমনার কাছে এসে বলল, রাজকুমারী রত্নমালা, এবারে ভিতরে যেতে হবে। দয়া করে আপনি ঘোড়ার পিঠ থেকে ভূমি পৃষ্ঠে অবতরণ করুন।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো, সেটা সম্ভব নয় বানর সেনাধ্যক্ষ প্রাচী।
——- কিন্তু আমাদের দেশের এটাই প্রথা। বানররাজ মহামতি মহাগ্রীবের কাছে কেউ দেখা করতে গেলে তাকে পায়ে হেঁটেই যেতে হয়।
—— সে নিয়ম আপনাদের দেশের বানর প্রজাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, রাজকুমারী রত্নমালার ক্ষেত্রে নয়।
তাছাড়া রাজকুমারী রত্নমালা এখানে স্বেচ্ছায় বানররাজ এর সঙ্গে দেখা করতে আসেননি, আপনি রাজকুমারীকে এখানে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন। কাজেই রাজকুমারী রত্ন মালাকে তার বাহন সমেত ভিতরে প্রবেশ করতে দিতে হবে,নচেৎ বানররাজের সঙ্গে দেখা না করেই রাজকুমারী রত্নমালা ফিরে যাবেন।
অদৃশ্য কন্ঠের কথা শেষ হতেই উপস্থিত বানরদের মধ্যে একটা মৃদু গুঞ্জন শুরু হল। বানর সেনাধ্যক্ষ প্রাচী জোরে ধমক দিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে দিল।
বানরগুলো থামতেই প্রাচী হাতজোড় করে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, হে রাজকুমারী রত্নমালা,”এই অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমাকে আজ্ঞা করুন, আমি মহারাজের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসি।”
সুমনা বলল, বেশ।
বানর সেনাধ্যক্ষ প্রাচী খোলা দরজা দিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল।
চলবে