মুম্বাই এর এই অঞ্চলটা ততটা উন্নত নয়, বেশির ভাগটাই নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও আছে, ঠিক ধারাভি বস্তি নয়, তবে তার কাছেই । এখানে কদিন আগে গণেশ পূজো হয়ে গেল, যদিও অন্যান্য বছরের মত অত ধূ্মধাম করে নয়, তবু তো উৎসব । লকডাউন নয় এমন দিনগুলোতে মানুষ সর্তকতা অবলম্বন করে, মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পকেটে স্যানিটাইজারের বোতল হলেও মন্দিরে গেছে, ঠাকুরের মুখ দর্শন করেছে, আর মুম্বাই এর গণেশ চতুর্থী মানে টানা উৎসব, ঠিক পশ্চিমবাংলার দূর্গাপূজোর মত।
দূর্গাপুজোর কথা মনে হতেই সন্দীপনের মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। গনেশ চতুর্থী মানেই শরৎ,তার মানে দুর্গা পুজো এসে গেছে। ওর মনে পড়ে এই সময় ওদের গ্রামের আকাশ ,নীল আকাশে সাদা মেঘ, নদীর ধার কাশ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে হয়তো এতোদিনে। যদিও মা এর ফোনে জানতে পারে যে ওদের যে ওদের পাড়ায় যে পূজোটা পাঁচটা গ্রামের মধ্যে সব থেকে বড় সেই পূজোটা এ বছর হচ্ছে না । সে পূজোটা কেন ,এ বছর কোনো পূজোই হবে না , বেশির ভাগ বারোয়ারী গুলোই ঘট এনে নমঃ নমঃ করে পূজো সারবে বা বলা ভালো সারতে বাধ্য হবে। তবু তো প্রকৃতি সাজবে। মা আসবেন বলে শরৎ প্রকৃতি সেজে উঠেছে এতো দিনে । সন্দীপন ভাবে মনে মনে , নিশ্চই বাড়ির উঠোনটায় শিউলি তলা ভোরবেলা ছেয়ে থাকে শিউলি ফুলে , মা ঘুম থেকে উঠে বাসী কাপড় ছেড়ে ফুল কুড়োন। নিশ্চই মহালয়ার দিন এবারও মা ভোরবেলা উঠে দরজায় দরজায় চন্দনের তিলক দেবেন , বাহ্যিক আড়ম্বরটা না থাকলেও মনের আনন্দ তো সেই একই আছে ।
আসলে সন্দীপন, রাকেশ, রজত আর বিনোদ ওরা চার বন্ধু একসঙ্গেই পড়াশুনা করেছে । উচ্চমাধ্যমিকের পর ওদের বাড়ির তেমন অবস্থা ভালো না যে কলেজে পড়ানোর খরচ বইতে পারে ,তাই ওরা চার জন এক পরিচিত কাকুর সঙ্গে এখানে চলে এসেছে। চারজন চারটে আলাদা আলাদা অফিসে পিওনের কাজ করে। চা, ফাইল দেওয়া নেওয়া, টেবিল ঝাড়া পোছা । থাকে ধারাভির কাছেই একটা বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসাবে ,পেয়িং গেস্ট আর কি? ঐ মাসে চার জনের আট হাজার টাকা নেয়, বিনিময়ে দুবেলা খাবার আর দুবেলা চা , ঐ হোটেলে খেতে গেলে এর থেকে বেশি পড়বে, তাই এ ব্যবস্থা। এটাও ঐ কাকুই ঠিক করে দিয়েছেন।
মুম্বাইএ তো শরৎ নেই , এখানে কাশ ফুল নেই, নেই শিশির ভেজা শিউলি সকাল। মহালয়ার সকাল বেলা যদিও বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া শুনে ওদের ঘুম ভাঙ্গে নি, তবু ক্যালেন্ডার আর মোবাইলের রিমাইন্ডার জানিয়েদিল আজ মহালয়া , সকালের অ্যালার্ম সন্দীপন দিয়েই রেখেছিল। ভোর পাঁচটা ,চারজনের এই দুটো ছোট চৌকি জোড়া লগিয়ে শোয়া বিছানার একপাশে বসে সন্দীপনের হঠাৎ মন ভীষন খারাপ করতে থাকে, জানালা দিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু শুধুই চোখে পড়ে ইট পাথরের বিল্ডিং, হঠাৎ রাকেশের ঘুম ভাঙে সন্দীপকে বসে থাকতে দেখে রাকেশ জিজ্ঞাসা করে , “কি রে এতো সকালে উঠলি যে ? ” “মন খারাপ করছে যে খুব ।” সন্দীপ ভারী গলায় জবাব দেয় “কেন ? ” রাকেশের উত্তরে যেন প্রায় কান্না ভেজা গলায় সন্দীপন বলে ,”আজ মহালয়া, প্রতি বছর দেখতাম মা ধূ্প জ্বেলে পূজা করতো, খুব মিস করছি রে।” রাকেশ ও উঠে বসে, ওর ও সন্দীপনের কথা শুনে বাড়ির কথা মনে পড়ে। ও বলে “ দূর এই লকডাউন না হলে তো বাড়ি চলে যেতাম । ” “গিয়ে কি করতিস ? “,বিনোদের আওয়াজ পেয়ে ওরা অবাক হয়, ওদের কথার শব্দে কখন যে বিনোদের ঘুম ভেঙ্গে গেছে ওরা বুঝতে পারেনি। ওর এই ধরনের কথা শুনে সন্দীপন বলে ,”কেন একথা বলছিস কেন ? “,”বাড়ি ফিরে গেলে কি খেতাম? দরকার ছিল বলেই তো বাড়ি ছেড়েছি ! ” “কিন্ত পুজোতে তো বাড়ি যাওয়ার ঠিক ছিল”। সন্দীপন উত্তর দেয়, “হ্যাঁ কিন্তু ,যাওয়া হয়নি ,তো হয়নি। তোদের কথায় ঘুম ভেঙ্গে মাথা ধরে গেছে এবার বকবক বন্ধ করে ঘুমাতে দে”, বিনোদ বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শোয় । অন্যজন তখন গভীর ঘুমে অচেতন কিন্তু সন্দীপন আর ঘুমাতে পারেনা ,সন্দীপন বলে “রাকেশ বল এই সময় কাশ ফুলে ফুলে নদীর ধার একেবারে সাদা হয়ে যায় “,”হ্যাঁ রে “,রাকেশ সায় দেয় । আর এতদিনে প্রতিবছর ক্লাব এর ঠাকুর একেবারে রেডি, শুধু চক্ষুদান আজ হবে “,সন্দীপন যেন ছোট্ট শিশু হয়ে যায় ,ওর মনে ফেলে আসা গ্রাম, পুজোর স্মৃতি একেবারে শেকড় ধরে টানতে থাকে । ও বলতে থাকে ,”তোর মনে আছে রাকেশ ,গতবার মহালয়ার দিন আমরা ফিস্ট ,করেছিলাম, মাংস আর ভাত । এই বিনোদটা সব পুড়িয়ে ফেলেছিল” ,বলে আলতো করে একটা লাথি মারে বিনোদের পায়, বিনোদ সঙ্গে সঙ্গে বলে “মোটেই না তোমাদের ও দোষ ছিল। তোমাদের দেখতে বলেছিলাম ,তোমরা সব বেহাল হয়ে পড়েছিলে
।” সন্দীপন মজা করে, “নিজে রাঁধতে পারিস না তাই বল !” “কে রাঁধতে পারে না? “বিরোধিতা করতে উঠে বসে বিনোদ, ” প্রতিবার আমিই রাঁধি, এবার থেকে আর রাঁধব না।” রজত ততক্ষণ ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। জড়ানো গলায় বলে, “আগে তো বাড়ি যাই ,তবে তো !এখানে না জানি আর কতদিন থাকতে হবে ?” পূজার দিনগুলোর আনন্দ মনে করে যে খুশির হাওয়া উঠেছিল, রজতের কথায় সঙ্গে সঙ্গে সেখানে নেমে এলো ভয়ংকর বিষাদের ছায়া। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ চারটি তরুণের মন ছুটে গেলো, তাদের ফেলে আসা গ্রাম ,গ্রামের মাঠ, ঘাট নদীর ধারের কাশফুল ,বাড়ির উঠোনের শিউলিতলায়। সুদূর মহারাষ্ট্রে তাদের শরীর পড়ে থাকলেও এক মুহূর্তের জন্য তারা একবার ঘুরে এলো তাদের অত্যন্ত প্রিয় জন্মভূমি তাদের গ্রাম থেকে । রুটি-রুজির জন্য যার থেকে তারা আজ দূরে অনেক অনেক দূরে।