T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় শম্পা সাহা

দখল
ন্যাংলা অনেকক্ষণ ধরে দুই পা ছড়িয়ে বসে বাগে আনার চেষ্টা করছে বিষয়টা! কিন্তু ন্যাংলা যত মরিয়া সেই বিষয় তেমনি তেরিয়া! বাঁ পায়ের বুড়ো আর তার পাশের আঙ্গুল দিয়ে সরু বাখারির শলার একপ্রান্ত আর অপরপ্রান্ত বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমায় ধরে যতবার ঘুড়ির কান্নিক লাগাতে যায়,ততবার পায়ের আঙ্গুল ফসকে ফটাং! পাতলা ফিনফিনে ঘুড়ির লাল নীল কাগজ জোড়া লাগিয়ে যতবার তাতে কান্নিক লাগানো ততবারই এই এক ঘটনায় ভারী রেগে, ন্যাংলা ধুত্তোর বলে হাত ঝাড়তেই, হাতের ধাক্কায় ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাটিটা উল্টে ভাত ছড়িয়ে ছত্রখান!
প্যাংলার ততক্ষণে সরু সরু করে বাঁশ চাঁছতে গিয়ে ঘেমে জেরবার অবস্থা! ন্যাংলার এই হাল দেখে, কপালের গড়িয়ে পড়া ঘাম আর তার আশ্রয়ে দুচারটে বিজবিজে ঘামাচি নখের আঁচড়ে একেবারে সমূলে উপড়ে, একটু জ্বালাজ্বালা ভাবে হাত ঘষতে ঘষতে, প্যাংলা বলে,
– কী রে? এখনো হলুনি?
-এচ্ছাই বার বার ফেঁসে যাচ্চে! ধুর! এ হবেনি! চল না প্যাংলা মায়ের কাছে চাই!
– থালেই হয়েচে! যা গে মায়ের কাছে! একুনি দেবের পিঠের উপর গুদোম গুদোম!
-হ্যাঁ, তুমি আর চিল্লিয়ে মাকে তুলোনি! থালে একুনি!!!
চোখের ইশারায় দুই ভাইয়ের কথা সারা! নেত্যকালী ঘরে তখন ঘুমে বেভুর! তার বিশাল বপু খাটের মধ্যপ্রদেশ দখল করে স্বসম্মানে! এই সাত বাই ছয় খাটে একা ওর রাজত্ব! দুই ছেলে নিয়ে শ্রীপতিচরণের সেখানে জায়গা হয় না। শ্রীপতি মেঝেয় , গরমে ছালা আর শীতে তার উপরে একখানা ধুঁসো কম্বল! ছেলেদের জায়গা রান্নাঘরের পাশের ছোট ঘরখানায়! সেখানে সাইকেল, ব্যাটবল, লাটাই, ঘুড়ি, হাবিজাবি, ছেঁড়া তার, ভাঙা চুম্বক আর তার মাঝে একটা তক্তপোষে দুই ভাইয়ের রাম রাজত্ব! সেখানে অবশ্য একটা পায়া ভাঙ্গা টেবিল আর তার উপরে খানিক বই, খাতা, ছেঁড়া ব্যাগ মায় একটা গত মেলায় কেনা প্লাস্টিকের পেনদানি পর্যন্ত বিরাজমান। কিন্তু তাতে পেনের বদলে রং করা পাটকাঠি, একটা স্ক্র ড্রাইভার, দুটো বড় গজাল, আর গোটা পাঁচেক ছোট পেরেক কোনো রকমে ওই পেনদানির সম্মান বজায় রাখছে!
এখন অবশ্য সে ঘরে পদার্পণের জো নেই! কাগজের টুকরো, চ্যাটপেটে গলা আঠা আঠা ভাত, বাঁশের সরু সরু কঞ্চি আর মাঞ্জার সুতোতে ঘরময় এক যুদ্ধকালীন অবস্থা। তাই দুই ভাইয়ের এই মুহূর্তের বারান্দা আরোহন! মিশন ঘুড়ি চলছে তাদের গত দিন পাঁচেক। যদিও সারা বছরই এসব চলে, কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিনগুলো যেন মার মার কাট কাট অবস্থা! ন্যাপাল, গদাই, হারু, জয়ন্ত, লাল্টু এদের সবার ঘুড়ির বাহার দেখে দেখে ন্যাংলা প্যাংলার হীনমন্যতা প্রায় আকাশপ্রমাণ! ওদের অবশ্য সব বানানো নয়, কিছু কেনাও কিন্তু অত ঘুড়ি কেনার পারমিশন নেত্যকালী কোনোদিন দেবে না। যতই ভুষিমালের ব্যবসায় টুপাইস কামাক, গিন্নির অনুমতি ছাড়া ডান বাঁ করার ক্ষমতা নেই শ্রীপতির! সেখানে স্ত্রীকে এড়িয়ে ছেলেদের ঘুড়ি কেনার পয়সা দিলে বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ কেউ আটকাতে পারবে না! সে ওরা দুই ভাই ভালোই জানে। অনেক অনুরোধ উপরোধ করে যে টাকা পাওয়া গেছে, তাতেই এই ঘুড়ির ছোটখাটো কর্মশালা!
অনেক চেষ্টাতে এইসব করেও যখন কিছুতেই ঘুড়ি দাঁড়ালো না, তখন আর কী করা! ওদিকে দুপুর বিকেল ছুঁইছুঁই! জলঙ্গীর তিরতিরে জলে কমলা মরা রোদ বেশ ঘুলে গিয়ে রঙীন করে তুলেছে, সেই যেমনটা ন্যাপলার জন্মদিনে রসনার হয়েছিল! তখন কি আর এই দুই মক্কেলকে ঘরে আটকে রাখা যায়! এক ফাঁকে ঘাড় উঁচু করে দেখে, নেত্যকালি তখনো তার দ্বিপ্রহরিক নিদ্রালুতা ছাড়ার নাম নেয়নি, কিন্তু খেলার বেলা কি আর তার জন্য থমকে থাকে? দুজনে গুটিগুটি পায়ে হাওয়াই চটি গলিয়ে এক ছুটে নদীর ধারে।
সামনের আগারি ঘাটের চাতালে ততক্ষনে বেশ মজলিস বসে গেছে। ও কী রে!! বলেনি তো!! দুই যমজ ভাই, তখন বন্ধুদের কাজ কারবারে বেশ চমকে চ! এ যেন ঘুড়ির প্রদর্শনী, ঠিক যেমনটি হয় কালী পুজোর আগে। ওরা প্লাস্টিকে করে বয়ে নিয়ে আসে ওদের সবার বাজির পসরা! কার কত রকমের আর কত বেশি বাজি আছে সেটা বন্ধুদের দেখান যদিও আপাত উদ্দেশ্য কিন্তু আসলে নিজের বাজির স্টক দেখিয়ে অপরকে চমকে দেওয়াই লক্ষ্য! তুবড়ি, কালিপটকা, দোদমা, ফটাশ বোম, কারেন্টের তার, সাপবাজি এমনকি চকলেট বোম, আর রং মশালও! নানা রকমের বাহারি বাজি আর বারুদের গন্ধে সে এক আহামরি আনন্দ! তার আবার দুপুরে দুপুরে রোদে দেওয়ার পালা! সেখানেও বন্ধুদের ডেকে দেখানো কার বাবা দোকান থেকে,কার বাবা বাজির বাজার থেকে আর কার মামা কোন বড় বাজির কারখানা থেকে কী কী রকম বাজি এনে দিয়েছে! বাজি পোড়ানোর চেয়ে দেখানোতেই যেন মজা বেশি!
আজ যে সে রকমই ঘুড়ি দেখাদেখির পালা তা তো ওদের কেউ বলেনি! ভারী মন খারাপ দুই ভাইয়েরই! ইশ গদাইয়ের পেটকাটিগুলো কী সুন্দর! ওই ঘুড়িগুলোর কী বাহারি লেজ! ওদিকে জয়ন্তর ঘুড়ির কাগজ কী চকচকে! যেন প্লাস্টিক মতন! মোমবাতি, চাঁদিয়ালগুলোও ভারী অপূর্ব! ন্যাপলার ঢাউশটা কী সুন্দর আকাশি রংয়ের! গোখরো আর কামরাঙা নামের দুটো নতুন রকম ঘুড়ি নিয়ে ইমন যা বাহাদুরি করছিলো! ওগুলো নাকি ওর মামা বাংলাদেশ থেকে এনে দিয়েছে। বিদেশী ঘুড়ি বলে কথা!
– ভারী তো বাংলাদেশ, তার আবার বিদেশ!!
প্যাংলা মুখ ব্যাঁকায়। বন্ধুদের ঘুড়ির মেলায় ওদের নিজেদের বড় গরীব, বড় অসহায়, বড় দুঃখী মনে হয়। সবাই অনেক অনেক ঘুড়ি এনেছে, দেখাচ্ছে, একে অপরেরটা নেড়েচেড়ে দেখছে! বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কোন সময়ে কোন ঘুড়িটা ওড়াবে তা নিয়ে আগারি ঘাটতলা কুচোকাঁচাদের কলরবে সরগরম। কাল থেকে শুরু হবে সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া। তার জন্য কাঁচ লাগবে, আঠা লাগবে, সুতো লাগবে! তার কত যোগাড়! ওদের এই বিশেষ কাজের তদারকি করে সুভাষ সংঘের ন্যাংটা দা! সবাই মিলে ঠিক হচ্ছে,কাল বিকেলে ঠিক কখন ন্যাংটাদার কাছে যাবে। কিন্তু এখানে ওদের কোনো ভূমিকা নেই, কথা নেই, করারও কিছু নেই। ওদের কেউ ডাকছেও না, ওদের যে ঘুড়িই নেই।
এত কিছু দেখে দুই ভাই মন খারাপ করে গুটিগুটি সরে আসে ওখান থেকে! ওদের যেন কেউ নেই, কিছু নেই! কোনো বন্ধুও না, মা বাবা তো নাইইই! মা বাবা থাকলে কি ওদেরও গদাইয়ের মত অতগুলো মোমবাতি বা নিদেন ন্যাপলার মত একটা ঢাউশ থাকতো না? কই নেই তো!! আর বন্ধুরাও বা কই? এই যে আজ ওরা দুভাই গেল, কেউ কি একবারও ওদের ডেকেছে? দেখিয়েছে যে,
– দেখ ন্যাংলা এটা কী সুন্দর!
– এই ঢাউশের রংটা বেশ না?
নাঃ! কেউ ওদের পাত্তাও দেয়নি!
-আমাদের ঘুড়ি নেই তো নেই! আমরা হ্যাংলা নাকি যে চেইয়ি চেইয়ি দেকবো, বল ন্যাংলা?
-ঠিক, আমারা চাই না দেকতে! হুঃ! ভারী তো ঘুড়ি!
-আমরাও আগামী বচর অনেক ঘুড়ি কিনবু আর ওদের দেকি দেকি ওড়াবু!
-ঠিক, এ বচর আমরা ঘুড়ি ওড়াবুও না আর দেকবুও না বল?
-হু, ঠিক বলেচিস। আমাদের বয়ি গেচে ও ঘুড়ি দেকতি!
ব্যস! দুই ভাই তাদের বঞ্চনা, না পাওয়ার মন খারাপে নিজেরাই মলম লাগায়। ঘাটের পার থেকে সরে এসে পা বাড়ায় বড় ফিল্ডের দিকে! ওখানে বড় দাদারা রোজ ক্রিকেট খেলে। ওখানে তো আর ঘুড়ির মন খারাপ নেই!
বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকালে রোজকার মত বড় জামবাটি ভর্তি বাড়ির গরুর দুধ আর দুটো করে রুটি খেয়ে, দুই ভাই বাইরে বের হয়। আজ ওদের ছুটি। ওদের বাড়ির কাছাকাছি কোথাও বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে না! এ কি কলকারখানার পাড়া নাকি যে মাইক বাজিয়ে, প্যান্ডেল খাটিয়ে পুজো হবে? মা সকাল সকাল বাবার সাইকেলের হ্যান্ডেলে খড়িমাটিতে গাদা ফুল চুবিয়ে ছাপ দিয়ে , একটু ফুল ছিটিয়ে,ধূপ দেখিয়ে পুজো সেরেছে। প্রসাদ বলতে রোজকার নকুল দানার সঙ্গে একটা শশার টুকরো। দুই ভাইয়ের মিশন ঘুড়ি ডাঁহা ফেল! মনমরা দুজন অনেকটা মন খারাপ নিয়ে বাড়ির বাইরে পা দেয়। কিন্তু নীল আকাশে চোখ পড়তেই মনটা নেচে ওঠে। বিরাট নীল আকাশটায় এক ঝলমলে রোদ্দুর। সারা আকাশ জুড়ে ভাসছে লাল, নীল, হলুদ,সবুজ, আকাশি ঢাউশ, মোমবাতি, বগ্গা, চাঁদিয়াল! নানা রকমের, নানা রংয়ের ঘুড়ি! পুরো আকাশটা যেন ঘুড়ির দখলে! নিমেষে দুই ভাইয়ের মন খারাপ উধাও! ঝলমলে খুশিতে দুজনেই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ঠিক করে ওদের পরবর্তী কর্মসূচি! টেনে দৌড় দেয় সুভাষ সংঘের মাঠে, যেখানে পাড়ার বড়, ছোট, মেজো, সেজ ঘুড়ি প্রেমিক তাদের লাটাই আর ঘুড়ি নিয়ে হাজির আকাশের দখল নিতে!