“মেঘ, মেঘ শিগগির আয়, মামাদাদু ভিডিও কল করেছে সুন্দরবন থেকে।” মার ডাকটা শুনেই মেঘ দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে নেমে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতে পেল, মামাদাদু একটা বড় নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে এক গভীর জঙ্গল।
মেঘ হাসতে হাসতে বলল, “দাদু, তুমি কোথায় গেছো?”
“আমি সুন্দরবনে এসেছি। এই জায়গাটার নাম ঝড়খালি।”
“দাদু, তোমার পেছনে কত বড় নদী, জঙ্গল! তোমার ভয় করছে না দাদু?”
“করছে তো! অল্প অল্প।”
“দাদু, ওই নদীটার নাম কি?”
“হেড়োভাঙ্গা নদী। এই নদীতে অনেক কুমীর আছে। ওই জঙ্গলে অনেক বাঘ আছে।”
“তুমি কেন গেছো দাদু?”
“আমি তো পুজোর জামা দিতে এসেছি।”
“কাদের দেবে পুজোর জামা।”
“এখানে একটা গ্রাম আছে। এই গ্রামে তোমার মত অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা থাকে। আমরা এসেছি ওদের পুজোর নতুন জামা দিতে।”
“তাই! কি মজা! ওরা সবাই নতুন জামা পাবে?”
“সবাই পাবে। আর দুটো বাঘ আছে এখানে। সেই দুটো বাঘের জন্যও এনেছি নতুন জামা!”
“বাঘের জন্য নতুন জামা! হা হা হা…দাদু তুমি মিথ্যে কথা বলছো।”
“না না। মিথ্যে নয়। সত্যি বলছি।” মামাদাদু খুব হাসছে।
হেড়োভাঙ্গা নদীতে বড় একটা লঞ্চ ভেসে আছে। হাওয়ায় দুলছে লঞ্চটা। কি সুন্দর সাদা রঙের দোতলা লঞ্চ। মেঘ দাদুর পিছনের লঞ্চটা দেখে বলল, “দাদু তোমরা কি ওই লঞ্চে করে জঙ্গলে যাবে?”
“না। আজকে তো আর যাওয়া হবে না । পরে একবার এসে যাব ওই জঙ্গলে।”
“তাহলে বাঘকে পাবে কোথায়? নতুন জামা দেবে কি করে?”
“বাঘদুটো তো এখানে একটা পার্কে থাকে। ওদের খাঁচায় বন্দী করে রেখেছে। এই পার্কটাকে বলা হয় টাইগার রেসকিউ সেন্টার।”
“তাই! দাদু আমাকে তুমি নিয়ে যাবে?”
“তোমার ভয় করবে না তো!”
ভিডিও কলে মামাদাদুর সাথে কথা শেষ করেই মেঘ মাকে বলল, “জানো মা, মামাদাদু সুন্দরবনের বাঘকেও পুজোর নতুন জামা দিতে গেছে!”
“ওমা! তাই নাকি!” মা তো খুব অবাক হয়ে হেসে হেসে বলল।
“বাঘ দুটোর কি মজা! পুজোয় নতুন জামা পরে খাঁচায় ঘুরে বেড়াবে। আচ্ছা মা, বাঘ কি পুজো বুঝতে পারে?”
“পারে নিশ্চয়ই। সুন্দরবনের জঙ্গলে তো বনবিবির পুজো হয়। দক্ষিণ রায় ঠাকুরের পুজো হয়। বাঘ রা তো সব জানে। লুকিয়ে লুকিয়ে পুজো দেখে!”
“তাই নাকি! সুন্দরবনের জঙ্গলে এই সব ঠাকুরের পুজো হয়? বাঘেরা লুকিয়ে লুকিয়ে সেই পুজো দেখে!” মেঘের খুব মজা লাগে। মায়ের সাথে গল্প করতে করতে মেঘ দেখতে পেল, ক্যাটি বাগানের টগরফুল গাছের ছায়ায় কেমন যেন মন খারাপ করে বসে আছে।
কালো কুচকুচে বিড়াল ছানাটার নাম মেঘ দিয়েছে ক্যাটি। পাড়ায় সব বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় ক্যাটি। তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে মেঘেদের বাড়িকে। ক্যাটি এই বাড়িতেই খায়, ঘুমোয়, বিশ্রাম নেয়। মেঘের সাথে খেলাও করে। মেঘ ক্যাটির কাছে গিয়ে বলল, “কি রে ক্যাটি, তুই চুপ করে বসে আছিস কেন? তোর মন খারাপ? কি হয়েছে বল না?”
কালো কুচকুচে ক্যাটি চকচকে দুটো চোখ নিয়ে তাকাল মেঘের দিকে। ওর চোখদুটো হঠাৎ দেখলে ভয় করবে। খুব হিংস্র মনে হয় ওর চোখের চাউনিটাকে। কিন্তু এখন যেন মেঘের মনে হল ক্যাটির চোখ ছলছল করছে! ক্যাটি কি মন খারাপ করে কাঁদছে!
মেঘ ঘরে এসে দেখল, মা কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে, “পুজো তো এসেই গেল। মনে মনে খুব আনন্দ হচ্ছে রে! তবে কিন্তু এবার ঠাকুর দেখতে কোথাও যাব না। নতুন শাড়ি পরে বাড়িতেই থাকব, পাড়ার পুজো মণ্ডপে একটু যাব। ব্যাস। করোনা এবার যা ছড়াবে না!..
মেঘ বারান্দায় চলে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছে, ক্যাটিকেও তো পুজোয় একটা নতুন জামা দিলে হয়। ওর নিশ্চয়ই পুজোয় একটাও নতুন জামা হয় নি। তাই মন খারাপ। মামাদাদু তো বাঘকে নতুন জামা দিতে গেছে। আমরা বাঘের মাসিকে দেব পুজোর নতুন জামা!
মেঘ বারান্দা থেকে ছুটে এল মায়ের কাছে। মা তখন ক্যাটিকে খাওয়ার দিচ্ছে। ক্যাটি কি আনন্দ করে মাছের কাঁটাগুলো খাচ্ছে। মেঘ মায়ের কানে কানে ফিস ফিস করে বলল ওর ইচ্ছেটা। মা তো শুনে খুব হাসল। হাসতে হাসতে বলল, “দারুণ হবে তাহলে!”
মেঘ এবার আবদার করে বলল, “মা, মা, তুমি একটু ভিডিও কল করো না মামাদাদুকে। আমি ক্যাটিকে দেখিয়ে বলব, ওর জন্যও আমরা আজ নতুন জামা কিনব! মামাদাদু, তুমি বাঘ মামাকে বলে দাও, “তোমার মাসীকেও পুজোর নতুন জামা দেওয়া হবে!…