রাজেন্দ্র রাজনীতি জানে না, বোঝেও না। তবে খিদেটা ভালোই বোঝে। আর বোঝে ওর অক্ষমতা।
নাম রাজেন্দ্র হলে কি হয়, রাজা বা ইন্দ্র এর কারো সাথে ওদের পরিবারের যুগ যুগ ধরে কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে নাম এতো গালভরা, রাশভারী কেন?
ওর বাবা ফকরা মানে ফকির চাঁদ যে বাবুর বাড়ি মুনিষ খাটতো,তার ছেলের নাম ছিল রাজেন্দ্র। তার যেমন সুন্দর চেহারা তেমনি ভাগ্য!
তাই হয়তো ফকির চাঁদ ভেবেছিল রাজেন্দ্র নাম রাখলেই বোধহয় ছেলের ভাগ্য ফিরবে! ফকির চাঁদের মত ফকির হয়ে আর জীবনটা কাটাতে হবে না।
অদৃষ্ট বোধহয় এই নাম রাখা দেখে মনে মনে হেসেছিলেন।তাই রাজেন্দ্র হবার বছর পাঁচেকের মধ্যেই ফকির চাঁদ ছেলের রাজা হবার স্বপ্ন পৃথিবীতে রেখেই পাড়ি দিল সেই সুখ দুঃখ ছাড়া অসীম আনন্দ লোকে।
রাজেন্দ্র ওই মানুষ হলো কোনোরকম। আলুটা, চালটা,গাঁ গঞ্জে শাক পাতার তো আর অভাব নেই, অভাব নেই বড়ি দেওয়া, কাঁথা সেলাই বা ধানসেদ্ধ, চাল ঝাড়া, মুড়ি ভাজার মত কাজের।
তাই ফুলুরানী আর রাজেন্দ্রর দিন যেতে লাগলো, গায়ে গতরে রাজেন্দ্র বড় হলো, তার বিয়ে হলো, ষষ্ঠী ঠাকুরের কৃপায় তিন তিনটে মেয়ে হলো, শেষে বৌ পূণ্যির কোল আলো করে এলো ছেলে!
ফুলুরানী নাতির নাম রাখলো উকিল। কাদের বাড়ির ছেলে নাকি উকিল হয়েছে, তাতে নাকি শহরে এসে তার বেশ পসার। কাঁচা ঘর পাকা হলো, বিয়েতে ছেলে খাট পালং পেলো, একটা ভটভটি মানে মোটর সাইকেল পেল, বৌ গা ভরতি গয়না পেল।
ফুলুরানী, রাজেন্দ্র আর পূণ্যি তিন মেয়ে যেমন তেমন ছেলে মানুষ করতে লাগলো প্রাণপণ। মেয়েরা জল ভরে, উঠোন নিকোয়,লোকের বাড়ি যখন ফুলুরানী ধানসেদ্ধ করতে যায় ঠাকমার হাতে হাতে একটু এগিয়ে দেয়।
উকিল আদরে আবদারে বড্ড লায়েব। তার ভাব ই আলাদা। সে পুরো পরিবারের স্বপ্ন। পুরো পরিবার স্বপ্ন দেখে সে একদিন তার নামের সার্থকতা বজায় রাখবে ঠিক!
ছেলের কথা যেন বেদবাক্য। যা বলবে তাই সই। ছেলে যদি চাঁদ চায় তো রাজেন্দ্র পারলে তাই এনে দেয়। মুনিষ খেটে সাজোয়ান রাজেন্দ্র বেশ দু পয়সা কামায়।
শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে রাজেন্দ্র একদিনের জন্য ও কামাই করে না কাজ, আর ভালো মানুষ দেখে ওর কাজ ও জুটে যায়! কোনো কাজে যে ওর না নেই!
উকিল ইস্কুলে শুনেছে, কলকাতা এক বিরাট শহর, ওর বন্ধু ফটকে নাকি সেবার পূজোর বাপের সঙ্গে কাঁসি বাজাতে গিয়ে দেখে এসেছে। ফটকের বাপ রতন ঢাকি, ফি-বছর ঢাক বাজাতে কলকাতা যায়। এবার ফটকেও গেছিলো।
সে নাকি বিরাট শহর, কত বড় বড় গাড়ি, কতো আলো, কত লোকজন, ভিড়! মানুষ জন কি সুন্দর দেখতে, কি সুন্দর জামা পড়ে। ওদের এই বাউরে তো ভালো জামা বলতে সস্তার ছিটের জামা। ওখানে মেয়েদের গাল মুখ নাকি সব সময় চকচক করে।
শুনে উকিলের ও বড় ইচ্ছা কলকাতা যাবে। সে বায়না ধরে বাপের কাছে, “আমি কোলকেতা যাবো। ” ব্যাস অমোঘ সে বাণী। ছেলে “কোলকেতা” যেতে চেয়েছে আর সে বাপ হয়ে নিয়ে যাবে না, তাও কি হয়? কিন্তু যাবে কি করে? কি করে যায় সেখানে?
শুনেছে “টেরেনে চেইপে” যেতে হয় কিন্তু রাজেন্দ্রর দৌড় তো ওই সাহেব নগর বড় কালীর মেলা। তাও বৌ ছেলে নিয়ে সাইকেলে। একবার “অঘ্যদীপে” গেছিলো, সেই লড়ি চেপে। কিন্তু “টেরেন’?
সে সুযোগ ও “ভগমান কইরি দিলেন”। ভোট পূজো দেখতে দেখতে চলে এলো। ফাঁটাফুটি মাটির দেওয়াল গুলোতে চুনের প্রলেপ পড়লো। কত সব ছবি আঁকা হল, “ভোট দিন, ভোট দিন”, লেখা হলো। আর রাত্তিরে মুরগির মাংস আর গরমাগরম ভাত হল।
“সেই ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মাঝখানে খোঁদল কইরি তাতে ডাবু হাতা দি লাল লাল মাংসের ঝোল আর আলু” ঢেলে দিলো সাদেক খুড়ো। মাংস ও! বড় বড় চার পিস!
সঙ্গে উকিল কেও নিয়ে যায় রাজেন্দ্র। আহা ছেলেটাকে ছেড়ে কি খাওয়া যায়? যেন অমৃত! “টকটকে লাল ঝোল আর মাংস দেইখি ছেইলি কি খুশি!” মেয়েরা ফুলুরানী আর পূণ্যির সঙ্গে রেশনের দুটাকা কেজি চালের ভাত আর মুসুর ডাল পেঁয়াজ ফোরণ দিয়ে আলুসেদ্ধর সঙ্গে খেলো। ওদের একটু রাগ রাগ হয়! কিন্তু একটা মাত্র ভাই, মা বলেছে ও বড় হলে রোজ রোজ মাংস হবে, রোজ!
পরদিন সকাল সকাল বেড়োতে হবে, “কোলকেতা” যেতে হবে। সাদেক খুড়ো “বলিচে কিচ্ছুটি না”, শুধু বাসে চেপে যাওয়া আর আসা। “পঞ্চাশ টি ট্যাকা দেবে, টিপিনে পাঁরুটি ঘুগনি দেবে আর দোফরে হোটেলে মাছ ভাত। “সাদেক খুড়ো কে বলে এসেছে রাজেন্দ্র।” উকিল ও যাবে।” সাদেক খুড়ো বড় ভালো মানুষ,” বলিচে, “তা যাক, লোক হওয়া নিয়ে কতা!”
বাস চলছে হু হু করে, মাঝে মাঝে সবাই পাটির গান টা বলছে, “গান লয় শোলোগান।” মাঝে মাঝে রাজেন্দ্র আর উকিল ও গলা মেলাচ্ছে।কি খুশি উকিল, কি খুশি গরীব গুর্বো মানুষ গুলো। মাঝে এক জায়গায় বাস দাঁড়িয়ে সবাই হালকা হয়। তারপর চা, পারুটি,ঘুগনি। যে যতো পারো খাও। রাজেন্দ্র বেশি করে রুটি নেয়, লুকিয়ে রাখে থলেতে,পুতুল, পুলু, আর পুতুর জন্য। যত ই হোক বাপ তো।
রাস্তা যখন প্রায় শেষ শেষ, কতো লোক, কতো গাড়ি,কতো ভিড়। বাব্বা! এতো লোক। বাস থেকে উকিলের হাত ধরে নামে রাজেন্দ্র। হাঁটতে থাকে দলের লোকেদের সঙ্গে। হাঁটছে, হাঁটছে, হাঁটছে আর গাইছে সেই “শোলোগান”। যা সবাই বলছে ওরাও তাই বলছে। চারিপাশের এতো ভিড়, এতো লোক, শুধু মাথা আর মাথা আর ঠ্যালাঠ্যালি! “দেখছিস বাপ একেই বলে শহর! কোলকেতা শহর! উকিল, উকিল! “
নিজের হাতের দিকে তাকায় রাজেন্দ্র। ছেলে কই? বাঁ হাতে বাজারের থলেটা যাতে মেয়েদের জন্য রুটি ভরা আর ডানহাত, সেই হাতেই তো ছেলে ধরা ছিল, কোথায় গেল?
“উকিল, উকিল”, ভিড় ঠেলে পেছন দিকে যেতে চায় রাজেন্দ্র, “উকিল উকিল”, চিৎকার করে,তার চিৎকার ঢাকা পড়ে যায় শ্লোগানে, হাজার রকম দাবি দাওয়ায়।ভিড় ঠেলে ছেলে খুঁজতে গিয়ে ভিড়ের চাপে এগোতে থাকে সে মিটিং মঞ্চের দিকে। ভিড় যেন তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়!
ওদিকে একটা কচি গলা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে, খুঁজতে থাকে তার বাবাকে, কিন্তু দুজনের গলাই ঢাকা পড়ে যায় শ্লোগানে।