সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৬)

দেবমাল্য
মনে আছে মতিঝিলের কথা। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার মাসি ঘসেটি বেগম বড় সাধ করে, কয়েক মাইল এলাকা জুড়ে হিরে-মণি-মাণিক্য দিয়ে কারুকার্যখচিত চোখ ধাঁধানো একটা রাজপ্রাসাদ বানিয়েছিলেন। সামনে ছিল নিশ্ছিদ্র প্রহরী। পেছন দিক থেকেও কেউ যাতে আক্রমণ করতে না-পারে, সে জন্য ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’-এর মতো করে একটা জলাশয়ও খনন করিয়েছিলেন তিনি। মাপজোখ করে সেটা এতটাই চওড়া করেছিলেন যাতে ওপার থেকে অত্যাধুনিক কামান দাগলেও, তাঁর প্রাসাদের ত্রিসীমানার ধারেকাছেও গোলার একটা ফুলকিও এসে না পৌঁছয়।
সেই জলাশয় বা ঝিলে ঝিনুক থেকে তিনি বড় বড় মুক্তো চাষ করাতেন। সম্রাট সেই মুক্তো উপহার পেয়ে এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে, মুক্তোকে যেহেতু চলতি ভাষায় ‘মতি’ বলে, তাই তিনি ওই ঝিলটার নামই দিয়ে দিয়েছিলেন— মতিঝিল।
মাইলের পর মাইল জমির ওপরে হিরে-জহরতখচিত যাঁর প্রাসাদ, তাঁর কাছে না জানি কত ধনরত্ন আছে, এমনটা আন্দাজ করে ইংরেজরা এ দেশ দখল করার পর অন্যান্য রাজপ্রাসাদের মতো এখানেও হানা দিয়েছিল লুঠপাট করার জন্য। কিন্তু তারা কিছুই পায়নি।
পরে বাগানের ভেতরে মসজিদের পাশে একটা বিশাল বদ্ধঘর আবিষ্কার করে তারা। যার কোনও দরজা-জানালা নেই। লোকমুখে তারা জানতে পারে, কেউ যাতে টের না পায়, সে জন্য ঘসেটি বেগম নাকি তাঁর প্রাসাদের তলা থেকে একটি সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে এসে এই ঘরটার ভেতরেই ধনরত্ন লুকিয়ে রাখতেন। কিন্তু হাজার তল্লাশি করেও তারা সেই সুড়ঙ্গপথ খুঁজে পায়নি। ফলে ইংরেজরা ওটাকে ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগে। অনেক চেষ্টা করেও ভাঙা তো দূরের কথা, দেওয়ালের গায়ে এতটুকু আঁচড়ও কাটতে পারেনি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে দেয়।
পরে, অনেক পরে, একবার এক চিনা গোলন্দাজ মসজিদের চাতালে কামান বসিয়ে ওই বদ্ধঘর লক্ষ্য করে মাত্র কয়েক মিটার দূর থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী গোলা ছোড়ে। তাতে বদ্ধঘরের দেওয়ালটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটির মতো একটু টোপ খায় ঠিকই, কিন্তু একটা ইটও খসে পড়ে না। তার থেকেও বড় কথা, যে দিন ওই গোলন্দাজ কামান দাগে, সে দিনই সন্ধেবেলায় দিব্যি সুস্থ মানুষ হঠাৎ কী হল, কে জানে! রক্ত বমি করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আর ওঠে না।
শুধু সে-ই নয়, এর ক’দিন পরে তার একমাত্র ছেলে ইউ আঙ্ক কিটিং মাত্র পাঁচ বছর দু’মাস এগারো দিন বয়সে কোনও অসুখ-বিসুখ ছাড়াই আচমকা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
এই ঘটনার পরেই লোকেরা বলতে শুরু করেন, ওই বদ্ধঘর ভাঙতে যাওয়ার জন্যই উনি নির্বংশ হলেন। এই ধরনের মন্তব্যকে কাকতালীয় ঘটনা বলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে আর এক ইংরেজ প্রচুর লোকলস্কর নিয়ে ভাঙতে গিয়েছিল ওটা। না, মণি-মাণিক্যের লোভে নয়, নিছক ভেতরে কী আছে, তা জানার জন্য। কিন্তু অত লোকজন নিয়ে হাজার চেষ্টা করেও কোনও হাতুড়ির ঘা কিংবা একটা ছেনির আঁচড়ও সে বসাতে পারেনি ওই বদ্ধঘরের দেওয়ালের গায়ে। উল্টে সে দিনই এক বিষাক্ত সাপের দংশনে তার মৃত্যু হয়।
ব্যস, ওটাই শেষ। তার পর আর কেউ ওটাকে ভাঙার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।
আরও অনেক কিছু দেখেছিল সে। মিরজাফরের সমাধিতে গিয়ে ও চমকে উঠেছিল। বিশ্বাসঘাতক বলে লোকে এখনও তাকে এভাবে ঘেন্না করে! সমাধিস্থল দেখতে এসে এভাবে থুতু ছেটায়! এইভাবে সমাধির ওপরে ইট ছুড়ে মারে! এ জন্যই কি তার বসতভিটে, যেখানে তার বংশধরেরা এখনও বসবাস করে, সেখানে পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ! গিয়ে যদি আবেগবসত কিছু করে বসে, সেই ভয়ে! বংশের কোন্ এক পূর্বপুরুষ কবে কী করেছে, তার দায় তার উত্তরসূরিদের এখনও বয়ে বেড়াতে হবে! এর কোনও মানে হয়, ছি!