সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৮)

দেবমাল্য

তখন এ সব ছিল। ঘরে ঘরে চা-কফি চালু করার জন্য ইংরেজরা কী-ই না করেছে। কফি বোর্ড গঠন করে সারা দেশের সব ক’টা বড় শহরে একাধিক করে কফিহাউস খুলেছে। যতক্ষণ খুশি আড্ডা মারো, বসে বসে বিনে পয়সায় ইলেকট্রিক পাখার হাওয়া খাও, কেউ কিচ্ছু বলবে না। কিন্তু তার বিনিময়ে এক কাপ কফি খাওয়া চাই। পকেটে যদি তেমন রেস্তো না থাকে, তিন জনে মিলে একটা কফি ভাগ করে খাও। তাও খাও। খেতে খেতে কফি খাওয়ার নেশা হোক।

শোনা যায়, প্রথম দিকে নাকি ফ্রি-তেই কফি খাওয়াত ওরা। সেই কফিহাউসগুলো এখনও আছে। তার মধ্যে কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস তো জগদ্বিখ্যাত। আগে নাম ছিল অ্যালবার্ট হল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ওখানে গিয়েছিলেন। এক সময় ওখান থেকেই গোটা কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছিল একাত্তর-বাহাত্তর সালের সব চেয়ে বর্ণময় রাজনৈতিক আন্দোলন— নকশাল মুভমেন্ট। বিখ্যাত গায়ক মান্না দে তো কফিহাউস নিয়ে একটা গানই গেয়ে ফেলেছেন— কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই / কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো / সেই…

তবু কফি নয়, ভেতো বাঙালিরা একদিন যাতে ঘুম থেকে উঠেই চায়ের জন্য ছটফট করেন, সেজন্য প্রচুর উদ্যোগ নিয়েছিল ওরা। তার মধ্যে প্রথম এবং প্রধান ছিল, এদেশের লোকের কাছে চা পানের উপকারিতা তুলে ধরা। তখনকার লোকেরা নাকি উপকার হবে জানতে পারলে, বিষ খেতেও পিছপা হতেন না। তাই তারা রটিয়েছিল, চা খেলে শ্লেষা হয় না। কর্মক্ষমতা বাড়ে। ক্লান্তি দূর হয়। আরও কত কী…

কী? আর কী কী? সেটা দেখার জন্যই সেই টিনের পাতে চোখ রাখল দেবমাল্য। কিন্তু চলটা উঠে মাঝে মাঝেই অক্ষরগুলো ঝরে পড়েছে দেখে কোনও লাইনই গড়গড় করে পড়া যাচ্ছে না। পড়া তো দূরের কথা, উদ্ধারও করা যাচ্ছে না পুরো বাক্যটা কী! তা ছাড়া চা খাওয়ার জন্য হঠাৎ হঠাৎ দোকানের সামনে লোকজন দাঁড়িয়ে পড়ায়, তাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে লেখাগুলো।

চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে দেবমাল্য দেখল, চা-টা একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। ও আরও এক কাপ নিল। পাশে তাকিয়ে দেখে গাড়ি করে যে ওকে নিয়ে এসেছে, সেই ড্রাইভারটা নেই। ইতিউতি তাকিয়ে দেখে ওদিকের ঝুড়িতে ভাঁড় ফেলে সে এগিয়ে আসছে। ও তাকে বলল, আর একটা চা খাবে নাকি?

ড্রাইভার বলল, না না, এই তো খেলাম।

তার কথা শেষ হল কি হল না, মাইকে ঘোষণা— লালগোলা প্যাসেঞ্জার এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে। দেবমাল্য বলল, রোজই লেট করে নাকি?

ড্রাইভার বলল, না না, এটা তো রাইট টাইমেই আসে। তবে খুব বেশি কুয়াশা পড়লে হেড লাইটের আলোতেও চার হাত দূরে কী আছে, অনেক সময় দেখা যায় না। সিগনাল দেখার ক্ষেত্রেও চোখ প্রতারণা করে। আর তাতেই অ্যাক্সিডেন্টের সম্ভাবনা শতগুণ বেড়ে যায়। ট্রেনচালকদের ক্ষেত্রে এটা খুব হয়। সিগনাল লাল হয়ে থাকলেও ওঁরা সবুজ দেখেন। আবার সবুজ হয়ে থাকলেও হলুদ দেখতে পারেন। দীর্ঘক্ষণ ট্রেন চালালে নাকি ড্রাইভারদের এ রকম ভ্রম হামেশাই হয়। তাই প্রতি ছ’মাস অন্তর ট্রেনচালকদের চোখ পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। সদ্য পরীক্ষা করিয়ে এলেও ট্রেনচালকদের ধন্দ কিন্তু মন থেকে যায় না। ফলে কুয়াশা হলেই ওঁরা সতর্ক হয়ে যান। তখন খুব আস্তে আস্তে ট্রেন চালান। বলা তো যায় না, কখন কোথা থেকে কার গরু-ছাগল হুট করে রেল লাইনে উঠে আসে। আর তাতেই তো লেট হয়ে যায় আসতে। সে হোক। দুর্ঘটনায় পড়ার চেয়ে লেট হওয়া ভাল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।