ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৬৩)

সুমনা ও জাদু পালক

রাজা রুদ্রমহিপাল কে ওই ভাবে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখে সুমনা ও চন্দ্রকান্তা যৎপরোনাস্তি বিস্মিত হল।ওরা কী করবে বুঝতে পারছিল না।
সুমনা বলল, হে রাজন, হে পুষ্প নগরের অধিপতি, হে মহারাজ রুদ্র মহিপাল, আপনি এভাবে ভূমিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন কেন? আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?
রুদ্র মহিপাল কোন উত্তর দিলেন না ,কিন্তু ওই স্বর্ণ তুলসীপত্রের সামনে ভূমিতে পূর্বের মতোই গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন।
চন্দ্রকান্ত এবার ভূমিতে হাঁটু গেড়ে বসে হাত জোড় করে বলল, হে মহারাজ, আপনি আমার পিতার বন্ধু। বর্তমানে আপনার রাজপ্রাসাদে হূডুর অবস্থান। হূডু কে পরাস্ত করে ওর জাদু দণ্ড হস্তগত করতে না পারলে আপনার রাজ্য, আমার পিতার রাজ্য, রাজকুমারী রত্নমালার পিতৃ রাজ্য কোনটাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আপনার রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ঢুকতে গেলে বা লুকিয়ে হূডুর সঙ্গে লড়াই করতে গেলে ,আপনার সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। কোন কারনে আপনি অসুস্থতা বোধ করলে ,নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব আপনাকে সুস্থ করে তোলার। কিন্তু আপনি কিছু না বললে আমরা খুব অসহায় বোধ করব।
চন্দ্রকান্তার এই কথা শুনে রাজা রুদ্রমহিপাল স্থির হলেন। একটু পরে তিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, তোমাদের কোন চিন্তা নেই রাজকুমারীদ্বয় ,আমি মোটেই অসুস্থ হয়নি।
এখন আমি আগের থেকে নিজেকে অনেক অনেক বেশি সুস্থ এবং সৌভাগ্যবান মনে করছি।
চন্দ্রকান্তা বলল, তাহলে আপনি কাঁদছিলেন কেন?
—– আনন্দে, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আনন্দে,ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা দর্শনের আনন্দে।
—— মানে?
——- তাহলে বলি শোন।
ভূমি শয্যা থেকে উঠে বসলেন রাজা রুদ্র মহিপাল।
একটু সময় পরে তিনি বলতে শুরু করলেন, “আমি তো আগেই বলেছি যে, আমাদের রাজবংশ ভগবান বিষ্ণুর উপাসক। আর ঠিক সেই কারণেই আমি আমাদের রাজ্যে ভগবান শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
আমার পিতামহ রাজা হয়েও ঋষির মতো ছিলেন। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি পারিবারিক বিষ্ণুমন্দিরে কাটাতেন।তাঁকে তাঁর গুরুদেব বিষ্ণু মন্ত্র খোদিত করা এই স্বর্ণ নির্মিত তুলসীপত্র দিয়েছিলেন। আমার পিতামহের প্রতি তাঁর গুরুদেবের এই নির্দেশ ছিল যে, আমার পিতামহ বিষ্ণু মন্দিরে পূজার্চনা করার সময় এই তুলসী পত্রটি নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করে যেন শ্রী বিষ্ণুর চরণে প্রতিদিন অর্পণ করেন। তিনি এটাও বলেছিলেন যে ওই স্বর্ণ তুলসী পাত্রটি আমাদের রাজ পরিবারকে এবং রাজ্যকে সমস্ত রকম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে। কাজেই ওই তুলসী পত্রটি যাতে সুরক্ষিত থাকে তার ব্যবস্থা পিতামহ কে করতে হবে।
আমার পিতামহ এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন ।পুজো শেষ হওয়ার পর তিনি প্রতিদিন ওই স্বর্ণ নির্মিত তুলসী পত্রটি তাঁর শয়ন কক্ষে একটি নির্দিষ্ট সিন্দুকে তুলে রাখতেন। পরের দিন মন্দিরে পুজো করার সময় ওই তুলসীপত্রটি আবার সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
একদিন আমার পিতামহ পুজো শেষ হওয়ার পর ওই তুলসী পাত্রটি বিগ্রহের চরণ থেকে তুলে এনে সিন্দুক তুলে রাখতে ভুলে গেছিলেন।
সেই দিন ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনা। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম ।আমি পারিবারিক মন্দিরে খেলার ছলে প্রবেশ করে ওই স্বর্ণ তুলসী পত্রটি দেখতে পাই। ওটি এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, আমি ওটি নিয়ে আমার পোশাকের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রেখে দিই। কিছু সময় পরে আমার খেলার সঙ্গীরা আমাকে ডেকে নিয়ে রাজবাটি সংলগ্ন ফলের বাগানে খেলতে যায়। সেই সময় ওই তুলসী পত্রটি আমার অজান্তে বাগানে কোথাও পড়ে হারিয়ে যায়।
রাজসভার কাজ সমাপনান্তে হঠাৎ আমার পিতামহের ওই তুলসী পত্রটির কথা মনে পড়ে। তিনি তৎক্ষণাৎ বিষ্ণু মন্দিরে যান। কিন্তু তুলসী পত্রটি সেখানে দেখতে পান না। খুবই আশ্চর্য হন তিনি, দুঃখিত ও হন। গুরুদেব প্রদত্ত ওই স্বর্ণ তুলসী পত্রটি হারিয়ে যাওয়ায় তিনি বিপদের আশঙ্কা করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে আমার পিতামহের গুরুদেব পুষ্প নগর রাজ্যে আসেন।
তিনি গণনা করে সমস্ত ঘটনাটি জানতে পারেন। কিন্তু তিনি সেই বিষয়ে পিতামহকে কিছু জানান না। তিনি পিতামহ কে বলেছিলেন, দুঃখ করোনা, এটা বিধির বিধান। যেভাবে ওই তুলসী পত্রটি হারিয়ে গেছে , সেভাবে একদিন ফিরে আসবে আপনা আপনি। যতদিন তা না আসে তোমরা সতর্ক থেকো,বহিঃশত্রু আক্রমণের সম্ভাবনা আছে।
আমার পিতামহ তাঁর গুরুদেবকে বলেন, কিভাবে কবে ওই তুলসীপত্রটি ফেরত পাওয়া যাবে, সেই ব্যাপারে দয়া করে যদি একটু আভাস দেন তো নিশ্চিন্ত হই।
গুরুদেব গণনা করে বলেছিলেন, তোমার বংশের কোন এক পুরুষ রাজ্য হারিয়ে, প্রায় নিঃস্ব হয়ে ,কোন একদিন কোন বিশেষ কারণে ,
মহাদেবের বর প্রাপ্ত কোন এক সুলক্ষনা কন্যাকে সেই কথা বলতে গিয়ে যদি মনের দুঃখে তোমাদের ওই বাগানে কেঁদে ফেলে ,তাহলে সেদিন তার চোখের জলে উদ্যান মৃত্তিকা সিক্ত হলে মাটির অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে আসবে ওই তুলসীপত্র। আর তারপর থেকেই তোমার পুষ্পনগর রাজ্য সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত হবে। আজ সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আমার এতটাই আনন্দ হয়েছে যে, আমি আমার পরিবারের ওই পবিত্র তুলসীপত্রের সামনে মৃত্তিকায় গড়াগড়ি খেয়ে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছিলাম।
সুমনা বলল, আপনাদের রাজ্যে কি বহিঃশত্রুর আক্রমণ হয়েছিল?
—– হ্যাঁ, আমার পিতামহ বেঁচে থাকতেই বিধর্মীরা আক্রমণ করেছিল আমার ঠাকুরদার রাজ্য, ধ্বংস করেছিল বিষ্ণু মন্দির, বিষ্ণু মূর্তিকে সিংহাসনচ্যুত করে নিক্ষেপ করেছিল রাজবাটির পিছনে এক বৃহৎ জলাশয়ে।
—— সেই মূর্তি উদ্ধারের কোন চেষ্টা করেন নি আপনারা??
—— না, ওই ঘটনার পরে শোকে দুঃখে আমার পিতামহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুকাল রোগ ভোগের পর তিনি পরলোক গমন করেন। আমার পিতা বাল্য অবস্থা থেকেই রুগ্ন ছিলেন। আমার পিতামহ দেহ রক্ষা করার কিছুদিন পরে আমার পিতা ও স্বর্গপ্রাপ্ত হন। আমার মাতা আমাকে বড় করার পাশাপাশি রাজ্যের দায়িত্ব সামলান। আমি রাজ্যভার পাওয়ার পর একবার ওই জলাশয় থেকে ওই বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোন হদিশ পাইনি।
হঠাৎ অদৃশ্য কন্ঠ বললো, আমার মনে হয় হে রাজা রুদ্র মহিপাল, এবারে ওই মূর্তির সন্ধান মিলবে ।
রাজা রুদ্রমহিপাল চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কে,কে বললেন এই কথা?
সুমনা বলল, ও আমাদের আরেক বন্ধু,যে এই অভিযানে আড়ালে থেকে সব সময় সাহায্য করে আমাদের।

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।