ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৫২)

সুমনা ও জাদু পালক
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা এইভাবে ধীরে ধীরে সেই বিশেষ লতার রক্তবর্ণ শিকড় গুলিকে দু টুকরো পাথরের সাহায্যে এবং হাতের চাপে পিষ্ট করে রস সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। শিকড় গুলিকে বাইরে থেকে দেখতে শুকনো এবং খুব শক্ত মনে হলেও সেগুলির ভিতরে যথেষ্ট পরিমাণ রস সঞ্চিত ছিল।
সুমনা , বানর রাজ মহাগ্রীব ও মহারানী তারা খুব আগ্রহ সহকারে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার রস নিষ্কাশনের কাজ দেখছিল। বৃদ্ধ রাজপুরোহিত তখনো চোখ বন্ধ করে এক মনে কি যেন মন্ত্র জপ করে চলেছেন।
এভাবে দুটি পাথরের সাহায্যে ও হাতের চাপে চন্দ্রকান্তা যেভাবে রস নিষ্কাশন করছিল তা দেখে সুমনা বুঝতে পারছিল যে ,রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা শুধু দেখতেই সুন্দরী নয়, সে যথেষ্ট শক্তিশালী ।হাতের কবজিতে যথেষ্ট জোর ও আছে তার।
আরো কিছুক্ষণ পরে রস নিষ্কাশনের কাজ সম্পূর্ণ হলে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা সুমনাকে বলল, রাজকুমারী রত্নমালা,
আমি এইবার এই রস বানর রাজকুমারের চোখের উপর প্রয়োগ করতে চাই। তুমি দয়া করে বানর রাজ মহাগ্রীবের অনুমতি প্রার্থনা করে আমাকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে এবং বানর রাজকুমারকে সুস্থ করতে সাহায্য কর।
—— বেশ, তাই হবে।
সুমনা বানররাজের কাছে রাজকুমারের চোখে রস প্রয়োগ করার অনুমতি চাইতেই মহাগ্রীব বললেন, রাজকুমারী রত্নমালা, এই রস আমার পুত্রের চোখে প্রয়োগ করে আরো মারাত্মক কোন ক্ষতি হবে না তো,?
—– এই মুহূর্তে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার উপরে ভরসা করা ছাড়া তো আর কিছু করণীয় নেই মহারাজ মহাগ্রীব।
মহারানী তারা এতক্ষন চুপচাপ ছিলেন।
সুমনার কথা শুনে তিনি বললেন, ঠিক বলেছেন রাজকুমারী রত্নমালা, চন্দ্রকান্তার উপরে আমাদের ভরসা করতেই হবে।
তারপর তিনি হাত জোড় করে বানর রাজকে বললেন, হে বানর রাজ, দয়া করে আমার পুত্রের চোখে ওই রস প্রয়োগ করার অনুমতি দিন। রাজকুমারী রত্ন মালার মত আমারও বিশ্বাস , চন্দ্রকান্তা ওই লোহিত বর্ণ রস প্রয়োগ করে আমার পুত্রকে সুস্থ করে তুলতে পারবে।
— বেশ ,আমি অনুমতি দিলাম।তবে….
—-কী মহারাজ?
—– আমি এই ব্যাপারে পুনরায় চন্দ্রকান্তা কে সাবধান করে দিয়ে বলছি, এই রস প্রয়োগ করার পরে যদি আমার পুত্রের চোখের উন্নতি না হয় বা আরো অবনতি হয় তাহলে আমি চন্দ্রকান্তাকে শাস্তি দেবো ,কঠোর শাস্তি ।
—- তাই হবে হে বানর রাজ।
চন্দ্রকান্তা স্বর্ণ পাত্রে সঞ্চিত রক্তবর্ণের রস নিয়ে বানর রাজকুমারের কাছে গেল। তারপর নিজের পোশাকের ভিতর থেকে একটি সাদা রঙের পাখির পালক বের করল। এরপর বানর রাজ্যের দেবী মায়ের উদ্দেশ্যে করজোরে প্রণাম জানানোর পর ওই পালকের সাহায্যে রক্তবর্ণের রস বানর রাজকুমারের চোখের চারিদিকে ধীরে ধীরে লাগাতে শুরু করলো। ওই রস বানর রাজকুমারের চোখের চারিদিকে লাগানো মাত্র সে ঘনঘন কাঁপতে শুরু করলো।
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন বানর রাজ। তাঁর চোখের তারায় ফুটে উঠলো শঙ্কা ও উদ্বেগ।
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা সেদিকে না তাকিয়ে আপন মনে কিছুক্ষণ পরপর বানর রাজকুমারের চোখের চারিদিকে পালকের সাহায্যে রস লাগাতে থাকলো। তাকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল।বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল সে। হয়তো বিশেষ কোন মন্ত্র বলছিল বা প্রার্থনা জানাচ্ছিল কোন অদৃশ্য শক্তির কাছে।
মন্দির অভ্যন্তর ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছিল।
বানর রাজপুরীর ভিতর থেকে দুজন বানর অনেকগুলো মশাল এনে মন্দিরের চারদিকে এবং সামনের খোলা জায়গায় পাহাড়ের গায়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে উঠলো চারদিক।
সারারাত ধরে অসীম ধৈর্য সহকারে সেই রক্ত বর্ণের তরল ওষুধ প্রয়োগ করে গেল রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা।
ধীরে ধীরে রাত বাড়তে থাকে। বানর রাজের অনুরোধে সুমনা অল্প ফলমূল ও পানীয় গ্রহণ করতে রাজি হলেও চন্দ্রকান্তা কিছুই খেতে রাজি হলো না। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল , সে যেন এক কঠিন সাধনায় মগ্ন হয়েছে। বানর রাজকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বোধহয় সে আসন পরিত্যাগ করবে না। সারারাত কেটে গেল। কেউ দু চোখের পাতা এক করলো না।
এক সময় রাতের আঁধার কেটে গিয়ে প্রভাত হল। সুমনা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলো যে, বানর রাজকুমারের দু চোখের চারদিকে যে ফোলা ভাবটা ছিল ,তা কমে গিয়ে যেন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
এভাবে আরো দুটো রাত কেটে যাওয়ার পর তৃতীয় দিন ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালো বানর রাজকুমার। চোখের দৃষ্টি তার স্বাভাবিক। সে চোখের তারা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক করে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো। মনে হচ্ছিল, সে যেন কাউকে খুঁজছে। একটু দূরে দেবী মায়ের সামনে হাতজোড় করে বসে থাকা মহারানী তারার দিকে চোখ পড়তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। মাকে চিনতে পেরেছে সে । মহারানী তারা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন,” আমার খোকা সুস্থ হয়ে গেছে মহারাজ। ও আমাকে চিনতে পারছে। ”
—– তুমি ঠিক বলছো , আমাদের পুত্র সুস্থ হয়ে গেছে?
—— হ্যাঁ মহারাজ।
মহারানী তারা ছুটে এসে পুত্রকে কোলে তুলে নিলেন। তার মুখে, সারা শরীরে চুম্বন দিয়ে আদর করতে লাগলেন। খিল খিল করে হেসে উঠলো বানর রাজকুমার।
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে সুমনার চোখে জল চলে এল। কতদিন মাকে দেখেনি সে। কতদিন মায়ের ছোঁয়া পায়নি। মায়ের জন্য মন কেমন করে উঠলো তার।
চলবে