ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৪৮)

সুমনা ও জাদু পালক

—–কী করেছিল হূডু?
—— মুহূর্তের মধ্যে জাদুকাঠি ঘুরিয়ে মন্ত্র পড়ে আমাকে ব্যাঙ করে দিল। দুটো ডানা লাগিয়ে দিয়ে বলল, ‘যা ,এবার উড়ে উড়ে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়া আর সবাই তোকে দেখে হাসুক।’ আমি খুব কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাইতে লাগলাম তার কাছে। কিন্তু সে আমাকে দয়া করেনি। এরপর সে মন্ত্র বলে আমাদের গোটা রাজ্যটাকে একটা মরুভূমি করে দিল।
——- আর রাজ্যের মানুষেরা?
——- তারাও তার মন্ত্রের প্রভাবে সবাই গাছ হয়ে গেল। কেউ খেজুর গাছ, কেউবা কাঁটার ঝোপ, কেউবা অন্য কিছু।
——আর তোমার মা-বাবা?
——তারা মরুভূমির মাঝে এক মরুদ্যানে একজোড়া গাছ হয়ে গায়ে গা লাগিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে আজও।
—– কি সাংঘাতিক!
——- হ্যাঁ , এটাই আমার জীবনের ইতিহাস। মনের দুঃখে এদিকে সেদিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ চলে এসেছিলাম তটিনি নদীর তীরে, যেখানে নদীর পাড়ে শুয়েছিল বানর রাজকুমার। আর অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার পায়ের আঘাতে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আমি সত্যি বলছি রাজকুমারী রত্নমালা, আমাকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্ত করে দিলে এই বানর রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে এক ছোট্ট পাহাড়ের উপরে আমি চিহ্নিত করতে পারব সেই লতা,যার মূলের রস মাত্র তিন দিন চোখে লাগালেই বানর রাজকুমার সুস্থ হয়ে যাবে ।
—— তোমাকে ছেড়ে দিলে তুমি যে পালিয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কি রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা?
——- প্রয়োজনে বানর রাজার সৈন্যরা আমাকে হাত-পা বেঁধে সেখানে নিয়ে চলুক। তারপর আমার দেখানো লতার মূল তুলে নিয়ে আসুক।
—- কিন্তু আমি একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে, বারবার তুমি লতা চিহ্নিত করার কথা ,অন্যদের সাহায্যে লতার মূল তোলার কথা
কেন বলছ?তুমি নিজে ওই লতার মূল তুলে আনছ না কেন?
সুমনার কথা শেষ হতে না হতেই ব্যাঙ রাজকুমারী আবার কেঁদে উঠলো, হাউ হাউ করে।
সুমনা জিজ্ঞাসা করল,একি,আবার কাঁদছ কেন তুমি?
কাঁদতে কাঁদতেই ব্যাঙ রূপী রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা উত্তর দিল, আমি তো তোমাদের মত মানুষ নই যে,লতার গোড়া খুঁড়ে মূল তুলে আনব!
অদৃশ্য কন্ঠ বলে উঠলো, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা, আপনি তো জাদুকর হূডুর জাদু মন্ত্রের প্রভাবে এই অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন। আমার মনে হয়, বাবা ভোলানাথের আশীর্বাদে আপনি জাদু মন্ত্রের প্রভাব কাটিয়ে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরতে পারবেন।
—–কি বলছেন আপনি!
—- দেখা যাক চেষ্টা করে। রাজকুমারী রত্নমালা, তোমার কাছে মহাদেবের আশীর্বাদী যে চতুর্থ বিল‌্বপত্রটি আছে, সেটি একবার রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার শরীরে ছুঁইয়ে দাও তো।
সুমনা বলল,এক্ষুণি দিচ্ছি।
ব্যাঙ রাজকুমারী বলল, কিন্তু আমি তো দেবী মহামায়ার ভক্ত। শিব ঠাকুর কি আমাকে দয়া করবেন?
সুমনা বলল, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা ,বাবা ভোলানাথ তো মহাদেবী মহামায়ার পতি।তুমি মা মহামায়াকে প্রণাম জানিয়েই বাবা ভোলানাথের নাম স্মরণ কর,তাঁর আশীর্বাদ ভিক্ষা কর।
ব্যাঙ রাজকুমারী চোখ বন্ধ করলো।তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।
সুমনা তার পোশাকের অভ্যন্তরে সযত্নে রক্ষিত বিল্বপত্র বের করে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল খাঁচায় বন্দি রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার কাছে। বাবা মহাদেবের নাম স্মরণ করে বেলপাতাটি ব্যাঙ রাজকুমারীর গায়ে ঠেকাতেই এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত ব্যাঙ পরিবর্তিত হয়ে গেল এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যায়।
কন্যার পরনে অতীব সুন্দর রাজ পোশাক, সারা শরীরে ঝলমল করছে হীরা মুক্তা খচিত সোনার গয়না।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, হে বানর রাজ মহাগ্রীব, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা যে সমস্ত কথা সত্যি বলেছিল ,তা প্রমাণ হয়ে গেছে। আপনি দয়া করে ওকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিন। রাজকুমারী আপনার রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত পাহাড়ের উপর থেকে সেই বিশেষ লতার মূল সংগ্রহ করে আনুক। আমার বিশ্বাস,ওই বিশেষ লতার মূলের রসে বানর রাজকুমারের চোখ ভালো হয়ে যাবে।
—– কিন্তু মুক্তি পেয়ে ও যদি পালিয়ে যায় তাহলে……?
—– আমার দৃঢ় বিশ্বাস,ও পালাবে না।
সুমনা বলে, বানর রাজকুমারকে সুস্থ করার জন্য এটুকু চেষ্টা তো আমাদের করতেই হবে।
দুধরাজ দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাদের সাহায্য করবে দ্রুত আপনার রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে পৌঁছাতে । রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার সঙ্গে আমিও যেতে পারি ওই পশ্চিম সীমান্তে।
অদৃশ্য কন্ঠ বললো, তার কোন প্রয়োজন নেই রাজকুমারী রত্নমালা। দুধরাজের পিঠে আরোহন করে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা কে একাই যেতে দেওয়া হোক ওই পাহাড় থেকে লতার মূল সংগ্রহ করতে। এটুকু ভরসা আমরা রাজকুমারীর উপর করতেই পারি।
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা হাত জোড় করে বলল, আড়াল থেকে আপনি কে কথা বলছেন, আমি জানিনা। তবে আমার উপর আস্থা প্রকাশ করার জন্য আমি আপনাকে করজোড়ে নমস্কার জানাই, জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।
বানর রাজ খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে বলল, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা, আশা করি আপনি আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, আপনার কারণে বানর রাজকুমারের ক্ষতি হয়েছে। ওকে সুস্থ করে আপনি আপনার কর্তব্য পালন করুন।
—— তাই হবে হে বানরাজ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি ওই লতার মূল সংগ্রহ করে শীঘ্রই ফিরে আসবো।
কিছুক্ষণ পরেই দুধরাজের পিঠে চেপে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে রওনা হল বানর রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তের উদ্দেশ্যে।

চলবে..

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।