ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১)

দেশ-বিদেশের মানুষ গো যাও
বীরভূমের পরম শ্রদ্ধেয় কবি স্বর্গীয় আশানন্দন চট্টরাজ গান লিখেছিলেন,
” দেশ-বিদেশের মানুষ গো যাও এই বীরভূম ঘুরে,
যেথা বৈরাগী আকাশের তলে মন মাতে বাউল সুরে।
কেন্দুবিল্ব আর সে নানুর জয়দেব কবি- চন্ডীদাসের ধাম,
আছে নলহাটীর নলাটেশ্বরী তারাপীঠে বামাক্ষ্যাপার নাম,
বক্রেশ্বর কঙ্কালীতলা ,ফুল্লরা মা লাভপুরে।
ভান্ডির বনে ভান্ডিশ্বর শিব, পাশে তার গোপাল করেন লীলা,
আছেন সাঁইথিয়ায় নন্দীকেশ্বরী, দুবরাজপুরে মামা ভাগ্নে শিলা,
নিত্যানন্দের জন্মভূমি, গর্ভাবাসে দেখবে তুমি,
পাবে এই জেলার অতীত কাহিনী রাজধানী রাজনগরের ভিত খুঁড়ে।
বাদশাজাদী ওই শেরিনা হেতমপুরের বুকে,
বর্গী সনে লড়াই করে ঘুমায় মনের সুখে।
ময়না ডালের মহাপ্রভু, ভুল করো না দেখতে কভু,
আছে তিলপাড়ার ময়ূরাক্ষী -বাঁধ সদর সিউড়ি হতে নয় দূরে।”
বীরভূম নামটা উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের আকৃতি আউল বাউল ফকির দরবেশের দেশ বলে পরিচিত রাঙ্গামাটির জেলা বীরভূমের গ্রামে গঞ্জে শহরের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে থাকা অজস্র মন্দির ,মঠ, ভাস্কর্য, মূল্যবান প্রত্ন সামগ্রী, ইতিহাসের অজস্র দলিল, অজস্র পৌরাণিক কাহিনী আর লোক কথা।
বর্তমানের ৪৫৬২.১৪ বর্গ কিলোমিটারের এই ভূমি খণ্ড আগে ছিল বৃহদাকার।এর সীমানা ছোটনাগপুর থেকে রাজমহল পর্বতমালা এবং কর্ণসুবর্ণ( বর্তমানে মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত)
থেকে বাঁকুড়া জেলার অনেকখানি জুড়ে। আর ছিল সমগ্র সাঁওতাল পরগনার সম্পূর্ণাংশ,দেওঘর, মধুপুর , গিরিডি পর্যন্ত শুধু নয়, পরেশনাথ পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। যুগে যুগে ইতিহাসের উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ হতে হতে এই বীরভূম জেলা আজকের আকৃতিতে পৌঁছেছে।
এই বীরভূম ঠিক কবেকার তার সঠিক তথ্য পরিবেশন করা দুরূহ।
চন্দ্রবংশীয় বলি রাজার পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে ও দীর্ঘতমা ঋষির ঔরসে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ সুহ্ম ও পুণ্ড্র নামে পাঁচপুত্র জন্মগ্রহণ করেন। এই পঞ্চপুত্রের নামেই পাঁচটি প্রদেশের নামকরণ করা হয়।” মহাভারত বিষ্ণু পুরাণ ও গড়ুর পুরাণে
অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ,পুণ্ড্র ও সুহ্ম এই পঞ্চ প্রদেশের নাম উল্লেখিত আছে।”
উপরোক্ত পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে সুহ্ম নামক প্রদেশের অন্তর্গত রাঢ়দেশের মধ্যেই যে আজকের বীরভূম জেলা, পন্ডিতেরা
সে বিষয়ে একমত।
” পান্ডবগণের রাজসূয় যজ্ঞ কালে ভীমের পূর্ব দ্বিগবিজয় প্রসঙ্গে মহাভারতে সুহ্ম দেশের উল্লেখ আছে।….’
“!!অঙ্গোবঙ্গঃ কলিঙ্গশ্চ পুণ্ড্র সুহ্মশ্চ তে সুতাঃ। তেষাং দেশাঃ সমাখ্যাতাঃ স্বনামকথিতা ভুবি।।”—মহাভারত,আদিপর্ব,১০৪ অধ্যায়।
একসময় উত্তর পশ্চিম মুর্শিদাবাদ(ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়)এবং সমগ্র বীরভূম উত্তর লাঢ়(রাঢ়) নামে পরিচিত ছিল।
দাক্ষিণাত্যের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের তিরুমালা লিপিতে উত্তর রাঢ়ের (উত্তির লাঢ়ম) উল্লেখ আছে।
সুতরাং এহেন প্রাচীন জনপদের এখানে ওখানে যে ছড়িয়ে থাকবে ইতিহাস,কাহিনী আর লোকগাথা তাতে আর আশ্চর্য কী!
চলবে