T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সমীরণ সরকার

মাটি
একটু আগেই সেই ভয়ংকর খবরটা জানতে পেরেছেন বিশ্বনাথ, বিশ্বনাথ বিশ্বাস। আর জানার পর থেকেই কেমন যেন গুম মেরে বসে আছেন তিনি।
কাজের মেয়ে মালতী চা নিয়ে এসেছিল, ফিরিয়ে দিয়েছেন। মালতী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, সেকিগো জেঠু, তুমি তো অবাক করলে আমাকে। সারাদিন আধঘন্টা পরপর যে চা খেতে চায় ,সেই লোক আজ চা ফিরিয়ে দিচ্চ কেন গ? বলি, কি হলগো তোমার?– শরিল খারাপ নাকি?
বিশ্বনাথ বাবু বেশ জোরে ধমকে উঠলেন, এত কথা কেন বলিস তুই? তোকে নিয়ে যেতে বলেছি নিয়ে যা,চা খাবনা আমি।
বিশ্বনাথ বাবুর চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে তাঁর স্ত্রী কমলা চেঁচিয়ে বললেন, কি হলো রে মালতী? এত চিৎকার চেঁচামেচি কিসের?
মালতি চিৎকার করেই জবাব দেয়, জেঠু চা খাব না বলছে গ।
—– কেন?
—— আরে সেই কারণটা জিজ্ঞাসা করতেই তো আমাকে বকে উঠলো গ জেঠু।
—— না খেলে চায়ের কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে আয়।
—— ঠিক আছে, আসচি।
দোতলা থেকে অশোক নেমে এলো নিচে। অশোক বিশ্বনাথ বাবুর একমাত্র ছেলে। গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে মাস ছয়েক আগে। ক্ল্যারিক্যাল পোস্টে ঢুকেছে। ওর মুখেই শুনেছেন বিশ্বনাথ বাবু যে, ইদানিং গ্রামীণ ব্যাংকে নাকি তাড়াতাড়ি প্রমোশন হয়, অশোক নাকি কয়েক বছরের মধ্যেই চেষ্টা করে অফিসার হয়ে যেতে পারবে। স্কেল ওয়ান থেকে ধীরে ধীরে আরো উপরে উঠতে পারবে।
সেটা তো ভালই। সন্তানের উন্নতি হলে তো বাবা মায়ের মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে ও এভাবে বাবাকে ঠকাবে? আর কমলা? সেও তো ছেলের সঙ্গে মিলে এই কাজটা করল। একবারও ভাবলো না তার কথা!
অশোক নিচে নেমে এসে বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকা অসুস্থ বাবাকে বলল, কি হয়েছে বাবা, চা খেলে না কেন? শরীর খারাপ নাকি?
বিশ্বনাথবাবু কথা বলার অবস্থায় নেই। অতলস্পর্শী ক্ষোভ আর অভিমান প্রসূত কান্না যেন একটা দলা হয়ে আটকে আছে গলায়। তিনি কোন মতে বললেন, শরীর ঠিক আছে।
অশোক রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। ভাত খেয়ে একটু পরেই বেরিয়ে যাবে অফিসে।
ঝামেলাটা শুরু হয়েছিল অশোক চাকরি পাওয়ার মাসখানেক পর থেকেই। যদিও এটার সূত্রপাত হয়েছিল অশোক চাকরি পাওয়ার আগে থেকেই। বিভিন্নভাবে কমলা দেবী স্বামীকে বোঝাচ্ছিলেন বিষয়টা। বিশ্বনাথ বাবু গুরুত্ব দেননি কথাটায়। ওই ভাবেই
চলছিল ।
অশোক চাকরি পাওয়ার পর একদিন রাতে কমলা আবার নতুন করে কথাটা পাড়লেন স্বামীর কাছে। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বিশ্বনাথ বাবু বুঝতে পারলেন যে ,অশোক নিজে না বলে মাকে দিয়ে বলিয়েছিল কথাটা। বিশ্বনাথ বাবু সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দিয়েছিলেন প্রস্তাব, “না না ,এটা হতে পারে না।”
কমলা দেবী স্বামীকে বুঝিয়েছিলেন,” একটু ভেবে দেখো, অশোক তো ভুল বলেনি কিছু।
এখন তুমি অসুস্থ, ঘর থেকে বের হতে পারছ না। কবে সুস্থ হয়ে আবার আগের মত স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারবে তা ভগবানই জানেন।কাজেই সবটা এখন কানাই এর উপর নির্ভর। মানছি , কানাইয়ের বউ মালতি এখন আমাদের বাড়িতে কাজ করে। কিন্তু কোন কারণে যদি কখনো ওর সঙ্গে কোন টক ঝাল হয় আর মালতি কাজ ছেড়ে দেয়, তখন কি হবে?
—— মালতির কাজ করা বা না করার সঙ্গে কানাই এর কি সম্পর্ক বলতো? বহু বছর ধরে কানাই এর বাবা হরেরাম কাজটা করতো। হরেরাম মারা যাওয়ার পরে কানাই কাজটা করে। মালতির সঙ্গে তার কি সম্পর্ক?
—— যে জেগে ঘুমায় তাকে জাগানো যায় না বুঝলে।
পরদিন সকালে বিশ্বনাথ বাবুর কানে এলো,
মা ছেলের কথোপকথন। অশোক মাকে বলছে,” বাবার না সবটাতেই বাড়াবাড়ি! জমি মা। মাকে কি পরের হাতে তুলে দেওয়া যায়? তাহলে ঠাকুরদা চলে এসেছিল কেন নিজের দেশ ছেড়ে? বাবার মুখেই তো শুনেছি, সেখানে নাকি অনেক জমিজমা ছিল ঠাকুরদার নামে। সবতো ছেড়ে আসতে হয়েছে—নাকি?
—— কি জানি বাপু ,ভালো লাগে না তোদের বাপ ছেলের অশান্তি।
—— কি করবো বলো?– বাবা তো অবুঝের মতো করছে। তাও যদি ঠাকুরদা ঠাকুরমা বেঁচে থাকত, তাহলে না হয় কথা ছিল।
বাবার শরীর খারাপ, ঘর থেকে বের হতে পারে না। আমি নাকে মুখে গুঁজে সকাল ন’টায় বেরিয়ে যাই, ফিরতে রাত হয়। ভরসা তো সেই কানাই। আরে, ও যে একদিন কিছু করে বসবে না তার গ্যারান্টি কি?
এরপরে কমলা কি উত্তর দিলেন সেটা শুনতে পাননি বিশ্বনাথ বাবু। গরম কড়াইয়ের তেলে তরকারি ছাড়ার শব্দে কমলার কথা চাপা
পড়ে গেছিল।
১৯৭১ এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী নাগরিকেরা উর্দু শাসকের অপশাসন থেকে মুক্তি পেতে, স্বাধীনতার স্বাদ পেতে লড়াই শুরু করেছিল। মুক্তির লড়াই। মুক্তিকামী বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ার এক ব্যাঘ্র পুরুষ। ডাক দিয়েছিলেন লড়াইয়ের। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ অত্যাচারিত বাঙালি মুক্তির স্বাদ পেতে নেমেছিল লড়াইয়ে। অসম লড়াই। পাকিস্তানের খান সেনারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিকামী মানুষের উপর। তাদের মদত যুগিয়েছিল কিছু ধর্মান্ধ মৌলবাদী মানুষের দল।
এই সুযোগে তারা সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অকথ্য অত্যাচার করতে শুরু করেছিল।
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরপুর বরিশাল জেলার বাইশারী গ্রামে বাস করতেন বিশ্বনাথবাবুর বাবা হরিহার বিশ্বাস।
ছোট ব্যবসা করতেন তিনি। চাষের জমি, পুকুর ,পুষ্করনী, বাগান সবকিছু দেখাশোনা করে খুব ধনী না হলেও ভালোই চলে যেত সংসার ।পুত্র বিশ্বনাথ , কন্যা শুক্লা আর স্ত্রী মৃন্ময়ী কে নিয়ে ভালোই ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্থানীয় মৌলবাদীদের মদতে খান সেনারা নূশংস অত্যাচার শুরু করল। উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যদের লালসার শিকার হলো যুবতী মেয়ে, বউরা। বাধা পেলে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত খান সেনারা। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে অজস্র মানুষকে বন্দুকের গুলি আর বেয়োনেটের খোঁচায় নৃশংস ভাবে হত্যা করত । মুক্তি সেনারা প্রতিরোধের চেষ্টা করেও সব সময় সফল হতো না। বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায় মানুষের উপরে শুরু হয়েছিল অত্যাচার। মুসলমানেরা এদিক সেদিক পালিয়ে আর হিন্দুরা ভিটেমাটি ছেড়ে দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নিজের দেশ ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছিল ।
এমনি সময় একদিন নদীতে স্নান করতে গিয়ে নিখোঁজ হলো হরিহর বিশ্বাসের কিশোরী কন্যা শুক্লা। দিন তিনেক পরে
নদীর পারে হোগলা ঝোপে শুক্লার ক্ষতবিক্ষত লাশ মিলল। ছেঁড়া কাপড় জামা আর ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে বোঝা গেল একাধিক নরপশুর লালসার শিকার হয়েছে সে।
পরের দিনই স্ত্রী পুত্র কে নিয়ে দেশ ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে এলেন হরিহর বিশ্বাস। কখনো রেল স্টেশনে, কখনো ফুটপাতে, কখনো হঠাৎ খুঁজে পাওয়া কোন দেশের মানুষের আস্তানায় ,এদিক সেদিক করে ভবঘুরের মত দিন কাটাতে কাটাতে একদিন এই শীতলপুর গ্রামে এসে পৌঁছেছিলেন হরিহর বিশ্বাস। এই গ্রামের এক ধনী ব্যক্তির বদান্যতায় চূর্ণী নদীর
পাড়ে এক টুকরো জংলা জমিতে নিজের থাকার মত আস্তানা গড়ার অনুমতি পেয়েছিলেন তিনি।
ওই ধনী ব্যক্তির চালকলে একটা অস্থায়ী চাকরিও পেয়েছিলেন। বিশ্বনাথ বাবু তখন বছর বারোর বালক। ওই ধনী ব্যক্তির বদান্যতায় গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক দূরে একটা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বিশ্বনাথ।
ওখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরেই কাজের চেষ্টায় নামতে হয়েছিল বিশ্বনাথ বাবুকে। কারণ তার বাবা হরিহর বাবুর আকস্মিক অসুস্থতা।
এরপর অনেক লড়াই করতে হয়েছে বিশ্বনাথ বাবু কে শুধুমাত্র মা ,বাবা আর নিজের পেটের ভাত জোগাড় করতে। অনেক রকম জীবিকা অবলম্বন করতে হয়েছে তাঁকে।
কিছুদিনের মধ্যে কলকাতায় একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটু ভালো বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন বিশ্বনাথ বাবু।
বাবার খুব ইচ্ছে ছিল একটা ভালো বাড়ি হোক নিজেদের আর এক টুকরো চাষের জমি হোক।
বাবার দুটো ইচ্ছাই পূর্ণ করেছেন বিশ্বনাথ বাবু।
চূর্ণী নদীর পাড়ের ওই অস্থায়ী টিনের চালা ঘর ছেড়ে শীতলপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটুকরো জমি কিনে পাকা বাড়ি বানিয়েছিলেন তিনি।
বাড়ি তৈরি হওয়ার পরে পরেই মা বায়না ধরেছিল ছেলের বিয়ের । মায়ের পছন্দ করা মেয়ে কমলাকে বিয়ে করেছিলেন ।
অশোকের যে বছর জন্ম হয়েছিল ,সে বছরই দুই বিঘা ধানী জমিটা কিনেছিলেন বিশ্বনাথ বাবু ,শুধু বাবার খুশির জন্য । জমিটা কিনতে অফিস কোঅপারেটিভ থেকে টাকা ধার করেছিলেন।
ওই জমিতে তখন অবশ্য ধান হতো না। নয়না বিলের পাড়ে ওই জমিটা প্রায় বারো মাস জলমগ্ন থাকতো। জমিতে ছিল শোলা গাছের জঙ্গল।শোলাগাছের গোড়ায় ছিল মা মনসার দাস দাসীদের অধিষ্ঠান। সেই জমি ধীরে ধীরে সংস্কার করে চাষের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বনাথ বাবু। জমির দক্ষিণ প্রান্তে মাটির চওড়া বাঁধ দিয়ে বিলের জল ঢোকা বন্ধ করেছিলেন। জমিকে চাষযোগ্য করার পর যে বছর প্রথম ধান উঠল ওই জমিতে, বাবার সে কি আনন্দ। প্রায় সারাটা দিন মাঠে বসে ছিলেন। পুত্র বিশ্বনাথকে বাবা-মা দুজনেই প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেছিলেন। হরিহর বিশ্বাস একটা ধানের আঁটি বুকে ধরে ,কাঁচা পাকা ধানের গন্ধ নিতে নিতে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন,”অ বড়বৌ, দ্যাহো দ্যাহো, মোগো পোলা ঠিক দ্যাশের বাড়ির লাখান ধান লইয়া আইসে ঘরে, নিজেগো জমির ধান।”
বিশ্বনাথ বাবুর বাবা হরিহর বিশ্বাস যেন নতুন করে প্রাণশক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। একটা লাঠিতে ভর দিয়ে প্রায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে পৌঁছে যেতেন ওই জমির মাথায়। জমিতে ফসল থাকলেও যেতেন ,না থাকলেও যেতেন।জমির দিকে তাকিয়ে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কি যে দেখতেন কে জানে।
এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। বিশ্বনাথ বাবুর বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। বিশ্বনাথ বাবুর ছেলে অশোক বড় হয়েছে। একে একে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেরিয়েছে। এতগুলো বছর ছেলেকে পড়াশোনা করাতে ,সংসার চালাতে গিয়ে বহুবার মারাত্মক অভাবের মুখোমুখি হয়েছেন বিশ্বনাথ বাবু। কিন্তু ভুল করেও ওই জমি বিক্রি করার কথা চিন্তা করেননি। আর আজ যখন কিনা তাঁর সংসারে কোন অভাব নেই তখন জমি বিক্রি করার কথাটা বারবার বলছিল কমলা ও অশোক।অশোক বলছিল,” কি লাভ হবে জমি রেখে? বছরে ক টাকার ধান পাওয়া যায়? ব্যাংকে টাকাটা ফিক্সড করে রাখলে ওর থেকে বেশি সুদ পাওয়া যাবে। জমি থাকলেই কাদামাটি, ধুলো, ধান ,খড়কুটোয় ঘরবাড়ি নোংরা হয়।”
কিছুদিন থেকে চুপচাপ ছিল অশোক।
বিশ্বনাথ বাবু নিশ্চিন্ত হয়ে ভেবেছিলেন, যাক ভূতটা নেমেছে ঘাড় থেকে। কিন্তু অশোক যে তলে তলে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে এমন কান্ড ঘটাবে এটা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি বিশ্বনাথ বাবু। কথাটা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে কমলার নামে জমিটা কিনেই ভুল করেছিলেন তিনি।
মাস ছয়েক আগে বিশ্বনাথ বাবুর একটা হালকা স্ট্রোক হয়েছিল। বাম দিকটা প্যারালাইসিস হয়ে গেছিল। ফিজিও থেরাপি করে এখন উনি লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে পারেন কোনোমতে। বাড়ি থেকে বের হন না। বড় রাস্তার ধারে বারান্দায় চুপ করে বসে থাকেন। লোকজন দেখেন। একটু আগে আজ সকালে ওখানে বসে থেকেই দেখলেন গ্রামের দক্ষিণপাড়ার হারু মোড়ল হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। পিছনে লাঙ্গল আর বলদ নিয়ে যাচ্ছে হারু মোড়লের কিষাণ বাদল।
বিশ্বনাথ বাবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোথায় চললে গো হারু?
—- ওই নয়না বিলের পাড়ের জমিটা কিনলাম পরশু, ওটা বাদলকে দেখিয়ে দেবো, ও একটা চাষ দেবে।
——- নয়না বিলের পারে কার জমি গো?
—— আহা, তোমার ছেলে আর বৌদি পরশু জমিটা রেজিস্ট্রি করে দিয়ে এলো ।অথচ তুমি এমন করে জিজ্ঞাসা করছ যে ,তুমি যেন কিছুই জানো না! ভারী মজা তো।
ও, এই ব্যাপার। পরশুদিন শহরে জামা কাপড় কিনতে যাওয়ার নাম করে কমলা আর অশোক তাহলে শহরে গেছিল জমি রেজিস্ট্রি করতে!
না,এ হতে পারেনা। নিজের হাতে তৈরি করা এই জমি বিশ্বনাথ কাউকে দেবেন না। ওই জমির সঙ্গে তার বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দরকার হলে এই বাড়ির অর্ধেক বিক্রি করে হারু মোড়লের টাকা ফিরিয়ে ওর হাতে পায়ে ধরে জমি ফিরিয়ে নেবে। বেঁচে থাকতে ওই জমি সে কাউকে চাষ করতে দিতে পারবে না।
ঘরের কোণে ঝুলিয়ে রাখা হরিহর বিশ্বাসের লাঠিটা হাতে তুলে নেন বিশ্বনাথ বাবু। মনে হয় যেন প্রচন্ড জোর খুঁজে পান তিনি।
কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। হাঁটতে শুরু করেন। হারু মোড়ল ওই জমিতে চাষ দেওয়ার আগেই তাকে পৌঁছাতে হবে। বাইরে প্রচন্ড রোদ। মাথার ছাতিটা যেন ফেটে যাচ্ছে। তবু এগিয়ে চলেছেন বিশ্বনাথ। হঠাৎ মাথাটা যেন ঘুরে ওঠে তাঁর।
না না,তাঁকে পৌঁছাতেই হবে জমিটাতে।
ওই তো দেখা যাচ্ছে জমিটা। ঐ তো জমির আলে বাবা বসে আছে । বাবা হাতছানি দিয়ে ডাকছে । কিন্তু বাবার চোখে জল কেন? বাবা কি জেনে গেছে যে,জমিটা বিক্রি করে দিয়েছে কমলা?
বিশ্বনাথ বাবু চিৎকার করেন ,আমি আসছি বাবা, ওই জমি আমি ফেরত নিয়ে নেব । তুমি একদম দুঃখ করো না।
বাবা ফোকলা দাঁতে ফিক করে হাসল মনে হচ্ছে।
বিশ্বনাথ বাবু মনে আরো জোর পেলেন। হাঁটার গতি বেড়ে গেল তার।
হারু মোড়ল জমিটা দেখিয়ে কি যেন বলছে বাদলকে। বিশ্বনাথ বাবু চিৎকার করে উঠলেন,”হারু, জমিতে নেমোনা।”
একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ বেরিয়ে আসে গলা দিয়ে। ওই তো হারু মোড়ল তাকিয়েছে তার দিকে।
বিশ্বনাথ বাবু ছুটতে ছুটতে জমির মাথায় পৌঁছে যান। কিন্তু বাবা কোথায় গেল? এইখানেই তো বসে ছিল । তবে কি বাবা তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে সেই ছোট্টবেলার মত?
—- বাবা টুকি,বাবা টুক্কি—-টুক্কি!
বিশ্বনাথ বাবুর বুকটা কামারশালের হাপরের মত উঠানামা করছে। দম যেন ফুরিয়ে আসছে তাঁর।হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেন বিশ্বনাথ বাবু।
হারু মোড়ল কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে ,”কি হয়েছে বিশ্বনাথ, এমন করছ কেন? ”
—-জ -জ- জ ——জ–মি,…..আ ——আ —মা র —–জ—!
—– হ্যাঁ ,জমি ।—কি হয়েছে?
কথা বলতে যান বিশ্বনাথ বাবু। পারেন না।
মাথাটা ঘুরে ওঠা তার। চোখের সামনে সব কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।
হারু মোড়ল তাকে ধরে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বসতে পারেন না বিশ্বনাথ বাবু। মুখ থুবড়ে পড়ে যান জমিতে। তাড়াতাড়ি হারু মোড়ল তাকে তোলার চেষ্টা করে। পারেনা। বিশ্বনাথ বাবুর দু’ হাতের মুঠিতে জমির মাটি। খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরা।