সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৫)

দেবমাল্য

— চার্জে না দিলে চার্জ থাকবে কী করে? এখানে চার্জার নেই? মাছ স্বপন প্রশ্ন করতেই ও বলল, আছে, লাগিয়ে দেব।
— পরে ভুলে যাবেন। আমাদের সামনেই লাগিয়ে দিন।
কোনও ট্যাঁ ফুঁ করেনি দেবমাল্য। ফোনটাকে চার্জে বসিয়ে দিয়েছিল। মাছ স্বপন ফের বলেছিল, আমি ভদ্রঘরের ছেলে দেখে আপনার সঙ্গে এত কথা বললাম। অন্য কেউ হলে… এই দেখুন, বলেই,আঙুল তুলে কারখানার গেট আগলে দাঁড়িয়ে থাকা টাটাসুমোটাকে দেখিয়েছিল সে। গাড়িতে কয়েকটা ছেলে বসা। ও বলেছিল, ওই যে লাল জামা পরে আছে যে ছেলেটা, সে আটটা খুনের আসামি। এখনও ওয়ান্টেড। আর ডোরাকাটা গেঞ্জি পড়ে যে, সে হচ্ছে সোমেনদার ডান হাত। ছোটবেলায় বোমা বাঁধতে গিয়ে ডান হাতের কবজি থেকে উড়ে গিয়েছিল। বাইরে যত থাকে, তার থেকে বেশি থাকে জেলে। এখন বেলে আছে। ওরা তো বলছিল, এত কথা কীসের? যাবি। জিজ্ঞেস করবি, দেবে কি দেবে না। দিলে ভাল। না দিলে দুটো দানা ঘুসিয়ে দিবি। ব্যস, খেল খতম। কিন্তু আমি তো ওদের মতো না। ভাল বংশের ছেলে। পড়াশোনা করেছি। এইট পাস সার্টিফিকেট আছে। তাই আপনাকে এত কথা বললাম। যা ভাল বুঝবেন করবেন। আমাদের সঙ্গে দু’নম্বরী করবেন না। আমি আপনাকে ছেড়ে দিলেও, আমার এই সব ছেলে যদি ক্ষেপে যায়, তখন আমার আর কিছু করার থাকবে না।
সে দিনই দেবমাল্য ঠিক করে ফেলেছিল, ও কী করবে। মাছ স্বপন তো পঁচিশ চেয়েছে, দরাদরি করে সেটা পনেরো লাখে নামাবে। কিছু টাকা গেলে যাক, তাও ভাল। তবু এখানে আর এক মুহূর্ত নয়। তা হলে কোথায়!
সেই জায়গাটা খোঁজার জন্যই ও এসেছে এই দৌলতাবাদে। জায়গাটা ভারি মনোরম। চমৎকার। শান্ত। নিরিবিলি। তার চেয়েও বড় কথা, এখানে কোনও মস্তানদের উপদ্রব নেই। জুলুম নেই। হোটেলে এসে শুধু ম্যানেজারকেই নয়, হোটেলের অন্যান্য কর্মচারী, হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে আশপাশের দোকান, পান-বিড়ি সিগারেটের দোকান, এমনকী স্থানীয় লোকজনেদের কাছেও ও জানতে চেয়েছিল, জায়গাটা কেমন? প্রত্যেকেই এক কথা বলেছেন, ভাল। সমস্যা শুধু একটাই, আর তা হল, এখানে খুব লোডশেডিং হয়।
স্থানীয় মস্তানদের দৌরাত্মে কালীবাবুর বাজারে ব্যবসা করা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শুনে, তার এক ব্যবসায়ী বন্ধু তাকে বলেছিল, তুই তো বেশিরভাগ মালই সাপ্লাই দিস বহরমপুরে। তা, ওখানকার আশপাশে কোথাও কারখানাটা তুলে নিয়ে যা না… তাতে তো তোর ক্যায়ারিং কস্টও অনেক কম পড়বে।
সে-ই বলেছিল এই দৌলতাবাদের কথা। এই জায়গাটা সম্পর্কে সে যা যা বলেছিল, তার সঙ্গে এখানকার লোকজনের অনেকগুলো কথাই মিলে গেছে। তার মানে, বাকিগুলোও মিলে যাবে। আর তা যদি মিলে যায়, তা হলে তাকে ব্যবসা করার জন্য এখানে আর শেড বা বাড়ি ভাড়া নিতে হবে না। তার যা বাজেট, তাতেই অনেকটা জমি কিনে কারখানা বানিয়ে নিতে পারবে। আর ওই বন্ধুর কথামতো এখানে যদি কম টাকায় লেবার পাওয়া যায়, তা হলে তো কথাই নেই। সোনায় সোহাগা। কালীবাবুর বাজার থেকে দু’-চার জন দক্ষ কারিগরকে নিয়ে এসে এখানকার লোকেদের কাজ শিখিয়ে নিলেই হবে।
পুরো ব্যাপারটা সে ছকে ফেলেছে। মোটামুটি নিশ্চিন্ত। তাই বিকেলেই তানিয়াকে ফোন করে বলে দিয়েছে, এখানে চলে আসার জন্য। তা হলে এই জায়গাটা সেও দেখে যেতে পারবে, সে এখানে থাকতে পারবে কি না। কারণ, এখানে ব্যবসা তুলে নিয়ে এলে, থাকতে হবে এখানেই। তা ছাড়া তানিয়া এলে এখানকার কাজ মিটিয়ে একটু মুর্শিদাবাদটাও ঘুরে আসতে পারবে তারা। এখান থেকে খুবই কাছে। আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে ইংরেজদের কাছে বাংলা যেখানে পরাধীন হয়েছিল, সেটা না দেখলে হয়! এখানে কত কী দেখার আছে!
খুব ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে ও একবার বাবার সঙ্গে মুর্শিদাবাদে এসেছিল। এখনও মনে আছে সেই হাজারদুয়ারির কথা। লোকে যে কেন ওটাকে হাজারদুয়ারি বলে কে জানে! ওখানে তো হাজারটা দরজা নেই। আছে ছ’শোটা। বাকি চারশোটা তো নকল।
মনে আছে ফুটো মসজিদের কথা। কে নাকি এক রাতের মধ্যে তিনটি গম্বুজওয়ালা একটা প্রকাণ্ড মসজিদ বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাজার লোকলস্কর নিয়েও শেষ পর্যন্ত তিনি আর তা করে উঠতে পারেননি। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করলেও তৃতীয় গম্বুজটার মাথা ঢালাইয়ের আগেই নাকি সকালের আলো ফুটে গিয়েছিল। ফলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সেই থেকেই ওটা ওই অবস্থায় পড়ে আছে। ওই গম্বুজের নীচে দাঁড়ালে মনে হয়, বাজ পড়ে বুঝি মাথাটা ফুটো হয়ে গেছে। ওটার নাম তাই ‘ফুটো মসজিদ’।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।