সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৭)

দেবমাল্য

এখনও আবছা-আবছা মনে পড়ে, মুর্শিদাবাদের প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র মেয়ে আজিমুন্নিসা বেগমের জীবন্ত কবরের কথা। তার সেই মেয়ের গল্প শুনিয়েছিলেন গাইড। তিনি বলেছিলেন, এই মেয়েটার একটা অদ্ভুত রোগ হয়েছিল। রাজবৈদ্য বলেছিলেন, ওকে রোজ একজন তরতাজা যুবকের কলিজার জুস করে খাওয়াতে হবে। তবেই ও আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠবে। তাই প্রত্যেক দিন রাতের অন্ধকারে সবার অলক্ষে একটা করে যুবককে ফুসলেফাসলে, লোভ দেখিয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে আসা হত। সম্রাট সেটা জানতেন না। যেদিন জানলেন, সেদিনই প্রকাশ্য রাজপথের ধরে তাঁকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিলেন। সেই কবরের পাঁচ-ছ’হাত ওপরে ছোট্ট একটা ঝাঁঝরি পেতে দিলেন। তার এপাশে ওপাশে বানিয়ে দিলেন কয়েক ধাপ সিঁড়ি। তিনি আবেদন করলেন, ওই পথ দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করবেন, তাঁরা যেন খালি পায়ে একবার ওই সিঁড়ি দিয়ে উঠে অন্য সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান। কিন্তু সম্রাটের আবেদন তো আর আবেদন নয়, ওটা আদেশ। সেই থেকে আজও লোকেরা খালি পায়ে একদিক থেকে উঠে অন্য দিক দিয়ে নেমে যান। আর সেই সব লোকের পায়ের ধুলো ওই ঝাঁঝরি দিয়ে গলে তার মেয়ের সমাধির ওপরে পড়ে। ওই সম্রাট বিশ্বাস করতেন, এতেই নাকি তাঁর মেয়ের পাপ খণ্ডন হবে। তাই ওই মেয়ের প্রতি করুণার জন্যই হোক কিংবা পাপ থেকে উদ্ধারের জন্যই হোক, ওরাও সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে অন্য সিঁড়ি দিয়ে নেমেছিল।
পরে, অনেক পরে দেবমাল্য বুঝেছিল, আসলে ও সব রোগটোগ কিছু নয়, মেয়েটি ছিল পুরুষ-শিকারি। প্রতিদিন তাঁর নিত্যনতুন এক-একটা পুরুষ লাগত। সারা রাত ভোগ করে সূর্য ওঠার আগেই তাকে খতম করে দিত সে।
সম্রাটদের একটি পারিবারিক কবরখানায় টিকিট কেটে ঢুকেছিল ওরা। দেখেছিল, সম্রাট, সম্রাটের বউ, তাঁদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ওই রাজপরিবারের পোষ্য কবুতরদের কবরও রয়েছে ওখানে। একটা কুকুরকেও নাকি কবর দেওয়া হয়েছিল তাঁদের পাশে। ভাবা যায়! গোটা ভারতবর্ষের সম্রাটের সঙ্গে একই কবরখানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে পায়রা আর কুকুর!

এখানে এসে ওর মনটা ভাল হয়ে গেছে। তাই রাতের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্ত মনে ও টিভি খুলে বসেছিল। কিন্তু এ কী! কী শুনল ও! এটা গুলির আওয়াজ না!
ও ঝট করে বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে চলে গেল। ভারী পর্দা সরিয়ে, ছিটকিনি খুলে, ইস্পাতের ফ্রেমে বাঁধানো কাচের পাল্লা দুটো বাইরের দিকে ঠেলে দিল। মুখ বাড়িয়ে দেখল, সবুজ ঢালু লনটা উধাও। অন্ধকার ওটা গিলে খেয়েছে। দূরে, পাঁচিলের ওপারে সরু রাস্তাতেও তেমন কাউকে দেখতে পেল না ও। তা হলে কি গুলির শব্দ শুনে সবাই পালিয়ে গেছে! নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে। তা না হলে ওই রাস্তায় অন্তত কয়েক জনকে ও নিশ্চয়ই ছোটাছুটি করতে দেখত কিংবা ছোটখাটো এক-আধটা জটলা নজরে পড়ত। কিন্তু পুরো রাস্তাটাই শুনশান। জানালা দিয়ে যতটা রাস্তা দেখা যাচ্ছে, ওই রাস্তায় কিছু দূরে দূরে স্ট্রিট লাইট জ্বলছে। তবে, তার আলো এত কম যে, এত দূর থেকে ভাল করে কিছু দেখাই যাচ্ছে না।
হঠাৎ দেখতে পেল, তার জানালার সোজাসুজি যে স্ট্রিট লাইটটা জ্বলছে, লাইট জ্বললেও জায়গাটা কেমন জানি অন্ধকার-অন্ধকার। তার নীচে জোব্বা পরা দুটি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। ওর মনে হল, ওরা তার জানালার দিকেই একদৃষ্টে চেয়ে আছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।